যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনিই আমাকে পথপ্রদর্শন করেন—এই বাক্যে ঈমানের হৃদয় এমন এক আলোর কাছে নত হয়, যেখানে মানুষ নিজের অস্তিত্বকেও আর নিজের সম্পদ বলে মনে করতে পারে না। আমি যে নই, তারও আগে ছিল তাঁর ইচ্ছা; আমি যে আছি, তারও পরে আছে তাঁর হিদায়াত। এই আয়াতে বান্দার প্রথম সত্যটি উচ্চারিত হয়: সৃষ্টি একান্তই আল্লাহর, আর পথও একান্তই তাঁর। মানুষ দেহে জন্ম নেয়, কিন্তু সত্যিকার জীবন পায় তখনই, যখন রবের দিকনির্দেশ তার অন্তরে নেমে আসে। তাই এই বাক্য কেবল একটি স্বীকৃতি নয়; এটি আত্মসমর্পণের ঘোষণা, অহংকার ভেঙে পড়ার শব্দ, এবং অন্তরের গভীরে জেগে ওঠা এক অমোঘ সত্য—আমাকে বানানোও তাঁর, আমাকে পথ দেখানোও তাঁর।
সূরা আশ-শুআরার এই অংশে হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের তাওহিদী কথামালা ধ্বনিত হয়; তিনি মূর্তির সামনে নত হননি, নিজের জাতির ভ্রান্ত উপাসনার সামনে আপস করেননি। এই আয়াতের ভেতরে সেই দাওয়াতের হৃদয়স্পন্দন আছে: যে সত্তা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, ক্ষমতা কি তাঁর বাইরে কারও হতে পারে? যে আমাকে অস্তিত্ব দিয়েছেন, তিনি ছাড়া আমার কল্যাণ-অকল্যাণ, সত্য-মিথ্যা, সঠিক-ভুলের শেষ মানদণ্ড আর কে হতে পারে? এখানে কোনো ব্যক্তিগত কাহিনি কেবল স্মরণ করা হচ্ছে না; বরং নবী-দাওয়াতের চিরন্তন ভাষা শোনানো হচ্ছে—মানুষের ভরসা যখন স্রষ্টার উপর স্থির হয়, তখনই জীবনের পথ সোজা হয়।
এ আয়াত আমাদের শেখায়, হিদায়াত কোনো বাহ্যিক সাজসজ্জা নয়, কোনো কেবল বুদ্ধির বিজয়ও নয়; এটি আল্লাহর দান, যা বান্দার অন্তরকে অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে আসে। মানুষ অনেক পথ চিনতে পারে, কিন্তু কোন পথ তাকে আল্লাহর নিকট পৌঁছাবে—এই জ্ঞান ছাড়া সে আসলে পথহারা। তাই এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে হৃদয় নরম হয়ে যায়: আমি আমার অস্তিত্বের মালিক নই, আমার গন্তব্যও আমি ঠিক করতে পারি না, যদি না তিনি দয়া করে পথ দেখান। নবীদের কাহিনির মধ্য দিয়ে কুরআন আমাদের এ কথাই বারবার শিখায়—সত্যের আলো তখনই পূর্ণ হয়, যখন বান্দা বলে, ‘আমাকে সৃষ্টি করেছেন যিনি, পথও দেখান তিনিই।’
যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনিই আমাকে পথপ্রদর্শন করেন—এই ঘোষণার মধ্যে মানুষের সমগ্র অহংকার যেন এক মুহূর্তে নত হয়ে যায়। আমি যে কেবল একটি দেহ নই, আমি যে শূন্য থেকে নিজেকে নিজে তৈরি করিনি, আমার অস্তিত্বের প্রথম অক্ষরটিও যে আমার নয়—এই সত্য হৃদয়ে নেমে এলে, বান্দা আর নিজের বুদ্ধিকে সর্বময় মনে করতে পারে না। সৃষ্টির পর হিদায়াতের প্রয়োজন, আর হিদায়াতের উৎস একমাত্র সেই রব, যিনি গড়েছেনও, দেখানও। তাই তাওহিদের সবচেয়ে কোমল অথচ সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা এখানে: মানুষের জীবনের মানচিত্র মানুষের হাতে নয়; তার গন্তব্য, তার দিশা, তার সত্য পথ—সবই আল্লাহর দান।
সূরা আশ-শুআরার এই প্রবাহে সত্য ও মিথ্যার সংঘাতে এই বাক্য অদ্ভুত শক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মিথ্যা নিজের জৌলুসে মানুষকে মোহিত করতে চায়, সত্য নিজের সরলতায় মানুষকে জাগাতে চায়; আর এই আয়াত বলে দেয়, জাগরণের প্রথম দরজা হলো—নিজেকে রবের সৃষ্টি হিসেবে চেনা। যে হৃদয় বুঝে নেয় আমি মালিক নই, আমি পথনির্মাতা নই, আমি কেবল নির্দেশপ্রাপ্ত এক বান্দা—তার কাছে দুনিয়ার প্রতিটি মোহের দাম কমে যায়, আর হিদায়াতের মূল্য আকাশ ছুঁয়ে যায়। তখন জীবন আর অন্ধ গতি থাকে না; তা হয়ে ওঠে আল্লাহর দিকে ফেরার এক সচেতন সফর।
যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনিই আমাকে পথপ্রদর্শন করেন—এই বাক্যটি মানুষের অস্তিত্বের ওপর আল্লাহর পূর্ণ অধিকারকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করে, যেন হৃদয়ের সব মিথ্যা অবলম্বন একে একে খুলে পড়ে। আমি যে শ্বাস নিচ্ছি, তা আমার কৃতিত্ব নয়; আমি যে বেঁচে আছি, তা আমার নিয়ন্ত্রণেও নয়। অতএব আমি যখন নিজেকে নিজের মালিক ভাবি, তখনই বিভ্রান্তির শুরু; আর যখন স্বীকার করি যে স্রষ্টাই পথদাতা, তখনই অন্তর সত্যের দিকে ফিরতে শেখে। এই হিদায়াত কেবল জানার আলো নয়, এটি বাঁচার দিশা, সিদ্ধান্তের নূর, এবং আত্মাকে তার মূলের দিকে ফেরার আহ্বান।
সূরা আশ-শুআরার এই প্রেক্ষাপটে হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের তাওহিদী কণ্ঠ যেন মানুষের সমাজকে প্রশ্ন করে—যে রব আমাকে সৃষ্টি করেছেন, তাঁর দিকনির্দেশ ছাড়া আমি কার কাছে নিরাপত্তা খুঁজব? মানুষ অনেক গড়তে পারে, কিন্তু হৃদয়ের পথ সে বানাতে পারে না; সমাজ আইন বানাতে পারে, কিন্তু ন্যায়কে জীবন্ত করতে পারে না; ভাষা সাজাতে পারে, কিন্তু সত্যকে জাগাতে পারে না। তাই এই আয়াত একদিকে তাওহিদের অগ্নিশিখা, অন্যদিকে দাওয়াতের কোমল ডাক—নিজের হাতে গড়া ভরসাগুলো ভেঙে ফেলো, কারণ যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনিই জানেন কোন পথে মানুষ শান্তি পায়, কোন পথে সে অন্ধকারে হারায়।
এই সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে বান্দা নিজের হিসাব নিতে শেখে। আমি কি আজও আমার স্রষ্টার দেখানো পথে চলছি, নাকি নিজের ইচ্ছাকে হিদায়াতের আসনে বসিয়েছি? এই প্রশ্ন মানুষের অহংকারকে কাঁপিয়ে দেয়, আবার নিরাশাকে প্রশমিতও করে; কারণ যে আমাকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি আমাকে পথ দেখাতেও সক্ষম। তাঁর হিদায়াতের দরজা বন্ধ নয়, তাঁর দয়া শুষ্ক নয়, তাঁর দিকে ফিরে আসার পথ কখনও শেষ হয় না। যে হৃদয় ভেঙে তাঁর কাছে আসে, সে অপমানিত হয় না; বরং সঠিক পথে ফিরে পেয়ে নতুন জীবন পায়। এ আয়াত তাই শুধু একটি ঘোষণাই নয়, এটি প্রত্যাবর্তনের আহ্বান—সৃষ্টি থেকে হিদায়াত, হিদায়াত থেকে আনুগত্য, আর আনুগত্য থেকে আল্লাহর নৈকট্য।
মানুষ অনেক সময় নিজের পথকে নিজের বুদ্ধির জয় বলে ভাবতে চায়, কিন্তু এই আয়াত এসে সেই ভ্রান্ত গর্বকে নীরবে ভেঙে দেয়। যে আমাকে সৃষ্টি করেছেন, পথ দেখানোর অধিকারও তো একমাত্র তাঁরই। আমি যদি আমার দেহের গঠন, আমার নিঃশ্বাসের ধার, আমার হৃদয়ের স্পন্দন—কোনোটারই মালিক না হই, তবে আমার জীবনের মানে, আমার ন্যায়ের বোধ, আমার মুক্তির দিশা কীভাবে আমার হাতেই থাকবে? এই প্রশ্নের সামনে অহংকার টেকে না। এখানে মানুষ বুঝে যায়, হিদায়াত কোনো অর্জিত পদক নয়; এটি রবের দয়া, যা না পেলে চোখ থাকলেও অন্ধকার কাটে না।
তাই এই আয়াত আমাদের বুকের ভেতর এক নরম কিন্তু গভীর কাঁপন জাগায়: আমি কোথা থেকে এসেছি, তা যদি আমার রব জানেন, তবে কোথায় যাব, সেটাও তো তাঁর দেখানো পথে-ই ঠিক হবে। জীবনের প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি সিদ্ধান্তে, প্রতিটি বিপদে ও প্রতিটি তাওবার মুহূর্তে এই সত্য আমাদের ডাক দেয়—নিজেকে যথেষ্ট ভেবো না, আর আল্লাহকে দূরে কল্পনা কোরো না। যে রব সৃষ্টি করেছেন, তিনি পথও দেখান; আর যে বান্দা এই কথায় ফিরে আসে, তার জন্য অন্ধকারও ধীরে ধীরে সেজদার দিকে ঝুঁকে পড়ে।