নবীদের কাহিনির এই দীর্ঘ স্রোতে, সত্যের আহ্বান যখন মানুষের হঠকারিতা, অস্বীকার আর বিদ্রূপের পাথরে বারবার আঘাত খায়, তখন এই আয়াত যেন আকাশ থেকে নামা এক শান্ত অথচ কম্পনজাগানিয়া ঘোষণা: “নিশ্চয় আপনার পালনকর্তা প্রবল পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু।” এখানে একসঙ্গে দু’টি মহান সত্য হৃদয়ে বসে যায়—আল্লাহর ক্ষমতা পরাভব মানে না, আর তাঁর দয়া সীমা মানে না। নবীদের কাজ ছিল ডাক দেওয়া; ফলাফল আল্লাহর হাতে। যারা সত্যকে দুর্বল ভেবে তুচ্ছ করে, এই বাক্য তাদের জন্য সতর্কবার্তা। আর যারা সত্যের পথে একা, ক্লান্ত, আহত হয়ে পড়ে, এই বাক্য তাদের জন্য আশ্রয়। কারণ দাওয়াতের পথে মানুষকে শক্তি জোগায় মানুষের প্রশংসা নয়, বরং সেই রবের পরিচয়—যিনি চাইলে অবাধ্যকে পাকড়াও করতে পারেন, আবার চাইলে তাওবাকারীর জন্য রহমতের দরজা খুলে দেন।
সূরা আশ-শুআরা-এর এই অংশে বারবার দেখা যায়, নবীদের আহ্বান একটাই ছিল: আল্লাহকে ভয় করো, তাঁর দিকে ফিরে এসো, সত্যকে গ্রহণ করো। কিন্তু প্রত্যেক সমাজেই একদল মানুষ উঠে দাঁড়ায়, যারা কণ্ঠকে উপহাসে চাপা দিতে চায়, কুরআনের সত্যবাণীকে কবিতা বলে উড়িয়ে দিতে চায়, আর নবীদের সতর্কবাণীকে মানুষের বানানো কথা মনে করে। এই আয়াত সেই বিদ্রূপের ভেতরেও একটি অটল কেন্দ্র স্থাপন করে দেয়। মানুষ যদি প্রত্যাখ্যান করে, তাতে সত্য নড়ে না। মানুষ যদি অহংকার করে, তাতে রবের রাজত্ব কমে না। বরং আল্লাহর “العزيز” নাম মনে করিয়ে দেয়—তিনি এমন ক্ষমতাবান, যাঁর সামনে দম্ভ ভেঙে পড়ে; আর “الرَّحِيم” নাম জানিয়ে দেয়—তিনি এমন দয়ালু, যাঁর রহমত পাপীর পথের শেষে পর্যন্ত পেছনে পেছনে ডাক দেয়।
এই আয়াতের ঐতিহাসিক বা নির্দিষ্ট কোনো পৃথক কারণ-অবতরণ নিশ্চিতভাবে বর্ণিত নয়; তবে এর বৃহত্তর প্রেক্ষাপট স্পষ্ট—এটি নবীদের দাওয়াত, মিথ্যাপ্রচারকারী সমাজের বিরোধিতা, এবং আল্লাহর নিদর্শন অস্বীকারকারীদের পরিণতি সম্পর্কে এক ধারাবাহিক বয়ানের অংশ। তাই আয়াতটি শুধু অতীতের কোনো ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রতিটি যুগের জন্য একইসঙ্গে ভয় ও ভরসার বার্তা। যে হৃদয় আজও সত্যের পথে দাঁড়িয়ে আছে, সে যেন মনে রাখে: রাস্তা যত কঠিনই হোক, তার ওপর দিয়ে চলা মানুষটি একা নয়। তার সামনে আছে আল্লাহর ক্ষমতার সুরক্ষা, আর তার পেছনে আছে আল্লাহর দয়ার ছায়া। এভাবেই এই ছোট্ট বাক্যটি মুমিনের অন্তরে অদ্ভুত ভারসাম্য তৈরি করে—আশঙ্কাকে ভেঙে দেয়, আবার গাফিলতিকে নরম হাতেও জাগিয়ে তোলে।
নবীদের কাহিনির দীর্ঘ পথ পেরোতে পেরোতে মানুষ দেখে—সত্যের ডাক কখনো সহজ ছিল না। প্রতিটি যুগেই বাতিল তার কণ্ঠ উঁচু করেছে, বিদ্রূপকে অস্ত্র বানিয়েছে, আর অহংকারকে সত্যের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু এই আয়াত যেন সব হাঙ্গামার মাঝখানে এক অপার স্থিরতা হয়ে নেমে আসে: নিশ্চয় আপনার পালনকর্তা প্রবল পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু। অর্থাৎ, যে রবের দিকে আহ্বান করা হচ্ছে তিনি দুর্বল নন, আর যে পথে ডাকা হচ্ছে তা নিঃসহায়ও নয়। দাওয়াতের বাহ্যিক রূপ হয়তো মানুষের চোখে একাকী, ক্ষীণ, এবং কখনো পরাজিতপ্রায়; কিন্তু তার অন্তরে রয়েছে এমন এক মালিকের সান্নিধ্য, যাঁর শক্তির সামনে কোনো জুলুম দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
নবীদের কাহিনি আমাদের শেখায়, সফলতা মানে তাৎক্ষণিক জয় নয়; সফলতা মানে আল্লাহর হুকুমে অবিচল থাকা। মানুষ যদি গ্রহণও করে, তা তাঁর তাওফীক; আর না করলেও, সত্যের আলো মিথ্যা হয়ে যায় না। এই আয়াত তাই মুমিনের অন্তরে দুই রকম আগুন জ্বালায়: অন্যায়কে দেখে ভয়ের আগুন, আর আল্লাহর রহমতকে দেখে আশার আগুন। দাওয়াতের পথ ক্লান্তিকর হতে পারে, কিন্তু অপমানের শব্দই শেষ কথা নয়; ইতিহাসের শেষ কথা আল্লাহর। তিনি শক্তিমান—তাই জালিম টিকে থাকবে না। তিনি দয়ালু—তাই তাওবাকারীর জন্য দরজা বন্ধ হয়ে যায় না। এমন রবের দিকে ডাকা মানে, মানুষকে একটি সীমিত শক্তির নয়, বরং এমন এক সত্তার দিকে আহ্বান করা যাঁর হাতে ধ্বংসও আছে, আবার ফিরে আসার জন্য অসীম আশ্রয়ও আছে।
নবীদের দীর্ঘ কাহিনি যেন আমাদের সামনে একটাই বাস্তবতা তুলে ধরে—সত্যের ডাক কখনোই সহজ ছিল না। মানুষ যখন অহংকারে ফুলে ওঠে, তখন তারা বার্তাবাহককে ছোট করতে চায়; যখন হেদায়েত কাছে আসে, তখন তারা শব্দের আড়ালে নিজেদের হৃদয় লুকায়। এমন মুহূর্তে এই আয়াত এসে দাঁড়ায় বুকের উপর হাত রেখে বলা আশ্বাসের মতো: নিশ্চয় আপনার পালনকর্তা প্রবল পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু। অর্থাৎ এই দাওয়াত দুর্বল নয়, এর পেছনে আছেন এমন এক রব, যাঁর সামনে কোনো শক্তি টিকে থাকতে পারে না; আবার তাঁর দরজা এমনই প্রশস্ত, যে অবাধ্যতম হৃদয়ও তাওবা করে ফিরলে সেখানে রহমতের ছায়া পায়।
এখানেই মুমিনের অন্তর নিজের হিসাব নিতে শেখে। আমরা কত সহজে সত্যের পথে ক্লান্ত হয়ে যাই, কত দ্রুত মানুষের প্রতিক্রিয়াকে বড় করে দেখি, আর আল্লাহর শক্তিকে স্মরণ করতে ভুলে যাই। কিন্তু এই আয়াত মনে করিয়ে দেয়, ফলাফলের মালিক মানুষ নয়, ক্ষমতার মালিকও মানুষ নয়। যারা তুচ্ছ করে, যারা অস্বীকার করে, যারা সত্যের আলোকে নিভিয়ে দিতে চায়—তাদের জন্য আল্লাহর ‘আল-আযীয’ নামটি ভয় জাগায়; আর যারা লজ্জিত, ভাঙা, প্রত্যাবর্তনের পথ খুঁজছে—তাদের জন্য ‘আর-রাহীম’ নামটি অশ্রুকে আশায় বদলে দেয়। এক হৃদয়ে ভয় ও আশা, এক দৃষ্টিতে জবাবদিহির অনুভব, আরেক দৃষ্টিতে করুণার বিস্তার—এটাই ঈমানের ভারসাম্য।
সূরা আশ-শুআরা-র এই স্রোতে নবীদের কাহিনি শুধু অতীতের গল্প নয়; তা আজকের মানুষের আত্মাকে জাগানো এক আয়না। আমরা কি সত্যের আহ্বান শুনে নরম হই, নাকি নিজেদের শক্তি, গোষ্ঠী, যুক্তি আর অভ্যাসের দেয়ালে বন্দি থেকে যাই? যে রব প্রবল পরাক্রমশালী, তিনি আমাদের গোপন অবাধ্যতাও জানেন; আর যে রব পরম দয়ালু, তিনি আমাদের ফিরে আসার একটি নিঃশব্দ মুহূর্তকেও উপেক্ষা করেন না। তাই এই আয়াত মুমিনকে ভাঙে, আবার জোড়া লাগায়; ভয় দেখায়, আবার আশ্রয় দেয়; অভিমান গলিয়ে দেয়, আবার হৃদয়ে ফিরে আসার সাহস জাগায়। সত্যের পথে হাঁটা মানেই একা হাঁটা নয়—কারণ যে পথে আল্লাহ আছেন, সে পথে শক্তির শেষ নেই, আর করুণারও শেষ নেই।
নবীদের কাহিনির স্রোত আমাদের শেখায়—দাওয়াতের পথ কখনো সহজ ছিল না, তবু তা কখনো ব্যর্থও হয়নি। মানুষ কখনো অবিশ্বাসের অন্ধকারে লুকিয়েছে, কখনো বিদ্রূপের আড়ালে সত্যকে ঠেলে দিয়েছে; কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনা তাদের চেয়ে বড়, তাঁর রহমত তাদের অবজ্ঞার চেয়েও বিস্তৃত। যে হৃদয় আজও নরম হয়ে কুরআনের সামনে দাঁড়ায়, সে যেন এই বাক্যটিকে নিজের বুকে লিখে রাখে: ভয় আমাকে ছোট করবে না, আর আশা আমাকে গাফিল করবে না। কারণ যিনি শাস্তি দিতে পারেন, তিনিই ক্ষমা করতেও পারেন।
তাই এই আয়াতের সামনে এসে মাথা নত করাই শোভন। নিজের বক্তব্যের জোরে নয়, নিজের রবের পরিচয়ে ভরসা করতে শেখাই ঈমানের সৌন্দর্য। যদি পথ কঠিন হয়, তবে মনে রেখো—তোমার রব পরাক্রমশালী; যদি অন্তর ভেঙে যায়, মনে রেখো—তোমার রব পরম দয়ালু। তাঁর শক্তি যাদের হঠকারিতাকে ভেঙে দেয়, তাঁর দয়া তাদেরকেও তুলে নেয় যারা ভেঙে পড়েছে। আজ এই কুরআন আমাদের কানে নয়, হৃদয়ে পৌঁছাক; আর হৃদয় বলুক—হে রব, আপনার ক্ষমতার সামনে আমি নির্ভরশীল, আর আপনার রহমতের সামনে আমি আশ্রয়প্রার্থী।