“যখন আমি রোগাক্রান্ত হই, তখন তিনিই আরোগ্য দান করেন”—এই বাক্যটি কেবল একটি মানুষের অভিজ্ঞতা নয়; এটি তাওহিদের এক নরম অথচ অটল ঘোষণা। এখানে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম নিজের অসুস্থতার কথা বলছেন, কিন্তু ভাষার ভেতরে কোথাও অহংকার নেই, কোথাও আত্মপ্রশংসা নেই। তিনি রোগের উৎস, নিয়ন্ত্রণ, নিরাময়—সবকিছুর চূড়ান্ত মালিক হিসেবে আল্লাহকেই সামনে আনছেন। চিকিৎসা, ওষুধ, সেবা, যত্ন—এসব সবই উপায়; কিন্তু হৃদয়ের গভীরতম বিশ্বাস হলো, শিফা আসলে আল্লাহর দান। মানুষ জ্ঞান খাটায়, হাত বাড়ায়, ওষুধ দেয়; আর আল্লাহ চাইলে সেই চেষ্টা ফলবান হয়, না চাইলে সেখানেই সীমা টেনে দেন। এই আয়াত সেই সীমারেখাকে স্পষ্ট করে দেয়—মানুষ উপায় অবলম্বন করে, আর নিরাময়ের ক্ষমতা আল্লাহর হাতে।
সূরা আশ-শুআরার এই অংশে নবীদের কাহিনির ভেতর দিয়ে এক গভীর দাওয়াত ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে: সত্যের পথ শুধু ভাষণের নয়, হৃদয়ের সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের পথ। ইবরাহিম আলাইহিস সালামের দোয়ার ধারাবাহিকতায় তিনি জীবন, মৃত্যু, রিজিক, ক্ষমা—সবকিছুর ক্ষেত্রে আল্লাহর দিকে ফিরে যান; আর রোগের প্রসঙ্গে এসে বোঝান, শরীরের ভাঙনেও একমাত্র আশ্রয় তিনিই। এখানে কোনো নির্দিষ্ট কারণ-ঘটনা উল্লেখ নেই; বরং এটি নবীদের সার্বজনীন তাওহিদি ভাষা, যা প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য একই রকম সত্য। যে মানুষ রোগে নিজেকে সম্পূর্ণ অসহায় মনে করে, সে-ই সবচেয়ে গভীরভাবে এই বাক্যের অর্থ বুঝতে পারে—আল্লাহ ছাড়া কারও কাছে চূড়ান্ত ভরসা নেই।
এই আয়াতে রোগের নাম আছে, কিন্তু কেন্দ্রবিন্দু রোগ নয়; কেন্দ্রবিন্দু হলেন আল্লাহ। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এমন এক ভাষায় কথা বলছেন, যেখানে দাসত্বের সব বিনয় এসে জমা হয়েছে। তিনি বলেন, “যখন আমি রোগাক্রান্ত হই”—তিনি নিজের অবস্থাকে আল্লাহর সামনে পেশ করছেন; কিন্তু “তখন তিনিই আরোগ্য দান করেন”—এইখানে মানুষের সীমা আর রবের অসীমতা একসাথে প্রকাশ পায়। কত সূক্ষ্ম তাওহিদের শিক্ষা! অসুস্থতা মানুষের শরীরে নেমে আসে, অথচ শিফার ফয়সালা আকাশ থেকে আসে। চিকিৎসক পথ দেখাতে পারেন, ওষুধ উপকারের দরজা খুলতে পারে, পরিচর্যা সান্ত্বনা হতে পারে; কিন্তু আরোগ্যের শেষ আলো জ্বালান যিনি, তিনি আল্লাহ। বান্দা মাধ্যম দেখে, মুমিন দেখেন মুমিনের প্রভুকে।
আরও গভীর কথা এই যে, ইবরাহিম আলাইহিস সালামের ভাষায় অভিযোগের তিক্ততা নেই, অবজ্ঞার শব্দ নেই, নিজের কষ্টকে কেন্দ্র করে দুনিয়াকে থামিয়ে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা নেই। তিনি কষ্টকে আল্লাহমুখী করে দিয়েছেন, যেন রোগও এক ধরনের ইবাদতে রূপ নেয়—যে ইবাদতে হৃদয় বলে, হে রব, আমার শরীর দুর্বল হতে পারে, কিন্তু আপনার ক্ষমতা দুর্বল হয় না। অনেক সময় মানুষ সুস্থ থাকলেও অন্তরে ভেঙে যায়, আর অনেক সময় রোগে শায়িত হয়েও ঈমানের আশ্চর্য মাধুর্যে আলোকিত হয়ে ওঠে। কারণ শিফা কেবল দেহে আসে না; শিফা আসে ভীত হৃদয়ে, পাপ-অশান্ত আত্মায়, ছিন্নভিন্ন ভরসায়। আল্লাহ যখন আরোগ্য দেন, তখন শুধু জ্বর কমে না, কখনো কখনো বিশ্বাসও নবীকৃত হয়, ফিরে আসে তাওয়াক্কুল, নরম হয় অহংকার, জেগে ওঠে দোয়ার ক্ষুধা।
“যখন আমি রোগাক্রান্ত হই, তখন তিনিই আরোগ্য দান করেন”—এই বাক্যে বান্দার মুখে নিজের অসহায়তার স্বীকারোক্তি যেমন আছে, তেমনি আছে রবের সামনে ভেঙে পড়া হৃদয়ের সজল বিনয়। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এখানে রোগের অভিজ্ঞতাকে আল্লাহবিমুখতার অন্ধকারে ফেলে রাখেননি; বরং সেটিকে তাওহিদের আলোয় তুলে ধরেছেন। মানুষের শরীর দুর্বল, জীবনের ভিত নরম, সুস্থতার বাসনা সত্য, কিন্তু কোনো সুস্থতাই স্থায়ী নয়। আজ যে দেহ সোজা দাঁড়িয়ে আছে, কালই তা বিছানায় পড়ে যেতে পারে। এই আয়াত আমাদের শেখায়—রোগ কখনো কেবল শরীরের পরীক্ষা নয়; তা আত্মসমীক্ষার ডাক, নিজের সীমা চিনে নেওয়ার আহ্বান, আর আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার নীরব কিন্তু তীব্র আহ্বান।
মানুষ চিকিৎসা নেয়, ওষুধ খায়, অভিজ্ঞের পরামর্শ মেনে চলে—এসবই আল্লাহর দেওয়া উপায়। কিন্তু উপায়কে যখনই মূল শক্তি ভেবে নেওয়া হয়, তখন হৃদয় শির্কের সূক্ষ্ম রোগে আক্রান্ত হতে থাকে। আর এই আয়াত সেই ভুল ভাঙিয়ে দেয় কোমল অথচ দৃঢ় ভাষায়: চিকিৎসক পথ দেখাতে পারেন, ওষুধ সহায়তা করতে পারে, কিন্তু আরোগ্যের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কারও হাতে নয়। কত মানুষ ঘনিষ্ঠ সেবা পেয়েও সুস্থ হয়নি, আবার কত দুর্বল শরীর আল্লাহর কুদরতে এমনভাবে জেগে উঠেছে যে মানুষের হিসাব থেমে গেছে। তাই মুমিনের দৃষ্টি ওষুধে আটকে থাকে না; সে ওষুধের ওপারে তাকায়, কারণ সে জানে শিফা কেবল আল্লাহরই দান, এবং তাঁর ইচ্ছা ছাড়া সুতার ভাঙনও জোড়া লাগে না।
সমাজ যখন ক্ষমতা, প্রযুক্তি আর আত্মবিশ্বাসে ফুলে ওঠে, তখন এই আয়াত এক গভীর সংশোধন এনে দেয়। মানুষের সভ্যতা বড় হতে পারে, কিন্তু মানুষের দুর্বলতা বিলীন হয় না; তার বুকের ভেতর ভয়, ব্যথা, উদ্বেগ, মৃত্যু-স্মরণ—সবই রয়ে যায়। সেই কারণে আল্লাহর দিকে ফেরা কেবল রোগীর প্রার্থনা নয়, সুস্থ মানুষেরও নীরব প্রস্তুতি। কারণ রোগ হোক বা আরোগ্য, দুটিই বান্দাকে তার আসল ঠিকানার দিকে ফেরায়। আজ যে অন্তর নিজের অসুস্থতা, গুনাহ, অহংকার, অবহেলা, আর আত্মপ্রতারণার রোগে ক্লান্ত—সে যদি এই আয়াতের সুরে কান পেতে বলে, হে আল্লাহ, আমার ভাঙা জীবনে তুমিই শিফা দাও, তবে আরোগ্য শুধু দেহে আসবে না; ঈমানের শিরা-উপশিরায় এক প্রশান্ত আলো নেমে আসবে।
রোগ মানুষকে কেবল দুর্বল করে না, মানুষের ভেতরের মিথ্যা ভরসাগুলোও একে একে খুলে ফেলে। তখন বোঝা যায়, দেহ যতই শক্ত দেখাক, এক মুহূর্তের কষ্টেই তার অহংকার কাঁপতে শুরু করে। আর এই কাঁপনের মাঝখানে ইবরাহিম আলাইহিস সালামের কণ্ঠ আমাদের শেখায়—রোগের সামনে মাথা নত করো, কিন্তু রোগের কাছে নয়; কারণ শিফা রোগের মধ্যে নেই, শিফা আছেন আল্লাহর হাতে। তিনি চাইলে অল্প কারণে আরোগ্য দেন, তিনি চাইলে দীর্ঘ পরীক্ষার ভেতরেও বান্দাকে শোধন করেন। চিকিৎসা তারই সৃষ্টি, ওষুধ তারই দান, ডাক্তারও তারই অনুমতিতে চেষ্টা করে; আর শেষ কথা একটাই—আল্লাহ যা চান, তাই হয়।
এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে হৃদয় নরম হয়ে আসে। আমরা কত সহজে নিজের সুস্থতাকে নিজের কৃতিত্ব ভাবি, আর অসুস্থতাকে ভাগ্যের নিষ্ঠুরতা বলে অভিযোগ করি। অথচ রোগও এক শিক্ষা, আর আরোগ্যও এক অনুগ্রহ। একটিতে আমরা অসহায়তা বুঝি, অন্যটিতে রহমতের দরজা দেখি। তাই মুমিনের দোয়া শুধু আরোগ্যের জন্য নয়, আত্মসমর্পণের জন্যও; সে বলে, হে রব, আমি তোমার কাছে চাই, কারণ তোমার ছাড়া আর কেউ আমার দুর্বলতার গভীরতা জানে না। এই আয়াত শেষ পর্যন্ত আমাদের কানে কানে বলে, মানুষ ভাঙে, উপায় ভেঙে যায়, আশাও কখনো ক্ষীণ হয়ে আসে; কিন্তু যে হৃদয় আল্লাহর দিকে ফিরে, তার জন্য শিফার দরজা কখনোই বন্ধ হয়ে যায় না।