সূরা আশ-শুআরার এই আয়াতে ইবরাহিম (আ.) এমন এক বাক্য উচ্চারণ করেন, যা শুনতে খুব সাধারণ মনে হলেও তার ভেতর তাওহিদের গভীরতম কম্পন লুকিয়ে আছে: “যিনি আমাকে আহার এবং পানীয় দান করেন।” জীবনের এত বড় সত্য—আমি বাঁচি, কারণ তিনি বাঁচিয়ে রাখেন; আমি তৃপ্ত হই, কারণ তিনি তৃপ্তির দরজা খুলে দেন; আমার গলায় এক ফোঁটা পানি পৌঁছে, আমার মুখে এক দানা খাদ্য ওঠে—সবই তাঁর ইচ্ছা, তাঁর দয়া, তাঁর নিয়ন্ত্রণের অন্তর্গত। মানুষ রিজিককে অনেক সময় পরিশ্রমের ফল বলে দেখে, কিন্তু এই আয়াত হৃদয়কে ফিরিয়ে আনে মূল উৎসের কাছে। পরিশ্রম মাধ্যম, ব্যবস্থা পর্দা; রিজিকের প্রকৃত দাতা আল্লাহ।

এই কথা নবী ইবরাহিম (আ.)-এর দাওয়াতি ভাষণেরই অংশ, যেখানে তিনি নিজের রবকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন—স্রষ্টা, পথপ্রদর্শক, আরোগ্যদাতা, মৃত্যু-জীবনের মালিক, এবং শেষে রিজিকদাতা। কোনো বিশেষ ঐতিহাসিক ঘটনা এখানে আলাদা করে নির্দিষ্ট করা যায় না; তবে আয়াতের বৃহত্তর প্রসঙ্গ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, এটি মক্কার অস্বীকারকারীদের সামনে তাওহিদের উজ্জ্বল ঘোষণা। যারা প্রতিমা, বংশ, শক্তি বা সামাজিক মর্যাদার ওপর নির্ভর করে, তাদের সামনে ইবরাহিম (আ.) একেবারে আদির সত্যটি দাঁড় করান—মানুষের ক্ষুধা মেটে না মানুষের হাতে, তৃষ্ণা নেভে না মানুষের হাতে; সেগুলো আসে আসমানের পক্ষ থেকে। এ কারণে এই আয়াত শুধু রিজিকের কথা বলে না, বরং কৃতজ্ঞতার শিষ্টাচারও শেখায়: যা কিছু পাই, তার মালিকানা আমার হাতে নয়, আমানত মাত্র।

মানুষের চোখে আহার খুবই সাধারণ, পানীয় আরও সাধারণ—দৈনন্দিন জীবনের এমন এক নিঃশব্দ উপহার, যার দিকে আমরা খুব কমই তাকাই। কিন্তু ইবরাহিম (আ.)-এর এই বাক্য সেই সাধারণতার আবরণ সরিয়ে দেয়। তিনি আমাদের শেখান, খাদ্যের প্লেটটি কেবল রান্নার ফল নয়, পানির পাত্রটি কেবল কোনো উৎসের শেষ পরিণতি নয়; এ সবকিছুর পেছনে আছেন সেই একক রব, যিনি গোপনে জীবনকে টিকিয়ে রাখেন, অদৃশ্য হাতে তৃষ্ণা নিবারণ করেন, এবং প্রতিটি লোকমাকে রহমতের অর্থে ভরে দেন। যে হৃদয় এই সত্য বুঝে, সে আর রিজিককে পূজ্য মনে করে না; সে রিজিকের পেছনে থাকা রবকে চিনে নেয়।

এই স্বীকারোক্তি আমাদের অহংকার ভেঙে দেয়, আবার ভয়কে মধুর আশ্রয়ে বদলে দেয়। কারণ যে আল্লাহ আমাকে খাওয়ান, তিনিই তো আমার অভাব জানেন; যে আল্লাহ আমাকে পান করান, তিনিই তো আমার শূন্য গলার কান্নাও শোনেন। তাই মুমিনের ভরসা শুধু ভবিষ্যতের সঞ্চয়ে নয়, তার রবের অশেষ কুদরতে। আজকের ভোজও তাঁর, আগামী দিনের অন্নও তাঁর, তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের শান্তিও তাঁর। এই আয়াত নীরবে বলছে: যখন উপায় বন্ধ মনে হয়, তখনও রবের দয়া বন্ধ হয়নি; যখন হাত খালি, তখনও আসমানের ভাণ্ডার শূন্য হয়নি।

এখানে তাওহিদ কেবল বিশ্বাসের একটি বাক্য নয়, এটি জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি। মানুষ যখন সত্যিই বলে, ‘যিনি আমাকে আহার ও পানীয় দান করেন,’ তখন সে নিজের ইচ্ছা, নিজের পরিকল্পনা, নিজের উপার্জনের অহংকার—সবকিছুকে আল্লাহর সামনে ছোট করে ফেলে। কৃতজ্ঞতা তখন আর মুখের উচ্চারণ থাকে না; তা হয়ে ওঠে অন্তরের নতমুখিতা, হারাম থেকে দূরে থাকা, এবং অল্পে সন্তুষ্ট থাকার এক আলোকিত সাধনা। যে ব্যক্তি প্রতিদিনের রিজিকের মধ্যে আল্লাহকে দেখে, সে জানে—তার জীবন নিয়ন্ত্রিত নয় কেবল বাজার, পেশা বা পরিস্থিতির হাতে; তার জীবন ধারণ করে আছেন সেই রব, যাঁর দান থামে না, যার করুণা শুকায় না, আর যার কাছে ফিরে যাওয়াই প্রকৃত নিরাপত্তা।
ইবরাহিম (আ.)-এর এই স্বীকারোক্তি মানুষকে তার দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে সাধারণ দৃশ্যগুলোর সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়, আর সেখানেই হৃদয়ের পর্দা সরে যায়। যে রুটি আমরা মুখে তুলি, যে পানিতে তৃষ্ণা মেটে, যে আহার দেহকে শক্তি দেয়—এসব কেবল অভ্যাসের ফল নয়, কেবল বাজারের চালচিত্রও নয়। পেছনে আছেন সেই রব, যাঁর হাতে প্রত্যেক শ্বাসের মতোই প্রত্যেক গ্রাসের ব্যবস্থাও। মানুষ কখনো নিজের আয়কে বড় দেখে, নিজের সংরক্ষণকে নিরাপত্তা ভাবে, নিজের জমা করে রাখাকে ভবিষ্যতের গ্যারান্টি মনে করে; কিন্তু এই আয়াত ধীরে ধীরে অহংকারের ভিত ভেঙে দেয়। বান্দাকে শেখায়, আমি খাই, কিন্তু দাতা আমি নই; আমি পান করি, কিন্তু উৎস আমার হাতে নেই। রিজিকের এই স্বীকৃতি আসলে হৃদয়ের ইবাদত—অন্তরের সিজদা, অন্তরের কৃতজ্ঞতা, অন্তরের ভরসা।

এই বাক্যের ভেতর আত্মসমালোচনার এক কঠিন ডাকও আছে। যদি আল্লাহই আহার ও পানীয়ের দানকারী হন, তবে তাঁর দেওয়া নেয়ামতকে আমরা কীভাবে ব্যবহার করছি? তৃপ্তি কি আমাদেরকে কৃতজ্ঞ করছে, নাকি গাফিল বানাচ্ছে? দান কি আমাদেরকে নরম করছে, নাকি কেবল ভোগের নেশায় ডুবিয়ে দিচ্ছে? সমাজ যখন রিজিককে কেন্দ্র করে অস্থির হয়ে ওঠে, মানুষ যখন হালাল-হারামের সীমানা ভুলে যায়, তখন এই আয়াত আবার স্মরণ করিয়ে দেয়—জীবন টিকে আছে অনুগ্রহে, আর অনুগ্রহের মর্যাদা হচ্ছে আনুগত্য। যিনি খাওয়ান, তিনিই দেখেন; যিনি পান করান, তিনিই জবাবদিহির দিন হিসাব নেবেন। তাই বান্দার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হলো রবের কাছে ফিরে যাওয়া—ভয়ের সঙ্গে আশা, প্রয়োজনের সঙ্গে কৃতজ্ঞতা, আর রিজিকের সঙ্গে তাওহিদের পবিত্র উচ্চারণ বহন করা: আমার রিজিকের সত্য মালিক আল্লাহ।

যে হৃদয় একদিন সত্যিই বুঝে যায়—আহারও তাঁর, পানীয়ও তাঁর—সে হৃদয় আর নিজের শক্তিকে উপাস্য বানাতে পারে না। তখন খাবার থালায় থাকলেও ভরসা থালায় থাকে না; পয়সা হাতে থাকলেও নিরাপত্তা পকেটে থাকে না; কারণ অন্তর জানে, দান আসছে দাতার কাছ থেকে, আর দাতা যদি না চান, তবে ধনও ক্ষুধা মেটাতে পারে না, জলও তৃষ্ণা নিবারণ করতে পারে না। এই স্বীকারোক্তি মানুষকে ছোট করে না; বরং তাকে মুক্ত করে। অহংকারের বোঝা নামিয়ে দেয়, অভিযোগের ধুলো ঝেড়ে ফেলে, এবং বান্দাকে আবার বান্দার জায়গায় দাঁড় করায়—অভিভূত, কৃতজ্ঞ, লাজুক, নির্ভরশীল।

ইবরাহিম (আ.)-এর কণ্ঠে এই কথা তাই শুধু একটি নিদর্শন নয়, এটি তাওহিদের জীবন্ত শ্বাস। যিনি আহার দেন, তিনি জানেন কে অভুক্ত; যিনি পানীয় দান করেন, তিনি জানেন কে তৃষ্ণার্ত; যিনি প্রতিদিন এত নিঃশব্দে জীবনকে চালিয়ে নিচ্ছেন, তাঁর দয়ার সামনে মানুষের সব কৃতিত্বের দাবি কত ক্ষুদ্র, কত কাঁচা, কত ভঙ্গুর। আমরা যাকে উপার্জন বলি, তার পেছনে কত অদৃশ্য দান কাজ করে—শ্রমের সুস্থতা, সময়ের প্রশস্ততা, মুখে খাদ্য ওঠার অনুমতি, গলাকে বাঁচিয়ে রাখা পানির পথ। যদি হৃদয় এই সত্যের দিকে ফিরে আসে, তবে প্রতিটি লোকমা হয়ে ওঠে শোকর, প্রতিটি চুমুক হয়ে ওঠে সিজদার আহ্বান।

তাই এই আয়াত আমাদের সামনে একটি নরম কিন্তু অমোঘ প্রশ্ন রেখে যায়: আমি কি সত্যিই তাঁকেই রিজিকদাতা জানি, নাকি কেবল কথা বলি? যদি জানি, তবে গুনাহের অন্ধকারে আর কতক্ষণ পড়ে থাকব? যদি জানি, তবে অবাধ্যতার রুটি আর কতদিন খেতে থাকব? যদি জানি, তবে চোখের সামনে যা আসে তাকে কারণ ভেবে কেন চূড়ান্ত ভরসা করব? হে আল্লাহ, আমাদের অন্তরকে এমন বিশ্বাস দাও, যা মুখে নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষুধায়, প্রতিটি তৃষ্ণায়, প্রতিটি প্রয়োজনের মুহূর্তে তোমার দরজায় ফিরে আসে। আমাদের রিজিকের জন্য নয় শুধু, বরং তোমাকে রিজিকদাতা হিসেবে চেনার জন্যও আমরা বাঁচি—এ সত্য যেন আমাদের ভেঙে নরম করে, পাপ থেকে ফিরিয়ে আনে, আর তোমার কৃতজ্ঞ বান্দা করে তোলে।