“বরং পরকাল সম্পর্কে তাদের জ্ঞান নিঃশেষ হয়ে গেছে; বরং তারা এ বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করছে; বরং তারা এ বিষয়ে অন্ধ।” — এই আয়াত যেন মানুষের ভেতরের একটি ভয়ংকর শূন্যতার ছবি আঁকে। কুরআন এখানে শুধু অজ্ঞতার কথা বলছে না; বলছে এমন অবস্থার কথা, যেখানে জ্ঞান আর এগোতে পারে না, সন্দেহ এসে তার জায়গা দখল করে, আর শেষে অন্তর এমন অন্ধ হয়ে যায় যে সত্যের স্পষ্ট নিদর্শনও তাকে নড়াতে পারে না। পরকাল যখন কেবল আলোচনার বিষয় থাকে, বিশ্বাসের বিষয় থাকে না, তখন মানুষ দুনিয়ার কোলাহলে ডুবে থেকেও আখিরাতের ডাক শোনে না। সে বাঁচে, কিন্তু জীবনের শেষ ঠিকানাটিকে ভুলে বাঁচে।
সূরা আন-নামলের এই অংশে আগের আয়াতগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা গেলে একটি গভীর ধারাবাহিকতা বোঝা যায়। কুরআন এখানে কেবল প্রকৃতি, পিঁপড়ার ক্ষুদ্র জগৎ, সুলাইমান আলাইহিস সালামের বিস্ময়কর ঘটনা, সাবার কাহিনি, আর আল্লাহর নিদর্শনের কথা বলেই থামে না; এসব নিদর্শন শেষ পর্যন্ত মানুষকে তাওহীদের দিকে ডাকে, জবাবদিহির দিকে ডাকে, পরকাল স্মরণের দিকে ডাকে। কিন্তু কিছু হৃদয় এমনও থাকে, যাদের সামনে নিদর্শন যত স্পষ্টই হোক, তারা তা থেকে শিক্ষা নেয় না। তাদের ক্ষেত্রে সমস্যা তথ্যের অভাব নয়; সমস্যা অন্তরের অবস্থায়। তারা আখিরাত নিয়ে নিশ্চিত হয় না, কারণ আত্মা দুনিয়ার ধুলোয় এত ভারী হয়ে গেছে যে, সত্যের সূর্য উঠলেও তার আলো তাদের ভেতরে পৌঁছায় না।
এই আয়াত তাই একজন মুমিনের জন্য কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো সতর্কতা। পরকালকে সন্দেহের চোখে দেখা কোনো নিরীহ বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান নয়; এটি ধীরে ধীরে অন্তরের দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেয়। মানুষ তখন আল্লাহর আয়াত পড়ে, কিন্তু তা তাকে বদলায় না; শোনে, কিন্তু জেগে ওঠে না; বোঝে, কিন্তু নতি স্বীকার করে না। কুরআন যেন বলছে, জ্ঞানের গর্ব মানুষকে কত সহজে ডুবিয়ে দেয়, আর সন্দেহ তাকে কত নিঃশব্দে অন্ধ করে দেয়। তাই আখিরাতের স্মরণকে যদি হৃদয়ের জীবনীশক্তি বানানো না যায়, তবে চোখ থাকলেও দেখা হয় না, কান থাকলেও শোনা হয় না, আর জীবন থাকলেও তা সত্যিকারের জাগরণে পৌঁছায় না।
মানুষ যখন পরকালকে নিয়ে সত্যিকার চিন্তা হারায়, তখন তার ভেতরের জ্ঞানও এক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। প্রথমে সে সন্দেহকে আশ্রয় দেয়, তারপর সন্দেহই তার মানদণ্ড হয়ে ওঠে; আর শেষে অন্তর এমন এক অন্ধকারে ঢেকে যায়, যেখানে আল্লাহর নিদর্শন চোখের সামনে থাকলেও তা হৃদয়ে পৌঁছায় না। এই আয়াত আমাদের সতর্ক করে—ইলম কেবল তথ্যের নাম নয়; যদি তা আখিরাতের জবাবদিহি পর্যন্ত না পৌঁছায়, তবে তা শুধু শব্দের ভিড়, উপলব্ধির নয়।
এই আয়াতের আঘাত তাই খুবই নরম, কিন্তু গভীর। এটি আমাদের জিজ্ঞেস করে: আমি কি সত্যিই জানি, নাকি শুধু জানার ভান করছি? আমি কি আখিরাতকে বিশ্বাস করি, নাকি তাকে দূরে সরিয়ে রেখে জীবনকে হালকা করতে চাই? আল্লাহর কিতাব মানুষকে বারবার জাগায়, কারণ অন্ধত্ব কেবল চোখের নয়—অন্তরেরও হয়। আর যে অন্তর আল্লাহর সামনে ফিরে যাওয়ার কথা ভুলে যায়, তার সামনে কুরআনের সব নিদর্শনও যেন নীরব হয়ে দাঁড়ায়; অথচ সত্যের ডাক তখনও থামে না, শুধু অপেক্ষা করে—কবে একটি ভাঙা হৃদয় কেঁপে উঠে বলবে, হে রব, আমি ফিরে এলাম।
কুরআন এখানে এক নির্মম সত্যের দরজায় দাঁড় করিয়ে দেয় মানুষকে—পরকালকে যখন মানুষ শুধু ধারণা, বিতর্ক, বা অস্বস্তিকর প্রশ্নের জায়গায় নামিয়ে আনে, তখন তার জ্ঞান আর সামনে এগোয় না; থেমে যায়, ক্ষয়ে যায়, নিঃশেষ হয়ে যায়। আল্লাহর নিদর্শন চারপাশে ছড়িয়ে থাকে, আকাশে, জমিনে, প্রাণীর জগতে, সুলাইমান আলাইহিস সালামের বিস্ময়কর রাজত্বে, পিঁপড়ার ক্ষুদ্র সতর্কবাণীতে, সাবার উন্মুক্ত আলো-ছায়ায়—সবই যেন বলে, “এ জীবন একা নয়, এই পথ শেষ নয়।” তবু যখন অন্তর নিজের অহংকারে মোহিত হয়, তখন পরকাল তার সামনে আর সত্য হয়ে ওঠে না; সে হয়ে যায় দুর্বল সন্দেহ, আর সন্দেহের পরিণতি হয় অন্ধত্ব।
এই অন্ধত্ব কেবল বুদ্ধির নয়, হৃদয়েরও। মানুষ তখন দুনিয়ার হিসাব খুব নিখুঁতভাবে গুনতে পারে, কিন্তু নিজের আত্মার হিসাব ভুলে যায়; অন্যের ভুল খুঁজে পায়, কিন্তু নিজের রবের সামনে দাঁড়ানোর কথা মনে রাখে না। সমাজও এমন অন্ধত্বে আক্রান্ত হতে পারে—যেখানে শক্তি, সম্পদ, প্রযুক্তি, আর কথার জোর বাড়ে, কিন্তু জবাবদিহির ভয় কমে যায়। তখন মানুষ আল্লাহর নিদর্শন দেখে না বলেই নয়, দেখেও দেখতে পায় না; শুনে না বলেই নয়, শুনে হৃদয়ে নামাতে পারে না। এভাবেই পরকাল সম্পর্কে সন্দেহ মানুষকে ধীরে ধীরে এমন এক অন্তর্লোকের দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে সত্যের আলো থাকলেও চোখ তা গ্রহণ করতে চায় না।
তবু এই আয়াতের ভেতরেই আছে ফিরে আসার দাওয়াত। কারণ কুরআন যখন অন্ধত্বের কথা বলে, তখন তা আমাদের চিরতরে পরিত্যাগ করতে নয়; জাগিয়ে তুলতে বলে। আজ যদি অন্তর কেঁপে ওঠে, তবে সেটাই রহমতের দরজা; আজ যদি আমরা অনুভব করি যে আখিরাতের স্মরণ কমে গেছে, তবে সেটাই তওবার আহ্বান। মানুষকে বাঁচতে হয় এমনভাবে, যেন প্রত্যেক দিন তার অন্তর বলছে—আমি রবের সামনে ফিরে যাব, এবং আমার প্রতিটি সন্দেহ, প্রতিটি অবহেলা, প্রতিটি গাফিলতি সেখানে ধরা পড়বে। তাই এই আয়াত আমাদের ভয় শেখায়, আবার আশা-ও শেখায়: যে অন্তর নিজের অন্ধত্ব স্বীকার করে, সে-ই আলো খোঁজে; আর যে আলো খোঁজে, আল্লাহ তাকে পথ দেখান।
কুরআন যখন পিঁপড়ার ক্ষুদ্র সমাজ থেকে শুরু করে সুলায়মান আলাইহিস সালামের রাজকীয় নিদর্শন, আর সাবার অহংভরা সভ্যতার পতন—সবই আমাদের সামনে এনে দেয়, তখন শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা একটাই থাকে: তুমি কি দেখছ? নাকি দেখেও বুঝছ না? এই আয়াত সে হৃদয়ের দিকে আঙুল তোলে, যে হৃদয়কে বারবার জাগানোর পরও পরকাল সম্পর্কে স্পষ্ট জ্ঞান ধরে রাখতে পারেনি। জ্ঞান সেখানে থেমে গেছে, সন্দেহ সেখানে বাসা বেঁধেছে, আর অন্ধত্ব এমনভাবে ঢেকে দিয়েছে যে আল্লাহর নিদর্শনও আর নড়াতে পারে না। এটা শুধু মস্তিষ্কের ব্যর্থতা নয়; এটা আত্মার রোগ, বিবেকের নিস্তেজতা, সত্যের সামনে দাঁড়িয়েও নিজের ভেতরের পর্দা সরাতে অক্ষম হওয়া।
মানুষ যখন আখিরাতকে দূরের কোনো তত্ত্ব বানিয়ে ফেলে, তখন সে দুনিয়ার শব্দে ডুবে যায়, কিন্তু চিরস্থায়ী গন্তব্যের নীরব আহ্বান শুনতে পায় না। তখন জীবন হয় ব্যস্ত, কিন্তু উদ্দেশ্যহীন; চোখ খোলা থাকে, কিন্তু হৃদয় ঘুমিয়ে থাকে। আর এই ঘুমই আসল বিপদ—কারণ এর পরেই আসে বিস্মৃতি, তারপর আসে অস্বীকার, আর শেষে আসে এমন এক অন্ধত্ব, যেখানে সত্য বারবার কড়া নাড়লেও দরজা খুলে না। তাই এই আয়াত আমাদের ভয় দেখায় না কেবল; এটি আমাদের জাগায়। যেন আমরা লজ্জিত হই, কাঁপি, এবং বলি: হে আল্লাহ, আমাদের জ্ঞানকে সন্দেহে মেরে ফেলো না, আমাদের অন্তরকে অন্ধত্বে ছেড়ে দিও না, আমাদেরকে সেই লোকদের মধ্যে রেখো না যারা নিদর্শন দেখেও তাতে পৌঁছাতে পারে না।