নিশ্চয় এতে নিদর্শন আছে—এই বাক্যটি কেবল একটি খবর নয়, এটি অন্তরকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া এক আলোকরেখা। আল্লাহর কুদরতের ইতিহাসে, নবীদের কাহিনিতে, সত্যের দীর্ঘ সফরে বারবার একই দৃশ্য ফুটে ওঠে: আসমানী দাওয়াত আসে, নিদর্শন প্রকাশ পায়, হক স্পষ্ট হয়; তবু মানুষের এক বড় অংশ মুখ ফিরিয়ে নেয়। সূরা আশ-শুআরার এই আয়াতে যেন আল্লাহ আমাদের সামনে সত্যের এক নির্মম কিন্তু পবিত্র আয়না ধরছেন—নিদর্শন আছে, কিন্তু বিশ্বাসের দরজা সবার জন্য খুলে যায় না; কারণ ঈমান শুধু দেখা নয়, বরং আত্মসমর্পণ।

এখানে কোনো নির্দিষ্ট একক ঘটনার সীমায় কথা আটকে নেই; বরং পুরো সূরার ধারাবাহিক প্রেক্ষিতেই এ আয়াতের স্বাদ গভীর হয়। নূহ, হূদ, সালিহ, লূত, শুআইব—প্রত্যেক নবীর কাহিনিতেই দেখা যায় একই মানব-প্রবণতা: সত্যের ডাক আসলে অহংকার জেগে ওঠে, স্বার্থের পর্দা নড়ে, ভিড়ের চাপ শক্ত হয়, আর অধিকাংশ মানুষ ঈমানের বদলে অস্বীকারকে বেছে নেয়। তাই আয়াতটি শুধু অতীতের জাতিগুলোর বর্ণনা নয়; এটি মানব হৃদয়ের রোগেরও বর্ণনা, যেখানে সত্য চোখে পড়েও হৃদয় তাকে গ্রহণ করতে চায় না।

আর ‘তাদের অধিকাংশই বিশ্বাসী নয়’—এই অংশে এক গভীর বিষাদের স্বর আছে। আল্লাহর রাসুলদের দাওয়াত কখনো সংখ্যার জোরে সত্য হয় না; সত্য তার নিজস্ব নূরে সত্য। বহু মানুষ অস্বীকার করলেও হক ক্ষীণ হয় না, আর অল্প কয়েকজন মুমিন থাকলেও তাদের ঈমান ছোট হয়ে যায় না। এই আয়াত আমাদের শেখায়, হেদায়াত ভিড়ের অনুগ্রহ নয়; এটি আল্লাহর দান। তাই চোখের সামনে নিদর্শন থাকা সত্ত্বেও যদি হৃদয় নরম না হয়, তবে বিপদ নিদর্শনের অভাবে নয়—বরং অন্তরের অন্ধকারে।

নবীদের কাহিনির ভেতর আল্লাহ যেন মানুষের সামনে বারবার একই সত্য খুলে দেন—নিদর্শন কখনো দুর্বল ছিল না, দুর্বল ছিল গ্রহণের হৃদয়। এই আয়াতটি আমাদের শেখায়, হককে ছোট করে দেখার সাহস আসলে হকের ভেতর নয়, দেখার চোখের ভেতর। নূহের ধৈর্য, হূদের সতর্কবাণী, সালিহের স্পষ্ট দাওয়াত, লূতের বেদনাময় আহ্বান, শুআইবের ন্যায়ভিত্তিক আহ্বান—সবখানেই আল্লাহর আয়াত জ্বলজ্বল করেছে; কিন্তু মানুষের অহংকার, অনুসৃত অভ্যাস, ভিড়ের মানসিকতা আর দুনিয়ার মোহ অনেককে সত্যের দিকে হাঁটতে দেয়নি। তাই এখানে কেবল অতীতের ইতিহাস নেই, আছে মানুষের অন্তর্গত দুর্বলতার চিরন্তন মানচিত্র।

অধিকাংশই বিশ্বাসী নয়—এই বাক্যটি শুনতে কঠিন, কিন্তু এটাই যুগে যুগে বাস্তব। আল্লাহর দাওয়াত সবসময়ই জনতার সংখ্যায় জেতেনি; বরং তা হৃদয়ের গভীরে নীরবে বিজয়ী হয়েছে। ঈমানের পথ এমন নয় যে সবাই একসঙ্গে সেখানে পৌঁছে যায়; বরং সেখানে আসে সেই হৃদয়, যা সত্যের সামনে নিজেকে হারাতে রাজি। যে মানুষ নিজেকে কেন্দ্র বানায়, সে নিদর্শন দেখেও অন্ধ থাকে; আর যে বান্দা নিজের ভাঙনকে স্বীকার করে, সে সামান্য এক আয়াতেই আসমানের দরজা টের পায়। এ কারণেই কুরআন আমাদের সংখ্যার নয়, অন্তরের মানদণ্ড শেখায়। ভিড়ের সম্মতি সত্যের প্রমাণ নয়; আল্লাহর সত্য নিজেই প্রমাণ।
এই আয়াত আমাদের অন্তরকে জিজ্ঞেস করে: তুমি কি নিদর্শন দেখেও কেবল কথা বলছ, নাকি হৃদয় দিয়ে সেজদার দিকে ঝুঁকছ? কারণ নিদর্শন দেখা আর ঈমান আনা এক জিনিস নয়। চোখ সত্যকে ধরতে পারে, কিন্তু আত্মা যদি গর্বে শক্ত থাকে, তবে সত্যও সেখানে অসহায় হয়ে পড়ে না—অসহায় হয় মানুষ নিজেই। তাই এই আয়াত শুধু হতাশার নয়, সতর্কতারও। যেন আল্লাহ বলেন, হে মানুষ, রাস্তা স্পষ্ট, দাওয়াতও স্পষ্ট, নিদর্শনও স্পষ্ট; এখন বাকিটা তোমার বিনয়ের পরীক্ষা। যে হৃদয় আল্লাহর সামনে নত হয়, তার জন্য একটিমাত্র নিদর্শনই যথেষ্ট। আর যে নত হয় না, তার সামনে সমগ্র কায়েনাতও সাক্ষ্য দিয়ে শেষ হয়ে যায়।

এই আয়াত আমাদের বুকের ভেতর এক কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রশ্ন রেখে যায়: সত্য যদি এত স্পষ্টই হয়, তবে মানুষ কেন ঝুঁকে পড়ে না? আল্লাহর নিদর্শন কখনও কম পড়ে না; কম পড়ে মানুষের হৃদয়ের নম্রতা, আত্মসমর্পণ, আর সত্যকে সত্য বলে মেনে নেওয়ার সাহস। নবীদের কাহিনি আমাদের শেখায়, দাওয়াতের আলো শুধু জ্ঞান নয়, এটি চরিত্রের পরীক্ষাও। চোখে যখন আয়াতের দীপ্তি এসে পড়ে, তখনও যদি অন্তর গাঢ় অন্ধকারে ডুবে থাকে, তবে দোষ আলোর নয়; দোষ সেই চোখের, যে দেখেও দেখতে চায় না।

‘তাদের অধিকাংশই বিশ্বাসী নয়’—এই বাক্যটি যুগে যুগে মানুষের সমষ্টিগত দুর্বলতার এক করুণ স্বাক্ষর। সমাজ যখন সংখ্যাকেই সত্যের মানদণ্ড বানায়, তখন হকের পথ একা হয়ে যায়; আর সেই একাকীত্বেই ঈমানের সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল হয়। অধিকাংশের অস্বীকার কোনো যুক্তি নয়, কোনো নিরাপত্তা নয়; বরং তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে হিদায়াত ভিড়ের পণ্য নয়, আল্লাহর এক বিশেষ দান। তাই এই আয়াত আমাদেরকে ভয়ও দেয়, আবার আশা-ও দেয়: ভয়, যেন আমরা গাফিলদের দলে না পড়ি; আশা, যেন সামান্য এক বিনয়ী হৃদয়ও আল্লাহর নিদর্শনের সামনে নত হতে পারে।

অতএব, এই বাক্য পাঠ করে নিজেকে জিজ্ঞেস করতে হয়—আমার ভেতরে কি এমন কোনো পর্দা আছে, যা সত্যকে চেনার পরও তাকে মানতে দিচ্ছে না? আমি কি মানুষের স্রোতকে সত্য ভাবছি, নাকি আল্লাহর বাণীকে? জীবন ক্ষণিক, অথচ হককে অস্বীকারের দায় অনন্তের দিকে নিয়ে যায়। আর যে অন্তর আজই কাঁপে, সে-ই রক্ষা পেতে পারে; যে চোখ আজই অশ্রুতে ধুয়ে নেয় অহংকার, সে-ই নিদর্শনকে নিছক ইতিহাস নয়, জীবন্ত আহ্বান হিসেবে শুনতে পারে। আল্লাহ আমাদেরকে সেই হৃদয় দিন, যে নিদর্শন দেখে বিস্মিত হয়, অবনত হয়, এবং শেষ পর্যন্ত তাঁরই দিকে ফিরে যায়।

এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ কেবল ইতিহাসের পাঠক থাকে না; সে নিজের অন্তরের বিচারকের মুখোমুখি হয়। কারণ “অধিকাংশই বিশ্বাসী নয়”—এ বাক্যটি শুধু অতীতের জাতিগুলোর জন্য নয়, আমাদের ভেতরের প্রতিরোধকেও উন্মোচন করে। কত নিদর্শন আমরা দেখি, কত সত্য আমরা শুনি, কতবার আমাদের জীবনে আল্লাহ এমন দরজা খুলে দেন যা কৃতজ্ঞতা ও নততার দিকে নিয়ে যেতে পারত; তবু হৃদয় যদি অহংকারে শক্ত হয়ে থাকে, তবে নিদর্শনও অনেক সময় নীরব হয়ে যায়। সত্যের অভাব নেই, অভাব হলো সেই বিনয়ী হৃদয়ের, যে সত্যকে সত্য হিসেবেই গ্রহণ করতে শেখে।
তাই এই আয়াত আমাদের ভেতর ভয়ের সঙ্গে আশা জাগায়। ভয়, এই ভেবে যে মানুষ সত্য দেখেও অস্বীকার করতে পারে; আর আশা, এই ভেবে যে আল্লাহ যাকে চান, তাকেই হৃদয়ের দরজা খুলে দেন। নবীদের কাহিনিতে আমরা শক্তির গল্প কম দেখি, বেশি দেখি ধৈর্যের, দাওয়াতের, এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসার গল্প। তারা সংখ্যার জন্য ডাকেননি, প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করেননি; তাঁরা সত্য বলেছেন, আর ফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। এভাবেই ঈমানের মর্যাদা বেড়ে যায়—কারণ সেটি ভিড়ের অনুসরণ নয়, রবের ডাকে সাড়া দেওয়া।
হে অন্তর, নিদর্শন দেখে যদি তুমি নরম না হও, তবে দুনিয়ার শব্দে তুমি আরও শক্ত হয়ে যাবে। আর যদি আজই তুমি আল্লাহর সামনে নত হও, তবে একাকী ঈমানও তোমাকে যথেষ্ট করে দেবে। সূরা আশ-শুআরার এই আয়াত যেন আমাদের শেখায়: সত্যের পথে অধিকাংশের থাকা জরুরি নয়; জরুরি হলো আল্লাহর কাছে তোমার অবস্থান। তাই আমরা যেন সেই অল্পসংখ্যকের মাঝে থাকতে পারি, যাদের চোখ সত্য দেখে, হৃদয় কাঁদে, আর আত্মা বলে—হে আল্লাহ, আমরা শুনলাম, আমরা বিশ্বাস করলাম, আমাদেরকে অস্বীকারকারীদের ভিড়ে ফেলে রেখো না।