আল্লাহ তাআলা এখানে যেন এক ভয়ংকর সত্যকে অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে ঘোষণা করছেন: যারা পথভ্রষ্টতার মধ্যে পড়ে আছে, তাদের জন্যও দয়াময় রব দুনিয়ার দরজা একেবারে বন্ধ করে দেন না। অবকাশ দেন, সময় দেন, সুযোগ দেন—এমন এক বিস্তৃত রহমত, যা অনেক সময় মানুষের চোখে দয়া বলে মনে হয়, অথচ অন্তরে তা এক সূক্ষ্ম পরীক্ষা। মানুষ ভাবে, এখনও তো কিছু হয়নি; এখনও তো জীবন চলছে; এখনও তো ক্ষমতা, প্রভাব, সুখ, আর জবাবদিহির বিলম্ব রয়েছে। কিন্তু কুরআন আমাদের শেখায়, আল্লাহর এই বিলম্ব কখনো অক্ষমতা নয়, কখনো বিস্মৃতি নয়। এটি এমন এক অবকাশ, যার মধ্যে পথভ্রষ্ট মানুষ নিজের শেষ রূপটি প্রকাশ করে ফেলে, আর সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এই আয়াতের সুর সূরা মারইয়ামের সামগ্রিক আবহের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। এখানে যাকারিয়া ও মারইয়ামের বিস্ময়কর দোয়া, ঈসা আলাইহিস সালামের পবিত্র জন্ম ও আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন, নবীদের স্মৃতি, রহমত এবং আখিরাতের দৃশ্য—সব মিলিয়ে হৃদয়কে এক দিকে কোমল, অন্য দিকে সতর্ক করে। এমন সূরায় এসে আল্লাহ যেন বলছেন, নবীদের স্মরণ কেবল ইতিহাসের কথা নয়; তা আমাদের বর্তমানকে জাগিয়ে তোলার জন্য। যারা নবীদের সত্যকে অস্বীকার করে, যারা আল্লাহর আয়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাদের জন্য দুনিয়ার প্রশস্ততা কোনো নিরাপদ আশ্রয় নয়। এই অবকাশের ভেতরেই একদিন তাদের সামনে খুলে যাবে সেই বাস্তবতা, যা তারা এড়িয়ে চলেছিল।

অবশেষে তারা যা ওয়াদা করা হয়েছে, তা প্রত্যক্ষ করবে—হোক তা আযাব, হোক তা কিয়ামত। তখন আর কোনো আত্মপ্রবঞ্চনা টিকবে না, কোনো শক্তির দাবি কাজে আসবে না, কোনো দলবল মানুষকে বাঁচাতে পারবে না। কে মর্যাদায় নিকৃষ্ট, কে সৈন্যবলে দুর্বল—সেই সত্য উন্মোচিত হবে দুনিয়ার সব আড়াল ছিঁড়ে। এ আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অবকাশের দিনগুলোকে নিরাপত্তা ভেবে ভুল করা যায় না; সেগুলো আসলে ফিরে আসার আহ্বান। দয়াময় আল্লাহর রহমতই মানুষকে বারবার ডাকছে, যেন শাস্তির আগে অন্তর জেগে ওঠে, আর কিয়ামতের আগে বান্দা তার রবের দিকে ফিরে আসে।

আল্লাহর রহমত কত বিস্তৃত—তা এমন অনেক সময় গুনাহগারকেও ছুঁয়ে যায়, আর নাফরমানের জন্যও দুনিয়ার দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না। এই আয়াতে সেই বিস্তৃত অবকাশের কথাই বলা হয়েছে: যারা পথভ্রষ্টতায় আছে, দয়াময় আল্লাহ তাদেরকে সময় দেন, সুযোগ দেন, অবকাশ দেন। কিন্তু এই অবকাশকে নিরাপত্তা মনে করা সবচেয়ে বড় ভুল। কারণ কখনো কখনো আল্লাহর বিলম্বই মানুষের অন্তরের গোপন অবস্থা প্রকাশের জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়। মানুষ ভাবে, আমি এখনো বাঁচছি, তাই সব ঠিক; অথচ এই বেঁচে থাকাই তার বিরুদ্ধে এক নীরব সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, যদি সে তাওবা না করে, ফিরে না আসে, হৃদয়কে জাগিয়ে না তোলে।

সূরা মারইয়ামের আবহে এই কথা আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। যাকারিয়া আলাইহিস সালামের দোয়া, মারইয়ামের পবিত্রতা, ঈসা আলাইহিস সালামের আগমন—সবখানেই আমরা দেখি, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য রহমতের অদ্ভুত দরজা খুলে দেন। কিন্তু সেই রহমতের ভেতরেই সতর্কতা লুকিয়ে থাকে। যে আল্লাহ অনুগ্রহ করে সময় দেন, তিনিই আবার সময়ের শেষে সত্যকে এমনভাবে প্রকাশ করে দেন যে তখন আর অস্বীকারের মুখ থাকে না। আযাব আসুক বা কিয়ামত আসুক—মানুষ একদিন দেখবেই, কে সত্যিই শক্ত অবস্থানে ছিল আর কে ছিল আসলে দুর্বল, কে ছিল সত্যের পক্ষে আর কে ছিল ঠুনকো কল্পনার ভরসায় দাঁড়িয়ে।
এই আয়াত হৃদয়কে জাগিয়ে বলে: দুনিয়ার প্রসারকে দিয়ে নিজের পরিণতি মাপো না। কখনো কখনো আল্লাহ পথভ্রষ্টকে ছেড়ে দেন, যাতে সে নিজের পথের শেষপ্রান্তে পৌঁছে সত্যের মুখোমুখি হয়—তখন তার জন্য অজুহাতের আর কোনো ছায়া থাকবে না। ক্ষমতা, জনবল, প্রভাব, জৌলুস—সবই একদিন ক্ষণিকের ধুলো হয়ে যায়; আর অবশিষ্ট থাকে শুধু বান্দার আমল, তার অন্তরের অবস্থা, তার রবের সামনে নীরব দাঁড়িয়ে থাকা। সেদিন বোঝা যাবে, মর্তবায় কে নিকৃষ্ট আর জুড়ে কে সবচেয়ে দুর্বল। তাই আজই ফেরার সময়। আজই সেই অবকাশকে রহমত হিসেবে গ্রহণ করে তওবার পথে হাঁটার সময়। কারণ দয়াময় আল্লাহর অবকাশ চিরদিন অবকাশ থাকে না; কখনো কখনো তা আখিরাতের কঠিন জবাবের আগে শেষ সুযোগ।

আল্লাহ তাআলা এখানে দয়াময়ের অবকাশকে এমন এক আয়নায় পরিণত করেছেন, যেখানে পথভ্রষ্ট মানুষ নিজের মুখ দেখতে পায়। অবকাশকে অনেকেই বিজয় ভাবে, বিলম্বকে মনে করে নিরাপত্তা, আর সুযোগকে ধরে নেয় সত্যের পক্ষে প্রমাণ। কিন্তু কুরআন বলছে, না—এটা আল্লাহর অক্ষমতা নয়, এটা রহমতের ভেতর লুকোনো পরীক্ষা। মানুষ যখন গোমরাহির পথে চলেও জগতে কিছুদিন টিকে যায়, তখন বুঝতে হবে, রব তাকে ছেড়ে দেননি; বরং তাকে ফিরবার, ভেবে দেখবার, নিজের ভেতরের অন্ধকার চেনবার সময় দিয়েছেন। আর এই সময়ই হয়তো তার জন্য সবচেয়ে কঠিন, কারণ এখানে আকাশ থেকে শাস্তি নেমে আসে না, কিন্তু অন্তরের ওপর সত্যের দস্তক এসে পড়ে।

সূরা মারইয়ামের সুরে এই আয়াত যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে। এখানে যাকারিয়া আলাইহিস সালামের দোয়ার ভাঙা কণ্ঠ, মারইয়াম আলাইহাস সালামের পবিত্র আত্মসমর্পণ, ঈসা আলাইহিস সালামের জন্মের অসাধারণ নিদর্শন—সব মিলিয়ে বোঝায়, আল্লাহর রহমত শুধু কৃপা নয়; তা সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার এক জীবন্ত শক্তি। তাই যে সমাজ নবীদের স্মৃতি থেকেও শিক্ষা নেয় না, বরং দুনিয়ার অহংকারে নিজেকে বড় মনে করে, তার জন্য এই অবকাশ একদিন ভয়ংকর সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। আযাব আসুক বা কিয়ামতই আসুক—যে দিন আসল, সে দিন আর কল্পনার অবকাশ থাকবে না; তখন মানুষ বুঝবে, কে সত্যিই সম্মানের অধিকারী ছিল আর কার শক্তি ছিল নিছক ছায়া।

এই আয়াত আমাদের অন্তরকে আত্মজবাবদিহির দিকে ফেরায়। কারণ গুনাহের পথে কখনও কখনও স্থবিরতা আসে, আর সেই স্থবিরতাকেই আমরা শান্তি ভেবে নিই; অথচ হৃদয় ভিতরে ভিতরে শুকিয়ে যেতে থাকে। আল্লাহর অবকাশকে ভয় করতে হবে, আবার তাঁর রহমতকে আশা করতে হবে—এই দুইয়ের মাঝখানে ঈমানের জীবন। যদি আজও সময় থাকে, তবে তা তওবার সময়; যদি বুকের ভেতর নরম কিছু অবশিষ্ট থাকে, তবে তা সিজদার জন্যই রাখা। শেষ পর্যন্ত মানুষের মর্যাদা ঠিক হবে তার দাবি দিয়ে নয়, তার পরিণাম দিয়ে। আর আখিরাতের দরজায় পৌঁছে সব কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে—কোন দল সত্যের ছিল, আর কার শক্তি ছিল কেবল ধোঁয়া।

এই আয়াত আমাদের ভিতরে এক অস্বস্তিকর কিন্তু সত্য দরজা খুলে দেয়: অবকাশকে কেউ কেউ নিজের নিরাপত্তা ভাবে, অথচ অবকাশ অনেক সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে শেষবারের মতো জেগে ওঠার ডাক। দয়াময় রব পথভ্রষ্টকেও সুযোগ দেন, সময় দেন, আলোকিত হওয়ার মতো একটি ভোরও দেন; কিন্তু মানুষ যদি সেই ভোরের আলোকে অবজ্ঞা করে, তাহলে একদিন এমন সময় আসবে যখন পর্দা সরে যাবে, আর অবাক হয়ে দেখবে—যে দুনিয়াকে সে শক্তি ভেবেছিল, তা কত দুর্বল; যে দলবলকে সে ঢাল ভেবেছিল, তা কত অসহায়। সেই মুহূর্তে অহংকারের ভাষা থেমে যাবে, আর সত্য নিজের ভার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে।

সূরা মারইয়াম আমাদের যে হৃদয়শুদ্ধ আসমানি স্মৃতি উপহার দেয়, এই আয়াত যেন তার শেষ সুরে এক গভীর কাঁপন যোগ করে: যাকারিয়ার দোয়া, মারইয়ামের পবিত্রতা, ঈসা আলাইহিস সালামের নিদর্শন, নবীদের উত্তরাধিকার—সবই আমাদের শেখায় আল্লাহর রহমত অসীম, কিন্তু সেই রহমতের সামনে অবিনয় না আনলে মানুষ নিজেই নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়ে দাঁড়ায়। তাই আজ, যখন দরজা খোলা আছে, তখন অন্তরকে নরম করাই বুদ্ধি; যখন সময় আছে, তখন ফিরে আসাই নিরাপত্তা; যখন আল্লাহ এখনো ঢেকে রেখেছেন, তখন তাঁর কাছে লজ্জায় কেঁপে ওঠাই ঈমানের সৌন্দর্য। কারণ আযাব বা কিয়ামতের দিন সত্য আর লুকিয়ে থাকবে না—সেদিন শুধু প্রকাশ পাবে কে সত্যিই আল্লাহর কাছে ছিল, আর কে শুধু দুনিয়ার ছায়ায় নিজেকে বড় ভেবেছিল।