সূরা আন-নাহল-এর এই আয়াতটি মানুষের অন্তরের এক নির্মম সত্যকে উন্মোচন করে: যখন তাদের কাউকে কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখ কালো হয়ে যায়, আর বুকের ভেতর জমে ওঠে অসহ্য মনস্তাপ। এখানে আল্লাহ তাআলা কোনো নিছক সামাজিক অভ্যাসের কথা বলেননি; তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, জাহিলি অহংকার কীভাবে আনন্দের সংবাদকেও লজ্জা, ক্রোধ আর অবমাননায় রূপ দেয়। কন্যা—যে নিজেই আল্লাহর এক মহান নি‘আমত, কোমলতা ও রহমতের প্রতীক—তাকে অপমানের চোখে দেখা ছিল সে সমাজের ভেতরকার অন্ধকার। আয়াতটি সেই অন্ধকারের ওপর আল্লাহর বিচারালয়ের আলো ফেলে: মানুষ কি আল্লাহর দানকে গ্রহণ করবে, নাকি নিজের কু-অহংকারে তা প্রত্যাখ্যান করবে?
এই বাক্যে একটি হৃদয়বিদারক দিক আছে: মুখ কালো হয়ে যাওয়া শুধু মুখের রঙ নয়, বরং অন্তরের বিকৃতি। বাহিরের প্রতিক্রিয়ার পেছনে লুকিয়ে থাকে ভেতরের এক ভাঙা তাওহীদ—যেখানে মানুষ আল্লাহর হেকমতকে মানতে পারে না, নিজের মান-সম্মানের মাপকাঠিকে আল্লাহর ইচ্ছার ওপরে বসায়। সন্তান দান, পুত্র হোক বা কন্যা, সবই রবের বণ্টন; কিন্তু জাহিলি মন সেই বণ্টনকে ন্যায় বলে দেখে না, বরং নিজের খেয়াল-খুশিকে ন্যায়ের আসনে বসায়। সূরা আন-নাহল-এর সামগ্রিক সুর আমাদের শেখায়, নি‘আমতকে চেনা মানে শুধু উপকারকে স্বীকার করা নয়; নি‘আমতদাতাকে চিনে তাঁর সামনে নরম হৃদয়ে সেজদায় নুয়ে পড়া।
এই আয়াতের বিস্তৃত সামাজিক পটভূমি ছিল এমন এক সমাজ, যেখানে কন্যাসন্তানকে বোঝা, অপমান, এমনকি ভবিষ্যৎ দুশ্চিন্তার প্রতীক ভাবা হতো। নির্দিষ্ট কোনো একক ঘটনার ওপর আয়াতটি সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি সেই যুগের সাধারণ জাহিলি বাস্তবতাকে চিরস্থায়ীভাবে নিন্দা করে। তাই এই আয়াত শুধু ইতিহাসের বর্ণনা নয়, এটি আজকের হৃদয়ের জন্যও আয়না। আমরা কি কখনো আল্লাহর কোনো ফয়সালায় অস্বস্তি বোধ করি? কোনো নি‘আমত আমাদের প্রত্যাশার মতো না হলে কি হৃদয় সংকীর্ণ হয়ে যায়? কুরআন আমাদের শেখায়, ঈমানের সৌন্দর্য সেখানে, যেখানে মানুষ আল্লাহর দানকে সম্মান করে, আর তাঁর হেকমতের সামনে নিজের অহংকারকে নত করে।
আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে যখন মানুষ নিজের জাহিলি মানদণ্ডে বিচার করে, তখন তার ভেতরে আগে অন্ধকার নামে, পরে সে অন্ধকার মুখে ফুটে ওঠে। কন্যাসন্তানের সংবাদে মুখ কালো হয়ে যাওয়া আসলে একটি ভাঙা হৃদয়ের ছবি নয় শুধু; এটি সেই আত্মাভিমানী সত্তার প্রকাশ, যে আল্লাহর বণ্টনকে সম্মান করতে শেখেনি। সে ভুলে গেছে, রিজিক যেমন আল্লাহর হাতে, সন্তানও তেমনি তাঁরই রহমতের এক-একটি দরজা। কে জানে, কখন একটি কন্যা সন্তানের কোমলতা ঘরকে নরম করে, পিতার হৃদয়ে দয়া জাগিয়ে তোলে, মায়ের অশ্রুকে ইবাদতে রূপ দেয়, এবং পরিবারের উপর এমন রহমত এনে দেয় যা বাহ্যিক অহংকার কখনো চিনতেই পারে না।
সূরা আন-নাহলের নি‘আমতের সুরের ভেতর এই আয়াত যেন একটি তীক্ষ্ণ আয়না: মৌমাছির মতো শৃঙ্খলিত জীবনে যেমন আল্লাহ মধুর পথ খুলে দেন, তেমনি মানুষের অন্তরে কৃতজ্ঞতার পথও খোলা থাকে—যদি সে অহংকারের বিষ ঢেলে তা বন্ধ না করে। তাই এই আয়াত কেবল কন্যাসন্তানকে সম্মান করার শিক্ষা নয়; এটি তাওহীদের শিক্ষা, হৃদয়কে শুদ্ধ করার আহ্বান, এবং আল্লাহর দানকে লজ্জায় নয় বরং সেজদায় গ্রহণ করার ডাক। যে ব্যক্তি আল্লাহর বণ্টনে সন্তুষ্ট, তার মুখে কালিমা নামে না; তার অন্তরে প্রশান্তি নামে। আর যে ব্যক্তি নিয়ামতকে অপমান করে, সে আসলে নিজের আত্মাকে অপমান করে। মুমিনের মর্যাদা এখানেই—সে আল্লাহর দানকে চিনে, ভালোবাসে, এবং নীরবে বলে: হে রব, তুমি যা দাও, তাতেই কল্যাণ।
এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে মানুষের অন্তর নিজেকেই দেখে ফেলে। কন্যাসন্তানের সংবাদে মুখ কালো হয়ে যাওয়া—এ কেবল এক ব্যক্তির রাগ নয়, এ এক পুরো সমাজের আত্মাভিমান, যা আল্লাহর বণ্টনকে সম্মান করতে শেখেনি। যে হৃদয় আল্লাহর দানকে বোঝা মনে করে, তার ভেতরে নি‘আমতের আলো নেভা শুরু করে। কন্যা এখানে অপমানের নাম নয়; কন্যা সেই ঘরে আল্লাহর রহমতের এক দরজা, যে দরজা হয়তো কোমলতা, দয়া, লালন, ধৈর্য আর ঈমানের গভীরতা নিয়ে আসে। তবু জাহিলি হৃদয় দানকে দেখে নয়, নিজের কৃত্রিম মর্যাদাকে দেখে; তাই সংবাদ শুনে তার মুখে অন্ধকার নামে। এই অন্ধকার আসলে চোখে নয়, তাওহীদের ভেতরে।
আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের সামনে আয়নার মতো এই দৃশ্য তুলে ধরেন—মানুষ কি তার রবের সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট, না কি নিজের সংকীর্ণ মানদণ্ডকে আল্লাহর হুকুমের ওপরে বসায়? তাওহীদ মানে শুধু এক আল্লাহকে মানা নয়; তাওহীদ মানে আল্লাহর হেকমতকে ভালোবাসা, তাঁর দানকে নত হয়ে গ্রহণ করা, আর নিজের হৃদয়ের গোপন অহংকারকে ভেঙে ফেলা। সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে, তা তো একমাত্র রবের পক্ষ থেকে অগাধ হিকমতের উপহার। যে এ সত্য বুঝতে পারে, সে কৃতজ্ঞতায় নরম হয়; আর যে বুঝতে পারে না, সে অকারণ অপমানে কঠিন হয়ে পড়ে। এই আয়াত আমাদের জিজ্ঞেস করে: আমার আনন্দ কি আল্লাহর দানে, নাকি সমাজের দৃষ্টিতে? আমার সম্মান কি রবের কাছে, নাকি মানুষের কু-রুচিতে?
এখানে প্রত্যেক মুমিনের জন্য আত্মসমালোচনার আহ্বান আছে। আমরা কি আমাদের ঘরের খবর, আমাদের সন্তান, আমাদের ভাগ্য—সবকিছুকে আল্লাহর নি‘আমত হিসেবে দেখি? নাকি অজান্তে এমন কিছু মানদণ্ড বয়ে বেড়াই, যা জাহিলি অহংকারেরই পুরোনো ছায়া? কন্যাসন্তানের সঙ্গে এই আয়াত যেন শুধু এক সামাজিক অবমাননাকে ধিক্কার দেয় না; এটি হৃদয়কে তাওবার দিকে ফিরিয়ে আনে, কৃতজ্ঞতার দিকে ডাকে, এবং শেখায় যে আল্লাহর দানকে ছোট করা মানে নিজেরই আত্মাকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া। যে হৃদয় আল্লাহর ফয়সালায় রাজি, সে শান্ত; আর যে হৃদয় নি‘আমতকে অবমাননা করে, সে ভিতরে ভিতরে কষ্টে দগ্ধ। আজও এই আয়াত আমাদের কানে কানে বলে: আল্লাহর দেওয়া কোনো সন্তানই লজ্জা নয়, বরং পরীক্ষা, রহমত, এবং হয়তো জান্নাতের পথে একটি নরম সোপান।
কিন্তু মানুষের অন্তর কত সহজে ভুলে যায়। আজও কত ঘরে, কত মনে, কত নীরব কোণে আল্লাহর দানকে ছোট করে দেখা হয়—যেন আমরা সিদ্ধান্তের মালিক, আর রবের দান আমাদের মর্যাদার মাপকাঠি! অথচ ঈমানের সৌন্দর্য এখানেই যে সে মানুষকে শেখায়, আল্লাহর নে‘আমতকে অপমান নয়, শোকর দিয়ে গ্রহণ করতে। কন্যা সন্তানের আগমনে যে হৃদয় নরম হয়, সে হৃদয় আল্লাহর এক কোমল দরজা খুলে দেয়; আর যে হৃদয় সংকুচিত হয়, সে হৃদয় নিজের ভেতরেই বন্দি থেকে যায়।
তাই এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রার্থনা একটাই—হে আল্লাহ, আমাদের অন্তর থেকে জাহিলি অহংকার মুছে দাও। তুমি যা বণ্টন করো, তা-ই আমাদের জন্য কল্যাণকর করে দাও। আমাদের শেখাও, নিয়ামত দেখে মুখ কালো করতে নয়, বরং সাজদায় পড়ে যেতে। সন্তানের লিঙ্গে নয়, ঈমানের আলোয় মানুষ চেনার তাওফিক দাও। কারণ শেষ পর্যন্ত সম্মান দেয় না মানুষ; সম্মান দেন তুমি। আর যে হৃদয় তোমার দেওয়া প্রতিটি নে‘আমতকে তোমারই নিদর্শন হিসেবে দেখে, সে হৃদয়ই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আলোর পথে হাঁটতে শেখে।