সূরা ইউনুসের এই আয়াতে এমন এক মানবিক প্রবণতার মুখোমুখি করা হয়েছে, যা যুগে যুগে একই রূপে ফিরে আসে: মানুষ সত্যকে গ্রহণ করার আগে এমন নিদর্শন চায়, যা যেন তার নিজের মাপকাঠিতে অলৌকিকভাবে তাকে সন্তুষ্ট করে। তারা বলে, তাঁর রবের পক্ষ থেকে তাঁর ওপর কোনো নিদর্শন কেন নাযিল হয় না? বাহ্যত এটি একটি প্রশ্ন, কিন্তু অন্তরে লুকিয়ে থাকে আরেকটি দাবি—সত্য যদি সত্যই হয়, তবে তা আমাদের ইচ্ছেমতো প্রমাণিত হোক। অথচ আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে শিক্ষা দিলেন, গায়েবের মালিক মানুষ নয়; গায়েবের চাবিও মানুষের হাতে নয়। যাকে তিনি রাসূল বানিয়েছেন, তার সত্যতা মানুষের কৌতূহল নয়, বরং ওহীর আলো, চরিত্রের সত্য, এবং আল্লাহর নির্ধারিত সময়েই উদ্ভাসিত হয়।
অতএব নবীকে বলা হয়েছে, পরিষ্কার জবাব দাও: গায়েব তো আল্লাহরই। অর্থাৎ ভবিষ্যতের পরিণতি, কিয়ামতের মুহূর্ত, শাস্তি-রহমতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, এবং কোন সময় কোন জাতির ওপর কোন নিদর্শন নামবে—এসব কিছুর কর্তৃত্ব একমাত্র তাঁর। এটি নবুয়তের মর্যাদা কমায় না; বরং নবুয়তকে মানবীয় অনুমান থেকে মুক্ত করে। রাসূল আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কিছু ঘটান না, আর সত্যও মানুষের তাড়াহুড়োয় নয়, বরং রবের হিকমতে প্রকাশ পায়। তাই এখানে একদিকে আছে তাওহীদের ঘোষণা, অন্যদিকে আছে সেই নীরব ধৈর্যের শিক্ষা—যেখানে বান্দা জানে, সব প্রশ্নের উত্তর মানুষের হাতে নয়, আল্লাহর জ্ঞানে।
এই সূরার সামগ্রিক সুরেও আমরা দেখি, কুরআন বারবার মানুষকে তার অহংকার থেকে নামিয়ে আনে। কেউ নিদর্শন চায়, কেউ তাড়াতাড়ি ফয়সালা চায়, কেউ বলে এটাই যদি সত্য হয় তবে কেন এখনই সব স্পষ্ট হলো না। কিন্তু কুরআন শেখায়, সত্যের পথ কখনো মানুষের জেদের অধীন নয়। যারা দেখেও মানতে চায় না, তাদের সামনে নিদর্শন এলেও তারা নতুন অজুহাত খুঁজে নেয়; আর যারা হৃদয় দিয়ে শুনতে চায়, তাদের কাছে এই সামান্য একটি বাক্যই আসমানের দরজা খুলে দেয়। শেষ বাক্যটি যেন আল্লাহভীত এক অপেক্ষার ঘোষণা: আমি তোমাদের সঙ্গে অপেক্ষায় রইলাম। এই অপেক্ষা দুর্বলতা নয়; এটি বিশ্বাসের দৃঢ়তা। সময় আল্লাহর, ফয়সালাও আল্লাহর—আর মুমিনের কাজ হলো সেই সত্যের আগমনের জন্য অন্তরকে প্রস্তুত রাখা।
মানুষের এক চিরচেনা অহংকার আছে—সে সত্যকে মানতে চায়, কিন্তু নিজের শর্তে; আল্লাহর পাঠানো আলোকে গ্রহণ করতে চায়, কিন্তু নিজের পছন্দমতো আকারে। এই আয়াতে সেই অন্তর্গত দাবি উন্মোচিত হয়। তারা জিজ্ঞেস করে, তাঁর রবের পক্ষ থেকে কোনো নিদর্শন কেন আসে না? অথচ নিদর্শন তো চারপাশেই ছড়িয়ে আছে, কিন্তু যাকে হৃদয়ের চোখ খুলে দেখার তাওফিক দেওয়া হয়নি, সে আকাশের বিস্ময় দেখেও অস্বীকারের অন্ধকারে পড়ে থাকে। আল্লাহর রাসূলকে এখানে এমন এক জবাব দিতে বলা হয়েছে, যা মানুষের কৌতূহলকে থামিয়ে দেয় এবং তাওহীদের সীমারেখা স্পষ্ট করে: গায়েবের চাবি আল্লাহর হাতে, মানুষ তা জানিয়ে দেয় না, আহ্বানও করে না, বরং বিনয়ের সঙ্গে অপেক্ষা করে।
অতএব এই আয়াত আমাদেরও দাঁড় করিয়ে দেয় এক নীরব প্রহরায়। আমরা কি সত্যকে কেবল তখনই গ্রহণ করি, যখন তা আমাদের প্রত্যাশার ছাঁচে ঢুকে পড়ে? নাকি আমরা জানি—আল্লাহর সিদ্ধান্তই শেষ কথা, আর তাঁর রহমতই শেষ আশ্রয়? এখানে অপেক্ষা মানে সন্দেহ নয়; অপেক্ষা মানে হৃদয়ের সেই জাগ্রত অবস্থান, যেখানে বান্দা জানে, আমি সব জানি না, কিন্তু আমার রব জানেন। আর যখন তিনি দেখাবেন, তখনই সব পরিষ্কার হবে—কারণ গায়েব তাঁরই, হুকুমও তাঁরই, এবং সত্যের বিজয়ও শেষ পর্যন্ত তাঁরই সময়ে।
এই জবাবের ভেতর মানুষের অহংকারের ওপর এক সূক্ষ্ম আঘাত আছে। মানুষ চায়, আসমানের দরজা তার মেজাজের সঙ্গে মিলিয়ে খুলে যাক; সত্য চায় তার দাবির সুরে নেমে আসুক। কিন্তু আল্লাহর ফয়সালা মানুষের অস্থিরতার গোলাম নয়। যে সমাজ সত্যকে কেবল দর্শনীয় নিদর্শনে মাপতে শেখে, সে সমাজ ধীরে ধীরে অন্তরের দৃষ্টিশক্তি হারায়। তখন চোখ জেগে থাকলেও হৃদয় ঘুমিয়ে থাকে; কানে শব্দ পৌঁছে, কিন্তু হেদায়েত পৌঁছে না। এ আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিশ্বাস কোনো বিনোদনের নাম নয়, আর নবুয়ত কোনো তামাশার জবাবও নয়। সত্য আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর তার সময়ও নির্ধারিত হয় তাঁরই জ্ঞানে। তাই যে ব্যক্তি আজ তাড়াহুড়া করে, সে আসলে নিজের অক্ষমতারই ঘোষণা দিচ্ছে।
অতএব বলা হলো, অপেক্ষা করো। এই অপেক্ষা কেবল অবিশ্বাসীর জন্য হুঁশিয়ারি নয়, মুমিনের জন্যও এক গভীর পরীক্ষা। কারণ অপেক্ষার ভেতরেই প্রকাশ পায় কার হৃদয় আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট, আর কার হৃদয় নিজের ইচ্ছাকে ইলাহ বানিয়েছে। বান্দা যখন বোঝে যে গায়েবের চাবি আল্লাহর হাতে, তখন সে ভবিষ্যতের ভয়েও ভেঙে পড়ে না, আবার দুনিয়ার মোহেও হারিয়ে যায় না। তার অন্তর এক অদ্ভুত ভারসাম্য পায়—আশা করে, কারণ আল্লাহর রহমত বিস্তৃত; ভয় করে, কারণ তাঁর বিচার ন্যায়পরায়ণ; আর মাথা নত রাখে, কারণ সত্যের শেষ কথাও কেবল তিনিই বলেন। এই আয়াত যেন আমাদের নিজের দিকে ফিরিয়ে দেয়: আমি কি আল্লাহর ফয়সালার অপেক্ষায় আছি, নাকি আল্লাহকে নিজের প্রত্যাশার অপেক্ষায় দাঁড় করিয়ে রেখেছি?
এ আয়াত আমাদের বুকের ভেতরকার সেই গোপন অহংকারকে স্পর্শ করে, যে অহংকার সব যুগেই সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে বলে: “আরও কিছু দেখাও, তবেই মানব।” কিন্তু আল্লাহর দ্বীন মানুষের শর্তে চলে না; মানুষের চাহিদা অনুযায়ী ওহী নেমে আসে না। গায়েবের চাবি যখন আল্লাহর হাতে, তখন কার কবে হৃদয় খুলবে, কার কবে চোখ খুলবে, কার ওপর কবে হুজ্জত পূর্ণ হবে—সবই তাঁর জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। তাই মুমিনের শান্তি এখানে: আমি সব না জানলেও, আমার রব জানেন। আমি সব বুঝে উঠতে না পারলেও, তাঁর ফয়সালা ভুল হতে পারে না।
আর এ কথাই অন্তরকে কাঁপিয়ে দেয়—সত্যকে অস্বীকার করার জন্য মানুষ যতই নিদর্শন চাইুক, শেষ কথা নিদর্শনের নয়, হেদায়েতের। অনেকেই চায় এমন প্রমাণ, যা তার গর্বকে তৃপ্ত করবে; কিন্তু আল্লাহ চান এমন হৃদয়, যা তাঁর সামনে নত হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জবাবের ভেতর তাই কেবল প্রতিরক্ষা নেই, আছে তাওহীদের নির্মল শিক্ষা: অপেক্ষা করো। সময়ের পেছনে দৌড়িও না, সত্যকে তাড়াহুড়োর খেলায় নামিও না। যে আল্লাহ গায়েব জানেন, তিনিই জানেন কবে সত্যকে প্রকাশ করবেন, কবে মিথ্যাকে উন্মোচন করবেন, কবে এক অবিশ্বাসী অন্তরকে ভেঙে দিয়ে ঈমানের দরজা খুলে দেবেন। আমাদেরও তাই অপেক্ষা করতে হয়—কিন্তু নিস্পৃহ হয়ে নয়; ভয়ের সাথে, আশার সাথে, তওবার সাথে। কারণ সেই অপেক্ষার শেষে থাকতে পারে রহমত, আবার থাকতে পারে এমন ফয়সালা, যার সামনে সব অজুহাত ভেঙে পড়ে।