কষ্ট যখন মানুষকে ঘিরে ধরে, তখন তার অন্তর প্রায়ই নরম হয়; আর যখন আল্লাহর রহমত এসে পৌঁছে, তখনই সেই নরম হৃদয় কঠোর হয়ে সত্যের বদলে কৌশলের আশ্রয় নিতে পারে—এই আয়াতে সেই মানবস্বভাবের নির্মম চিত্র ফুটে উঠেছে। আল্লাহ বলছেন, দুঃখ-দুর্দশার পরে যখন তিনি মানুষের ওপর রহমত আস্বাদন করান, তখন অনেকেই কৃতজ্ঞতার সেজদায় ঝুঁকে না পড়ে বরং তাঁর আয়াত, তাঁর নিদর্শন, তাঁর হিদায়াতকে ঘিরে ছলনার জাল বোনে। যেন বিপদ কেটে গেলেই মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যায় তার দুর্বলতা, আর সে ভুলে যায়—যে হাত তাকে উদ্ধার করেছে, সেই হাতই একদিন তার সব চাল-চাতুরীকে পরিবেষ্টন করে আছে।

সুরা ইউনুসের বৃহৎ আলোচনায় এ কথা কেবল একটি নৈতিক পর্যবেক্ষণ নয়; এটি তাওহীদ ও আখিরাতের প্রতি আহ্বানের বিরুদ্ধে মানুষের চিরচেনা প্রতিক্রিয়ারও বর্ণনা। নবী-রাসূলদের সময় বহু জাতিই দুঃখে আল্লাহকে ডেকে, স্বস্তি পেয়ে আবার অস্বীকারে ফিরেছে; কখনও ওহির সত্যতা নিয়ে সন্দেহ, কখনও নিদর্শনের বিরুদ্ধে অপব্যাখ্যা, কখনও সত্যকে ঢাকতে কৌশল—এসবই মানবসমাজের ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে। এখানে নির্দিষ্ট কোনো একক ঘটনার কথা দৃঢ়ভাবে বলা জরুরি নয়; বরং কুরআন মানুষের সামগ্রিক প্রবণতাকেই উন্মোচন করছে, যাতে মুমিন বুঝে নেয়—রহমত কোনো সময় অহংকারের লাইসেন্স নয়, বরং আরও গভীর কৃতজ্ঞতা ও আনুগত্যের পরীক্ষা।

আয়াতের শেষ অংশে সতর্কবাণীটি অত্যন্ত কাঁপিয়ে তোলে: ‘আল্লাহ সবচেয়ে দ্রুত কৌশলকারী’—অর্থাৎ মানুষের গোপন ফন্দি, সত্যবিরোধী আঁতাত, আধ্যাত্মিক প্রতারণা, কিছুই তাঁর জ্ঞানের বাইরে নয়; আর আমাদের রাসূলগণ–প্রেরিত ফেরেশতারা সবকিছু লিখে রাখেন। এখানে বান্দার জন্য এক কঠিন আয়না আছে: তুমি যা পরিকল্পনা করছ, তা কেবল মানুষের চোখের আড়ালেই নয়, আসমানের দফতরেও অক্ষরে অক্ষরে সযত্নে লিপিবদ্ধ। তাই রহমত পেয়ে যে মানুষ গর্বে ফুলে ওঠে, তার জন্য আসলে ভেতরে ভেতরে শাস্তির পথই প্রশস্ত হয়; আর যে বান্দা রহমতকে কৃতজ্ঞতা, তাওবা ও নতশিরে গ্রহণ করে, তার জন্য সেই একই রহমত হয় নাজাতের সিঁড়ি।

কত মানুষ আছে, যারা কষ্টের আঁধারে আল্লাহকে ডাকে, আর রহমতের আলো পেয়ে প্রথমেই ভুলে যায় সেই ডাকের সুর। বিপদ মানুষকে নরম করে, কিন্তু নরম হৃদয় সবসময় কৃতজ্ঞ হয় না; কখনও তা আত্মপ্রবঞ্চনার আস্তরণে কঠিন হয়ে যায়। তখন সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে বিনয়ের সেজদা না করে, সে আল্লাহর আয়াতকে ঘিরে ছলনার বুদ্ধি খোঁজে—যেন নিদর্শনকে মুছে ফেললে বাস্তবও মুছে যাবে। অথচ কুরআন আমাদের জানিয়ে দেয়, এই প্রবণতা নতুন কিছু নয়; মানুষের ভেতরের দুর্বলতা, অহংকার, আর ভুলে যাওয়ার অসুস্থতা যুগে যুগে একই রূপে ফিরে আসে। রহমত যখন আসে, তখনই পরীক্ষা শুরু হয়: মানুষ কি দাতা রবকে চিনবে, নাকি নিজের কৌশলকে বড় মনে করবে?

কিন্তু আল্লাহর মোকাবিলায় মানুষের সব পরিকল্পনা কেবল ক্ষণস্থায়ী ছায়া। সে যা গোপনে বোনে, তা আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়; তাঁর ফেরেশতারা লিখে রাখে মানুষের সব ছলচাতুরী, সব কৌশল, সব অস্বচ্ছ সংকল্প। এই লেখা শুধু কর্মের নয়, অন্তরেরও; শুধু প্রকাশের নয়, গোপন মনোভাবেরও। তাই আল্লাহ বলেন, তিনি দ্রুততম কৌশল-নির্মাতা—অর্থাৎ তাঁর সিদ্ধান্তের সামনে কারও ফন্দি টেকে না, কারও ষড়যন্ত্র স্থায়ী হয় না। এ আয়াত ভয় জাগায়, আবার জাগায় আশা-ও: যে রব মানুষের কৃতঘ্নতা দেখেও তাকে অবকাশ দেন, তিনি চাইলে এক নিমেষেই সব হিসাব চুকিয়ে দিতে পারেন; কিন্তু তিনি অবকাশ দেন, যেন মানুষ ফিরতে পারে, যেন তওবার দরজা বন্ধ হওয়ার আগে হৃদয় জেগে ওঠে।
সূরা ইউনুসের এই আয়াত আমাদের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা এক কঠিন আয়না। আমরা কি বিপদে শুধু সাহায্য চাই, আর স্বস্তি পেলে সত্যকে উপেক্ষা করি? আমরা কি আল্লাহর নিদর্শনের সামনে আত্মসমর্পণ করি, নাকি ব্যাখ্যার নামে, সন্দেহের নামে, প্রয়োজনের নামে নিজেরই অহংকারকে বাঁচিয়ে রাখি? মনে রাখা দরকার, আল্লাহর রহমত কোনো নিরাপদ আশ্রয় নয় যেখানে ইচ্ছামতো গাফিলতি করা যাবে; তা হলো দায়িত্বের মেহেরবানি, ফিরে আসার সুযোগ, কৃতজ্ঞতার পরীক্ষা। আর যে হৃদয় এই রহমতের ভেতরও ষড়যন্ত্র বুনে, সে আসলে নিজেরই বিরুদ্ধে লিখিত এক অদৃশ্য নথি তৈরি করে।

আয়াতটি আমাদের অন্তরের আয়না হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ কত অদ্ভুত—দুঃখে সে ভেঙে পড়ে, আর রহমত পেলে সে সব ভুলে গিয়ে কৌশলের আশ্রয় নেয়। যে আল্লাহ বিপদের গহ্বর থেকে তাকে টেনে তোলেন, সেই আল্লাহর নিদর্শনের বিরুদ্ধেই সে কখনও সন্দেহের ধোঁয়া তোলে, কখনও বিদ্রুপের তীর ছোড়ে, কখনও সত্যকে আড়াল করার সূক্ষ্ম জাল বোনে। কিন্তু এই জাল আসলে তার নিজের ভেতরের দুর্বলতাই প্রকাশ করে; কারণ কৃতজ্ঞ হৃদয় যুক্তি খোঁজে না, সে সেজদা খোঁজে। আর অকৃতজ্ঞ হৃদয় আলো দেখেও অন্ধকারের পক্ষে সাফাই গায়।

এখানে মুমিনের জন্য ভয়ও আছে, আশা-ও আছে। ভয় এই যে, আজকের নিরাপত্তা, সুস্থতা, রিযিক, সম্মান—এসবও এক ধরনের রহমত; এগুলো পেয়ে যদি হৃদয় আরও কঠিন হয়ে যায়, তবে তা শোকর নয়, পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। আর আশা এই যে, আল্লাহ মানুষের ছলনা দেখেও তৎক্ষণাৎ তাকে ধ্বংস করেন না; তিনি সুযোগ দেন, ঢেকে দেন, বোঝান, ফিরিয়ে আনেন। তবু তাঁর হিসাব বিলম্বিত হলেও অচল নয়। মানুষের ধূর্ততা যত সূক্ষ্মই হোক, আল্লাহর জবাব তার চেয়ে দ্রুত; আর ফেরেশতাদের লেখার খাতা কোনো কথাই হারায় না—নীরবতা, ভঙ্গি, অপব্যাখ্যা, প্রতারণা—সবই সেখানে উপস্থিত।

সুতরাং এই আয়াত শুধু অন্যদের জন্য সতর্কবাণী নয়, আমাদের নিজের নফসের জন্যও প্রশ্ন: আমি যখন সংকটে থাকি তখন কি আল্লাহকে ডাকি, আর স্বস্তি পেলে কি তাঁকেই ভুলে যাই? আমি কি রহমতকে শোকরের পথে নেব, নাকি আত্মপ্রসাদের? সমাজও এমনই—যেখানে কৃতজ্ঞতা কমে যায়, সেখানে সত্যকে ঢাকার সংস্কৃতি জন্ম নেয়; আর যেখানে হৃদয় আল্লাহমুখী থাকে, সেখানে ন্যায়, স্বচ্ছতা ও বিনয় বেঁচে থাকে। শেষ পর্যন্ত ফিরে যেতে হবে সেই রবের কাছেই, যিনি ছলনা দেখেন, নিয়ত জানেন, এবং যাঁর দরবারে মানুষের সব কৌশল একদিন নগ্ন হয়ে পড়বে।

এই আয়াত আমাদের সামনে একটি আয়না ধরে। মানুষ যখন বিপদে থাকে, তখন তার ভেতরের অহংকার অনেক সময় ভেঙে পড়ে; সে আল্লাহকে মনে করে, দোয়া করে, অনুতপ্ত হয়। কিন্তু রহমত এসে গেলে—স্বস্তি, নিরাপত্তা, সুস্থতা, সুযোগ, অবকাশ—তখনই অনেক অন্তর আবার আগের চেয়েও কঠিন হয়ে যায়। তখন সত্যকে গ্রহণ করার বদলে মানুষ সত্যের বিরুদ্ধে বুদ্ধি খাটায়; হেদায়াতের সামনে নত হওয়ার বদলে সে তার নিজের কৌশলকে বড় করে দেখে। যেন বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া কোনো উপদেশ নয়, বরং নতুন এক সুযোগ—আল্লাহর নিদর্শনগুলোর ওপর ছলনার জাল ফেলার সুযোগ। অথচ এ কৌশল মানুষকেই ক্ষয় করে, আল্লাহকে নয়।

আল্লাহর জবাব কত ভয়ংকর, কত নীরব, আর কত নিখুঁত: তিনি বলেন, আমার রসূলগণ তোমাদের কৃতকর্ম লিখে রাখছে। মানুষের অন্তরে যা গোপন, তার থেকেও গোপন করে যা সে আভাসে-ইঙ্গিতে সত্যকে আঘাত করে, সবই সংরক্ষিত। এই লেখার মধ্যে শুধু কাজের হিসাব নেই, আছে হৃদয়ের নোংরা নকশাও। আর আল্লাহ সবচেয়ে দ্রুত চক্রান্তের জবাব দেন—অর্থাৎ তাঁর সিদ্ধান্তকে দেরি মনে করা মূর্খতা, কারণ তিনি অবকাশ দেন পরীক্ষা নিতে, আর যখন পাকড়াও আসে, তখন কেউ তা ঠেকাতে পারে না। তাই এই আয়াত আমাদের শেখায়, রহমত পেলে আনন্দে ডুবে নয়, কৃতজ্ঞতায় জেগে উঠতে; অবকাশ পেলে অহংকারে নয়, তওবায় নত হতে। আজ যদি আমি নিজেকে চিনতে পারি, তবে হয়তো বিপদ আমাকে ভাঙেনি—রহমতই আমাকে জাগিয়ে তুলেছে। আর যদি সেই জাগরণও আমার ভেতরে নরমতা না আনে, তবে ভয় এখানেই যে, যে আল্লাহ রক্ষা করেন, তিনিই আবার হিসাবও নেন।