তিনিই জীবন দান করেন, তিনিই মৃত্যু ঘটান; আর রাত ও দিনের পালাবদলও তাঁরই অধিকার। এই একটিমাত্র আয়াত যেন মানুষের অস্থির বুকে থেমে যাওয়া সময়ের ওপর আল্লাহর সিলমোহর এঁকে দেয়। আমরা যাকে জীবন বলি, তা কেবল শ্বাস-প্রশ্বাসের নাম নয়; আর যাকে মৃত্যু বলি, তা কেবল নিঃশেষ হয়ে যাওয়া নয়। উভয়ই তাঁর ইচ্ছার সামনে বিনীত নিদর্শন। মানুষ চায় চিরস্থায়ী হতে, অথচ প্রতিটি ভোর তাকে বলে দেয়—তুমি স্থায়ী নও। মানুষ রাতকে অন্ধকার ভাবে, দিনকে আলো ভাবে; কিন্তু কুরআন শেখায়, এই দুটির ওঠানামাও স্রষ্টার হিকমত, মাপজোক, শাসন ও দয়ার নিদর্শন।

সূরা আল-মুমিনূনের এই ধারাবাহিক আয়াতগুলো মূলত সৃষ্টির নিদর্শন, মানুষের উত্পত্তি, এবং আখিরাত অস্বীকারকারীদের জন্য জাগরণের ভাষা হয়ে এসেছে। নির্ভরযোগ্যভাবে নির্দিষ্ট কোনো আলাদা শানে নুযূল প্রতিষ্ঠিত নয়; তবে আয়াতের ভেতরের প্রবাহ স্পষ্টভাবে মানুষের ভুল স্মৃতি আর ভুল অহংকারকে ভাঙতে চায়। যে হৃদয় জীবনকে নিজের অর্জন মনে করে, মৃত্যুকে দূরের কথা ভাবে, আর সময়কে নিজের সম্পত্তি ভেবে ছুটে চলে, এই আয়াত তাকে থামিয়ে দেয়। বলে দেয়, তোমার রক্তে, তোমার নিঃশ্বাসে, তোমার রাত-জাগায়, তোমার দিনের পরিশ্রমে—সবখানেই একমাত্র রবের ক্ষমতা কাজ করছে।

আরও গভীরভাবে দেখলে, রাত-দিনের আবর্তন কেবল জ্যোতির্বিদ্যার বিষয় নয়; তা ইমানেরও পাঠশালা। রাত আসে যেন মানুষ থামে, ভাবে, নরম হয়; দিন আসে যেন মানুষ জাগে, কাজ করে, দায়িত্ব বোঝে। যে চোখ এই আবর্তনে আল্লাহকে দেখে না, সে চোখের সামনে থেকেও নিদর্শন অদৃশ্য থেকে যায়। তাই আয়াতের শেষ প্রশ্নটি খুব কড়া ও খুব করুণ—তবু কি তোমরা বুঝবে না? এ প্রশ্ন অবজ্ঞার নয়, বরং রহমতের। কারণ আল্লাহ মানুষকে শুধু ভয় দেখান না, চিন্তার দরজাও খুলে দেন। জীবন, মৃত্যু, সময়, আলো, অন্ধকার—সবই তাকে ডেকে বলে: ফিরে এসো, কারণ সফলতা কেবল তারই, যে নিদর্শন দেখে রবকে চিনে নেয়।

আল্লাহ যখন বলেন, তিনিই জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান, তখন আসলে মানুষের সমস্ত দাবি, সমস্ত অহংকার, সমস্ত নিয়ন্ত্রণবোধ এক মুহূর্তে মাটির কাছে নত হয়ে যায়। আমরা বাঁচি, কিন্তু জীবন সৃষ্টি করি না; আমরা মরি, কিন্তু মৃত্যুর দরজা খুলে দিই না। জীবনের ভেতরে যে স্পন্দন, আর মৃত্যুর ভেতরে যে নীরবতা—দুটোর কোনো একটিও আমাদের আয়ত্তে নেই। এই সত্য মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য নয়; বরং তার ভেতরের মিথ্যা শক্তির আসন ভেঙে দেওয়ার জন্য। যেন বান্দা বুঝে যায়, আমি মালিক নই, আমি কেবল আশ্রিত; আমি অধিকারী নই, আমি কেবল ধারক; আমি চূড়ান্ত নই, আমি কেবল যাত্রাপথের পথিক।

আর রাত-দিনের বিবর্তন—এও কেবল সময়ের ঘটনা নয়, এ এক চলমান আয়াত। রাত আসে বিশ্রামের পর্দা হয়ে, দিন আসে কর্মের ময়দান হয়ে; আবার রাত-দিন পরস্পরকে সরিয়ে দেয়, যেন মানুষ ভুলে না যায় যে কোনো অবস্থাই চিরস্থায়ী নয়। সুখের আলো স্থায়ী নয়, দুঃখের অন্ধকারও স্থায়ী নয়। সুস্থতার দিনও বদলে যায়, ক্লান্তির রাতও ভোর দেখে। এই অবিরাম পালাবদল আমাদেরকে শেখায় স্থিতি কোথায় খুঁজতে হবে—সময়ের মধ্যে নয়, সময়ের মালিকের কাছে। যে হৃদয় আল্লাহকে চিনে, সে রাতের নীরবতায়ও পথ পায়, দিনের কোলাহলেও বিভ্রান্ত হয় না।
অতএব প্রশ্নটি এসে পড়ে মানুষের বিবেকের দরজায়—أَفَلَا تَعْقِلُونَ, তবে কি তোমরা বুঝবে না? অর্থাৎ, এত নিদর্শন, এত স্পষ্টতা, এত জীবন্ত সত্যের পরও কি হৃদয় জেগে উঠবে না? কুরআন আমাদের শুধু মানতে বলে না, ভাবতে বলে; শুধু মুখে স্বীকার করতে বলে না, অন্তরে উপলব্ধি করতে বলে। কারণ ঈমানের আলো তখনই গভীর হয়, যখন মানুষ বুঝে ফেলে—জীবনও তাঁর, মৃত্যু ও তাঁর, সময়ও তাঁর। আর যাঁর হাতে জীবন-মৃত্যু ও সময়ের পালাবদল, তাঁর সামনে একদিন দাঁড়াতেই হবে। তখন বেঁচে থাকার হিসাব শুধু শ্বাসের হবে না; হবে আল্লাহকে জেনে বেঁচে থাকার, তাঁর নিদর্শন দেখে জেগে ওঠার, আর আখিরাতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার হিসাব।

তিনিই জীবন দান করেন, তিনিই মৃত্যু ঘটান—এই ঘোষণা মানুষের সমস্ত অহংকারের উপর আল্লাহর এক শান্ত অথচ অপ্রতিরোধ্য হুকুম। আমরা জীবনকে যেন নিজের কৃতিত্ব মনে করি, আর মৃত্যুকে দিই দূরের কোনো অচিন ভবিষ্যতের নাম; কিন্তু কুরআন আমাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় কঠিন সত্য: শ্বাসও তাঁর অনুগ্রহ, থেমে যাওয়া শ্বাসও তাঁরই ফয়সালা। এই আয়াত যেন হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ে—যে জীবন আজ তোমার হাতে মনে হচ্ছে, তা আসলে রবের আমানত; আর যে মৃত্যু অনিবার্য মনে হয়, তা কেবল ধ্বংস নয়, তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনের দ্বার। তাই মুমিনের জীবন আর হেলায় কাটে না, আর মৃত্যুর স্মৃতিও তাকে ভেঙে দেয় না; বরং সে প্রতিটি দিনকে জবাবদিহির প্রস্তুতি মনে করে।

আর রাত-দিনের বিবর্তনও তাঁরই কাজ—এ কথার মধ্যে শুধু সময়ের হিসাব নেই, আছে সৃষ্টির গভীর শৃঙ্খলা, মানবজীবনের জন্য আল্লাহর নিদর্শনের অবিরাম পাঠ। রাত আসে বিশ্রামের জন্য, দিন আসে পরিশ্রমের জন্য; আলো ও অন্ধকারের এই আবর্তনে মানুষ বুঝে নিতে পারে, তার জীবনও স্থির নয়, এগোচ্ছে এক মহাসত্যের দিকে। সমাজ যখন নিজের কোলাহলে ডুবে যায়, মানুষ যখন বস্তু, ক্ষমতা ও ভোগের পেছনে ছুটে ক্লান্ত হয়, তখন এই আয়াত তাকে থামিয়ে প্রশ্ন করে—তুমি কি সত্যিই বোঝো না? কেবল চোখে দেখা পরিবর্তন নয়, হৃদয়ে অনুভব করার মতো নিদর্শনও তো চারদিকে ছড়িয়ে আছে। যে বুঝে, সে আল্লাহকে ভয়ও করে, ভালোবাসেও; সে জানে ফিরে যেতে হবে সেই রবেরই কাছে, যিনি জীবন দিয়েছেন, মৃত্যু দেবেন, আর প্রতিটি রাতের পর আবার এক নতুন দিনের দরজা খুলে দেবেন।

তবু কি তোমরা বুঝবে না? এই প্রশ্ন যেন কেবল অস্বীকারকারীর জন্য নয়, আমার-আপনার ক্লান্ত হৃদয়ের জন্যও। কারণ আমরা অনেক সময় বুঝি, আবার ভুলে যাই; দেখি, আবার অন্ধ হই; শুনি, আবার বেখেয়ালে পা বাড়াই। জীবন হাতে নেই, মৃত্যু পেছনে নেই, সময়ও আমাদের অনুগত নয়—সবই এক মহামালিকের ইচ্ছার মধ্যে বন্দি। ভোরের আলো যেমন হঠাৎ আসে না, তেমনি আমাদের জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাসও তাঁর অনুমতি ছাড়া আসে না। তাই যে হৃদয় একটু হলেও জেগে আছে, সে জানে: অহংকারের জন্য এই দুনিয়া নয়, গাফিলতির জন্য এই আয়াত নয়, আর তাড়াহুড়োর জন্য এই জীবন নয়।

রাত নেমে এলে মানুষ যেমন নিজের দুর্বলতা দেখে, দিন এলে তেমনি নিজের ব্যস্ততার মধ্যে আল্লাহকে ভুলে যায়। অথচ দিন-রাত—দুটিই সাক্ষী, দুটিই বার্তা, দুটিই ফিরে ফিরে বলে যায়: ফিরে এসো। তোমার শৈশব কোথায় গেল, তোমার শক্তি কোথায় গেল, তোমার প্রিয়জন কোথায় গেল—আর একদিন তুমি নিজেও কোথায় যাবে? এই প্রশ্নের উত্তর কেবল তওবা, কেবল বিনয়, কেবল রবের সামনে নত হওয়া। সূরা আল-মুমিনুনের এই পথচলা শেষমেশ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়—মুমিন সে-ই, যে জীবনকে পরীক্ষা জেনে বাঁচে, মৃত্যুকে সাক্ষাৎ জেনে প্রস্তুত হয়, আর সময়ের প্রতিটি অদলবদলে তার রবের ক্ষমতা, রহমত ও বিচারকে চিনে নেয়।