মানুষের জন্মই যেন এক বিস্তারের কাহিনি। কেউ দূরে, কেউ কাছে; কেউ ক্ষমতায়, কেউ অসহায়; কেউ আলোতে, কেউ অন্ধকারে—তবু সবাই একই মাটির ওপর ছড়িয়ে আছে। এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, পৃথিবীতে আমাদের ছড়িয়ে দেওয়া কোনো এলোমেলো ঘটনা নয়; এটি আল্লাহরই পরিকল্পনা। তিনি যেমন সৃষ্টি করেছেন, তেমনি বণ্টনও করেছেন। আমাদের জাত, ভাষা, অঞ্চল, জীবনের রং—সবই তাঁর ইচ্ছার প্রকাশ। তাই এই ছড়িয়ে থাকা অবস্থায় অহংকারের কোনো জায়গা নেই; এখানে কেউ স্থায়ী মালিক নয়, সবাই পথিক।
কিন্তু এই ছড়িয়ে থাকা জীবনের ভেতরেই আয়াতটি এক গভীর সত্যের দরজা খুলে দেয়: শেষে ফিরে যেতে হবে তাঁরই দিকে। যিনি পৃথিবীতে মানুষকে বিস্তৃত করেছেন, তিনিই তাদের একদিন সমবেত করবেন। এই সমাবেশ শুধু মৃত্যুর পর দেহের পুনরুত্থান নয়, বরং দায়িত্বের মুখোমুখি হওয়া, গোপন-প্রকাশ্য সব কিছুর হিসাব দেওয়া। মানুষ হয়তো দুনিয়ায় ছড়িয়ে থাকে, বিচ্ছিন্ন থাকে, নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী পথ বেছে নেয়; কিন্তু আল্লাহর দরবারে কোনো ছত্রভঙ্গ পরিচয় নেই। সেখানে সবাই একত্র, সবার সত্য উন্মুক্ত, সবার পরিণতি নির্ধারিত।
সূরা আল-মুমিনুনের প্রবাহে এই আয়াত আসে মুমিনের গুণ, সৃষ্টির নিদর্শন, নবীদের সংগ্রাম এবং আখিরাতের দৃঢ় সত্য স্মরণ করাতে। এখানে কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার কথা নয়; বরং এটি মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে এক সার্বজনীন ঘোষণা। যে সমাজেই মানুষ থাকুক, যে যুগেই থাকুক, এই কথা তার হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ে—তুমি পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছ, কিন্তু হারিয়ে যাওয়ার জন্য নয়; পরীক্ষা শেষ হলে সমাবেশের দিন আসবেই। তখনই বোঝা যাবে, সফলতা শুধু বাঁচা নয়, সফলতা হলো এমন জীবন, যা শেষ সমাবেশের আগে আল্লাহর দিকে ফিরে যেতে শিখে।
মানুষের জীবন যেন পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এক বিস্ময়কর মানচিত্র। কেউ দূরে, কেউ কাছে; কেউ এক মাটিতে, কেউ আরেক প্রান্তে—তবু এই বিচ্ছিন্নতা অরাজক নয়, এটি সৃষ্টিকর্তারই সূক্ষ্ম ব্যবস্থা। তিনিই তোমাদেরকে পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছেন। আমাদের ভাষা, বংশ, ভূগোল, ক্ষমতা, দারিদ্র্য, আনন্দ, ক্লান্তি—সবকিছুই তাঁর জ্ঞানের আলোয় নির্ধারিত। তাই এই দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়া কোনো মালিকানার প্রমাণ নয়; বরং তা স্মরণ করিয়ে দেয়, আমরা নিজস্ব নই, আমরা পরিচালিত।
তাই মুমিন পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকলেও হৃদয়ে ছিন্নভিন্ন হয় না। সে জানে, তার গন্তব্য ছড়িয়ে থাকা নয়, জড়ো হওয়া; তার শেষ কথা এলোমেলোতা নয়, সাক্ষাৎ। এই বোধই তাকে বিনয়ী করে, ধৈর্যশীল করে, এবং দুনিয়ার ধুলোয় আচ্ছন্ন না হতে শেখায়। যে বুঝে নেয়—একদিন তাকে আল্লাহর সামনে সমবেত হতে হবে—সে আর পৃথিবীকে চূড়ান্ত মনে করে না, আর নিজের ক্ষণিক অবস্থানকে চিরস্থায়ী ভাবেও না। তখন জীবন হয়ে ওঠে প্রস্তুতি, মৃত্যু হয়ে ওঠে প্রত্যাবর্তন, আর সফলতা হয়ে ওঠে সেই দিনের মুক্তি, যেদিন সমস্ত ছড়িয়ে থাকা সত্তা একত্র হবে তাঁর সামনে।
মানুষকে পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়া—এও আল্লাহরই কাজ। এই ছড়িয়ে থাকা শুধু ভূগোলের বিস্তার নয়; এটি জীবন-পরীক্ষার বিস্তার। কেউ শহরে, কেউ প্রান্তরে; কেউ শক্তির কেন্দ্রে, কেউ অবহেলিত প্রান্তে; কেউ সচ্ছলতার আলোয়, কেউ দারিদ্র্যের শীতে। কিন্তু এই ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান কোনো চূড়ান্ত মর্যাদা বা চূড়ান্ত অপমান নয়। দুনিয়া মানুষের সত্যিকারের পরিচয়ের শেষ কথা বলে না। আমরা এখানে যে ভঙ্গিতে বাঁচি, যে নীচুতা বা মহত্ত্ব হৃদয়ে লালন করি, যে পাপকে সঙ্গী আর যে নেক কাজকে অবহেলা করি—সবকিছুই একদিন প্রকাশ পাবে। পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা জীবনের ভেতরেই আল্লাহ আমাদের অন্তরের ছড়ানো ধুলো জমতে দেন, যেন আমরা বুঝতে পারি: মানুষ যত ছড়িয়েই থাকুক, সে নিজের দিকে নয়, প্রভুর দিকে গমনশীল।
আর তারপর আসে সেই অনিবার্য বাক্য—তারই দিকে তোমাদেরকে সমবেত করা হবে। এ সমাবেশের কথা মনে পড়লে হৃদয় কেঁপে ওঠে। যাকে দুনিয়ায় দেখা যায়নি, যার সামনে দাঁড়ানোর জন্য অন্তর প্রস্তুত হয়নি, সেই মহান রবের সামনে একদিন সবাইকে দাঁড়াতেই হবে। সেদিন বংশ, ভাষা, অঞ্চল, পরিচয়, পদমর্যাদা—কিছুই আশ্রয় দেবে না। সেখানে থাকবে শুধু কর্মের ওজন, নিয়তের সত্য, এবং আল্লাহর ন্যায়বিচারের নির্ভুল দৃষ্টি। এই আয়াত ভয় জাগায়, আবার আশাও জাগায়; কারণ যিনি সমবেত করবেন, তিনিই তো দয়ালু, ক্ষমাশীল, আর ফিরে আসার পথ এখনো খোলা। তাই যে হৃদয় আজই জাগে, সে আর দুনিয়ার ছড়ানো ধুলোতে হারায় না; সে জানে, আমি ছড়িয়ে আছি ঠিকই, কিন্তু হারিয়ে যাইনি। আমার শেষ ঠিকানা মাটি নয়—আমার শেষ সমাবেশ আল্লাহরই দরবারে।
পৃথিবী আমাদের বিস্তার দিয়েছে, কিন্তু পরিচয় দেয়নি; পরিচয় দেয় সেই সমাবেশের দিন, যখন মানুষ বুঝবে—সে কেবলই মাটিতে ছড়িয়ে রাখা এক জীবনের যাত্রী ছিল। আজ আমরা কত দূরে দূরে আছি, কত ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন চেহারা, ভিন্ন অবস্থান—তবু এই বৈচিত্র্যও আমাদের রক্ষা করে না মৃত্যুর হাত থেকে, আর আমাদের স্থায়ীও করে না। আল্লাহই ছড়িয়ে দিয়েছেন, আর আল্লাহই ফিরিয়ে আনবেন; এই সত্যের সামনে দাঁড়ালে মানুষের বড়াই ধুলো হয়ে যায়, আর হৃদয়ের ভেতর নরম এক ভয় জেগে ওঠে।
যে রব আমাদের পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, তিনি আমাদের ভুলেও যাননি; যে হাতে তিনি বিস্তার দিয়েছেন, সেই হাতেই একদিন আমাদের সব ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন সত্তা জড়ো হবে। সেদিন দুনিয়ার দূরত্ব, মর্যাদা, সম্পদ, পরিচয়—কিছুই ঢাল হবে না। শুধু আমল কথা বলবে, শুধু অন্তর সাক্ষ্য দেবে। তাই আজই ফিরে আসি, আজই আত্মসমর্পণ করি, আজই সেই আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়ি যাঁর দিকে শেষ সমাবেশ অনিবার্য।
এ আয়াত যেন ফিসফিস করে বলে: তুমি হারিয়ে যাওনি, কিন্তু অবহেলাও করো না; তুমি ছড়িয়ে আছ, কিন্তু স্বাধীন নও; তুমি বেঁচে আছ, কিন্তু স্থায়ী নও। পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা এই স্বল্প সময়কে যদি আমরা তাঁর দিকে ফেরার প্রস্তুতি বানাতে পারি, তবে বিচ্ছুরণই হেদায়েতের দরজা হয়ে উঠবে, আর সমাবেশ হবে রহমতের ছায়া। হে আল্লাহ, আমাদের ছড়িয়ে থাকা জীবনে তোর দিকেই ফেরার সৎ তাওফিক দাও; যেন আমরা একদিন তোর সামনে লজ্জিত না হয়ে, তোর দয়ার আশ্রয়ে দাঁড়াতে পারি।