সূরা আন-নামলের এই আয়াত মানবহৃদয়ের এক ভয়ংকর রোগকে উন্মোচন করে: সত্য যখন দরজায় কড়া নাড়ে, তখন অহংকারী মানুষ তাকে বুকে জড়ায় না, বরং অবজ্ঞার ধুলো ছুঁড়ে মারে। তারা বলে, “এই প্রতিশ্রুতি তো আমরা আগেও শুনেছি, আমাদের বাপ-দাদারাও শুনেছে; এটা তো পূর্ববর্তীদের উপকথা ছাড়া আর কিছু নয়।” বাহ্যত এটি কেবল একটি অস্বীকারের বাক্য, কিন্তু অন্তরে এর ভেতর লুকিয়ে আছে আখিরাতকে অস্বীকার করার গোপন বিদ্রোহ, আল্লাহর কথা শোনার আগে নিজস্ব ধারণাকে সিংহাসনে বসিয়ে দেওয়ার দুঃসাহস। কুরআন এখানে দেখিয়ে দেয়, মানুষ যখন হিদায়াতকে পুরোনো গল্প বলেই খারিজ করে, তখন সে আসলে সত্যকে নয়, নিজের জিদকেই রক্ষা করে।

এই আয়াতের নির্দিষ্ট কোনো প্রমাণিত একক কারণ-নুযূল জানা না থাকলেও, এর বৃহত্তর প্রেক্ষাপট স্পষ্ট: সূরাটি আল্লাহর নিদর্শন, তাওহীদ, ও পুনরুত্থানের সত্যকে সামনে রেখে এমন এক মানসিকতার চিত্র আঁকে, যা সুলায়মান আলাইহিস সালাম, পিঁপড়ার ক্ষুদ্র সমাজ, সাবার রাজ্য, আর সমগ্র সৃষ্টিজগতের নিদর্শনের মাঝেও আল্লাহকে চিনতে চায় না। এই অস্বীকারকারীরা কেবল অদৃশ্য আখিরাতকেই অস্বীকার করছে না; তারা জীবনের প্রতিটি নিদর্শনে ছড়িয়ে থাকা রবের ডাককেও তুচ্ছ করছে। যেন কুরআন বলছে, যে চোখ পিঁপড়ার ভাষায়ও হিকমতের আলো দেখতে পায় না, সে আকাশ-জমিনের লক্ষ নিদর্শন দেখেও অন্তরে নড়ে না।

মানুষের অন্তরে যখন অহংকার জমে যায়, তখন সে সত্যের শব্দও শুনতে পায় না; সে শুধু নিজের অভ্যাসের প্রতিধ্বনি শোনে। এই আয়াতে তারা যে কথা বলে, তা কেবল যুক্তির একটি বাক্য নয়, বরং অন্তরের এক আত্মরক্ষা—যেন নতুন সত্যকে গ্রহণ করলে পুরোনো জীবন ভেঙে পড়বে, তাই সত্যকেই “উপকথা” বলে তাড়িয়ে দিতে হবে। অথচ আল্লাহর বাণী কোনো জীর্ণ কাহিনি নয়; তা জীবন্ত আহ্বান, যা মৃত হৃদয়কে জাগাতে আসে, অন্ধ দৃষ্টি খুলতে আসে, এবং মানুষকে তার সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যের দিকে ফিরিয়ে দেয়।

সূরা আন-নামলের বিস্তৃত পরিবেশে আমরা দেখি, আল্লাহ কত নিখুঁত নিদর্শনে নিদর্শনে মানুষকে ডাকছেন—সুলায়মানের রাজত্বে, পিঁপড়ার ক্ষুদ্র জগতে, সাবার সমৃদ্ধিতে, আর সৃষ্টির ভেতর ছড়িয়ে থাকা বিস্ময়ে। তারপরও কেউ যদি বলে, “এ তো আগের লোকদের গল্প,” তবে সে আসলে কাহিনিকে অস্বীকার করছে না; সে অস্বীকার করছে সেই হাত, যা আকাশ-জমিন ধারণ করে আছে, সেই রব, যিনি ক্ষুদ্রকে বড়ের চেয়ে বেশি নিখুঁতভাবে জানেন। কুরআন বারবার মনে করায়, সত্য নতুন হওয়ার জন্য সত্য নয়; সত্য সত্যই, যদিও তা মানুষের পুরোনো গাফিলতিকে অস্বস্তিতে ফেলে।

এই আয়াত আমাদের ভেতরের সেই ভয়ংকর রোগের মুখোমুখি দাঁড় করায়, যেখানে মানুষ আল্লাহর কথা শুনে বলেও, “আমরা তো আগেও শুনেছি,” কিন্তু হৃদয়ের দরজা খোলে না। যেন বহুবার শুনলেই সত্য মিথ্যা হয়ে যায়! অথচ বহুবার শোনা কেবল আমাদের উদাসীনতাই বাড়ায়, সত্যের মর্যাদা কমায় না। তাই কুরআন আমাদের শিখিয়ে দেয়—হিদায়াতকে বয়স দিয়ে মাপা যায় না, বংশ দিয়ে বিচার করা যায় না, লোকমুখে ছড়ানো ধারণা দিয়ে বাতিল করা যায় না। যে হৃদয় বিনয়ে নত হয়, তার কাছে আল্লাহর আয়াত বসন্তের বৃষ্টি; আর যে হৃদয় জেদে শক্ত হয়ে যায়, তার কাছে একই আয়াত কেবল বজ্রের মতো ধ্বনি হয়ে ফিরে আসে।
মানুষের সবচেয়ে পুরোনো প্রতারণাগুলোর একটি হলো—সত্য যখন সামনে দাঁড়ায়, তখন তাকে নতুন করে দেখার সাহস না রেখে, তাকে পুরোনো বলে হালকা করে দেওয়া। “এ তো আমাদের আগেও বলা হয়েছে”—এই বাক্যটি শুধু তথ্যের প্রতি অবজ্ঞা নয়; এটা হৃদয়ের ভেতর গড়ে ওঠা এক অদৃশ্য কারাগার, যেখানে বাপ-দাদার অভ্যাসকেই হক মনে করা হয়, আর আল্লাহর বাণীকেই অপরিচিত ঠেকে। কুরআন বারবার আমাদের সামনে এমন আয়না ধরে, যাতে বোঝা যায়: শুধু পুরোনো হওয়া কোনো কিছুকে মিথ্যা করে না, আর শুধু নতুন হওয়াও তাকে সত্য বানায় না। সত্যের মানদণ্ড সময় নয়; সত্যের মানদণ্ড আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা।

সূরা আন-নামলের বৃহত্তর প্রবাহে আমরা দেখি, সুলায়মান আলাইহিস সালামের রাজত্ব, ক্ষুদ্র পিঁপড়ার সতর্কতা, সাবার উল্লাসভরা সমৃদ্ধি, আর আল্লাহর নিদর্শনের পর নিদর্শন—সবই যেন মানুষকে জাগিয়ে বলতে চায়, এই জগৎ উদ্দেশ্যহীন নয়, এবং রবের শাসন কোনো কল্পকাহিনি নয়। যে সমাজ আল্লাহর আয়াতকে “উপকথা” বলে, তার ভেতরে একদিন আখিরাতের ভয় ঢুকে পড়ে না, ন্যায়ের কণ্ঠ ক্ষীণ হয়ে যায়, আর আত্মা নিজেরই অবহেলার ভারে ভারী হতে থাকে। এই আয়াত আমাদের শেখায়, কেবল অন্যদের নয়, নিজের অন্তরকেও প্রশ্ন করতে: আমি কি সত্যকে গ্রহণ করছি, নাকি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া গোঁড়ামিকে বাঁচিয়ে রাখছি? যে হৃদয় আজ নম্র হয়ে আল্লাহর সামনে নত হয়, তার জন্য আশার দরজা খোলা থাকে; আর যে হৃদয় অহংকারে সত্যকে উপকথা বলে উড়িয়ে দেয়, তার জন্য সতর্কতার কাঁটা আরও গভীরে গেঁথে যায়।

মানুষের ইতিহাসে সত্যকে এভাবে হালকা করে ফেলা নতুন কিছু নয়। কখনো সে বলে, “এ তো আগেও শুনেছি,” কখনো বলে, “এ তো পুরোনো গল্প,” আবার কখনো নিজের ধারণাকেই এত বড় করে তোলে যে আল্লাহর কথা তার কাছে আর ভারী লাগে না। কিন্তু কুরআন আমাদের শেখায়, যে সত্যকে যুগের পুরোনো আবরণ দিয়ে ঢেকে ফেলা হয়, তা পুরোনো হয়ে যায় না; বরং মানুষের অন্তরটাই পুরোনো হয়ে যায়, যখন সে আল্লাহর সামনে নতুন হয়ে জাগতে চায় না। সূরা আন-নামল আমাদের চোখের সামনে সুলায়মানের রাজ্য, পিঁপড়ার ক্ষুদ্র বোধ, সাবার বিস্ময়, আর আসমান-জমিনের নিদর্শন সাজিয়ে দেয়, যেন আমরা বুঝি—যে রব এত নিখুঁতভাবে সৃষ্টি করেন, তাঁর সংবাদ কি কেবল উপকথা হতে পারে?

এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে প্রত্যেক হৃদয়ের উচিত নিজের ভেতরের অস্বীকারকে চিনে ফেলা। কতবার আমরা সত্য শুনেও তাকে “পরিচিত” ভেবে অবহেলা করি, কতবার কুরআনের কথা শুনেও মনে মনে বলি—এ তো জানা কথা, এ তো আগেই শোনা, অথচ জানা আর মানা এক নয়। ভয় এখানেই যে, মানুষ আল্লাহর নিদর্শনকে বারবার দেখেও যদি তাতে সিজদা না করে, তবে একদিন তার হৃদয় সত্যের জন্য বন্ধ দরজা হয়ে যায়। তাই আজ নম্র হয়ে বলি—হে আল্লাহ, আমাদের এমন বানিও না যারা আপনার কথা শুনে অবজ্ঞা করে; বরং আমাদের সেই অন্তর দান করুন, যা আপনার আয়াত শুনলে কেঁপে ওঠে, আপনার সত্য চিনলে নরম হয়ে যায়, আর আপনার কাছে ফিরে আসতে লজ্জা বোধ করে না। সত্য যদি উপকথা না হয়, তবে আমাদের জীবনও আর গাফিলতার গল্প হতে পারে না।