কিছু মানুষ রাসূলের কণ্ঠ শোনে, কিন্তু সত্যের ডাক তাদের ভেতর পর্যন্ত পৌঁছে না। সূরা ইউনুসের এই আয়াতটি যেন এক গভীর আয়না—কানে শোনা আর অন্তরে গ্রহণ করা এক জিনিস নয়। আল্লাহ বলেন, তাদের কেউ কেউ আপনার দিকে কান লাগায়; কিন্তু আপনি কি বধিরকে শোনাতে পারেন, যদি তাদের বোধশক্তি নিজেই অচেতন হয়ে যায়? এখানে বধিরতা শরীরের নয়, হৃদয়ের; আর সেই হৃদয় যখন সত্যকে চিনতে চায় না, তখন আলোর সামনে দাঁড়িয়েও মানুষ অন্ধকারে রয়ে যায়।

এই কথার পেছনে কোনো একক নির্ভরযোগ্য কারণ-নুযূল স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়; তবে সূরা ইউনুসের সমগ্র সুরেই দেখা যায়, মক্কার মুশরিকদের এক শ্রেণি কুরআন শোনে, নবীকে দেখে, তবু অন্তরের দরজা খুলতে চায় না। তারা বাহ্যত শ্রবণ করে, কিন্তু অন্তর্গতভাবে প্রত্যাখ্যান করে—এ এক সামাজিক ও ঈমানি বাস্তবতা, যেখানে অহংকার, পূর্বধারণা, পারিবারিক-সামাজিক চাপ, এবং সত্যের কাছে আত্মসমর্পণের ভয় মানুষকে আটকে রাখে। এ আয়াত সেই মানসিক সত্যকে উন্মোচন করে: হিদায়াত জোর করে ঢোকানো যায় না; যার অন্তর প্রস্তুত নয়, তার কানে সত্যের সুরও কেবল শব্দ হয়ে ফিরে আসে।

তবু আয়াতের ভেতরে কঠোরতার সঙ্গে করুণাও আছে। কারণ আল্লাহর বাণী কেবল দোষ দেখায় না, পথও দেখায়। তিনি আমাদের বুঝিয়ে দেন—মানুষের শ্রবণশক্তি থাকা সত্ত্বেও কেন কেউ সত্য পায় না, আর কেউ একই কুরআন শুনে ভেঙে পড়ে, নরম হয়, সেজদায় লুটিয়ে পড়ে। পার্থক্য কানে নয়; পার্থক্য হৃদয়ের জীবন্ততা। সূরা ইউনুসের তাওহীদ, নবুয়ত, কুরআনের সত্যতা ও কিয়ামতের সতর্কবাণীর প্রেক্ষিতে এ আয়াত যেন এক তীক্ষ্ণ ডাক: নিজের অন্তরকে দেখো, কারণ অন্তরের মৃত্যু হলে মানুষ সত্য শুনেও শুনতে পায় না।

মানুষের সবচেয়ে ভয়ংকর বধিরতা কানে নয়, অন্তরে। কানে শব্দ ঢোকে, কিন্তু হৃদয় যদি অহংকারে জমে যায়, তবে সত্যের কণ্ঠও সেখানে পৌঁছে না। সূরা ইউনুসের এই আয়াত যেন আমাদের সামনে এক নির্মম আয়না ধরে—রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাণী শোনা, কুরআনের সুরে মুগ্ধ হওয়া, সত্যের উপস্থিতি টের পাওয়া, এসবের পরও যদি কেউ বুদ্ধির দরজা বন্ধ করে রাখে, তবে সে আসলে শুনছে না; সে শুধু শব্দের ধাক্কা নিচ্ছে। এ এক অদ্ভুত শূন্যতা—যেখানে কান আছে, কিন্তু গ্রহণক্ষমতা নেই; চোখ আছে, কিন্তু উপলব্ধি নেই; ভাষা আছে, কিন্তু আত্মসমর্পণ নেই।

এখানেই নবুয়তের সত্যতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নবীকে প্রত্যাখ্যান করা মানে শুধু একজন মানুষকে অস্বীকার করা নয়; তা হলো আল্লাহর পাঠানো আলোকে ঠেলে ফেলা, আর নিজের সীমিত অহংকারকে সত্যের উপর বসানো। কুরআন যখন জাগাতে চায়, তখন কিছু হৃদয় নরম হয়ে ওঠে; আর কিছু হৃদয় পাথরের মতো কঠিন থেকে যায়। এই আয়াত আমাদের শেখায়, হিদায়াত কোনো জোরজবরদস্তির ফল নয়—তা আল্লাহর দয়া, আর মানুষের ভেতরের সত্য-গ্রহণের প্রস্তুতি। যে হৃদয় নিজের গর্বে অন্ধ, তার সামনে সত্য যতই পরিষ্কার হোক, সে তাকে বিকৃত করে ফেলবে।
তাই এই আয়াত শুধু মক্কার একদল অস্বীকারকারীর গল্প নয়; এটি প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য সতর্কবার্তা। আজও আমরা শুনতে পারি, তবু না বুঝতে পারি; পড়তে পারি, তবু না বদলাতে পারি; আল্লাহর বাণী সামনে থাকা সত্ত্বেও অন্তর যদি জাগে না, তবে আমরা সেই বধিরতারই উত্তরাধিকারী হয়ে যাই। কিন্তু এখানেই আল্লাহর রহমতের দরজা—তিনি আমাদের এমন আয়াত পাঠান, যাতে নিদ্রিত আত্মা কেঁপে ওঠে, পাথর-হৃদয় নরম হয়, আর মানুষ বুঝতে পারে: সত্যকে শোনা মানে শুধু কানে গ্রহণ করা নয়, বরং বিনয় নিয়ে তার সামনে নত হওয়া।

কখনো মানুষ কুরআনের শব্দ শোনে, কিন্তু সেই শব্দের ভিতরকার আহ্বানকে শোনে না। সে মসজিদের দরজার পাশ দিয়েও যায়, সত্যের আলোচনাও শোনে, আল্লাহর নামও তার কানে পড়ে; তবু হৃদয়ের বন্ধ জানালা খুলে না। এই আয়াত যেন আমাদের বুকের ভেতরকার গোপন দেয়ালটিকে স্পর্শ করে দেয়। কারণ বধিরতা শুধু কানের নয়, অহংকারেরও হতে পারে; শুধু অস্বীকারের নয়, নিজের প্রবৃত্তিকে সত্যের ওপরে বসিয়ে দেওয়ারও হতে পারে। মানুষ যখন বুঝতে চায় না, তখন শোনা-না-শোনার মাঝেও এক ভয়াবহ অন্ধকার জন্ম নেয়—যেখানে সত্য উপস্থিত, কিন্তু গ্রহণক্ষমতা মৃত। আর এই মৃত্যু চোখে দেখা যায় না; এ মৃত্যু আত্মাকে ভিতর থেকে নিঃশেষ করে।

আল্লাহর রাসূল সত্যের দাওয়াত নিয়ে দাঁড়ান, কুরআনের বাণী সামনে থাকে, নিদর্শন একের পর এক খুলে যায়—তবু কারো কারো অন্তর নড়ে না। এখানে নবুয়তের মর্যাদাও প্রকাশ পায়, আবার মানুষের দায়িত্বও স্পষ্ট হয়। হিদায়াত কোনো জোর করে ঢোকানো আলো নয়; এটি সেই নরম, ভীত, বিনীত হৃদয়ে নামে, যে হৃদয় নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে। তাই এই আয়াত আমাদের থামিয়ে জিজ্ঞেস করে—আমি কি কেবল শুনছি, না বুঝছি? আমি কি কেবল শব্দ নিচ্ছি, না সত্যকে জায়গা দিচ্ছি? সমাজে যখন সম্মিলিতভাবে এই অন্তরের বধিরতা বেড়ে যায়, তখন মানুষ ন্যায় থেকে দূরে সরে, অন্যায়কে স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করে, আর আল্লাহর সতর্কবার্তাকে হালকা করে ফেলে। তখন গুনাহ শুধু ব্যক্তিগত থাকে না; তা পুরো পরিবেশকে বিষিয়ে তোলে।

তবু এই আয়াতের মধ্যে কেবল ভীতি নয়, রহমতেরও ইশারা আছে। কারণ আল্লাহ আমাদের জানিয়ে দিচ্ছেন—আজই জাগো, আজই অন্তরের কান খুলো, আজই আত্মসমীক্ষা করো। যে ব্যক্তি বুঝতে শেখে, সে-ই বাঁচে; যে ব্যক্তি সত্যকে ভয় পায়, সে-ই হঠাৎ একদিন নিজের ভেতরকার শূন্যতায় পতিত হয়। সুতরাং এই বাণী আমাদের জন্য দাওয়াত—নম্র হওয়ার দাওয়াত, ফিরে আসার দাওয়াত, আল্লাহর সামনে নিজের অক্ষমতা মেনে নেওয়ার দাওয়াত। কুরআন কেবল তেলাওয়াতের সুর নয়; এটি হৃদয়ের জন্য জাগরণ। আর যখন বান্দা সত্যিই শুনতে শেখে, তখন তার ভেতরে আল্লাহর দিকে ফেরার পথ খুলে যায়—ভয় ও আশা মিলেমিশে তাকে সিজদার দিকে নিয়ে যায়, এবং সে বুঝতে পারে, হিদায়াতের দরজাটা এখনো খোলা আছে।

মানুষের এই অন্তর্দীর্ণতা কত ভয়ংকর—কানে শব্দ পৌঁছায়, কিন্তু হৃদয় নড়ে না; চোখ দেখে, কিন্তু অন্তর সাড়া দেয় না। তখন রাসূলের দাওয়াতও যেন এক গভীর নীরবতার মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। এই আয়াত আমাদের শেখায়, সত্যের সামনে সবচেয়ে বড় বিপদ অজ্ঞতা নয়, বরং এমন এক বদ্ধতা, যেখানে মানুষ বুঝতে চায় না। আল্লাহ যাকে তাওফিক দেন, তার জন্য অল্প আলোই পথ দেখায়; আর যাকে নিজের অহংকারে ছেড়ে দেন, তার কাছে সমুদ্রের বাণীও যেন শুষ্ক বালিতে হারিয়ে যায়।

তাই আজকের এই আয়াত আমাদের দিকে ফিরে তাকায়। আমি কি কেবল শুনছি, নাকি বুঝছি? আমি কি কুরআনের শব্দে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, অথচ তার আহ্বানে অনুগত নই? অন্তরের বধিরতা বাহ্যিক কোনো রোগ নয়; এটি এমন এক পর্দা, যা গুনাহ, গাফলত, জেদ, এবং আত্মপ্রশংসায় ধীরে ধীরে গাঢ় হয়। এই পর্দা কেটে দেয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ। তাই ভীত হৃদয়ে তাঁর দরজায় দাঁড়ানো ছাড়া কোনো আশ্রয় নেই। হে আল্লাহ, আমাদের কানে শুধু তিলাওয়াত নয়, হৃদয়ে তাওহীদের বোধ দান করুন; আমাদের অন্তরকে এমন জাগান, যাতে আমরা সত্যকে শুনে তার সামনে নত হতে পারি, দেরি হয়ে যাওয়ার আগে।