কাফেররা বলে, যখন আমরা আর আমাদের বাপ-দাদারা মাটি হয়ে যাব, তখনও কি সত্যিই আবার বের করে আনা হবে? এই প্রশ্নের ভেতরে শুধু অবিশ্বাস নেই, আছে মানুষের সীমাবদ্ধ দৃষ্টির অহংকার। চোখ যা দেখে না, হৃদয় যা মানে না, তাকে তারা অস্বীকার করে বসে। মৃত্যুকে তারা শেষ ভেবেছে; অথচ মৃত্যু কেবল দুনিয়ার পর্দা সরে যাওয়া, আল্লাহর কুদরতের সামনে মানুষের দুর্বলতা প্রকাশ পাওয়ার আরেক নাম। যারা কুরআনের সতর্কবাণী শুনেও ফিরেও তাকায় না, তাদের মুখে এমন প্রশ্ন ওঠে—যেন মাটি হয়ে যাওয়া মানেই আল্লাহর ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়া।
সূরা আন-নামলের আগের আয়াতগুলোর ধারায় আমরা দেখি সুলায়মান আলাইহিস সালামের রাজত্ব, পিঁপড়ার ক্ষীণ অথচ বিস্ময়কর সতর্কতা, আর সাবার লোকদের কাছে পৌঁছে যাওয়া তাওহীদের আহ্বান—সবকিছু মিলিয়ে কুরআন আমাদের শেখায়, আল্লাহর নিদর্শন বড়ও হতে পারে, ক্ষুদ্রও হতে পারে, কিন্তু সবই তাঁরই নিদর্শন। সেই আলোয় এই আয়াতটি এসে দাঁড়ায় মানুষের অন্তরের কঠিন প্রশ্নের সামনে। যিনি পিঁপড়ার ভাষা শুনতে পারেন, যিনি সাবার জাতির সামনে সত্যের দরজা খুলে দেন, তাঁর জন্য মানুষকে পুনরুজ্জীবিত করা কি কঠিন হতে পারে? কুরআন বারবার আমাদের স্মরণ করায়, সৃষ্টি আর পুনরুত্থান—দুটিই একই রবের ইচ্ছার অধীন।
এই আয়াতের ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত নির্দিষ্ট কোনো এক ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি মক্কার সেই সামগ্রিক মানসিকতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে আখিরাতকে অস্বীকার করা, আল্লাহর ক্ষমতাকে ছোট করে দেখা, এবং কুরআনের সতর্ক ডাককে তুচ্ছ করা ছিল এক গভীর সামাজিক বাস্তবতা। প্রশ্নটি যেন মানুষের ভিতরের ভাঙনকে উন্মোচন করে: আমরা মাটির সন্তান, অথচ চিরস্থায়ী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। এ আয়াত আমাদের থামিয়ে দেয়—তুমি যখন মাটি ছিলে, তখন কে তোমাকে জীবন দিল? আর যখন আবার মাটিতে ফিরবে, তখন কে তোমাকে পুনরায় দাঁড় করাবে? এই জবাবের দ্বারই তাওহীদ: আল্লাহই প্রথম, আল্লাহই শেষ, আর তাঁর কুদরতের সামনে পুনরুত্থান কোনো কল্পনা নয়; এটি সেই সত্য, যা অস্বীকারকারীর কণ্ঠে কাঁপন ধরায় এবং মুমিনের হৃদয়ে আখিরাতের আলো জ্বালিয়ে দেয়।
মানুষের এই প্রশ্নে কেবল যুক্তির দম্ভ নেই, আছে অস্তিত্বের ভুল হিসাব। তারা ভাবে, মাটি হয়ে গেলে সব শেষ; অথচ মাটি তো শেষ নয়, মাটিই তো শুরু আর প্রত্যাবর্তনের সাক্ষী। যে সত্তা শূন্য থেকে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তাঁর জন্য পুনরায় জীবিত করা নতুন কোনো কাজ নয়। আসল বিস্ময় মরে যাওয়া নয়, বরং এই যে মানুষ নিজের ক্ষণভঙ্গুরতা জেনেও এমন কথা বলে, যেন মৃত্যুই তার শেষ অধিকার। কুরআন এখানে হৃদয়ের ওপর হাত রেখে জিজ্ঞেস করে না, বরং জাগিয়ে তোলে—তোমরা কি সত্যিই মনে করো, যিনি প্রথমবার অস্তিত্ব দিয়েছেন, তিনি আবার ডাকতে পারবেন না?
এই আয়াত আমাদের হৃদয়ে এক গভীর কাঁপন জাগায়: মৃত্যুর পরের জীবন যদি সত্য হয়, তবে আমাদের বর্তমান জীবন আর হালকা থাকে কীভাবে? প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি গোপন পাপ, প্রতিটি অশ্রু, প্রতিটি সিজদা—সবই তখন অন্য আলোয় দেখা দেয়। কুরআন আমাদের ভয় দেখাতে নয়, জাগাতে আসে; দম্ভকে ভাঙতে, অবহেলাকে সরাতে, এবং মানুষকে তার আসল ঠিকানার দিকে ফেরাতে। যে ব্যক্তি আজ এই প্রশ্নের জবাব হৃদয়ে গ্রহণ করে—আমি মাটি হলেও রব আমাকে ফিরিয়ে আনতে পারেন—সে-ই তাওহীদের দরজায় দাঁড়ায়। আর যে জবাব এড়িয়ে যায়, সে কেবল আখিরাত নয়, নিজের আত্মাকেও অস্বীকার করে।
এই আয়াত যেন মানুষের অহংকারের মুখে এক সরল, নির্মম প্রশ্ন। কাফেররা বলে, আমরা আর আমাদের বাপ-দাদারা যখন মাটি হয়ে যাব, তখন কি আবার বের করে আনা হবে? তারা যেন দেহের গুঁড়োকে শেষ সত্য ধরে নিয়েছে, আর আল্লাহর কুদরতের সামনে নিজেদের ক্ষুদ্র মাপকাঠিকে চূড়ান্ত মানদণ্ড বানিয়েছে। কিন্তু কুরআন এখানে শুধু তাদের কথাই শোনায় না, আমাদের হৃদয়ের ভেতরকার গোপন সংশয়কেও স্পর্শ করে। কারণ মানুষও কখনো কখনো মৃত্যুকে দূরে ঠেলে রাখতে চায়, আখিরাতকে অস্পষ্ট ভেবে এড়িয়ে যেতে চায়, আর জীবনের হিসাবকে দুনিয়ার ভোগে ঢেকে রাখতে চায়। অথচ মাটি হওয়া মানে শেষ হয়ে যাওয়া নয়; মাটি তো সেই উপাদান, যেখান থেকে আল্লাহ প্রথম মানুষকে সৃষ্টি করেছেন—আর যিনি শুরু করতে পারেন, তাঁর জন্য পুনরাবৃত্তি কি কঠিন হতে পারে?
সূরা আন-নামলের আগের দৃশ্যগুলোতে আমরা দেখি সুলায়মান আলাইহিস সালামের সামনে সৃষ্টির কত বিস্ময় নত হয়ে আছে, ক্ষুদ্র পিঁপড়াও সতর্কতা জানিয়ে দেয়, আর সাবার মতো জাতিও নিদর্শনের মুখোমুখি হয়। এই সবকিছু যেন একই সত্যের দিকে ইশারা করে—আল্লাহর রাজত্বের সামনে কেউ অদৃশ্য নয়, কেউ অসম্ভবও নয়। যে হৃদয় পিঁপড়ার বার্তা বুঝতে পারে, যে জাতির সামনে সত্যের আলো পৌঁছে যায়, সেই হৃদয়ের জন্য পুনরুত্থান অস্বীকার করা কেমন ভয়ংকর অন্ধত্ব! মানুষ যদি সত্যিই ভেবে দেখত, তবে বুঝত মৃত্যু কোনো বিলুপ্তি নয়; মৃত্যু হলো পর্দার ওপারে পৌঁছে যাওয়া, আর কিয়ামত হলো সেই পর্দা তুলে দিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর দিন। আজ যারা ‘আমাদের আবার তোলা হবে কি’ বলে বিদ্রূপ করে, কাল তাদেরই সামনে সেই জিজ্ঞাসা দাঁড়াবে—তখন অস্বীকারের ভাষা থাকবে না, থাকবে কেবল আমলের ভার।
এই আয়াত আমাদেরকে ভেতর থেকে জাগাতে চায়। সমাজ যখন আখিরাতকে ভুলে দুনিয়ার চাকচিক্যে ডুবে যায়, তখন মানুষের বিবেকও ধীরে ধীরে মাটি হয়ে যায়—দেহ নয়, হৃদয়। বাহ্যিক সভ্যতা বাড়ে, কিন্তু অন্তরের আলোক কমে; কথা বাড়ে, কিন্তু আত্মসমালোচনা কমে; ভোগ বাড়ে, কিন্তু জবাবদিহির ভয় মুছে যায়। তাই কুরআন বারবার মৃত্যু, পুনরুত্থান, হিসাব—এই সবকিছুর কথা স্মরণ করায়, যেন মানুষ নিজের সীমা চিনে নেয় এবং রবের সামনে নরম হয়। আমরা যেন এই প্রশ্নকে ঠান্ডা যুক্তিতে না দেখি, বরং কাঁপতে কাঁপতে শুনি: আমি কি সত্যিই বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ আমাকে আবার দাঁড় করাবেন? যদি বিশ্বাস করি, তবে আজকের আমল, আজকের অহংকার, আজকের গাফিলতি—সবই বদলে যেতে হবে। আর যদি না করি, তবে তা কেবল বুদ্ধির ভুল নয়; তা আত্মার ভয়ংকর বিদ্রোহ।
মাটি হয়ে যাওয়া দেহকে দেখে মানুষ ভাবে, সব শেষ। অথচ শেষের এই ধারণাটাই বড় ভুল। যে চোখ ধুলো দেখে, সে কুদরত দেখেনি; যে হৃদয় জীর্ণ হাড়ে আটকে থাকে, সে জীবনদাতার রাজত্ব বোঝেনি। এই আয়াতের প্রশ্নে যেন মানুষের অহংকার নগ্ন হয়ে যায়—আমরা কি সত্যিই ভেবেছি, যিনি প্রথমবার শূন্য থেকে সৃষ্টি করেছেন, তাঁর জন্য আবার জাগিয়ে তোলা কঠিন হবে? পিঁপড়ার ক্ষুদ্র জগত, সুলায়মানের বিশাল রাজত্ব, সাবার জাতির সামনে উন্মোচিত আল্লাহর নিদর্শন—সবই এক কথাই বলে: ক্ষমতা আল্লাহর, সীমা মানুষের।
তাই এই প্রশ্ন শুধু কাফেরদের নয়; প্রতিটি ভীত, গাফেল, পাপী হৃদয়ের কাছে একটি আয়না। আমরা কি সেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের মুখ চিনতে পারি? যেদিন কবরের নীরবতা ভেঙে ওঠার ডাক আসবে, সেদিন বাপ-দাদার স্মৃতিও, দেহের ধূলিও, দুনিয়ার গর্বও কোনো আশ্রয় দেবে না। তখন কাজ দেবে শুধু ঈমান—নম্র ঈমান, কাঁপতে কাঁপতে আল্লাহর কাছে ফেরা ঈমান। হে মানুষ, মাটি তোমাকে অপমান করার জন্য নয়; মাটি তোমাকে শেখানোর জন্যই আছে—তুমি কত দুর্বল, আর তোমার রব কত মহান।