সূরা ত্বহা’র এই আয়াতটি কিয়ামতের দিনের এক অচেনা, কাঁপিয়ে দেওয়া দৃশ্যকে আমাদের সামনে এনে দাঁড় করায়: অতঃপর পৃথিবীকে মসৃণ সমতলভূমি করে ছেড়ে দেওয়া হবে। যে ভূমি আজ আমাদের পা বহন করে, আমাদের ঘর-দ্বার, বাজার-হাট, আনন্দ-বিষাদ, শক্তি-দুর্বলতার সাক্ষী হয়ে আছে—সেই পৃথিবী একদিন তার চেনা উঁচু-নিচু সব আকৃতি হারিয়ে ফেলবে। পাহাড়, উপত্যকা, ঢাল, বাঁক—সবকিছু মুছে গিয়ে অবশিষ্ট থাকবে এক নিস্তব্ধ, সমান বিস্তৃতি। যেন সৃষ্টির সব কৃত্রিম আশ্রয় ভেঙে গিয়ে মানুষকে তার প্রকৃত ঠিকানার মুখোমুখি দাঁড় করানো হবে।

এই আয়াতের আগে-পরের কথায় কিয়ামতের ভয়াবহতা ও আল্লাহর সর্বশক্তিমত্তা স্পষ্ট হয়। সেদিন মানুষ প্রশ্ন করবে পাহাড়গুলোর কী হবে, আর উত্তর আসবে এমনভাবে, যেন পৃথিবীর পরিচিত দৃশ্যপটই এক নিমেষে বদলে যাবে। এর জন্য কোনো নির্ভরযোগ্য, বিশেষ শানে নুযূল বর্ণিত নেই; বরং এটি কিয়ামত-বিষয়ক ব্যাপক কুরআনিক বয়ানের অংশ, যা মানুষের অন্তরকে জাগিয়ে তুলতে নাযিল হওয়া মহাসত্যের ভাষা। মুসা আলাইহিস সালামের কাহিনির ধারাবাহিকতায় এই সূরা আমাদের শেখায়—ওহির আলো শুধু অতীতের বনি ইসরাইলকে নয়, আজকের মানুষের গর্বকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

এই দৃশ্যের ভেতরে তাওহীদের এক গভীর সান্ত্বনা আছে। যে আল্লাহ পৃথিবীকে আজ এমন সুবিন্যস্ত করে রেখেছেন, তিনিই ইচ্ছা করলে একে সমতল ধূলিময় প্রান্তরে পরিণত করতে পারেন। তাই মানুষের শক্তি, সভ্যতা, স্থাপত্য, দম্ভ—সবই ক্ষণস্থায়ী; আর আল্লাহর কুদরত চিরন্তন। এই আয়াত অন্তরকে ভীত করে, আবার ভাঙা হৃদয়কে সান্ত্বনাও দেয়, কারণ যে রব এত নিখুঁতভাবে সৃষ্টি করেন, তিনিই ইনসাফের সঙ্গে সবকিছুর পরিণতি নির্ধারণ করবেন। এ আয়াত স্মরণ করিয়ে দেয়: পৃথিবী স্থায়ী নয়, আশ্রয়ও নয়; সত্য আশ্রয় কেবল সেই আল্লাহ, যাঁর সামনে একদিন এই সমতলভূমিতেই সবাইকে দাঁড়াতে হবে।

এই আয়াত যেন আমাদের চোখের সামনে এমন এক মহাদৃশ্য খুলে দেয়, যেখানে পৃথিবীর সমস্ত দৃঢ়তা, সমস্ত ভরসা, সমস্ত পরিচিত ভূগোল এক নিমেষে নীরব হয়ে যায়। যে মাটি আজ আমাদের অহংকারের সাক্ষী, যে ভূমি আজ আমাদের পরিকল্পনা, সংগ্রাম, জমা-জমা আর ছুটে চলার মঞ্চ—সেটিই সেদিন সমতল, মসৃণ, নিস্তরঙ্গ হয়ে যাবে। না থাকবে পাহাড়ের আড়াল, না থাকবে উপত্যকার আশ্রয়, না থাকবে কোনো উঁচু-নিচুর বিভাজন; মানুষ তখন প্রকৃত অর্থেই দাঁড়িয়ে যাবে তার রবের সামনে, যেমন সে প্রথমবার সৃষ্টি হয়েছিল—নিঃস্ব, উন্মুক্ত, প্রতিরক্ষাহীন। এই এক আয়াতেই দুনিয়ার ভাঁজ খুলে যায়, আর অন্তর বুঝে নেয়: যা কিছু আমরা স্থায়ী মনে করেছিলাম, তা আসলে কেবলই সাময়িক আবরণ।

সূরা ত্বহা-র এই ধারায় মূসা আলাইহিস সালামের ডাকে যেমন মানুষকে তাওহীদের দিকে ফিরিয়ে আনা হয়, তেমনি কিয়ামতের এই দৃশ্য আমাদের স্মরণকে আরও গভীর করে। অহি শুধু খবর দেয় না, হৃদয়কে জাগিয়ে দেয়; শুধু ভবিষ্যৎ বলে না, বর্তমানকেও ভেঙে দেখে। যখন আল্লাহ পৃথিবীকে এভাবে সমতল করে দেবেন, তখন মানুষের জমি-জাগা, প্রাসাদ, সীমারেখা, আধিপত্য—সবই তার দুর্বলতা প্রকাশ করবে। আর যারা আজ নিজেদের শক্তিতে মত্ত, তারা বুঝবে: প্রকৃত শক্তি কেবল তাঁর, যিনি একটি পাহাড়কে মুছে দিতে পারেন, একটি পৃথিবীকে বদলে দিতে পারেন, আর মানুষের অন্তরকেও এক আহ্বানে কাঁপিয়ে দিতে পারেন।
তবু এই আয়াতের ভেতরে ভয় যেমন আছে, তেমনি সান্ত্বনাও আছে। কারণ যে রব কিয়ামতের দিনে সবকিছু সমান করে দেবেন, তিনিই আজও বান্দার হৃদয়ের উঁচু-নিচু জানেন, তার লুকানো ব্যথা জানেন, তার দুঃখের ভাঙা প্রান্ত জানেন। দুনিয়ার অস্থির ভূমি যখন কাঁপে, তখন মুমিন শিখে নেয় কোথায় দাঁড়াতে হবে—মানুষের প্রশংসায় নয়, নিজের ভঙ্গুর পরিকল্পনায় নয়, বরং আল্লাহর স্মরণে। এই আয়াত আমাদের বলে, পৃথিবীর আকৃতি বদলাবে, কিন্তু আল্লাহর কুদরত বদলাবে না; সৃষ্টির সব দৃশ্য উল্টে যাবে, কিন্তু তাঁর রাজত্বে কোনো কমতি আসবে না। তাই যে হৃদয় আজই এই সত্যকে মানে, সে কিয়ামতের ভয়কে কেবল আতঙ্ক হিসেবে নয়, বরং জাগরণের ডাক হিসেবে শুনতে পারে।

আজ যে পৃথিবীকে আমরা এত স্থির, এত শক্ত, এত আপন মনে করি—একদিন তা থাকবে না। আজকের উঁচু-নিচু, দুর্গ, গিরিখাত, পাহাড়ের গাম্ভীর্য, পথের বাঁক, জমিনের নানা রেখা—সব মুছে গিয়ে পৃথিবী হয়ে যাবে এক মসৃণ সমতলভূমি। এই দৃশ্য কেবল প্রকৃতির রূপান্তর নয়; এটি মানুষের অহংকারেরও পতন। যে মানুষ মাটির ওপর দাঁড়িয়ে নিজের শক্তি, নিজের পরিকল্পনা, নিজের সভ্যতা নিয়ে গর্ব করে—সেই মানুষ তখন দেখবে, তার পরিচিত পৃথিবীও আল্লাহর এক ইশারায় এমনভাবে বদলে যায়, যেন সৃষ্টি নিজেই নিঃশব্দে স্বীকার করছে: একমাত্র ক্ষমতা তাঁরই।

এ আয়াতের কাঁপন এখানেই যে, দুনিয়ার সব আশ্রয় কত অস্থায়ী। আমরা পাহাড়ের মতো দৃঢ় হতে চাই, অথচ পাহাড়ও থাকবে না। আমরা জমিনের মতো স্থির হতে চাই, অথচ জমিনের বর্তমান চেহারাও চিরস্থায়ী নয়। তাই মুমিনের অন্তর দুনিয়ার চূড়ায় নয়, আল্লাহর স্মরণে স্থির হয়। মুসা আলাইহিস সালামের কাহিনির এই ধারাবাহিকতা যেন আমাদের শেখায়—ওহি কেবল অতীতের কোনো কাহিনি নয়; এটি হৃদয়কে জাগিয়ে তোলা এক জীবন্ত আহ্বান। আজই নিজেকে জিজ্ঞেস করতে হয়: আমি কি সেই দিনের জন্য প্রস্তুত, যেদিন পৃথিবীই বদলে যাবে, আর আমার আমল ছাড়া আর কিছুই সঙ্গে থাকবে না?

যে সমাজ নিজের বাহ্যিক জৌলুশে মগ্ন, যেখানে জুলুম, গাফিলতি ও নাফরমানি স্বাভাবিক হয়ে যায়—এই আয়াত তাদের নীরব ভর্ৎসনা। কিন্তু একই সঙ্গে এটি মুমিনের জন্য সান্ত্বনাও: আল্লাহ যখন পৃথিবীকেই সমতল করে দেবেন, তখন তাঁর সামনে কোনো জটিলতা, কোনো অন্ধকার, কোনো দুঃসহ মুহূর্ত স্থায়ী থাকবে না। তিনি যিনি পৃথিবীকে বদলে দিতে পারেন, তিনিই ভাঙা হৃদয়কে জোড়া লাগাতেও সক্ষম। তাই ভয় হোক জাগরণের, আর আশা হোক আত্মসমর্পণের; যেন অন্তর নরম হয়ে বলে, হে রব, আমি তোমারই দিকে ফিরছি—সেদিনের আগে, যেদিন সবকিছু শেষ দৃশ্যের মতো মুছে যাবে।

এই এক আয়াত যেন মানুষের সব নির্মাণ, সব অহং, সব আত্মপ্রসাদের ওপর নীরব কিন্তু চূড়ান্ত ফয়সালা। আজ যে পৃথিবী আমাদের কাছে পরিচিত—পাহাড়ের ছায়া, উপত্যকার বাঁক, উঁচু-নিচু পথ, নিরাপত্তার ভ্রম—কাল তা থাকবে না; থাকবে কেবল সেই বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি, যেখানে কোনো আড়াল নেই, কোনো উঁচু অবস্থান নেই, কোনো লুকিয়ে থাকার কোণ নেই। তখন মানুষ বুঝবে, সে যে মাটির ওপর এত গর্ব করেছিল, সেই মাটিও আল্লাহর এক ইশারায় বদলে যেতে পারে। যে চোখ আজ দুনিয়ার রূপে মুগ্ধ, সে চোখ সেদিন বিস্ময়ে স্থির হয়ে যাবে; আর যে হৃদয় আজও গাফিল, তার সামনে দুনিয়ার সমস্ত স্থায়িত্বের দাবি মিথ্যা হয়ে ধরা দেবে।

সূরা ত্বহা’র এই প্রান্তে এসে মুসা আলাইহিস সালামের দাওয়াত যেন আরও গভীর হয়ে আমাদের অন্তরে নেমে আসে: তাওহীদই সত্য, স্মরণই জীবন, আর আল্লাহর সামনে বিনয়ই মুক্তির পথ। কিয়ামতের এই চিত্র আমাদের ভয় দেখানোর জন্য নয় কেবল, বরং জাগিয়ে তোলার জন্য—যাতে আমরা বুঝি, আজই ফেরার সময়; আজই চোখের জল, সিজদার দীর্ঘতা, পাপ থেকে ফিরে আসার সাহস। পৃথিবী একদিন সমতল হয়ে যাবে, কিন্তু মুমিনের হৃদয় যদি আজই ভেঙে আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে সে হৃদয়ে জান্নাতের দিকে এক সফর শুরু হয়ে যায়। হে রব, আমাদেরকে সেই দিন আসার আগে জাগিয়ে দিন; আমাদের গাফিলতিকে মাফ করুন, আমাদের অন্তরকে আপনার কিতাবের আলোতে স্থির করুন, আর আমাদের শেষ পরিণতিকে ঈমানের সৌন্দর্যে ভরিয়ে দিন।