কিয়ামতের ময়দানে মানুষ যেসব প্রশ্ন নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, তার একটি হবে পাহাড় সম্পর্কে। কত পাহাড়—দৃষ্টিতে স্থির, মাটিতে গাঁথা, আকাশের সঙ্গে কথা বলা নীরব মহিমা—মানুষের চোখে যেন চিরস্থায়ী। কিন্তু আল্লাহ এই আয়াতে এমন এক দৃশ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেন, যেখানে সেই অটল পাহাড়ও আর অটল থাকবে না। নবীকে বলা হয়েছে, বলুন: আমার রব সেগুলোকে সমূলে উৎপাটন করে বিক্ষিপ্ত করে দেবেন। অর্থাৎ যে শক্তিকে মানুষ নিরাপত্তা মনে করে, যে দৃঢ়তাকে মানুষ অবিচল মনে করে, তা-ও আল্লাহর হুকুমে ধুলিকণায় পরিণত হবে। এখানে পাহাড় শুধু পাহাড় নয়; এটি মানুষের মনের সব ভ্রান্ত ভরসার প্রতীক, সব অহংকারের প্রতীক, সব ‘এটাই টিকে থাকবে’—এই মোহের প্রতীক।
সূরা ত্বহার এই প্রসঙ্গকে কেবল একটি কিয়ামতের বর্ণনা হিসেবে পড়লে তার তীক্ষ্ণতা কিছুটা কমে যায়। এই সূরার সামগ্রিক ধারায় মুসা আলাইহিস সালামের নবুয়ত, অহি, ফেরাউনের জবরদস্তি, তাওহীদের আহ্বান, স্মরণের ভাষা—সবই মানুষের ভিতরকে জাগাতে আসে। এমন এক বুকে, যে বুকে ভয়, দায়িত্ব, দাওয়াত, বিরোধিতা আর হিদায়াতের সংগ্রাম জমে আছে, আল্লাহ যেন বলেন: বাইরের জগত যত দৃঢ়ই মনে হোক, শেষ স্থিরতা সেখানে নয়। এ আয়াত সেই অন্তরকে সান্ত্বনা দেয়, যে রবের পথে দাঁড়িয়ে কখনো একা বোধ করে; কারণ যার হাতে পাহাড়ও চূর্ণ হয়, তাঁর পথে চলা বান্দার জন্য কোনো শক্তিই শেষ কথা নয়।
এখানে কোনো দুর্বল নিরাপত্তাবোধকে আশ্রয় বানানোর সুযোগ নেই। পাহাড় যদি একদিন ছিন্নভিন্ন হয়, তাহলে মানুষের সঞ্চয়, নাম, ক্ষমতা, সম্পর্ক, অভ্যাস—সবই আরও বেশি ভঙ্গুর। এই উপলব্ধি মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য নয়, বরং জাগিয়ে তোলার জন্য। তাওহীদের অর্থ শুধু এক আল্লাহকে মানা নয়; তাওহীদের অর্থ হলো অন্তরের সব ভুল ভরসা থেকে ফিরে আসা, শুধু রবের দিকেই ঝুঁকে পড়া। সূরা ত্বহার এই আয়াত তাই হৃদয়কে কাঁপিয়ে বলে: তুমি যার ওপর ভর করছ, সে কি কিয়ামতের ধুলোঝড়ের সামনে টিকবে? যদি না টিকে, তবে আজই তোমার আশ্রয়কে ঠিক করো। পাহাড়ও থাকবে না; থাকবে শুধু সেই রবের হুকুম, যাঁর সামনে সব সৃষ্ট জিনিস শেষ হয়ে যাবে, আর বাকি থাকবে সত্য, স্মরণ, এবং তাঁর প্রতি নির্ভরতার শান্তি।
কিয়ামতের সেই মুহূর্তে পাহাড়ের মতো দৃঢ় জিনিসও নিজের পরিচয় হারাবে। মানুষের চোখে যা ছিল স্থায়িত্বের প্রতীক, তা হবে উড়ন্ত ধুলার মতো; আর যে হৃদয় দুনিয়ার দৃশ্যমান শক্তিকে নিরাপদ আশ্রয় মনে করত, সে বুঝবে—আসলে নিরাপত্তা ছিল না কোথাও, ছিল শুধু আল্লাহর হুকুম। এই আয়াত যেন আমাদের ভেতরের ভাঙাচোরা আত্মবিশ্বাসকে নাড়িয়ে দেয়। কতকিছু আমরা বুকের কাছে জড়াই, যেন সেগুলো আমাদের ধরে রাখবে; অথচ রব চাইলে সেই সবকিছুই এক নিমেষে মুছে যেতে পারে। পাহাড়ের পতন আমাদের শেখায়: সৃষ্টির কোনো দৃঢ়তাই চূড়ান্ত নয়, চূড়ান্ত কেবল তাঁর কুদরত, তাঁর ইচ্ছা, তাঁর সিদ্ধান্ত।
এখানেই এই বাণীর হৃদয়স্পর্শী সান্ত্বনা। যা কিছু আল্লাহর জন্য নয়, তা একদিন লীন হবেই; আর যা কিছু আল্লাহর জন্য, তা ধুলোর নিচে হারায় না। তাই ভয় পাওয়ার মতো পাহাড় আমাদের সামনে নেই, ভয় পাওয়ার মতো আছে সেই অহংকার, যা রবের সামনে মাথা নোয়াতে চায় না। কিন্তু একই সঙ্গে এই আয়াত মুমিনকে মুক্তিও দেয়: দুনিয়ার দৃশ্যমান কঠিনতা যত বড়ই হোক, তা চূড়ান্ত নয়। চূড়ান্ত হলেন তিনি, যিনি পাহাড়কে উড়িয়ে দিতে পারেন, আর ছিন্নভিন্ন এই বিশ্বের মাঝেও বান্দার হৃদয়ে ঈমানের স্থিরতা জাগিয়ে দিতে পারেন।
মানুষ কত কিছুকে পাহাড়ের মতো ধরে নেয়—সম্পদ, সম্পর্ক, ক্ষমতা, পরিচিতি, নিজের পরিকল্পনা, নিজের জেদ। মনে হয় এগুলো নড়বে না, ভাঙবে না, হারাবে না। কিন্তু এই আয়াত সেই ভ্রান্ত নিরাপত্তাবোধের উপর আকাশের গর্জনের মতো নেমে আসে: আমার রব পাহাড়সমূহকে সমূলে উৎপাটন করে বিক্ষিপ্ত করে দেবেন। যে পাহাড় আজ চোখের সামনে স্থির, কিয়ামতের দিন তা-ও থাকবে না। তাহলে মানুষের অহংকার কী? মানুষের ভরসা কী? মানুষের জমা করা শক্তির হিসাব কী?
এই কথার মধ্যে শুধু ভয় নেই, আছে তাওহীদের চরম পরিষ্কারতা। সব দৃশ্যমান দৃঢ়তার ওপরে একমাত্র দৃঢ় সত্তা আল্লাহ। মানুষ যখন পাহাড়কে অবলম্বন মনে করে, তখন সে আসলে মায়াকে আশ্রয় দেয়; আর যখন রবের দিকে ফিরে আসে, তখন সে এমন আশ্রয় পায়, যা কিয়ামতের ভাঙনের মধ্যেও ভাঙে না। সূরা ত্বহার এই সুর মুসা আলাইহিস সালামের দাওয়াতের ধারার সঙ্গে মিশে আছে—যেখানে মানুষকে ফেরাউনের ভয়ের বাইরে এনে রবের দিকে দাঁড় করানো হয়। এখানে আখিরাতের দৃশ্য কেবল ভবিষ্যৎ নয়; এটি আজকের হৃদয়কে জাগানোর জন্য এক জীবন্ত আয়না।
অতএব, এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা নিজেদেরকে জিজ্ঞেস করি—আমার অন্তরে কোন পাহাড় জমে আছে? কোন জেদ, কোন গর্ব, কোন গুনাহ, কোন দুনিয়ামোহ আমাকে ভারী করে রেখেছে? যে রব পাহাড়কে ধুলায় পরিণত করতে পারেন, তিনি আমার ভেতরের অহংকারও চূর্ণ করতে পারেন, যদি আমি তাঁকে ডাকতে শিখি। আবার তিনিই আমার ভাঙা হৃদয়কে সান্ত্বনা দিতে পারেন, যদি আমি তাঁর দিকে ফিরে যাই। তাই ভয় যেন আমাদেরকে ধ্বংস না করে, বরং নরম করে; আর আশা যেন আমাদেরকে গাফিল না করে, বরং জাগিয়ে তোলে। কিয়ামতের সেই ভাঙন আমাদেরকে আজই স্মরণে ফেরাক—কারণ শেষ আশ্রয় পাহাড় নয়, শেষ আশ্রয় শুধু রব।
কিয়ামতের সেই দিনে পাহাড়ের মতো কিছুই আর পাহাড় থাকবে না। যে জিনিসকে মানুষ দূর থেকে দেখে স্থিরতার প্রতীক ভেবেছে, আল্লাহর এক হুকুমে তা হবে বিক্ষিপ্ত ধূলি। এই আয়াত আমাদের চোখের সামনে শুধু শেষ দিনের দৃশ্যই আঁকে না; এটি আমাদের অন্তরের ভিতরে লুকানো সব মিথ্যা আশ্রয়ও ভেঙে দেয়। আমরা কত কিছুর ওপর ভরসা করি—সম্পদ, মর্যাদা, শক্তি, পরিকল্পনা, পরিচিত মুখ, দৃশ্যমান নিরাপত্তা। কিন্তু যখন রবের হুকুম আসে, তখন পাহাড়ও টিকে না। তখন বুঝে যায় হৃদয়: স্থায়ী শুধু তিনিই, যাঁর আদেশেই সব সৃষ্টি, আর যাঁর আদেশেই সব লীন।
তাই এ আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে গর্ব নয়, মাথা নত হওয়াই স্বাভাবিক। মুসা আলাইহিস সালামের দাওয়াত যেমন মানুষকে ফিরিয়ে আনে জীবন্ত রবের দিকে, তেমনি এই বাণী আমাদের ফিরিয়ে আনে নির্ভরতার শুদ্ধ জায়গায়। আজ যদি পাহাড়ও ভেঙে যায়, তবে আমার অহংকার কেন অটল থাকবে? আজ যদি সব দৃশ্যমান ভিত্তি মুছে যায়, তবে আমার গোনাহের ওপর গড়া নিরাপত্তাবোধ কেন স্থায়ী মনে হবে? ফিরে আসো—স্মরণে, তাওহীদে, তাওবায়। যে হৃদয় আল্লাহকে আশ্রয় বানায়, তার জন্য পাহাড় ভাঙার দৃশ্যও ভয় নয়; বরং এক গভীর সান্ত্বনা—রব আছেন, তাঁর হুকুম সত্য, আর তাঁর কাছে ফিরে যাওয়াই শেষ শান্তি।