কখনো মানুষের অন্তর এতটাই উল্টো হয়ে যায় যে, সে নিজের জন্য যা অপছন্দ করে, আল্লাহর জন্য সেটাই নির্ধারণ করতে কুণ্ঠিত হয় না। এই আয়াত সেই ভ্রান্ত মানসিকতার বুক চিরে দেয়: তারা আল্লাহর জন্য কন্যা সন্তান নির্ধারণ করে, অথচ নিজেদের জন্য বেছে নেয় যা তারা চায়। এরপরই আসে এক পবিত্র বিস্ফোরণ—সُبْحَٰنَهُۥ। তিনি সকল অপবাদ, সকল অসম্মান, সকল মানব-রচিত ধারণার ঊর্ধ্বে। আল্লাহর সত্তার সঙ্গে এমন তুলনা, এমন আরোপ, এমন অসম্মান—এটা শুধু ভুল নয়; এটা হৃদয়ের ন্যায়বোধেরও অপমান। যে রব সব নিয়ামতের উৎস, যার হাতেই সৃষ্টি, জীবন, মৃত্যু, রিযিক, তাঁর সম্পর্কে এমন কথা বলা মানে মানুষ নিজেই নিজের বিচারবুদ্ধিকে অন্ধ করে ফেলেছে।
সূরা আন-নাহলের বিস্তৃত ধারায় আল্লাহ বারবার নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেন—মৌমাছি, খাদ্য, পানীয়, জীবনের নানা নিদর্শন—যাতে মানুষ কৃতজ্ঞ হয় এবং তাওহীদের পথে ফিরে আসে। কিন্তু কৃতজ্ঞতার সেই আলোকে উল্টো করে দিলে মানুষ শুধু নিয়ামতই ভুলে যায় না, নিয়ামতের মালিক সম্পর্কেও মিথ্যা ধারণা পোষণ করতে শুরু করে। এই আয়াত সেই বিকৃত ধর্মচিন্তার প্রতিবাদ, যেখানে সমাজের একাংশ নিজেদের পছন্দ-অপছন্দকে সত্যের মানদণ্ড বানিয়ে নিয়েছিল। নারীসন্তান সম্পর্কে অবজ্ঞা আর পুরুষসন্তানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার যে সামাজিক অন্ধতা ছিল, কুরআন তার অন্তর্গত অন্যায়কে প্রকাশ করে দেয়; কারণ আল্লাহ কাউকেই হেয় করার জন্য সৃষ্টি করেননি। এখানে কোনো নির্দিষ্ট একটি ঘটনার বর্ণনা চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়, কিন্তু আয়াতের ভাষা তৎকালীন আরব সমাজে প্রচলিত শিরক, কুসংস্কার, এবং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের গভীর বাস্তবতাকে স্পর্শ করে।
এই এক বাক্য যেন মানুষের ভণ্ডামির উপর আকাশ থেকে নেমে আসা আয়না। মানুষ নিজের জন্য যা চায়, তা-ই চূড়ান্ত; কিন্তু রবের জন্য কেন এমন জিনিস আরোপ করা হয়, যা সে নিজের জন্যও গ্রহণ করতে লজ্জা পায়? তাওহীদ মানে শুধু একত্ববাদী কথা বলা নয়; তাওহীদ মানে ন্যায়ের সামনে আত্মসমর্পণ, আল্লাহর সম্পর্কে সব কল্পিত অসম্মান মুছে ফেলা, এবং অন্তরকে এমনভাবে শুদ্ধ করা যে, সে আর নিজের খেয়ালকে ধর্ম বানাতে পারে না। তাই এই আয়াত আমাদের শেখায়—আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করতে করতে নিজের অন্তরকেও জিজ্ঞেস করতে হবে: আমি কি সত্যিই তাঁর প্রতি সম্মান রাখছি, নাকি নিজের কামনা-বাসনাকেই নীরবে ইলাহ বানিয়ে নিয়েছি?
কত আশ্চর্য এই মানুষের বিচারবোধ! যে নিজে কন্যাকে অপমানের চোখে দেখে, যে নিজের প্রবৃত্তির কাছে পুত্রকে বেছে নেয়, সে-ই আবার আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করে এমন কিছু, যা তার অন্তর নিজেই অপছন্দ করে। এই আয়াত যেন অন্তরের আড়াল সরিয়ে দেয়; মানুষ যখন সত্যকে ভালোবাসে না, তখন তার যুক্তিও বিকৃত হয়ে যায়, তার ভাষাও অন্যায়ের বাহক হয়ে ওঠে। আল্লাহর জন্য কন্যা আর নিজেদের জন্য যা কামনা—এই অসম বণ্টনের মধ্যে শুধু সামাজিক কুসংস্কার নয়, বরং তাওহীদের বিরুদ্ধে এক গোপন বিদ্রোহ লুকিয়ে আছে। কারণ আল্লাহ সম্পর্কে ভুল ধারণা মানেই তাঁর প্রতি ভুল সম্মান, আর ভুল সম্মান শেষ পর্যন্ত ভুল ইবাদতে পৌঁছে যায়।
এই আয়াত আমাদের নিজের অন্তরকেও জিজ্ঞেস করে—আমি কি আল্লাহকে যথাযথভাবে চিনেছি, নাকি নিজের ইচ্ছাকে সত্যের মানদণ্ড বানিয়ে ফেলেছি? মানুষ যখন আল্লাহকে তাঁর মর্যাদায় গ্রহণ করে না, তখন সে নিজের পছন্দ-অপছন্দকেই ধর্ম বানিয়ে নেয়; আর তখনই হালাল-হারাম, সম্মান-অসম্মান, ন্যায়-অন্যায় সবকিছু কুয়াশায় ঢেকে যায়। তাই এই আয়াত শুধু একটি ভ্রান্ত বিশ্বাসের প্রতিবাদ নয়; এটি তাওহীদের কাছে ফিরে আসার আহ্বান, লজ্জিত হৃদয়ের জন্য তাওবার দরজা, আর কৃতজ্ঞ বান্দার জন্য সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ডাক। যে রবের জন্য সব প্রশংসা, তাঁর সম্পর্কে একমাত্র সঠিক কথা হলো: তিনি পবিত্র, তিনি মহান, এবং তাঁর সামনে মানুষের সব অহংকার শেষ পর্যন্ত ধুলোই।
কখনো মানুষ নিজের কামনার জন্য এমন ন্যায়বোধ তৈরি করে, যা সে আল্লাহর জন্য মানতে রাজি হয় না। নিজের পছন্দের বেলায় তার দাবি খুব সূক্ষ্ম, খুব কড়া; কিন্তু রবের ব্যাপারে সে নির্লজ্জভাবে অপছন্দের বোঝা চাপিয়ে দেয়। এই আয়াত সেই আত্মপ্রবঞ্চনার মুখে দাঁড়িয়ে বলে দেয়: আল্লাহর জন্য কন্যা নির্ধারণ করা—এমন কথা উচ্চারণ করাই এক ভয়াবহ অন্ধকার, আর তার সঙ্গে নিজের জন্য চাওয়া-না চাওয়ার হিসাব মিলিয়ে নেওয়া আরও বড় অন্যায়। মানুষ যা নিজের জন্য ভালো মনে করে, তা-ই যদি ন্যায়ের মানদণ্ড হয়, তবে তার হৃদয় আর ঈমানের আলোয় নেই; সে নিজেই নিজের প্রবৃত্তির বন্দী হয়ে গেছে।
এর পরই আসে সেই এক শব্দ, যা শিরকের ধুলো ঝেড়ে ফেলে হৃদয়কে কাঁপিয়ে তোলে: سُبْحَٰنَهُۥ। তিনি পবিত্র, তিনি মহিমান্বিত, তিনি সব অপবাদ, সব অসম্মান, সব মানব-নির্মিত কল্পনার ঊর্ধ্বে। সূরা আন-নাহল আমাদেরকে বারবার নিয়ামতের দিকে ফেরায়—মৌমাছির অলৌকিক পথ, খাদ্যের শুদ্ধতা, রিযিকের বিস্তার, জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাসে লুকানো অনুগ্রহ—যেন মানুষ বুঝে নেয়, এতসব দান যার কাছ থেকে এসেছে, তার সম্পর্কে এমন মিথ্যা ধারণা করা কৃতজ্ঞতার বিপরীত। কৃতজ্ঞতা শুধু মুখের প্রশংসা নয়; কৃতজ্ঞতা হলো রবকে তাঁর যথাযথ মর্যাদায় জানা, তাঁর একত্বকে মানা, এবং অন্তরের সব বক্রতা আলোর সামনে এনে ভেঙে ফেলা।
এই আয়াত আমাদের সমাজকেও আয়নার সামনে দাঁড় করায়। মানুষ কখনো বংশ, লিঙ্গ, মর্যাদা, সম্পদ, চাহিদা—এসব দিয়ে বিচার করে; কিন্তু আল্লাহর নিকট সত্যের মানদণ্ড এসব নয়। তাই এ আয়াতের সামনে দাঁড়ালে হৃদয় কেঁপে ওঠে: আমি কি কখনো এমন কথা বলেছি, এমন ধারণা পোষণ করেছি, যা আমার রবের মহান সত্তার সঙ্গে মানায় না? আমি কি নিয়ামত পেয়েও কৃতজ্ঞ হইনি, সত্য জেনেও অস্বীকার করেছি, সম্মানিত সৃষ্টিকে তুচ্ছ করেছি? এ প্রশ্নগুলো ভয় জাগায়, আবার আশা-ও জাগায়; কারণ যে হৃদয় নিজের ভুল চিনে ফেলে, তার জন্য প্রত্যাবর্তনের দরজা খোলা থাকে। তাওহীদের পথে ফেরা মানে কেবল সঠিক আকিদা গ্রহণ করা নয়, বরং প্রবৃত্তির অন্যায়কে ত্যাগ করে বিনম্রভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া—যিনি পবিত্র, যিনি ন্যায়পরায়ণ, যিনি তাঁর বান্দাকে কৃতজ্ঞতার আলোয় জীবিত দেখতে চান।
কী নির্মম এই বৈপরীত্য! মানুষ নিজের জন্য যা কামনা করে, তা-ই ন্যায্য মনে করে; আর আল্লাহর জন্য এমন কিছু আরোপ করে যা তার নিজের মুখে উচ্চারণ করতেও লজ্জা হওয়া উচিত। এই আয়াত যেন হৃদয়ের দরজায় এক তীক্ষ্ণ আঘাত—তুমি কি সত্যিই আল্লাহকে চেনো, নাকি তোমার রুচি, তোমার সংস্কার, তোমার অহংকারই তোমার “ধর্ম” হয়ে উঠেছে? সূরা আন-নাহল আমাদের নিয়ামতের পর নিয়ামত দেখায়, যাতে অন্তর নরম হয়, দৃষ্টি খুলে যায়, কৃতজ্ঞতা জন্মায়। কিন্তু কৃতজ্ঞতা যখন মরে যায়, তখন তাওহীদের আলোও বিকৃত হয়ে পড়ে; মানুষ রবের পবিত্রতায় বিস্মিত হওয়ার বদলে তাঁর সম্পর্কে অযথা কথা বলতে সাহসী হয়ে ওঠে।
এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে কণ্ঠ নিচু হয়ে আসে। কারণ এখানে শুধু একটি ভ্রান্ত ধারণার প্রতিবাদ নেই; এখানে মানুষের অন্তরের লোভ, পক্ষপাত, এবং নিজের সুবিধা অনুযায়ী সত্যকে বাঁকিয়ে নেওয়ার অভ্যাসেরও বিচার আছে। আল্লাহ সব অপবাদ থেকে পবিত্র, সব অসম্মান থেকে ঊর্ধ্বে—সُبْحَٰنَهُۥ। তাঁর ব্যাপারে কথা বলতে গেলে জিহ্বা কাঁপা উচিত, হৃদয় বিনত হওয়া উচিত, আর চোখে জল আসা উচিত। যে রব আমাদের জন্য হালাল রিযিক খুলে দেন, যিনি জীবনকে অর্থ দেন, যিনি মৌমাছির ক্ষুদ্র স্রোতে পর্যন্ত জ্ঞান ও রহমতের নিদর্শন রাখেন, তাঁর সম্পর্কে মিথ্যা ধারণা পোষণ করা মানুষের নিজের আত্মাকেই কলুষিত করে। তাই এই আয়াত আমাদেরকে শুধু চিন্তা করতে বলে না; ফিরে আসতে বলে। লজ্জা নিয়ে, ভয় নিয়ে, ভালোবাসা নিয়ে। রবের দিকে। তাওহীদের দিকে। কৃতজ্ঞতার দিকে।