আল্লাহই তোমাদের জন্য কান, চোখ এবং অন্তঃকরণ সৃষ্টি করেছেন। এই একটি বাক্যেই মানুষের সমগ্র অস্তিত্বের উপর রবের অনন্ত অনুগ্রহের ছায়া নেমে আসে। কান—যে শ্রবণ করে সত্যের ডাক, চোখ—যে দেখে নিদর্শনের জ্যোতি, আর অন্তঃকরণ—যে বুঝে, অনুভব করে, সত্যকে ধারণ করে। মানুষ নিজেকে যতই সম্পূর্ণ ভাবুক, তার ভেতরের দরজাগুলো আসলে আল্লাহর হাতে খোলা; জ্ঞান, উপলব্ধি, উপলক্ষ—সবই তাঁর দান। তাই এই আয়াত আমাদের গর্ব ভাঙে এবং হৃদয়ের দরিদ্রতা সামনে এনে দাঁড় করায়: আমরা যা আছি, তা আমাদের নিজের মালিকানায় নয়; প্রতিটি জাগ্রত ইন্দ্রিয়ও একেকটি আমানত।

কিন্তু এই দান পাওয়ার পরও মানুষের কৃতজ্ঞতা কত সামান্য! আমরা শুনি, অথচ সব শুনি না; দেখি, অথচ সবকিছুর ভেতরের নিদর্শন দেখি না; হৃদয় পাই, অথচ হৃদয়ের সত্যিকার জাগরণে পৌঁছাই না। আল্লাহ এখানে যেন মানুষের নীরব অবহেলাকে স্পর্শ করছেন—যে অবহেলা নাশুকরি হয়ে জমে, আর নাশুকরি জমে গেলে নেকির আলোর পথও ম্লান হয়ে আসে। কৃতজ্ঞতা শুধু মুখের স্বীকারোক্তি নয়; কৃতজ্ঞতা মানে কানকে হারাম থেকে বাঁচানো, চোখকে গোমরাহি থেকে ফিরিয়ে আনা, অন্তঃকরণকে অহংকার ও গাফেলতি থেকে রক্ষা করা।

সূরা আল-মুমিনূনের বৃহৎ প্রবাহে এই আয়াত মুমিনের গুণ, সৃষ্টির বিস্ময়, আখিরাতের জবাবদিহি এবং সফলতার পথে এক গভীর নীরব শিক্ষা বহন করে। এখানে কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার বাধ্যতামূলক উল্লেখ নেই; বরং কুরআনের সামগ্রিক আহ্বানই এখানে ধ্বনিত হয়েছে—মানুষ যেন নিজের অস্তিত্বকে দেখে, রবের দানকে চেনে, আর কৃতজ্ঞতার মধ্যে ইমানকে জীবিত রাখে। যে চোখ দিয়ে সত্য দেখা যায়, যে কান দিয়ে হিদায়াত শোনা যায়, যে হৃদয়ে আল্লাহর কথা নেমে আসে, সেই মানুষই আসলে জীবিত। আর যে এই নিয়ামত পেয়েও শুকর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে নিজের সত্তার সবচেয়ে মূল্যবান দরজাগুলোকেই অন্ধকারে ফেলে রাখে।

কান, চোখ, অন্তঃকরণ—এই তিনটি দান যেন মানুষের ভেতরের জগতে আল্লাহর তিনটি দরজা। কান শোনে, চোখ দেখে, হৃদয় অর্থ গ্রহণ করে; কিন্তু এই দরজাগুলো খুলে দেওয়ার মালিক মানুষ নয়, তাঁর রব। তাই মানুষ যখন শুনতে পায় সত্যের আহ্বান, দেখতে পায় নিদর্শনের ছায়া, অনুভব করতে পারে হিদায়াতের কম্পন—তখন তার প্রথম কাজ অহংকার নয়, কৃতজ্ঞতা। কারণ যে সত্তা শোনার ক্ষমতা দেয়, দেখার সামর্থ্য দেয়, বোঝার আলো জ্বালায়, তিনি চাইলে এক মুহূর্তেই এ তিনটি জানালাকে নিভিয়ে দিতে পারেন। তখন চারপাশে আলো থাকলেও হৃদয়ের ভেতর অন্ধকার নেমে আসে; শব্দ থাকে, কিন্তু অর্থ থাকে না; দৃশ্য থাকে, কিন্তু শিক্ষা থাকে না; হৃদয় থাকে, কিন্তু জীবন্ত থাকে না।

এই আয়াত মানুষকে তার নীরব ঋণের সামনে দাঁড় করায়। আমরা প্রতিদিন যে বিশ্বকে গ্রহণ করি, তার কতটুকু সত্যিকার অর্থে আল্লাহর জন্য? কতটুকু কান সত্যের দিকে ঝোঁকে, কতটুকু চোখ হালাল ও হেদায়াতের দিকে জাগে, কতটুকু অন্তঃকরণ রবের সামনে কেঁপে ওঠে? কৃতজ্ঞতা এখানে শুধু উচ্চারণের বিষয় নয়; এটি আত্মার বিনয়, দৃষ্টির শুদ্ধতা, শ্রবণের পবিত্রতা, অন্তরের জাগরণ। যে ব্যক্তি এই নিয়ামতগুলোকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দেয়, সে-ই আসলে শোকর আদায় করে। আর যে এগুলোকে গাফলত, অহংকার, পাপ ও বেপরোয়া অভ্যাসে ব্যয় করে, সে নিয়ামতের মাঝে থেকেও নিঃস্ব থেকে যায়। তাই এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়: তোমার ভেতরের ক্ষমতাগুলো তোমার সম্পদ নয়, তোমার পরীক্ষা; তোমার ইন্দ্রিয়গুলো তোমার মালিকানা নয়, তোমার আমানত। আর আমানতের সত্যিকার উত্তর হলো—শুকর, আনুগত্য, এবং সেই হৃদয়ের কান্না, যা বলে: হে আল্লাহ, তুমি না দিলে আমি কিছুই দেখতে পেতাম না; তুমি না শুনালে আমি কিছুই বুঝতে পারতাম না।
আল্লাহ যখন বলেন, তিনি তোমাদের জন্য কান, চোখ ও অন্তঃকরণ সৃষ্টি করেছেন, তখন মানুষ আর নিজের মালিকানার অহংকারে টিকে থাকতে পারে না। যে কান দিয়ে কথা প্রবেশ করে, যে চোখ দিয়ে দুনিয়ার রঙ ধরা পড়ে, যে অন্তঃকরণ দিয়ে সত্য মিথ্যা আলাদা হয়—এই তিনটি দরজাই তো আমাদের অস্তিত্বের ভিত। তবু আমরা কত সহজে এগুলোকে অভ্যাসের বস্তু বানিয়ে ফেলি! যেন কান শুধু শব্দ শোনার যন্ত্র, চোখ শুধু দৃশ্য দেখার আয়না, হৃদয় শুধু অনুভূতির কাঁপুনি। অথচ এগুলো আল্লাহর দান; এগুলোকে সত্যের পথে না লাগালে, এরা আমাদের পক্ষে সাক্ষ্য নয়, আমাদের বিপক্ষে বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করতে হয়: আমি কী শুনছি, কী দেখছি, কী ধারণ করছি? আমার কানে কি কুরআনের ডাক প্রবেশ করে, নাকি গুনাহের কোলাহল? আমার চোখ কি নিদর্শন দেখে সিজদায় নত হয়, নাকি হারামের চকচকে মোহে অন্ধ হয়ে যায়? আমার অন্তঃকরণ কি আল্লাহর স্মরণে কোমল হয়, নাকি দুনিয়ার ধুলোয় শক্ত পাথরের মতো জমে থাকে? সমাজ যখন অস্থির, চোখ যখন বিভ্রান্তিতে ক্লান্ত, মন যখন প্রয়োজনের চাপে নিঃশ্বাস হারায়, তখন এই আয়াত যেন নীরবে বলে—তোমাদের ভেতরের আলো নিভে গেলে বাইরের পথও অন্ধকার হয়ে যাবে। কৃতজ্ঞতা শুধু ভাষার সৌন্দর্য নয়; কৃতজ্ঞতা হলো ইন্দ্রিয়গুলোর আমানত রক্ষা করা, সেগুলোকে আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর সন্তুষ্টির দিকে ফিরিয়ে দেওয়া।

এজন্য এই আয়াত একই সঙ্গে ভয়েরও, আশারও। ভয়—যদি এত বড় নিয়ামতের পরও আমরা অকৃতজ্ঞ থাকি। আশা—যদি আজই আমরা ফিরে আসি, তবে যিনি কান-চোখ-হৃদয় দিয়েছেন, তিনিই এগুলোকে আবার জাগিয়ে তুলতে পারেন। মানুষের ফিরে আসা শুরু হয় তখনই, যখন সে বোঝে: আমি শুনতে পারি, কারণ আল্লাহ শুনিয়েছেন; আমি দেখতে পারি, কারণ আল্লাহ দেখিয়েছেন; আমি বুঝতে পারি, কারণ আল্লাহ অন্তঃকরণ দিয়েছেন। এই বোধই আত্মসমালোচনার দরজা খোলে, এই বোধই নরম করে হৃদয়, এই বোধই বান্দাকে রবের সামনে দাঁড় করায়। আর যখন বান্দা কৃতজ্ঞ হয়ে ফিরে দাঁড়ায়, তখন তার চোখে দুনিয়া কমে আসে, আখিরাত বড় হয়ে ওঠে, এবং সে বুঝতে শেখে—নিয়ামতের সবচেয়ে সুন্দর জবাব হলো শোকর, আর শোকরের সবচেয়ে সত্য রূপ হলো আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন।

কিন্তু এই আয়াতের গভীরতম কম্পন এখানেই থামে না। কান, চোখ, অন্তঃকরণ—এগুলো শুধু দেহের অঙ্গ নয়; এগুলো কিয়ামতের দিনের সাক্ষী হয়ে দাঁড়াবে। যে কান আল্লাহর কথা শুনে কেঁপে ওঠেনি, যে চোখ তাঁর নিদর্শনে অশ্রু আনেনি, যে অন্তঃকরণ তাঁর স্মরণে নরম হয়নি—সে হৃদয়ের কাছে একদিন জবাব চাওয়া হবে। মানুষ যখন বলে, আমি শুনিনি, আমি দেখিনি, আমি বুঝিনি—তখন তার নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গই যেন নীরবে বলে ওঠে, তুমি পেয়েছিলে, কিন্তু কৃতজ্ঞ হতে শিখোনি। এই না-শোকরির ভেতরেই কত অহংকার লুকিয়ে থাকে, কত গাফিলতি জমে থাকে, কত আত্মপ্রতারণা সুন্দর নাম পরে বেঁচে থাকে।

তাই আজ এই আয়াত আমাদের লজ্জিত করুক, কিন্তু নিরাশ না করুক। আমরা যেন রবের সামনে ফিরে আসি ভাঙা হৃদয়ে, আর বলি—হে আল্লাহ, তুমি না দিলে কিছুই দেখতাম না, শুনতাম না, বুঝতাম না; তুমি যখনই আমার জন্য দরজা খুলেছ, আমি তবু কতবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়েছি। আমার চোখকে ক্ষমা করো, যদি সে হারামের অভ্যাসে মরে গিয়ে থাকে; আমার কানকে ক্ষমা করো, যদি সে সত্যের ডাককে অবহেলা করে থাকে; আমার অন্তঃকরণকে জীবিত করে দাও, যদি তা দুনিয়ার ধুলোয় ভারী হয়ে গিয়ে থাকে। কারণ যে বান্দা নিজের ইন্দ্রিয়গুলোর জন্যও কৃতজ্ঞ হতে শেখে, সে আসলে তার রবের দিকে ফিরে চলতে শুরু করে। আর সেই ফেরা-ই মুমিনের সৌন্দর্য, সেই ফেরা-ই সফলতার শুরু।