আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করছেন: তিনি মানুষের প্রতি এক বিন্দুও জুলুম করেন না; বরং মানুষই নিজের উপর জুলুম করে। এই একটি বাক্যেই ন্যায়ের চূড়ান্ত মানদণ্ড স্থির হয়ে যায়। আমাদের দুঃখ, আমাদের বিভ্রান্তি, আমাদের পতন—সবকিছুর ভেতর একটি মৌলিক সত্য লুকিয়ে আছে: সৃষ্টিকর্তা কখনও বান্দার অকল্যাণ চান না, কিন্তু বান্দা অনেক সময় এমন পথ বেছে নেয়, যাতে তার নিজেরই আত্মা ক্ষতবিক্ষত হয়। পাপ, অবহেলা, অহংকার, সত্যকে অস্বীকার, কৃতজ্ঞতাহীনতা—এসব কিছুর ভার শেষ পর্যন্ত মানুষকেই বইতে হয়। আল্লাহর দরবারে অবিচারের কোনো আশঙ্কা নেই; আশঙ্কা মানুষের সেই অন্তর্দহন, যেখানে সে নিজেই নিজের জন্য অন্ধকার তৈরি করে।
সূরা ইউনুসের এই অংশে তাওহীদ, রিসালাত, কুরআনের সত্যতা এবং আখিরাতের জবাবদিহি—সবগুলো স্রোত এক জায়গায় এসে মিলেছে। এই সূরায় বারবার মানুষকে স্মরণ করানো হচ্ছে যে সত্য উন্মুক্ত, নিদর্শন স্পষ্ট, আর আল্লাহর বাণী নির্ভরযোগ্য; তবু অনেকে জেদের কারণে, দুনিয়ার মোহে, বা পূর্বধারণার ভারে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে। তাই এই আয়াত শুধু একটি ন্যায়বাক্য নয়, এটি মানব-হৃদয়ের আয়না। যে হৃদয় অহংকারে আচ্ছন্ন, সে নিজের কল্যাণকে ক্ষতির সঙ্গে বদলে ফেলে; আর যে হৃদয় আল্লাহর কাছে নতি স্বীকার করে, সে বুঝতে পারে—আল্লাহর রহমত অতিক্রম করে না, কিন্তু মানুষ নিজের ভুলে সেই রহমতের দরজাকে দূরে ঠেলে দিতে পারে।
এখানে কোনো দুর্বল অভিযোগ নেই, নেই কোনো অস্পষ্টতা—বরং এক গভীর ঐশী ঘোষণা আছে, যা কিয়ামতের দিনের জবাবদিহিকে আরো তীক্ষ্ণ করে। মানুষ যখন নিজের কর্মফল দেখে, তখন সে উপলব্ধি করবে, ক্ষতি আল্লাহর সিদ্ধান্তে নয়; ক্ষতি তার নিজের বাছাইয়ে। এই আয়াত আমাদের শেখায়, অন্যকে দোষারোপের আগে আত্মাকে প্রশ্ন করতে: আমি কি সত্য থেকে সরে গেছি? আমি কি আমার রবের আদেশের বিপরীতে গিয়ে নিজেরই ক্ষতি করেছি? এ প্রশ্নের সামনে দাঁড়ালে মানুষ বুঝতে শেখে, ন্যায় আল্লাহর গুণ, আর আত্মজুলুম মানুষের দুর্বলতা। সূরা ইউনুস আমাদের সেই চেতনার দিকেই ডাকে—যেখানে ঈমান মানে কেবল স্বীকৃতি নয়, বরং নিজের ভেতরের অন্যায়কে চিনে ফেলে তাওবার দিকে ফিরে আসা।
আল্লাহর ন্যায় এমন কোনো ন্যায় নয়, যা মানুষের বিচারবোধের মতো কখনও টলে, কখনও ভেঙে পড়ে। তিনি কারও ওপর অণুপরিমাণ জুলুম করেন না; বরং জুলুমের শেকড় মানুষ নিজেই নিজের ভেতরে রোপণ করে। যে সত্যের আলোকে সে চোখ বুজে থাকে, যে হিদায়াতের দরজায় সে ইচ্ছাকৃতভাবে পা রাখে না, যে অন্তরের ডাককে সে দুনিয়ার কোলাহলে চাপা দেয়—সে-ই একদিন নিজের আত্মার বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়ে দাঁড়ায়। বাহ্যিকভাবে ক্ষতিটি যেন জীবনের, কিন্তু গভীরে ক্ষতিটা আত্মার; কারণ আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া মানে হচ্ছে নিজের অস্তিত্বকে তার প্রকৃত নিরাপত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করা। তখন মানুষ হারায় শুধু শান্তি নয়, নিজের ওপরই নিজের মায়া, নিজের ওপরই নিজের দয়া।
আল্লাহ তাআলার ন্যায় এমন এক ন্যায়, যার সামনে মানুষের সব অভিযোগ নিঃশব্দ হয়ে যায়। তিনি কারও উপর এক কণা পরিমাণও জুলুম করেন না; বরং জুলুমের আঁচড় মানুষ নিজেই প্রথমে নিজের হৃদয়ে, পরে নিজের ভবিষ্যতে এঁকে দেয়। পাপ যখন অভ্যাস হয়ে যায়, সত্যকে অস্বীকার যখন অহংকারে রূপ নেয়, আর কৃতজ্ঞতার বদলে অকৃতজ্ঞতা যখন মনের স্থায়ী ভাষা হয়ে ওঠে, তখন মানুষ নিজের জন্যই অন্ধকারের দরজা খুলে দেয়। বাহ্যিকভাবে সে হয়তো বেঁচে থাকে, কিন্তু আত্মার ভেতরে সে ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে।
এই আয়াত আমাদের সমাজকেও আয়নার সামনে দাঁড় করায়। অন্যায়, প্রতারণা, অধিকারহানি, সত্য গোপন করা, ক্ষমতার অপব্যবহার—এসবের শেকড় যতই বাইরে দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত তা মানুষেরই অন্তরের ভেতরকার জুলুম থেকে জন্ম নেয়। আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষকে বারবার সতর্ক করা হয়, রাসূলদের মাধ্যমে ডাকা হয়, কুরআনের আলো সামনে রাখা হয়; তবু যে ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তির কাছে হার মানে, সে আসলে নিজেরই আত্মাকে বঞ্চিত করে। কিয়ামতের দিনে এই সত্য আরও নগ্ন হয়ে ফুটে উঠবে—সেদিন কেউ বলতে পারবে না, আল্লাহ তার জন্য ন্যায় করেননি; বরং প্রত্যেকেই বুঝবে, আমি নিজের জন্য কী সঞ্চয় করেছি, আর কীভাবে নিজের উপরই ভার নামিয়েছি।
তবু এই আয়াতে কেবল ভয় নেই, রহমতের এক গভীর দরজাও আছে। কারণ যে আল্লাহ জুলুম করেন না, তিনি তওবার পথও বন্ধ করেন না; যে আল্লাহ বান্দার ক্ষতি চান না, তিনি বান্দাকে ফিরে আসার সুযোগও দেন। তাই আজ যদি অন্তর কেঁপে ওঠে, তা-ই এক শুভ লক্ষণ—এ কাঁপন আত্মাকে ঘুম থেকে জাগানোর ডাক। মানুষ যখন নিজের জুলুম স্বীকার করে, ক্ষমা চায়, তাওহীদের পথে ফিরে আসে, তখনই তার ভেতর নতুন জীবন শুরু হয়। সূরা ইউনুসের এই বাণী আমাদের শেখায়: আল্লাহর দরবারে অভিযোগের আগে নিজের হৃদয়কে জিজ্ঞেস করো—আমি কি নিজেই নিজের আত্মার উপর জুলুম করছি না?
এই আয়াত আমাদের আরামদায়ক অজুহাতগুলোকে ভেঙে দেয়। আমরা কত সহজে দোষ চাপাই ভাগ্যের ওপর, সময়ের ওপর, মানুষের ওপর; অথচ কুরআন নিঃশব্দ অথচ কঠোরভাবে বলে দেয়, ক্ষতের অনেকটাই আমাদেরই তৈরি করা। আল্লাহর দরবারে কোনো অন্ধকার নেই, কোনো ভুল বিচার নেই, কোনো কমতি নেই। কমতি আছে আমাদের দৃষ্টিতে, আমাদের অহংকারে, আমাদের নির্বাচনে। মানুষ যখন সত্য শুনেও মুখ ফিরিয়ে নেয়, যখন হেদায়েতের ডাককে ভারি মনে করে, যখন গুনাহকে ছোট আর আত্মশুদ্ধিকে কঠিন ভাবে—তখন সে আল্লাহকে নয়, নিজের আত্মাকেই বঞ্চিত করে।
এমন এক রবের সামনে দাঁড়িয়ে আজ হৃদয় নরম হয়ে যায়। তিনি জুলুম করেন না, অথচ আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করতে করতে ক্লান্ত আত্মাকে আরও গভীরে ঠেলে দিই। এই জুলুম তলোয়ারের নয়, এই জুলুম হলো ঈমানকে অবহেলা করা, তওবাকে পিছিয়ে দেওয়া, হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়া সত্যকে তালা দিয়ে রাখা। কিয়ামতের দিন এ দায় অন্য কারও ঘাড়ে যাবে না। সেদিন মানুষ বুঝবে—যে অন্ধকার সে ভেবেছিল বাইরের, তা আসলে তারই ভিতরে জমে ছিল।
তাই আজ যদি অন্তরে একটুকু আলো জেগে ওঠে, তাকে ফিরিয়ে দেবেন না। আল্লাহর ন্যায়কে ভয় করুন, তাঁর রহমতকে আশা করুন, আর নিজের নফসের বিরুদ্ধে সত্যের পক্ষে দাঁড়ান। কারণ পরিণামে আল্লাহ কারও প্রতি জুলুম করেন না; বরং মানুষই ঠিক করে, সে নিজের আত্মার জন্য কী সঞ্চয় করবে—নূর, না অন্ধকার।