আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, তিনি যারা হিদায়াত গ্রহণ করে তাদের হিদায়াত আরও বাড়িয়ে দেন। এ এক বিস্ময়কর সত্য—সৎপথ কোনো স্থির জমাট পাথর নয়, বরং আল্লাহর করুণায় তা ক্রমে প্রসারিত হয়, আলোকিত হয়, গভীর হয়। মানুষ যখন সত্যকে মেনে নেয়, তার অন্তরের দরজা যখন সামান্যতম হলেও খুলে যায়, তখন রবের পক্ষ থেকে নতুন আলো নেমে আসে; ঈমানের বোধ সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হয়, নেক কাজের প্রতি আকর্ষণ দৃঢ় হয়, আর গোনাহর অন্ধকার থেকে বাঁচার শক্তিও বাড়তে থাকে। হিদায়াতের এই বৃদ্ধি আসলে বান্দার ওপর আল্লাহর এক মমতাময় অভিষেক—যেন তিনি বলেন, তুমি এগিয়ে এসো, আমি তোমার পথ আরও প্রশস্ত করে দেব।
এর বিপরীতে আয়াতটি আমাদের সামনে স্থাপন করে আরেকটি গভীর সত্য: স্থায়ী সৎকর্ম, বাকিয়াতুস সালিহাত, তোমার রবের কাছে প্রতিদানের দিক থেকে শ্রেষ্ঠ এবং প্রত্যাবর্তনের দিক থেকেও শ্রেষ্ঠ। ক্ষণস্থায়ী জগতের জৌলুস খুবই প্রতারণাময়; যা আজ হাতে ধরা যায়, কাল তা ঝরে যেতে পারে। কিন্তু যে আমল আল্লাহর জন্য থাকে, যে কথা, যে দান, যে ন্যায়, যে ধৈর্য, যে তাসবিহ, যে আত্মশুদ্ধি আল্লাহর দরবারে উঠতে থাকে, তা সময়ের ক্ষয়ে মুছে যায় না। মানুষের দৃষ্টি যখন সামান্য প্রশংসা, সাময়িক লাভ, বা তাড়াহুড়া করে অর্জিত ফলের দিকে বন্দি হয়ে পড়ে, তখন এই আয়াত তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়—তোমার প্রকৃত পুঁজি সেইটিই যা রবের কাছে জমা থাকে, এবং সেই সঞ্চয়ই শেষ পর্যন্ত তোমার কাছে ফিরে আসে অশেষ মর্যাদা হয়ে।
সূরা মারইয়ামের এই প্রেক্ষাপটেও বার্তাটি বিশেষভাবে হৃদয়স্পর্শী। এই সূরায় যাকারিয়া আ. এর কান্না মেশানো দোয়া, মারইয়াম আ.-এর পবিত্রতার গল্প, ঈসা আ.-এর নিদর্শনময় জন্ম ও নবীদের পবিত্র স্মৃতি আমাদেরকে বারবার আখিরাতের দিকে টেনে নেয়। এখানে মানুষের সামনে বারবার তুলে ধরা হয়েছে—রহমত, নুবুওয়াত, সততা, পবিত্রতা, এবং আল্লাহর ক্ষমতা। এই আলোয় এই আয়াত যেন বলে, নবীদের স্মৃতি কেবল ইতিহাস নয়; তা এক চলমান দাওয়াত। যে ব্যক্তি আল্লাহর পথ ধরে, তার অন্তর আরও প্রশস্ত হয়, তার জীবন আরও অর্থবহ হয়, আর তার আমলগুলো দুনিয়ার ধুলো ঝেড়ে গিয়ে আখিরাতের অনন্ত ঘরে স্থায়ী হয়ে ওঠে। এখানে কোনো বিশেষ একক শানে নুযূল নির্ভর করে বার্তা বোঝার প্রয়োজন নেই; বরং সমগ্র সূরার সুরই আমাদের শেখায়—আল্লাহর দেখানো পথে হাঁটলে হিদায়াত বাড়ে, আর সেই বাড়তে থাকা আলোকে ধরে রাখে কেবল স্থায়ী সৎকর্ম।
যে হৃদয় একবার সত্যের দিকে ঝুঁকে, আল্লাহ তার জন্য সত্যের দরজা আরও খুলে দেন। এ আয়াতের কোমল অথচ শক্তিশালী ঘোষণা যেন আমাদের অন্তরকে জাগিয়ে দেয়—হিদায়াত কোনো একবারের প্রাপ্তি নয়, বরং আল্লাহর ইচ্ছায় বেড়ে চলা এক নূর। বান্দা যখন আন্তরিকভাবে সরে আসে, যখন সে নিজের অজুহাত ভেঙে আলোর দিকে পা বাড়ায়, তখন রব তার ভেতরে বোধের পর বোধ, সংযমের পর সংযম, দৃঢ়তার পর দৃঢ়তা দান করেন। ঈসা ও মারইয়াম, যাকারিয়া ও তাঁর দোয়া, নবীদের স্মৃতিমাখা এই সূরার মাঝে এ আয়াত আমাদের শেখায়—আল্লাহ যাকে ডাকেন, তাকে শুধু পথ দেখান না; সেই পথের আলোও বাড়িয়ে দেন।
তাই হিদায়াত চাইতে হলে শুধু সঠিক কথা জানলেই হয় না; সেই কথার সামনে নত হতে হয়। যে নিজেকে আল্লাহর কাছে সঁপে দেয়, আল্লাহ তাকে আরও পথ দেখান; আর যে নিজের আমলকে আল্লাহর জন্য বাঁচিয়ে রাখে, তার কাজই তার সহযাত্রী হয় কবরে, কিয়ামতে, এবং চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তনে। সূরা মারইয়াম আমাদের কানে কানে স্মরণ করিয়ে দেয়—নবীদের জীবন স্মৃতি নয় শুধু, তা হচ্ছে আলোর উত্তরাধিকার। সেই উত্তরাধিকারের সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ হলো এমন আমল, যা মাটিতে পড়ে না, আকাশে ওঠে; মানুষ ভুলে গেলেও রব ভুলেন না।
হিদায়াত যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে, তা নিছক একবারের আলো হয়ে থেমে থাকে না; বরং তা বাড়তে থাকে, গভীর হয়, অন্তরে শিকড় গেড়ে বসে। আজকের দুনিয়ায় মানুষের কাছে অনেক কিছুই বাড়ে—সম্পদ বাড়ে, পরিচিতি বাড়ে, দাবি বাড়ে, কিন্তু অন্তরের নূর কি সত্যিই বাড়ে? এই আয়াত হৃদয়ের দরজায় নীরবে কড়া নাড়ে: তুমি কোন বৃদ্ধির পথে আছ? আল্লাহ যাকে সোজা পথে চালান, তাকে শুধু রাস্তা দেখান না; তিনি সেই পথের দৃঢ়তাও দেন, সেই পথের মাধুর্যও দেন, আর সেই পথে হাঁটার শক্তিও দেন। তাই হিদায়াতকে হালকা করে দেখা যায় না, কারণ তা আল্লাহর বিশেষ দান, আর এই দান যত রক্ষা করা হয়, ততই তা বিস্তৃত হয়। বান্দা যখন নত হয়ে সত্যকে আঁকড়ে ধরে, তখন রব তার জন্য সত্যকে আরও উজ্জ্বল করে দেন—এ এক রহমতের অদৃশ্য প্রবাহ, যা শুধু চোখে নয়, আত্মায় অনুভব করা যায়।
আর এই দুনিয়ার ক্ষণভঙ্গুর জৌলুসের বিপরীতে আল্লাহ আমাদের সামনে তুলে ধরেন বাকিয়াতুস সালিহাত—স্থায়ী সৎকর্ম। মানুষের সমাজ যতই বাহ্যিক সাফল্যে মুগ্ধ হোক, অন্তরের সত্য জানে যে যা আল্লাহর জন্য করা হয়, তাই টিকে থাকে; যা লোকদেখানো, তা মুছে যায়; যা নফসের জন্য, তা একদিন ভার হয়ে দাঁড়ায়। একটি ঈমানি শব্দ, একটি লুকানো দান, একটি অশ্রুসিক্ত সিজদা, একটি হারাম থেকে ফিরে আসা, একটি নিভৃত ক্ষমা—এসবই আখিরাতের ভাণ্ডারে জমা হয়। সমাজ যখন ভুলে যায় আখিরাত, তখন মানুষ কেবল তাৎক্ষণিক লাভের পেছনে ছুটে; কিন্তু এই আয়াত আত্মাকে জাগিয়ে বলে: ফিরে আসতে হবে রবের কাছে, আর সেই ফেরার পথে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সওয়াবও স্থায়ী সৎকর্মের, সবচেয়ে সুন্দর প্রত্যাবর্তনও তারাই পায়।
এই আয়াত যেন আমাদের কাঁধে হাত রেখে ধীরে বলে—তুমি যদি সত্যিই সৎপথের দিকে এক পা বাড়াও, আল্লাহ তোমার সামনে আরও পথ খুলে দেন। হিদায়াত এমন জিনিস নয়, যা একবার পেয়ে গেলে আর কোনো ভাঙন নেই; বরং তা আল্লাহর হাতে বাড়তে থাকা আলো, হৃদয়ের ওপর হৃদয় রেখে নেমে আসা করুণা। আজ যে অন্তর একটু নরম হয়, কাল সে আরও নরম হতে পারে; আজ যে চোখ একটুখানি সত্য দেখতে শেখে, কাল সে মিথ্যার সাজানো চাকচিক্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। কিন্তু এই বৃদ্ধি চাইলে, তা কেবল দাবিতে হয় না; তা আসে ভেঙে পড়া অন্তর, সত্যের সামনে নত হওয়া, আর রবের কাছে বারবার ফিরে আসার মধ্য দিয়ে।
আর এই সূরার আলোয় বোঝা যায়, মানুষের আসল সম্পদ সেই সব আমল, যা সময়ের হাতে নষ্ট হয় না। দুনিয়ার অনেক কীর্তি চোখে পড়ে, কিন্তু অন্তরকে বাঁচায় না; অনেক অর্জন নাম রেখে যায়, কিন্তু পরকালকে সমৃদ্ধ করে না। বাকিয়াতুস সালিহাত—অবশিষ্ট থাকা নেক আমল—সেগুলোই রবের কাছে শ্রেষ্ঠ, সেগুলোই ফিরে যাওয়ার দিনে সত্যিকারের সম্বল। একটি ইখলাসভরা সিজদা, একটি গোপন দান, একটি ক্ষমা, একটি সত্য উচ্চারণ, একটি চোখের পানি, একটি তাওবা—এসব কিছুই হারিয়ে যায় না। সূরা মারইয়ামের কোমল, করুণাময় আখিরাত-স্মারক আমাদের জাগিয়ে তোলে: জীবন ছোট, সফর দীর্ঘ, আর ফেরার জায়গা একটাই। তাই আজই আল্লাহর দিকে নত হও, নিজের ভেতরের অন্ধকারের জন্য লজ্জিত হও, এবং এমন কিছু আমল জমা করো যা কিয়ামতের দিন তোমার পক্ষ হয়ে দাঁড়াবে।