আল্লাহ তা‘আলা বলেন, মানুষের একটি দল আছে যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে তাকিয়েই থাকে; চোখ তাদের সামনে, কিন্তু অন্তর যেন জাগে না। এ আয়াতে এক করুণ সত্য উন্মোচিত হয়—দেখা আর উপলব্ধি এক জিনিস নয়। বাহ্যিক দৃষ্টি থাকলেও যদি অন্তরের জানালা বন্ধ থাকে, তবে সত্য সামনে দাঁড়িয়েও অচেনা থেকে যায়। তাই আল্লাহ প্রশ্ন করেন, তুমি কি অন্ধদের পথ দেখাবে, যদিও তারা কিছুই দেখতে পায় না? এই প্রশ্ন আসলে নবীজির প্রতি নয় কেবল, বরং সেইসব হৃদয়ের প্রতি, যারা সত্যের আলোকে পেয়েও অস্বীকারের অন্ধকার আঁকড়ে ধরে।

সূরা ইউনুসের এই পরিপ্রেক্ষিতে কুরআন বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়—নবুয়তের সত্য, তাওহীদের স্পষ্টতা, আর আখিরাতের সতর্কবার্তা মানুষের সামনে উন্মুক্ত হয়ে আসে; কিন্তু হিদায়াত কারও ব্যক্তিগত কৃতিত্বের ফল নয়, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে দয়া ও তাওফিক। মক্কার অবিশ্বাসীরা নবীর আহ্বান শুনত, তাঁর মুখের দিকে তাকাত, তাঁর সত্যবাদিতা জানত; তবু তাদের ভেতরের জেদ, অহংকার, এবং পূর্বধারণা তাদের চোখকে অন্তর্দৃষ্টি থেকে বঞ্চিত করত। এ কারণেই কুরআন তাদেরকে বাহ্যিক দৃষ্টিসম্পন্ন হলেও অন্তর্গতভাবে অন্ধ বলে চিহ্নিত করে—এ এক নৈতিক অন্ধত্ব, যা মানুষকে সত্যের সবচেয়ে কাছে থেকেও সবচেয়ে দূরে ফেলে দেয়।

এখানে আমাদের হৃদয় কেঁপে ওঠার মতো এক শিক্ষা আছে: মানুষ অন্যকে পথ দেখাতে পারে উপদেশের ভাষায়, স্মরণের শব্দে, কুরআনের আলোয়; কিন্তু হিদায়াতের দরজা খুলে দেন একমাত্র আল্লাহ। তাই এই আয়াত আমাদের অহংকার ভাঙে, আমাদের দাওয়াতের আদব শেখায়, আর মনে করিয়ে দেয়—সত্যকে দেখা মানে কেবল চোখ মেলে তাকানো নয়; সত্যকে মানতে হলে অন্তরকে নরম হতে হয়, আত্মাকে সমর্পণ করতে হয়। যে হৃদয় নিজের অন্ধত্ব স্বীকার করে, সে-ই রহমতের আলোর জন্য প্রস্তুত হয়। আর যে হৃদয় সবকিছু জেনে-শুনেও অবাধ্য থাকে, সে চোখে আলো নিয়েও অন্ধকারেই পথ হারায়।

মানুষের চোখ যদি কেবল চেহারা দেখে, কিন্তু সত্যের অর্থ না বোঝে, তবে সে চোখও এক ধরনের পর্দা হয়ে যায়। এই আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সামনে এমন এক মর্মান্তিক দৃশ্য তুলে ধরেন—কেউ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে তাকিয়ে আছে, সামনে সত্যের দীপ্ত মুখ, তবু অন্তরের অন্ধকারে সে কিছুই গ্রহণ করছে না। বাহ্যিক দৃষ্টি আর অন্তর্দর্শনের মাঝে যে বিস্তর দূরত্ব, এই আয়াত সেই ফাঁকটিকে হৃদয়বিদারকভাবে উন্মোচিত করে। মানুষ অনেক সময় সত্যকে অস্বীকার করে অজ্ঞতার কারণে নয়, বরং দেখেও না-দেখার অভিনয় করতে করতে তার ভেতরের বিবেককেই নির্বাক করে ফেলে। তখন চোখ থাকে, কিন্তু দেখা থাকে না; শ্রবণ থাকে, কিন্তু গ্রহণ থাকে না; উপস্থিতি থাকে, কিন্তু আত্মসমর্পণ থাকে না।

আল্লাহর নবী মানুষকে পথ দেখান, সত্যের দরজা খুলে দেন, কুরআনের আলো পৌঁছে দেন; কিন্তু হিদায়াতের চূড়ান্ত জাগরণ মানুষের হাতের মধ্যে বন্দী নয়। এটি আল্লাহর রহমতের ফল, তাঁর ইচ্ছার উপহার। তাই নবুয়তের সত্য যতই স্পষ্ট হোক, যার অন্তর জেদে শক্ত, অহংকারে জমাট, পূর্বধারণায় আবদ্ধ, তার কাছে সূর্যের আলোও যেন রাতের মতো। এই আয়াত যেন আমাদের নিজের বুকের দিকে তাকাতে বলে—আমার ভেতরে কি এমন কোনো অন্ধত্ব আছে, যা সত্য শুনেও নরম হয় না? আমি কি কুরআন শুনে কেবল অনুভব করি, না কি তার সামনে ভেঙে পড়ি? কারণ সবচেয়ে ভয়ংকর অন্ধত্ব চোখের নয়, হৃদয়ের; আর সবচেয়ে করুণ দাসত্ব জ্ঞানের অভাবের নয়, সত্যকে জেনেও তাকে গ্রহণ না করার জেদ।
তাই এই আয়াত শুধু অস্বীকারকারীদের প্রতি সতর্কবাণী নয়, আমাদের প্রত্যেকের জন্য এক সূক্ষ্ম মুজাহাদা। ঈমান মানে কেবল দেখা নয়, দেখা থেকে সিজদায় নেমে আসা; কেবল জানা নয়, জানা থেকে আত্মা বদলে যাওয়া। আল্লাহ যদি রহম করে হৃদয় খুলে দেন, তবে সামান্য আলোও মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে; আর যদি অহংকার সেই হৃদয়কে শক্ত করে রাখে, তবে চারদিকে আলো থাকলেও সে অন্ধই থেকে যায়। সূরা ইউনুস আমাদের শিখাচ্ছে—সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে বিনয়ী হও, কারণ হিদায়াত মানুষের ক্ষমতার ফল নয়, বরং আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। আর যে বান্দা নিজের অক্ষমতা বুঝে, সে-ই আসলে আলোর দরজায় কাঁপতে কাঁপতে পৌঁছে যায়, এবং সেই কাঁপনই অনেক সময় হিদায়াতের প্রথম নিশ্বাস হয়ে ওঠে।

মানুষের চোখের সামনে সত্য দাঁড়িয়ে থাকে, তবু হৃদয় যদি ইচ্ছাকৃত অন্ধ হয়ে যায়, তবে আলোও সেখানে অপরিচিত হয়ে পড়ে। সূরা ইউনুসের এ আয়াতে এক করুণ বাস্তবতা নেমে আসে আমাদের অন্তরে—কেউ কেউ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দিকে তাকায়, তাঁর কথা শোনে, তাঁর সত্যবাদিতা দেখে; কিন্তু দেখার এই কাজটি তাদের ভেতরে কোনো বদল আনে না। কারণ দৃষ্টির সঙ্গে যদি বিনয়ের আগুন না জ্বলে, যদি সত্যকে গ্রহণ করার নরম মন না থাকে, তবে চেহারার দিকে তাকানোও হিদায়াত হয়ে ওঠে না। এ কারণেই আল্লাহ তা‘আলা প্রশ্ন করেন, তুমি কি অন্ধদেরকে পথ দেখাবে, যদিও তারা দেখতে না পায়? এই প্রশ্ন নবীজির অক্ষমতা নয়, বরং মানুষের অন্তরের অস্বীকারের ভয়ংকর পরিণতি আমাদের সামনে তুলে ধরে।

এখানে সমাজের এক গভীর ক্ষতও দেখা যায়: মানুষ সত্যকে চেনে, তবু স্বার্থ, জেদ, গোষ্ঠীচিন্তা, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অহংকার, আর পাপের অভ্যাস তাকে সত্যের দিকে ঝুঁকতে দেয় না। এ এক এমন অন্ধত্ব, যেখানে চোখ খোলা, কিন্তু আত্মা বন্দি; কান শোনে, কিন্তু হৃদয় অস্বীকারে জড়ানো; মুখে বিবেকের ভাষা, কিন্তু ভেতরে নফসের শাসন। কুরআন আমাদের শেখায়, নবুয়তের কাজ হলো ডাক পৌঁছে দেওয়া, আর হিদায়াতের দরজা খুলে দেওয়া আল্লাহর কাজ। তাই বান্দার জন্য ভয়ও আছে, আশা-ও আছে: ভয় এ জন্য যে, বারবার সত্য শুনেও উদাসীন থাকা হৃদয়কে পাথর করে দিতে পারে; আর আশা এ জন্য যে, যে অন্তর আজও কেঁপে ওঠে, সে অন্তর আল্লাহর রহমতে আবার জীবিত হতে পারে।

এই আয়াত নিজেকে প্রশ্ন করতে শেখায়—আমি কি কেবল তাকিয়ে আছি, নাকি সত্যি দেখছি? কুরআন কি আমার কাছে কণ্ঠস্বরের মতো, নাকি অন্তরের জাগরণ? যদি আমার ভেতর অহংকারের পর্দা নেমে থাকে, তবে আমি যতই আলো ঘরে আনতে চাই, অন্ধকারের কাছে পরাজিত হব। কিন্তু যদি আমি লজ্জায়, ভয়ে, নরম আত্মসমর্পণে আল্লাহর দিকে ফিরি, তবে তিনিই সেই হৃদয়কে খুলে দেন যাকে কেউ খুলতে পারে না। সূরা ইউনুস এখানেই আমাদের কাঁপিয়ে দেয়—মানুষের হেদায়েতের চূড়ান্ত মালিক মানুষ নয়, আল্লাহ। আর তাই মুক্তির প্রথম শর্ত হলো এই স্বীকারোক্তি: আমি দেখতে পারছি না, হে রব, তুমি না দেখালে আমি অন্ধই থেকে যাব।

কখনো মানুষ সত্যের মুখোমুখি হয়, তবু সত্যকে চিনতে পারে না—কারণ চোখ থাকলেই দেখা হয় না, অন্তরের আয়না পরিষ্কার না হলে আলোও বিকৃত লাগে। এই আয়াত আমাদের খুব নরম কিন্তু খুব কঠিন এক বাস্তবতায় দাঁড় করায়: রাসূলের দিকে তাকানো, কুরআন শোনা, নিদর্শন দেখা—এসবের পরও যদি হৃদয়ের দরজা বন্ধ থাকে, তবে অন্ধত্ব শুধু দৃষ্টির নয়, আত্মারও। তাই এ প্রশ্ন আমাদের প্রতিও ফিরে আসে—আমি কি সত্যি দেখছি, নাকি শুধু তাকিয়ে আছি? আমি কি আল্লাহর বাণীকে গ্রহণ করছি, নাকি নিজের অভ্যাস, অহংকার, ও জেদের আবরণে তাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছি?

এখানেই হিদায়াতের কাঁপিয়ে দেওয়া রহস্য—মানুষ আলো দেখাতে পারে, কিন্তু আলো জাগাতে পারে না। দাওয়াত পৌঁছাতে পারে, প্রমাণ স্পষ্ট হতে পারে, কুরআনের আয়াত হৃদয়ের দরজায় বারবার কড়া নাড়তে পারে; তবু অন্তর যদি আল্লাহর দিকে নত না হয়, তাহলে সত্য সামনে থেকেও অধরা থেকে যায়। তাই মুমিনের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হলো বিনয়: হে আল্লাহ, আমাদের এমন অন্ধ হৃদয়ের শাস্তি দিও না, যে হৃদয় তোমার নিদর্শন দেখেও নড়ে না। আমাদের চোখকে শুধু দর্শন দিও না, উপলব্ধি দিও; আমাদের জিহ্বাকে শুধু তেলাওয়াত দিও না, আত্মাকে আনুগত্য দিও। কারণ অবশেষে পথ দেখানো আল্লাহরই কাজ, আর বান্দার কাজ হচ্ছে চোখের জল নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা—হে রব, আমাকে দেখাও, নইলে আমি নিজেই নিজের অন্ধকারে হারিয়ে যাব।