আল্লাহ বলেন, “তারা কি বলে তা আমি ভালোভাবে জানি।” মানুষের মুখে উচ্চারিত কথা অনেক সময় গর্বের আবরণ পরে আসে; কেউ দৃঢ় স্বরে বলে, কেউ ব্যঙ্গের হাসি নিয়ে বলে, কেউ আবার সত্যকে ছোট করে দেখাতে চায়। কিন্তু মানুষের এই শব্দ, এই অনুমান, এই আত্মবিশ্বাস—কিছুই আল্লাহর জ্ঞানকে স্পর্শ করতে পারে না। সূরা ত্বহার এই আয়াত আমাদের শেখায়, সত্যের মাপকাঠি মানুষের গুঞ্জন নয়; সত্যের মালিক স্বয়ং আল্লাহ। নবী মূসা আলাইহিস সালামের দাওয়াতের বিরোধিতার পটভূমিতে এ ধরনের কথা বিশেষ তাৎপর্য পায়—যেখানে অবিশ্বাসীরা সত্যকে হালকা করে দেখাতে চেয়েছিল, সেখানে আল্লাহ জানিয়ে দিচ্ছেন, তাদের কথার অন্তরালেও কী আছে, তা তিনিই জানেন।
আয়াতের দ্বিতীয় অংশে কিয়ামতের বিস্ময়কর সময়বোধের ইঙ্গিত আছে: “তাদের মধ্যে যে, অপেক্ষাকৃত উত্তম পথের অনুসারী সে বলবেঃ তোমরা মাত্র একদিন অবস্থান করেছিলে।” মৃত্যুর পর মানুষের দীর্ঘ জীবন, দুঃখ, আনন্দ, সংগ্রাম—সবই যেন এক দিনের ছায়া হয়ে যেতে পারে। এটি কেবল সময়ের হিসাব নয়; এটি স্মরণের এক আঘাত, যা হৃদয়কে জাগিয়ে তোলে। দুনিয়ার দীর্ঘতা আমাদের কাছে যতই ভারী মনে হোক, আল্লাহর সামনে তা ক্ষণিকের মতো; আর কিয়ামতের ভয়ে ও বিস্ময়ে সে ক্ষণিকও মানুষের কাছে অবিশ্বাস্য ছোট হয়ে যায়। এই বোধ বান্দাকে অহংকার থেকে নামিয়ে আনে, এবং আল্লাহর সামনে নিজের ক্ষুদ্রতাকে মেনে নিতে শেখায়।
এই আয়াতে তাই একদিকে আল্লাহর সর্বজ্ঞতা, অন্যদিকে মানুষের বিভ্রম—দু’টিই মুখোমুখি দাঁড়ায়। মানুষ কথায় বড় হতে চায়, অথচ তার জানা সীমিত; মানুষ সময়কে দীর্ঘ মনে করে, অথচ আখিরাতের সামনে সে সময় গলে যায়। যারা তাওহীদের পথে ডাকা হয়েছে, তাদের জন্য এতে সান্ত্বনা আছে: আপনারা সত্যের পথে একা নন, আল্লাহ আপনাদের প্রতিপক্ষের কথাও জানেন। আর যারা গাফেল, তাদের জন্য এতে কড়া সতর্কতা আছে: যে রব মানুষের অন্তরের কথাও জানেন, তাঁর সামনে কোনো অজুহাতই স্থায়ী হয় না। এ আয়াত হৃদয়ে স্মরণ জাগায়—আল্লাহ জানেন, আল্লাহ দেখেন, আর শেষ পর্যন্ত মানুষকে তাঁর জ্ঞানেরই কাছে ফিরে যেতে হবে।
মানুষ যখন কথা বলে, তখন অনেক সময় তার কণ্ঠে থাকে দম্ভের জোর, আর বাক্যের ভেতরে থাকে অজানার অন্ধকার। কেউ সত্যকে ঢেকে দিতে চায়, কেউ আবার নিজের ধারণাকেই সত্যের আসনে বসায়। কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান এসব শব্দের বাইরেও পৌঁছে যায়; উচ্চারিত বাক্যের আড়ালে যে উদ্দেশ্য, যে দুর্বলতা, যে অহংকার লুকিয়ে থাকে—তাও তাঁর অগোচর নয়। এ আয়াত যেন অন্তরকে বলে, মানুষের কথায় বিভ্রান্ত হয়ো না; কথার ভঙ্গি বড় হতে পারে, কিন্তু সত্যের ওজন নির্ধারণ করে আকাশ-জমিনের রব।
তাই সূরা ত্বহার এই বাক্য শুধু এক ভবিষ্যৎ দৃশ্যের সংবাদ নয়, এটি আজকের অন্তরের জন্যও তাওহীদের শিক্ষা। মানুষের ব্যাখ্যা নয়, আল্লাহর জ্ঞানই চূড়ান্ত; মানুষের প্রতারণা নয়, তাঁর স্মরণই স্থায়ী আশ্রয়। মূসা আলাইহিস সালামের দাওয়াতের পথে যেমন সত্যকে হালকা করে দেখানো হয়েছিল, তেমনি প্রতিটি যুগেই সত্যকে ছোট করার শব্দ ফিরে আসে। কিন্তু যারা আল্লাহকে জানে, তারা জানে—শেষ কথাটি মানুষের নয়। শেষ কথাটি সেই রবের, যিনি অদৃশ্যের ভেতরেও সত্যকে ধরে রাখেন, আর ভীত হৃদয়কে এই নিশ্চয়তা দেন: তোমরা হারিয়ে যাওনি, তোমাদের সবকিছু আমার জানা।
আল্লাহ যখন বলেন, “আমি তাদের কথা ভালোভাবে জানি,” তখন এই ঘোষণা শুধু বিরোধীদের মুখ বন্ধ করে না, আমাদের নিজের হৃদয়ের দরজাও খুলে দেয়। কারণ মানুষের সমাজে কথাই অনেক সময় রাজদণ্ডের মতো চালানো হয়—কেউ উচ্চারণের জোরে সত্যকে চাপা দিতে চায়, কেউ সংখ্যার দম্ভে মিথ্যাকে জোরালো মনে করে, কেউ আবার ধর্মের নামে আত্মপ্রতারণাকে সত্যের পোশাক পরায়। কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান এমন নয় যে তা কান দিয়ে শোনার অপেক্ষায় থাকে; তিনি প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য, উচ্চারণ-অন্তর, হাসি-বিদ্রূপ, বিশ্বাস-সন্দেহ—সবকিছুই জানেন। তাই এই আয়াত আমাদের শিখিয়ে দেয়, মানুষের রায়কে ভয় করে নয়, আল্লাহর সামনে নিজের অবস্থাকে চিনে বাঁচতে হবে। যে হৃদয় নিজের হিসাব নেয়, সে অন্যের কথায় কম ভেঙে পড়ে; কারণ সে জানে, শেষ কথা মানুষের নয়, রবের।
আর কিয়ামতের দিন সময়ের হিসাব এমন রূপ নেবে, যা দুনিয়ার ঘড়ি কখনও বোঝাতে পারবে না। যেই জীবনকে আমরা দীর্ঘ মনে করে কত আশা, কত অহংকার, কত ভয়, কত ভালোবাসা বুকে বয়ে চলি—সেই জীবনই তখন এক দিনের মতো, বরং আরও ক্ষীণ ও ক্ষণস্থায়ী মনে হবে। এ অনুভূতি ভয় জাগায়, কিন্তু একই সঙ্গে রহমতেরও দরজা খুলে দেয়। কারণ দুনিয়ার দীর্ঘতা যদি এমনই ক্ষণভঙ্গুর হয়, তবে পাপের জন্য বিলম্বের কোনো অজুহাত নেই, আর তাওবার জন্যও দেরির কোনো নিরাপত্তা নেই। মানুষ যখন মৃত্যুকে দূরে রাখে, তখন জীবনকে ভুলে যায়; আর যখন আখিরাতের সময়বোধ হৃদয়ে নামে, তখন বোঝা যায়—আমরা এখানে চিরদিনের বাসিন্দা নই, বরং ফেরার পথের পথিক।
এই আয়াতের ভেতর এক অদ্ভুত সান্ত্বনা আছে। যে অন্তর দাওয়াতের পথে কষ্ট পায়, সত্যের পক্ষ নিয়ে একা হয়ে যায়, সমাজের তিরস্কারে আহত হয়—সে যেন বুঝে নেয়, তার পরিশ্রম, তার নীরব কান্না, তার সহ্য, তার প্রত্যাবর্তনের আকুতি কিছুই আল্লাহর অজানা নয়। মানুষ কী বলল, কতটা অপমান করল, কতটা হেসে উড়িয়ে দিল—সবকিছুর ঊর্ধ্বে একজন আছেন, যিনি জানেন। আর এই জানার মধ্যেই মুমিনের স্থিরতা। দুনিয়ার শব্দ যতই তীব্র হোক, আখিরাতের এক মুহূর্ত তার চেয়ে সত্য; আর আল্লাহর জ্ঞান মানুষের কল্পনার চেয়ে বিস্তৃত। তাই হৃদয়কে বারবার স্মরণের দিকে ফিরতে হয়, যেন আমরা ভুলে না যাই—আমরা কোথা থেকে এসেছি, কোথায় যাচ্ছি, এবং কার সামনে দাঁড়াতে হবে।
এই আয়াত হৃদয়কে এক অদ্ভুত সত্যের সামনে দাঁড় করায়: আমরা যে জীবনকে দীর্ঘ মনে করি, সেই জীবনও আখিরাতের দরজায় গিয়ে এক ঝলকের মতো ক্ষীণ হয়ে যেতে পারে। জন্ম, কষ্ট, স্বপ্ন, জেদ, সাফল্য, হারা—সবই যেন এক দিনের ভিতর গলে যায়, যদি স্মরণ না থাকে। তাই অন্তরকে এমন দুনিয়ার কাছে অর্পণ কোরো না, যা শেষ পর্যন্ত নিজেকেই অস্বীকার করায়।
হে আল্লাহ, আমাদের কথার চেয়ে আমাদের অন্তরকে সত্যের দিকে ফিরিয়ে দিন। যে জিনিস আমাদের চোখে বড়, তাকে ছোট করে দেখার হিম্মত দিন; আর যে জিনিস আপনার কাছে বড়—তাকে ভালোবাসার তাওফিক দিন। মৃত্যু আসার আগেই যেন আমরা জেগে উঠি, হিসাবের আগেই যেন আমরা ফিরে আসি। কারণ শেষ সত্যটি হলো—আল্লাহ জানেন, আর মানুষ ভুলে যায়।