সূরা মারইয়ামের এই আয়াতটি মানুষের ভেতরের এক অদ্ভুত আত্মপ্রবঞ্চনাকে উন্মোচন করে। আল্লাহ প্রশ্নের ভঙ্গিতে বলছেন: তুমি কি তাকে দেখেছ, যে আমার নিদর্শনগুলো অস্বীকার করে, আর বুকভরা জেদের সঙ্গে বলে—আমাকে অবশ্যই ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দেয়া হবে? এখানে শুধু একটি কথাবার্তা নয়, বরং এক আত্মার অহংকার ধরা পড়ে। যে আল্লাহর সত্যকে মানে না, সে তবু ভবিষ্যতের জন্য নিজের ইচ্ছাকেই নিশ্চয়তা মনে করে। সে ভাবছে, সম্পদই নিরাপত্তা, সন্তানই স্থায়িত্ব, আর পার্থিব প্রাচুর্যই যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে তার বিশেষ প্রাপ্তি। কিন্তু আয়াতটি এই ভ্রান্ত আশ্বাসের মুখোশ খুলে দেয়।
মারইয়ামের সুরা আমাদেরকে বারবার স্মরণ করায়—যাকারিয়ার দোয়ায় রহমতের দরজা খোলে, মারইয়ামের পবিত্রতার স্মৃতিতে ঈমানের বিস্ময় জাগে, ঈসা আলাইহিস সালামের সত্য ঘটনায় মানুষের সীমাবদ্ধ ধারণা ভেঙে যায়। সেই নূরানী পরিমণ্ডলের পাশে দাঁড়িয়ে এই আয়াত যেন একটি তীক্ষ্ণ আয়না। যে হৃদয় নবীদের স্মৃতি থেকে শিক্ষা নেয় না, সে হৃদয় নিদর্শন দেখেও অন্ধ থেকে যায়। তার কাছে আল্লাহর কথা নয়, নিজের ধারণা বড়; ওহির আলো নয়, দুনিয়ার হিসাব বড়। ফলে সে আল্লাহকে অস্বীকার করেও ভবিষ্যতের কল্যাণ নিয়ে নিশ্চিন্ত ভাষায় কথা বলে—যেন আকাশ-জমিন সব তার পকেটে বন্দী।
এই আয়াতের পেছনে নির্দিষ্ট কোনো একক ঘটনাকে নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও, এর অর্থ মক্কার সেই বৃহত্তর বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত—যেখানে বহু মানুষ সম্পদ, বংশ, সামাজিক শক্তি ও সন্তানকে সম্মানের মানদণ্ড বানিয়েছিল। কুরআন সেই মানদণ্ডকে বারবার ভেঙে দেয়, কারণ আল্লাহর কাছে মর্যাদা ধন-সম্পদে নয়, ঈমান ও আনুগত্যে। তাই এই আয়াত শুধু এক অস্বীকারকারীর গল্প নয়; এটি প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য সতর্কবার্তা। যখন কেউ আল্লাহর নিদর্শনকে উপেক্ষা করে পার্থিব প্রাচুর্যের প্রতিশ্রুতিতে ভরসা করে, তখন সে আসলে এমন এক বালির দুর্গে দাঁড়ায়, যাকে প্রথম ঢেউই ভেঙে দিতে পারে।
আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার করে যে মানুষ, সে আসলে সত্যকে নয়—নিজের ক্ষণস্থায়ী আত্মাভিমানকে আঁকড়ে ধরে। এই আয়াতে তার ভেতরের শব্দ শোনা যায়: আমি তো পাবই; আমাকে তো দিতেই হবে। এ হলো সেই অন্তর্গত অন্ধতা, যেখানে বান্দা দাতার মুখে তাকায় না, শুধু দানের কল্পনায় মত্ত থাকে। ধন-সম্পদ আর সন্তানকে সে মনে করে মর্যাদার সনদ, স্থায়িত্বের প্রতিশ্রুতি, ভবিষ্যতের নিরাপদ দুর্গ; অথচ এগুলো সবই আল্লাহর ইচ্ছার অধীন ক্ষণিকের আমানত। যে হৃদয় রবের নিদর্শনকে মানে না, তার জন্য প্রাচুর্যও হতে পারে পরীক্ষার রূপ, আর সন্তানের মোহও হতে পারে আত্মিক পতনের নীরব পথ।
এই আয়াত আমাদের থামিয়ে জিজ্ঞেস করে: আমি কি আল্লাহর কাছে চাইছি, নাকি আল্লাহকে বাদ দিয়ে কেবল তাঁর দুনিয়াবি দানকে? আমি কি নিদর্শন দেখেও ঈমানের দিকে ফিরছি, নাকি প্রাচুর্যের কল্পনায় নিজের গাফিলতিকে বৈধতা দিচ্ছি? মানুষের জীবনে সম্পদ আসতে পারে, সন্তান আসতে পারে, সম্মানও আসতে পারে—কিন্তু সেগুলো যদি রবের দিকে ফিরিয়ে না দেয়, তবে সেগুলো হৃদয়ের পর্দা হয়ে দাঁড়ায়। সত্যিকারের সৌভাগ্য হলো, আল্লাহর নিদর্শন দেখে অন্তর নরম হওয়া; আর প্রকৃত ক্ষতি হলো, আয়াতের সামনে দাঁড়িয়েও জেদের চাদরে নিজের ভ্রমকে রক্ষা করা।
আল্লাহ যখন জিজ্ঞেস করেন—“আপনি কি তাকে লক্ষ্য করেছেন”—তখন সেটি কেবল একজন ব্যক্তিকে দেখার আহ্বান নয়; এটি যেন আমাদেরই অন্তরের দিকে তাকানোর হুকুম। যে মানুষ আল্লাহর নিদর্শন অস্বীকার করে, তার মুখে তবু আশা-আকাঙ্ক্ষার অহংকার জেগে ওঠে। সে বলে, আমাকে অবশ্যই ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দেয়া হবে। কী বিচিত্র আত্মপ্রবঞ্চনা! যে সত্যকে মানল না, সে কীভাবে ভেবেছে ভবিষ্যতের ভাণ্ডার তারই জন্য খুলে থাকবে? এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সম্পদ মানুষকে আল্লাহর প্রিয় বানায় না, আর সন্তানও পাপের পর্দা হয়ে থাকে না। যদি ঈমান না থাকে, তবে প্রাচুর্য কেবল পরীক্ষার আরেক নাম; আর যদি হৃদয় জাগ্রত হয়, তবে অল্পের মধ্যেও রহমতের সুগন্ধ খুঁজে পায়।
মারইয়াম, ঈসা, যাকারিয়ার এই সুরা আমাদের সামনে যে নূরানী ইতিহাস তুলে ধরে, সেখানে দোয়া, পবিত্রতা, বিস্ময় আর আখিরাতের স্মৃতি হৃদয়কে নরম করে। আর এই আয়াত সেই কোমলতার বিপরীতে এক কঠিন আয়না এনে ধরে—মানুষ কত সহজে নিজের ইচ্ছাকে আল্লাহর বিধানের ওপরে বসিয়ে দেয়। সমাজে এমন লোকের অভাব নেই; তারা সত্যকে এড়িয়ে যায়, তবু সাফল্যের নিশ্চয়তা দাবি করে, দুনিয়ার জাঁকজমককে নিজের অধিকার বলে মনে করে। কিন্তু কুরআনের এই প্রশ্ন আমাদের থামিয়ে দেয়: তুমি কি সত্যিই নিশ্চিত, নাকি শুধু নিজের ভ্রমকে শক্ত করে আঁকড়ে আছ?
এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে আত্মসমালোচনার দরজা খুলে যায়। আমার ভরসা কি আল্লাহ, না আমার সঞ্চয়? আমার নিরাপত্তা কি ঈমান, না মানুষের চোখে দেখা সমৃদ্ধি? আখিরাতের পথে হাঁটতে হাঁটতে মানুষকে বারবার শেখা দরকার—যা কিছু আছে, সবই আমানত; আর যা আসবে, তা আল্লাহর হুকুমে আসবে। ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি, সম্মান, প্রভাব—সবই পরীক্ষা; কোনোটি স্থায়ী আসন নয়। তাই এই আয়াত আমাদের ভেতরে এক কাঁপন জাগায়, যাতে হৃদয় অহংকার থেকে ফিরে এসে বিনয়ী হয়, আর গাফিলতি থেকে জেগে উঠে বলে: হে আল্লাহ, আমি তোমার নিদর্শন অস্বীকারকারীদের দলে থাকতে চাই না; আমাকে এমন ঈমান দাও, যা দুনিয়াকে নয়, তোমার সাক্ষাৎকে সত্য করে দেখে।
কিন্তু আল্লাহর নিদর্শন কি মানুষের আকাঙ্ক্ষার কাছে বাঁধা পড়ে? যে সত্যকে অস্বীকার করে, তার মুখে সম্পদ আর সন্তানের প্রতিশ্রুতি কেবল একটি দম্ভের ভাষা হয়ে ওঠে। সে ভাবে, যা আমি চাই তাই হবে; যা আমি বলি, সেটাই আমার ভবিষ্যৎ। অথচ মানুষের হাতে নেই জন্মের সিদ্ধান্ত, মৃত্যুর সময়, হৃদয়ের স্থিরতা, কিংবা এক চিলতে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। সূরা মারইয়ামের করুণ, পবিত্র, নূরানী স্মৃতিগুলো আমাদেরকে শেখায়—আল্লাহ যখন বান্দাকে দান করেন, তখন তা রহমত; আর যখন কিছু দেন না, তখনও তাতে হেকমত। কিন্তু অবিশ্বাসীর অন্তর এ সূক্ষ্মতা বোঝে না। সে সম্পদকে সম্মান মনে করে, সন্তানকে স্থায়িত্ব মনে করে, আর এসবের ছায়ায় নিজের ধ্বংসকে ঢেকে রাখে।
এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে মানুষের অহংকার নরম হয়ে যায়। কারণ একদিন সেই ‘অবশ্যই আমাকে দেয়া হবে’ উচ্চারণের সব ভিত্তি ভেঙে পড়বে, আর সামনে থাকবে শুধু আমল, শুধু সত্য, শুধু রবের বিচার। কত মানুষ আছে, যাদের বাহ্যিক জীবনে প্রাচুর্য নেই, কিন্তু তাদের অন্তর আল্লাহর স্মরণে পরিপূর্ণ; আর কত মানুষ আছে, যাদের হাতে সবকিছু, তবু তারা শূন্য, অস্থির, ভীত। তাই এই আয়াত আমাদেরকে ধ্বংস করার জন্য নয়, জাগিয়ে তোলার জন্য। যেন আমরা বুঝি—আল্লাহর নিদর্শন অস্বীকার করা মানে শুধু একটি বক্তব্য অস্বীকার করা নয়; তা হলো নিজের আত্মাকে অন্ধকারে ফেলে দেওয়া। হে হৃদয়, অহংকারের সেই মিথ্যা আশ্বাস থেকে ফিরে এসো। মারইয়াম, যাকারিয়া, ঈসা আলাইহিমুস সালাম-এর আলোয় দাঁড়িয়ে বলো: হে আল্লাহ, আমি তোমার নিদর্শনের সামনে বিনয়ী হতে চাই; আমার ভরসা তুমি, আমার ভবিষ্যৎ তুমি, আমার আখিরাতও তুমি।