কুরআনের এ আয়াত মানুষের অন্তরের সেই অন্ধকারকে উন্মোচন করে, যেখানে আল্লাহর দানও লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কন্যাসন্তানের সুসংবাদে যে ব্যক্তি মুখ লুকিয়ে নেয়, সে আসলে সন্তানের নয়—নিজের জাহিলি অহংকারের ভারে মুষড়ে পড়ে। কী কঠিন এক অবস্থা! যার হাতে ছিল রিযিকের মালিক আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এক অপার নিয়ামত, সে-ই তা দেখে কুঁকড়ে যায়, যেন দানটি নয়, দাতার সিদ্ধান্তটাই তার কাছে অপমান। এ আয়াতে কুরআন শুধু একটি কুসংস্কারকে ধিক্কার দেয় না; বরং হৃদয়ের সেই রোগকে ধরিয়ে দেয়, যেখানে মানুষ আল্লাহর বিধানকে নিজের সংকীর্ণ মানদণ্ডে মাপতে চায়।

এই সূরার বিস্তৃত সুরজুড়ে রয়েছে নিয়ামতের স্মরণ, তাওহীদের আহ্বান, হালাল-হারামের সীমা, এবং কৃতজ্ঞতার দিকে মানুষকে ফিরিয়ে আনার অনন্ত ডাক। তাই এখানে কন্যাসন্তানকে কেন্দ্র করে যে সামাজিক মানসিকতা ধিকৃত, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এক গভীর মানবিক ও সামাজিক অসুস্থতার প্রকাশ। জাহিলি সমাজে সন্তানকে কখনো বংশের মর্যাদার মানদণ্ড, কখনো জীবিকার বোঝা, কখনো লজ্জার বিষয় করে তোলা হতো। কুরআন সেই ভ্রান্ত মানসিকতার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়: এমন বিচার কি সত্যিই বিচার, নাকি অজ্ঞতার নিষ্ঠুরতা? আল্লাহর দেওয়া জীবনকে অপমান বলা হলে, সেখানে কৃতজ্ঞতার আলো কোথায় থাকে?

আয়াতটি আমাদের আজও থামিয়ে দেয়। আমরা কি এখনো আল্লাহর নিয়ামতকে নিজের পছন্দ-অপছন্দের ছাঁকনিতে ফেলি না? কখনো রিযিক, কখনো পরিবার, কখনো দায়িত্ব, কখনো পরীক্ষাকে আমরা অপমান ভেবে মুখ লুকাই। অথচ তাওহীদের শিক্ষা হলো, যা আল্লাহ দেন তা-ই কল্যাণ, আর যা তিনি নির্ধারণ করেন তা-ই হিকমত। এই আয়াত হৃদয়কে শেখায়—লজ্জা নয়, কৃতজ্ঞতা; আতঙ্ক নয়, ধৈর্য; জাহিলিয়াত নয়, ঈমান। কারণ আল্লাহর দানকে যারা তুচ্ছ করে, তারা আসলে নিজেদের বিচারকেই সবচেয়ে নিকৃষ্ট করে তোলে।

কুরআন এখানে একটি সমাজ-মনস্তত্ত্বের নগ্ন মুখোশ খুলে দেয়। মানুষ যখন আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে নিজের অহংকারের মানদণ্ডে বিচার করে, তখন সে আর সত্যকে দেখে না; দেখে কেবল নিজের হীনতা, নিজের ভয়, নিজের কুসংস্কার। কন্যাসন্তানের সংবাদে যে মুখ লুকায়, তার অন্তর আসলে সন্তানের জন্য অপমানিত নয়; সে অপমানিত হয় তার ভাঙা অহংকারে, তার মাটির তৈরি মানদণ্ডে, তার জাহিলি মর্যাদাবোধে। এভাবেই আয়াতটি বলে দেয়, মানুষের বিচার কত দুর্বল, কত অন্ধ, কত নিষ্ঠুর হতে পারে—যখন তা ওহীর আলো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়।

সূরা আন-নাহলের নিয়ামতভরা সুরের মধ্যে এই ধিক্কার যেন আরও গভীরভাবে কাঁপিয়ে তোলে অন্তরকে। যে সূরায় মৌমাছির মতো ছোট এক সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন দেখানো হয়, সেই সূরাই আবার মানুষকে মনে করিয়ে দেয়: আল্লাহর দানকে লজ্জা বলা, আল্লাহর রিযিককে অবজ্ঞা করা, আল্লাহর পরিকল্পনার সামনে অহংকার করা—এ সবই তাওহীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। কৃতজ্ঞতা কেবল মুখের শব্দ নয়; এটি অন্তরের শিরদাঁড়া সোজা করে দেওয়া এক ঈমানী অবস্থান। যে ব্যক্তি নিয়ামতের দিকে তাকিয়ে শুকর করে, সে আলোর দিকে হাঁটে; আর যে ব্যক্তি নিয়ামতকে দেখে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে নিজের আত্মাকেই অন্ধকারে সমাহিত করে।
আয়াতের শেষাংশে যে তীক্ষ্ণ তিরস্কার উচ্চারিত হয়েছে, তা আজও হৃদয়কে নাড়া দেয়: মানুষের ফয়সালা কত নিকৃষ্ট হতে পারে, যখন সে আল্লাহর দানে লজ্জা পায় এবং আল্লাহর হিকমতের বিরোধিতা করে। এখানে শুধু একটি সামাজিক রীতি ভাঙা হয়নি; ভাঙা হয়েছে জাহিলিয়াতের সেই কঠিন শিলা, যার উপর দাঁড়িয়ে মানুষ নিজেকে বিচারক ভেবেছিল। কিন্তু সত্যের সামনে মানুষের বিচার ক্ষুদ্র, অস্থির, অবিচারী। তাই কুরআন আমাদের শেখায়—নিয়ামত এলে তার সামনে নত হও, হারাম-হালালের সীমায় দাঁড়াও, দাওয়াতের পথে ধৈর্য ধরো, আর হৃদয়ে এমন তাওহীদ ধারণ করো যাতে কোনো দানকে আর অভিশাপ মনে না হয়।

মানুষ যখন আল্লাহর বিধানকে নিজের জাহিলি অহংকারের মানদণ্ডে মাপে, তখন তার অন্তরেই প্রথম কবর খোঁড়া হয়। কন্যাসন্তানের সুসংবাদে মুখ লুকিয়ে ফেলা, মানুষের চোখ এড়িয়ে চলা, “একে অপমানসহ বাঁচিয়ে রাখব, না মাটির নিচে পুঁতে ফেলব”—এমন নির্মম দ্বিধা কেবল এক পিতার সংকট নয়; এটি সেই সমাজের মুখ, যে সমাজ আল্লাহর নিয়ামতকে লজ্জা, আর আল্লাহর সিদ্ধান্তকে বোঝা মনে করে। এখানে কুরআন আমাদের সামনে শুধু এক বিশেষ কুসংস্কারকে নয়, বরং মানবহৃদয়ের সেই ভয়ংকর অসুস্থতাকে এনে দাঁড় করায়—যেখানে সন্তানও আল্লাহর দান নয়, বরং মানুষের মান-অপমানের খেলায় আটকে যায়।

এখানেই তাওহীদের আলো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। যে হৃদয় জানে রিযিকের মালিক আল্লাহ, জীবনের সম্মান-অসম্মানও তাঁরই হাতে, সে হৃদয় আর পুত্র-সন্তান কিংবা কন্যাসন্তানকে সৌভাগ্য-অসৌভাগ্যের মাপকাঠি বানায় না। সূরা আন-নাহল আমাদের বারবার শেখায়, নিয়ামতকে চিনতে, কৃতজ্ঞ হতে, হালাল-হারামের সীমা মানতে, আর জীবনের প্রতিটি দানকে আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত হিসেবে গ্রহণ করতে। কিন্তু জাহিলিয়াত সেই আমানতকে বোঝা ভাবে, আর সে বোঝার ভারে মানুষের বুক ভেঙে যায়। তাই আয়াতের শেষে কঠিন ধমক—তাদের ফয়সালা কত নিকৃষ্ট—শুধু অতীতের একটি সমাজকে নয়, আমাদের ভেতরের লুকানো অমানবিকতাকেও আঘাত করে।

এ আয়াত আমাদের আত্মসমালোচনার সামনে দাঁড় করায়। আমি কি আল্লাহর দেয়া কোনো নিয়ামতকে ছোট করে দেখছি? আমি কি মানুষকে তার বাহ্যিক অবস্থান দিয়ে মাপছি? আমি কি এমন কোনো সামাজিক মানদণ্ড আঁকড়ে ধরেছি, যা তাওহীদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়? কিয়ামতের আগে অন্তরকে জিজ্ঞেস করতে হবে—আমার লজ্জা কি আল্লাহকে নিয়ে, নাকি মানুষের কথায়? আমার ভয় কি গুনাহের, নাকি সমাজের তিরস্কারের? আর যদি আজও আমাদের মধ্যে আল্লাহর দানকে অবমূল্যায়ন করার প্রবণতা থাকে, তবে এ আয়াত আমাদের কাঁদিয়ে বলছে—ফিরে এসো, কারণ মানুষের বিচার ক্ষণস্থায়ী; আল্লাহর বিচারই শেষ সত্য। সেই সত্যের সামনে কেবল কৃতজ্ঞ হৃদয়ই টিকে থাকে, আর জাহিলিয়াতের অহংকার ধ্বসে পড়ে।

কুরআন যেন এখানে মানুষের মুখোশ টেনে খুলে দেয়। যে হৃদয় আল্লাহর দানকে অপমান ভাবে, সে হৃদয় আসলে দানের মূল্য বোঝে না; সে বোঝে কেবল নিজের অহংকারের ভার, নিজের সমাজের কটাক্ষ, নিজের ভেতরের অন্ধকার মানদণ্ড। সন্তান আল্লাহর নিয়ামত—কন্যা হোক বা পুত্র—কিন্তু জাহিলিয়াতের চোখে নিয়ামতও কখনো লজ্জা হয়ে যায়, যখন অন্তর থেকে তাওহীদের আলো উঠে যায়। এ আয়াত আমাদের শেখায়, মানুষ কত সহজে আল্লাহর সিদ্ধান্তের সামনে নিজের রুচিকে বিচারক বানিয়ে ফেলে; অথচ মানুষের রুচি কতই-না সংকীর্ণ, আর আল্লাহর জ্ঞান কতই-না পরিব্যাপ্ত। তাই এই তিরস্কার শুধু অতীতের কোনো সমাজের জন্য নয়; আজও সেই একই অন্ধতা ফিরে আসে—যেখানে আমরা নিয়ামতকে গ্রহণ করি, কিন্তু কৃতজ্ঞতা ভুলে যাই; দানকে চাই, কিন্তু দাতার হুকুমকে কষ্ট মনে করি।

আর এখানেই সূরা আন-নাহলের সুর আরও গভীর হয়ে ওঠে। আল্লাহ মানুষকে মৌমাছির মতো এক অপূর্ব শৃঙ্খলার দিকে তাকাতে বলেন, হালাল-হারামের সীমা মনে করিয়ে দেন, নিয়ামতের ভেতরে কৃতজ্ঞতার ভাষা খুঁজে নিতে শেখান, আর সত্যের পথে ধৈর্যকে ঈমানের সঙ্গী করেন। সেই বিস্তৃত আলোয় এই আয়াত আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে: আমি কি আল্লাহর দানকে সম্মান করি, নাকি নিজের ধারণাকে? আমি কি তাঁর ফয়সালায় সন্তুষ্ট, নাকি মানুষের মানদণ্ডে নিজের হৃদয়কে কাঁচা পাতার মতো কাঁপাই? আজ যদি এই প্রশ্নে বুক কেঁপে ওঠে, তবে সেটাই হোক তাওবার শুরু। কারণ নিকৃষ্ট ফয়সালা শুধু জাহিলির ছিল না; নিকৃষ্ট ফয়সালা তখনই হয়, যখন মানুষ আল্লাহর নিয়ামতের ওপর নিজের জেদকে বসিয়ে দেয়। হে রব, আমাদের অন্তরকে এমন আলো দাও, যাতে আমরা তোমার দানকে লজ্জা নয়, ইবাদত হিসেবে দেখি; তোমার হুকুমকে বোঝা নয়, রহমত হিসেবে গ্রহণ করি; আর তোমার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারি, আমাদের কৃতজ্ঞতা এখনও অসম্পূর্ণ, তবু আমাদের ফিরে আসা সত্য।