কিয়ামতের সে দিনটি কেমন হবে—এই আয়াত আমাদের কল্পনার শক্তিকেও যেন ভেঙে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, মানুষকে একত্র করা হবে, আর তাদের দুনিয়ার অবস্থান এমন মনে হবে যেন তারা দিনের সামান্য এক ক্ষণমাত্রই ছিল। দীর্ঘ জীবন, জমে ওঠা অভ্যাস, দুনিয়ার ব্যস্ততা, সম্পদ, সম্মান, মতভেদ—সবকিছু তখন এক অসহায় সংক্ষিপ্ততায় সঙ্কুচিত হয়ে যাবে। তারা পরস্পরকে চিনবে, পরিচয়ের স্মৃতি থাকবে, কিন্তু সেই পরিচয়ের ভেতর আর দুনিয়াবি স্থায়িত্ব থাকবে না। যেন বহু বছরের সফর শেষ হয়ে হঠাৎ দেখা গেল, সবই ছিল এক মুঠো ছায়া। এই একটিমাত্র চিত্রই অন্তরকে জাগিয়ে তোলে: মানুষ যতই দুনিয়াকে বড় ভাবুক, আল্লাহর সামনে তার অবস্থান কত অল্প, কত ক্ষণস্থায়ী।

আয়াতের শেষ বাক্যটি আরও তীক্ষ্ণ ও হৃদয়বিদারক—‘নিশ্চয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তারা, যারা আল্লাহর সাথে সাক্ষাতকে মিথ্যা বলেছিল এবং হিদায়াতের পথে ছিল না।’ এখানে ক্ষতির মানে শুধু আখেরাতের শাস্তি নয়; এ হলো অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় পরাজয়, যখন মানুষ নিজের রবের সামনে দাঁড়ানোর সত্যকে অস্বীকার করে বসে। আল্লাহর সাক্ষাৎকে অস্বীকার করা মানে শুধু ভবিষ্যতের এক দিনের কথা মানা না-মানা নয়; এর মানে জীবনকে উদ্দেশ্যহীন করা, হিসাবহীন ভোগে নিজেকে ছেড়ে দেওয়া, আর অন্তরের ওপর এমন পর্দা ফেলে দেওয়া, যা মানুষকে সোজা পথ থেকে বিচ্যুত করে। হিদায়াত হারানো এখানে একটি চূড়ান্ত পরিণতি—যে পথ শুরু হয় অবহেলা দিয়ে, আর শেষ হয় চিরস্থায়ী আফসোসে।

এই আয়াতের কোনো নির্দিষ্ট, প্রামাণ্য একটি ঘটনা-নির্ভর শানে নুযূল নিশ্চিতভাবে বর্ণিত নয়; বরং এটি সূরা ইউনুসের বৃহৎ প্রেক্ষাপটে এসেছে, যেখানে তাওহীদ, নবুয়ত, কুরআনের সত্যতা, পুনরুত্থান, এবং আল্লাহর বিচার-দিবসের বাস্তবতা বারবার জাগিয়ে তোলা হয়েছে। মক্কার সেই পরিবেশে, যখন কিছু মানুষ আখেরাতকে দূরের কল্পনা মনে করত, কুরআন তাদের সামনে সময়ের পর্দা সরিয়ে দেয়—দেখায় যে দুনিয়ার দীর্ঘ ভ্রমণও আল্লাহর দরবারে এক ক্ষণস্থায়ী উপস্থিতি মাত্র। এ আয়াত তাই শুধু কিয়ামতের সংবাদ নয়; এটি আজকের জীবনের জন্যও সতর্কবার্তা। যে হৃদয় আল্লাহর সাক্ষাতকে সত্য বলে জানে, সে দুনিয়াকে বন্দিশালা না ভেবে প্রস্তুতির মাঠ হিসেবে দেখে; আর যে তা অস্বীকার করে, সে নিজেই নিজের ক্ষতির সাক্ষ্য লিখে রাখে।

কিয়ামতের দিন মানুষের ভিড় হবে, পরিচয়ের স্মৃতিও থাকবে, কিন্তু দুনিয়ার সমস্ত দাবিদাওয়া তখন এমন নিস্তেজ হয়ে যাবে যে, বহু বছরের জীবনকে মনে হবে দিনের একটিমাত্র ছায়া। যে শরীরকে ঘিরে এত যত্ন, যে নামকে ঘিরে এত অহংকার, যে ঘর-সংসারকে ঘিরে এত ব্যস্ততা—সবকিছু তখন একটি বিস্ময়কর ক্ষণস্থায়িত্বে মিলিয়ে যাবে। মানুষ একে অপরকে চিনবে, কিন্তু সেই চেনাজানার ভেতরে আর কোনো নিরাপত্তা থাকবে না; থাকবে শুধু সমাবেশের আতঙ্ক, হিসাবের নীরবতা, এবং হারানো সময়ের করুণ উপলব্ধি।

এই আয়াত যেন হৃদয়ের গভীরে এক অনুচ্চ স্বরে বলে—যে জীবনকে আমরা দীর্ঘ মনে করি, তা আসলে আল্লাহর তুলনায় কত ছোট; যে দুনিয়াকে আমরা স্থায়ী ভেবে আঁকড়ে ধরি, তা কত অল্পে ভেঙে পড়ে। আর যারা আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতকে মিথ্যা বলেছিল, তারা কেবল একটি বিশ্বাস অস্বীকার করেনি; তারা নিজ অস্তিত্বের শেষ সত্যটিকেই অস্বীকার করেছে। কারণ রবের সামনে দাঁড়ানোর দিনকে যে মিথ্যা ধরে, সে দিন-রাতের এই জীবনকেই চূড়ান্ত বলে ধরে নেয়, আর চূড়ান্তকে ভুল জায়গায় বসিয়ে সে নিজের অন্তরকে অন্ধ করে ফেলে।
সেই অন্ধত্বের ফলই আয়াত ঘোষণা করছে—নিঃসন্দেহে ক্ষতিগ্রস্ত তারাই, যাদের হৃদয়ে হিদায়াতের পথ ছিল না। হিদায়াত মানে শুধু সঠিক তথ্য জানা নয়; হিদায়াত মানে এমন এক আলোর দিকে চলা, যা মানুষকে রবের দিকে ফিরিয়ে নেয়, দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত করে, এবং শেষ বিচারের জন্য প্রস্তুত করে। যে এই আলো হারায়, সে হয়তো পৃথিবীতে অনেক কিছু পায়, কিন্তু সবচেয়ে বড় সাক্ষাৎটির জন্য শূন্য হাতে দাঁড়ায়। আর এই শূন্যতা-ই প্রকৃত ক্ষতি: সময়ের ক্ষতি নয়, সুযোগের ক্ষতি নয়, সম্পদের ক্ষতি নয়—রবের কাছ থেকে দূরে পড়ে যাওয়ার ক্ষতি।

এই আয়াতের ভেতরে এক গভীর আত্মবিচারের ডাক আছে। দুনিয়ায় মানুষ কত পরিচয়ের ভেতর বাঁচে—নাম, পেশা, পরিবার, মত, পক্ষ, সম্পদ—কিন্তু কিয়ামতের সমাবেশে এসব পরিচয় আর মানুষকে রক্ষা করবে না। তখন একজন আরেকজনকে চিনবে, স্মৃতি থাকবে, কিন্তু সেই চেনাজানার ভিতর কোনো আশ্রয় থাকবে না। আজ যে মানুষ নিজের চারপাশের ভিড়ে নিশ্চিন্ত, কাল সে বুঝবে—আসলে সে ছিল এক অনিবার্য সাক্ষাতের দিকে হাঁটতে থাকা একাকী মুসাফির। এই উপলব্ধি হৃদয়কে নরম করে দেয়, অহংকার ভেঙে দেয়, আর নিজের আমলকে নতুন চোখে দেখতে শেখায়: আমি কী জমাচ্ছি, কাকে খুশি করছি, কোন পথের দিকে দ্রুত এগোচ্ছি?

আরো ভয়াবহ হলো এই সত্য যে, আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতকে অস্বীকার করা শুধু একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ভুল নয়; এটি আত্মাকে তার চূড়ান্ত গন্তব্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। যে মানুষ জবাবদিহিকে সত্য বলে মেনে নেয়, তার ভেতরে লজ্জা জাগে, তওবার দরজা খোলে, মানুষের হক আদায়ের তাগিদ জন্মায়, গুনাহের অন্ধকারে থেকেও সে ফিরে আসতে চায়। কিন্তু যে এই সাক্ষাৎকে মিথ্যা বলে, সে নিজের ভেতরেই দুনিয়াকে স্থায়ী করে তোলে, আর তাতে তার পথনির্দেশের আলো নিভে যায়। এ কারণেই আয়াত শেষে বলা হলো, তারা হিদায়াতপ্রাপ্ত ছিল না—কারণ হিদায়াত কেবল তথ্যের নাম নয়; হিদায়াত হলো এমন এক নূর, যা মানুষকে রবের সামনে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি শিখিয়ে দেয়।

তাই এই আয়াত আমাদের ভয় দেখায়, কিন্তু সেই ভয় আমাদের ধ্বংসের জন্য নয়; বরং জাগরণের জন্য। আল্লাহ তাআলা আমাদের সামনে কিয়ামতের সেই মুহূর্তকে এনে দাঁড় করান, যেন আমরা আজই নিজেদের হিসাব নিতে পারি। জীবন যদি সত্যিই এক দিনের ক্ষণমাত্রের মতো হয়, তবে পাপের ভার এত বড় কেন? দুনিয়ার প্রশংসা এত প্রিয় কেন? রবের অসন্তুষ্টি এত সহজে মেনে নিই কীভাবে? এই প্রশ্নগুলো অন্তরে জেগে উঠলেই মানুষ বুঝে যায়—আসল নিরাপত্তা অস্বীকারে নয়, স্বীকৃতিতে; সত্যকে চাপা দেওয়ায় নয়, সত্যের সামনে নত হওয়ায়। আল্লাহর সাক্ষাতের বিশ্বাস হৃদয়কে ভেঙে আবার গড়ে, আর সেই ভাঙা হৃদয়ই শেষ পর্যন্ত রহমতের সবচেয়ে নিকটে পৌঁছে।

এই আয়াত আমাদের বুকের ভেতর ধীরে ধীরে এক নির্মম আলো জ্বালিয়ে দেয়: যে জীবনকে আমরা এত দীর্ঘ, এত ভারী, এত অর্থপূর্ণ মনে করি—কিয়ামতের সামনে তা এক ক্ষণিক ছায়ার বেশি নয়। মানুষ তখন একত্র হবে; পুরোনো সম্পর্ক, মুখচেনা, স্মৃতি—সবই থাকবে, কিন্তু থাকবে না দুনিয়ার সেই ভরসা, সেই প্রতারণাময় স্থায়িত্ববোধ। তারা পরস্পরকে চিনবে, অথচ এই চেনাজানার ভেতর কোনো আশ্রয় থাকবে না। কারণ সেই দিন মানুষ বুঝে যাবে, আসল পরিচয় ছিল সম্পদে নয়, পদে নয়, নাম-ডাকেও নয়; পরিচয় ছিল রবের কাছে গ্রহণীয় হওয়ায়।
আর যাদের অন্তর আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের সত্যকে অস্বীকার করে অন্ধকারে থেকেছে, তাদের জন্য এই আয়াত এক মৌন প্রলয়। তারা ভেবেছিল মৃত্যু মানে শেষ, হিসাব মানে কল্পনা, আর আখিরাত মানে দূরের গল্প; কিন্তু যখন সমাবেশের ময়দান খুলে যাবে, তখন তাদের সমস্ত অস্বীকার নিজেরাই তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। আল্লাহর পক্ষ থেকে অবিচার হবে না—অবিচার ছিল তাদেরই, যারা হিদায়াতের আহ্বান শুনেও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। মানুষ অনেক কিছু হারিয়ে আবার পেতে পারে; কিন্তু আল্লাহর সাক্ষাৎকে মিথ্যা মনে করে যে হৃদয় পথ হারায়, সে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটিই করে ফেলে—নিজেকে রবের রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
তাই এই আয়াত শুধু ভয়ের নয়, ফিরে আসারও ডাক। এখনও সময় আছে, যখন দুনিয়ার এই ব্যস্ততা আমাদেরকে সম্পূর্ণ গ্রাস করেনি, তখনই অন্তরকে নরম করা দরকার। নিজের ভেতরের গর্ব, গাফেলতি, দেরি করে তাওবা করার অভ্যাস—সবকিছুকে আজই প্রশ্ন করতে হবে: আমি কি সত্যিই সেই দিনের জন্য প্রস্তুত? কারণ যে দিন আমাদেরকে একত্র করা হবে, সে দিন দুনিয়ার দীর্ঘ ইতিহাস এক মুহূর্তে ক্ষীণ হয়ে যাবে, আর অবশিষ্ট থাকবে শুধু সত্য—আমাদের রব আছেন, তাঁর সাক্ষাৎ সত্য, আর তাঁর সামনে দাঁড়ানো অনিবার্য। সৌভাগ্য তারই, যে দুনিয়ার মোহ ভেঙে আজই আল্লাহর দিকে ফিরে আসে।