মানুষের ইতিহাসের শুরুটা অনেক সময় আমরা বিভক্তির ইতিহাস হিসেবে দেখি, কিন্তু কুরআন এর গভীরে গিয়ে মনে করিয়ে দেয়—মানুষ প্রথমে ছিল এক উম্মত, এক মানবধারা, এক স্রোত, এক ফিতরাতের ভেতর জাগ্রত একটি সমষ্টি। তারপরই এসেছে اختلاف, এসেছে মতভেদ, এসেছে পথের বিচ্যুতি, এসেছে এক সত্যের মুখে বহু ভাঙা আয়না। এই আয়াত যেন মানুষের আত্মাভিমানকে থামিয়ে দিয়ে বলে: তোমাদের ভাঙনই তোমাদের আদি পরিচয় নয়; তোমরা এক ছিলে, পরে আলাদা হয়েছ। অর্থাৎ বিভেদ কোনো গৌরব নয়, বরং তা এক নাজুক মানব-অবস্থা—যেখানে হৃদয় হিদায়াত থেকে সরে গেলে সত্যের জায়গায় প্রবেশ করে মত, স্বার্থ, অহংকার ও অনিশ্চয়তা।
কিন্তু এই বিভেদের মধ্যেও আল্লাহ তাআলা মানুষকে চূড়ান্তভাবে পরিত্যাগ করেননি। আয়াতের দ্বিতীয় অংশে যে কথা এসেছে, তা ভয় ও আশা—দুই-ই জাগিয়ে তোলে। যদি তোমার রবের পক্ষ থেকে আগেই একটি নির্ধারিত কথা না থাকত, তবে তাদের মধ্যে যে বিষয়ে তারা বিরোধ করছে, তার মীমাংসা হয়ে যেত। অর্থাৎ মানুষের জেদ, তর্ক, দলাদলি, সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা—এসব কখনোই আল্লাহর ক্ষমতার বাইরে নয়। তিনি ইচ্ছা করলে এখানেই ফয়সালা করে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি এক হিকমতের সঙ্গে অবকাশ দেন, পরীক্ষা দেন, মানুষের অন্তরকে প্রকাশ করেন, সত্যকে শুনতে দেন, আর মিথ্যার জন্যও সাময়িক সময় রাখেন—যাতে যার হৃদয়ে জীবনের আলো আছে, সে ফিরে আসতে পারে।
সূরা ইউনুসের এই প্রসঙ্গে বিষয়টি বিশেষভাবে গভীর। এই সূরার কেন্দ্রীয় সুর তাওহীদ, নবুয়ত, কুরআনের সত্যতা, কিয়ামত এবং জাতিগুলোর পরিণতি। তাই এখানে মানবজাতির ঐক্য ও বিভেদের আলোচনা কেবল ইতিহাসের বর্ণনা নয়; এটি এক সতর্কবার্তা। মানুষ যখন আল্লাহর দিক থেকে বিচ্যুত হয়, তখন একই পৃথিবীতে থেকেও তার চিন্তা, নৈতিকতা, এবং সত্যবোধ ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে। আর যখন মতভেদ হেদায়াতের সীমা অতিক্রম করে, তখন তা শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক পার্থক্য থাকে না—তা হয়ে ওঠে আত্মিক বিপর্যয়। এই আয়াত আমাদের শেখায়, শেষ কথা মানুষের নয়, রবের। মানুষের বিরোধ যত দীর্ঘই হোক, সত্যের মাপকাঠি শেষ পর্যন্ত আল্লাহর নির্ধারিত ফয়সালাতেই স্থির থাকে।
মানুষের ইতিহাসে মতভেদ নতুন কিছু নয়; নতুন হলো তার অহংকার। এই আয়াত আমাদের চোখের সামনে এক কঠিন সত্য তুলে ধরে—মানুষ মূলত ছিন্নভিন্ন হওয়ার জন্য সৃষ্টি হয়নি, বরং এক ফিতরাতের, এক রবের দাসত্বের, এক সত্যের দিকে চলার জন্যই তাদের জন্ম। কিন্তু যখন হৃদয়ের ভেতর থেকে আনুগত্য সরে যায়, তখন মতভেদ কেবল বুদ্ধির পার্থক্য থাকে না; তা হয়ে ওঠে পথভ্রষ্টতার দরজা, স্বার্থের শিকল, আর সত্যকে আড়াল করার সূক্ষ্ম অজুহাত। তাই আল্লাহ বলেন, মানুষ ছিল এক উম্মত; পরে তারা বিভক্ত হলো। অর্থাৎ বিভেদ মানুষের গৌরব নয়, বরং তার অন্তর্গত দুর্বলতার সাক্ষ্য। আমরা যত সভ্যতার কথা বলি, যত উন্নতির গল্প বলি, তবু আমাদের ভাঙন দেখিয়ে দেয়—হিদায়াত ছাড়া একত্রতা টেকে না, আর সত্য ছাড়া ঐক্য কেবল বাহ্যিক ছায়া।
এ আয়াত আমাদের শেখায়, পৃথিবীর সব বিভক্তি শেষ কথা নয়। মানুষ দলাদলিতে ছিন্নভিন্ন হতে পারে, মতাদর্শে পথ হারাতে পারে, ধর্মের নামেও নিজের অহংকে সাজিয়ে তুলতে পারে; কিন্তু আল্লাহর কাছে সবকিছু এখনো উন্মুক্ত, নির্ধারিত, এবং শেষ বিচারের অপেক্ষায়। তাই মুমিনের হৃদয় এ আয়াত পড়ে দম্ভী হয় না, ভীতও হয় না; সে জেগে ওঠে। সে বোঝে, সত্যকে খণ্ডিত করা মানুষের কাজ, আর সত্যকে পুনরুদ্ধার করা আল্লাহর দয়া। সে আরও বোঝে, কিয়ামতের ময়দানে কোনো বিভেদই টিকে থাকবে না, কোনো অজুহাতই উপকার দেবে না। সেদিন একমাত্র মূল্য হবে সেই হৃদয়, যে হৃদয় বিভেদের ভেতরেও রবকে এক মানে, আর মানুষের মতের ভেতরেও আল্লাহর ফয়সালাকেই শেষ কথা জানে।
এই আয়াত মানুষের অন্তরকে এক অস্বস্তিকর কিন্তু প্রয়োজনীয় সত্যের সামনে দাঁড় করায়: আমরা যেভাবে নিজেদেরকে চূড়ান্ত সত্যের মালিক মনে করি, আসলে তা নয়। মানুষ এক উম্মত ছিল, তারপর মতভেদে ছড়িয়ে পড়েছে; ফলে ইতিহাস জুড়ে একের পর এক দল, ভাষা, পক্ষ, মত, দাবির জন্ম হয়েছে। কিন্তু কুরআন এখানে শুধু সমাজভাঙনের বর্ণনা দেয় না, আত্মভাঙনেরও খবর দেয়। যখন হৃদয় আল্লাহর হিদায়াত থেকে দূরে সরে যায়, তখন মতভেদ আর কেবল বৌদ্ধিক পার্থক্য থাকে না; তা হয়ে ওঠে অহংকার, স্বার্থ, জেদ, এবং সত্যকে স্বীকার না করার অদৃশ্য ব্যাধি। মানুষ তখন অনেক কথা বলে, কিন্তু তার ভেতরকার কেন্দ্রটি হারিয়ে ফেলে।
তবু এই ভাঙনের মাঝেও আল্লাহর রহমত ও হিকমত এমনভাবে বিরাজমান যে, তিনি মানুষকে সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংস করে দেন না। তাঁর পক্ষ থেকে এক পূর্বনির্ধারিত কথা রয়েছে বলেই মতভেদের এই জটিল ইতিহাসের ভেতরও সময় টিকে আছে, পৃথিবী চলছে, তাওবার দরজা খোলা আছে, এবং সত্যের আহ্বান বারবার ফিরে আসে। এ এক ভয়ের আয়াত, আবার আশারও আয়াত। ভয় এই জন্য যে, আমরা যে বিষয়ে বিবাদ করি, তার সবকিছুই মানুষের মাপে মীমাংসিত হবে না; চূড়ান্ত ফয়সালা আল্লাহর কাছেই। আর আশা এই জন্য যে, এখনো দেরি আছে, এখনো ফিরে আসার সুযোগ আছে, এখনো সত্যকে গ্রহণ করে নিজের ভাঙনকে জোড়া লাগানোর অবকাশ আছে।
এই আয়াতকে হৃদয়ে নিলে সমাজের চেহারাও বদলে যায়। মানুষ তখন দলকে বড় করে না, হককে বড় করে; কথাকে নয়, প্রমাণকে মানে; নিজের প্রবৃত্তিকে নয়, রবের সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার দেয়। কারণ শেষ পর্যন্ত আমাদের মতভেদই শেষ কথা নয়, শেষ কথা হলো আল্লাহর ফয়সালা। আর সেই ফয়সালার দিনটি মানুষের অহংকারের সব কাগজপত্র ছিঁড়ে ফেলবে, সব দাবি নিঃশব্দ করে দেবে, এবং জানিয়ে দেবে—যে আল্লাহ মানুষকে এক করেছিলেন, তিনিই আবার বিচার করবেন কেন তারা ছিন্নভিন্ন হলো। তাই বান্দার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ অবস্থান হলো বিতর্কে জেতা নয়, সত্যে ফিরে আসা; নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করা নয়, নিজেকে সংশোধন করা; এবং মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া নয়, রবের সামনে বিনয়ী হয়ে দাঁড়ানো।
আর যদি তোমার রবের আগেই নির্ধারিত কথা না থাকত, তবে এই বিরোধের মীমাংসা হয়ে যেত—এই বাক্য আমাদের বুকের ভেতর কাঁপন ধরায়। কত তর্ক, কত দল, কত দাবি, কত বিচার-প্রার্থনা; তবু সবকিছু আল্লাহর হিকমতের সামনে সীমাবদ্ধ। তিনি চাইলে মুহূর্তেই ফয়সালা করতে পারেন, কিন্তু তিনি মানুষকে অবকাশ দেন—যাতে সত্যের কাছে ফিরে আসার সুযোগ থাকে, তাওবার দরজা খোলা থাকে, আর পরীক্ষা পূর্ণ হয়। এই অবকাশকে যেন কেউ নিরাপত্তা না ভাবে; এটি রহমতও, আবার দেরি করা বিচারও। তাই আজই হৃদয়কে নরম করা দরকার, কারণ সত্যকে অস্বীকার করে বেঁচে থাকা যায় না, শুধু একটু সময় পাওয়া যায়।
এই আয়াত আমাদের শেখায়, মতভেদ দেখলে যেন আমরা সত্যের ওপর না দাঁড়িয়ে অহংকারের ওপর দাঁড়াই না। বরং মাথা নত করে বলি, হে আল্লাহ, তুমি যদি না রক্ষা করতে, তবে আমরাও ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতাম। তুমি যদি না পথ দেখাতে, তবে আমাদের মতভেদই আমাদের পরিচয় হয়ে যেত। এখনো সময় আছে; এখনো তোমার কিতাব আমাদের সামনে খোলা, তোমার রাসূলের সত্যতা আমাদের হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ছে, আর কিয়ামতের চূড়ান্ত ফয়সালা আমাদের অপেক্ষায়। সেই দিনের আগে এই দুনিয়ায় আমাদের সবচেয়ে বড় বিজয় হলো—নিজের মতের কাছে নয়, আল্লাহর হক্কের কাছে ফিরে আসা।