মানুষ কি স্মরণ করে না—সে একদিন কিছুই ছিল না? এই একটি প্রশ্নেই হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ে সূরা মারইয়ামের এই আয়াত। আল্লাহ তাআলা এখানে মানুষের গোড়া-সত্যটাকে সামনে এনে দাঁড় করান। যে সত্তা আজ কথা বলে, পরিকল্পনা করে, দাবি তোলে, গর্ব করে, সেই সত্তার সূচনাই ছিল শূন্যতা। তার নিজস্ব কোনো ক্ষমতা ছিল না, কোনো পরিচয় ছিল না, কোনো অস্তিত্বই ছিল না। তারপর আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করলেন—সামান্য এক বিন্দু থেকে, দুর্বলতার ভেতর দিয়ে, বিস্ময়ের পর বিস্ময় বয়ে এনে। তাই এই আয়াত শুধু তথ্য নয়; এটি আত্মাভিমানের বুকে এক আঘাত, আর কৃতজ্ঞ হৃদয়ের জন্য এক নির্মল জাগরণ।

সূরা মারইয়াম-এর ধারাবাহিকতায় এই বাক্যটি যেন নবীদের স্মৃতি, রহমতের প্রবাহ, আর আখিরাতের সতর্কতার মাঝখানে মানুষের দম্ভকে ছোট করে দেয়। এখানে আল্লাহ মানুষকে তার উৎসের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, যেন সে ভুলে না যায়—অস্তিত্ব তার অধিকার নয়, দান। এ জন্যই মানুষ যখন নিজের শক্তিকে স্থায়ী মনে করে, নিজের জ্ঞানকে চূড়ান্ত ভাবে, নিজের সাফল্যকে নিজেরই কৃতিত্বে বন্দি করে ফেলে, তখন এই আয়াত নীরবে বলে: তুমি তো শুরুতেই কিছু ছিলে না। তবে আজ যা কিছু আছে, তা শুধু তোমার রবের ইরাদা, কুদরত ও রহমতের ফল। এই স্মরণই ঈমানকে কোমল করে, অহংকারকে ভেঙে দেয়, আর বান্দাকে সিজদার মর্যাদায় ফিরিয়ে আনে।

এই আয়াতের নির্দিষ্ট কোনো সহিহ প্রেক্ষাপট সুনিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়; তবে এর ভাষা এমন এক সার্বজনীন সত্য ঘোষণা করে, যা কেবল একটি ঘটনা নয়, সব যুগের মানুষের জন্যই প্রযোজ্য। সূরা মারইয়ামের ভেতরে যাকারিয়া ও মারইয়াম আলাইহিমাস সালাম, ঈসা আলাইহিস সালাম, এবং আখিরাতের দৃশ্যপট একসাথে এসে মানুষের সামনে আল্লাহর অসীম ক্ষমতা তুলে ধরে। কখনো সন্তানহীন বৃদ্ধকে সন্তান দান, কখনো পিতাহীন সন্তানের জন্ম, কখনো মৃতকে জীবনদান—এই সবই যেন একই সত্যের নানা রূপ: যে আল্লাহ শূন্যতা থেকে সৃষ্টিকে আনতে পারেন, তাঁর জন্য অসম্ভব বলে কিছু নেই। তাই এই আয়াত মানবজীবনের গোড়ায় একটি স্থায়ী শিক্ষা রেখে যায়—নিজেকে ভুলে যেয়ো না, নিজের শূন্যতাকে ভুলে যেয়ো না, আর যিনি তোমাকে অস্তিত্ব দিয়েছেন, তাঁর সামনে মাথা নত করাই মানুষের সঠিক পরিচয়।

আল্লাহ যখন জিজ্ঞেস করেন, মানুষ কি স্মরণ করে না—সে একদিন কিছুই ছিল না? তখন প্রশ্নটি কেবল স্মরণচিহ্নের নয়, বরং ভেতরের পর্দা সরিয়ে দেওয়ার আহ্বান। কারণ মানুষ যতক্ষণ নিজের সূচনা ভুলে থাকে, ততক্ষণ সে নিজের অবস্থানও ভুলে যায়। আজ যে বুক টান করে দাঁড়ায়, যে মুখে দাবি জমে, যে হৃদয়ে কর্তৃত্বের স্বপ্ন জ্বলে—সেও তো একদিন অস্তিত্বের মানচিত্রেই ছিল না। আল্লাহর কুদরত তাকে শূন্যতা থেকে টেনে এনে নাম দিয়েছেন ‘মানুষ’; আর সেই নামের ভেতরেই লুকিয়ে আছে বিনয়ের দায়।

এই আয়াতের সামনে অহংকারের ভাষা ভেঙে পড়ে। মানুষ নিজেকে বড় মনে করে কাজের ভিড়ে, জ্ঞানের আলোয়, সম্পদের ও পরিচয়ের উচ্চতায়; কিন্তু তার আদিম সত্য বলে, সে সৃষ্ট, স্বতন্ত্র নয়; দানপ্রাপ্ত, অধিকারী নয়। সূরা মারইয়ামের নবী-স্মৃতির ধারায় এই কথা আরও গভীর হয়ে ওঠে—যাকারিয়ার প্রার্থনা, মারইয়ামের বিস্ময়, ঈসা আলাইহিস সালামের নিদর্শন, সবই মানুষকে জানান দেয় যে আল্লাহ চাইলে শূন্য থেকে অর্থ, অপারগতা থেকে পথ, দুর্বলতা থেকে নিদর্শন ফুটিয়ে তুলতে পারেন। সুতরাং যে প্রভু মানুষকে না-থাকা থেকে ডেকে এনেছেন, তাঁর সামনে অবনত হওয়াই সত্যের ভাষা।
এ আয়াত হৃদয়কে এক নির্মম কিন্তু করুণ সত্যে ফিরিয়ে আনে: আমরা শুরুতে কিছুই ছিলাম না, আর শেষেও আল্লাহর সামনে কিছুই নই—তাঁর রহমত ছাড়া, তাঁর বিচার ছাড়া, তাঁর অনুগ্রহ ছাড়া। তাই মানুষের সৌন্দর্য নিজের জেদে নয়, নিজের শূন্যতা স্মরণে; নিজের নিরাপত্তা নয়, নিজের রবকে চেনায়। যে ব্যক্তি এই স্মরণ ধারণ করে, সে আর অহংকারে ফুলে ওঠে না, বরং কৃতজ্ঞতায় নত হয়, তওবায় নরম হয়, আখিরাতের স্মরণে জেগে ওঠে। কারণ যে অস্তিত্ব একদিন ছিল না, তার উচিত আজও প্রতিটি নিঃশ্বাসে ঘোষণা করা: আমি কিছুই ছিলাম না, তুমিই আমাকে কিছু বানিয়েছো।

মানুষ কি সত্যিই স্মরণ করে না—সে একদিন কিছুই ছিল না? এই প্রশ্নটি কোনো সাধারণ তিরস্কার নয়; এটি আত্মার দরজায় নেমে আসা এক নির্মম, অথচ দয়াময় আলো। আজ যে মানুষ নিজেকে বড় মনে করে, যার ভাষায় আত্মবিশ্বাসের তুফান, যার চোখে শ্রেষ্ঠত্বের ছায়া, সে যখন নিজের শুরুটুকু ভুলে যায়, তখনই তার ভিতরে অহংকার বাসা বাঁধে। আল্লাহ তাআলা তাকে শূন্যতা থেকে অস্তিত্ব দিয়েছেন; না ছিল তার কিছু, না ছিল তার দাবি, না ছিল তার ক্ষমতা। এই স্মরণ মানুষকে ভেঙে দেয় না, বরং ঠিক জায়গায় দাঁড় করায়। কারণ বান্দার মর্যাদা তার শক্তিতে নয়, তার রবকে স্মরণে; তার সৌন্দর্য নিজের গৌরবে নয়, স্রষ্টার সামনে বিনয়ে।

সূরা মারইয়ামের নবী-স্মৃতির ভেতর এই আয়াত আরও গভীর হয়ে ওঠে। এখানে যাকারিয়ার দোয়া আছে, মারইয়ামের পবিত্রতা আছে, ঈসা আলাইহিস সালামের নিদর্শন আছে, আর প্রতিটি নিদর্শনের পেছনে আছে একটিই সত্য—আল্লাহর কুদরত মানুষের ধারণার সীমার বাইরে। যে সমাজ নিজের শক্তি, বংশ, সম্পদ, আর প্রভাবকে চূড়ান্ত মনে করে, সেই সমাজের জন্য এই আয়াত এক নীরব কিয়ামত। কারণ মানুষ যখন নিজের উৎস ভুলে যায়, তখন সে অন্যায়কে অধিকার ভেবে বসে, গুনাহকে স্বাভাবিক মনে করে, আর আখিরাতকে দূরের গল্প বানিয়ে ফেলে। কিন্তু কুরআন তাকে ফিরিয়ে আনে তার প্রথম সত্যের কাছে: তুমি ছিলে না, তারপর আল্লাহ তোমাকে আছেন বলে দিলেন। তাই কৃতজ্ঞতা এখানে শুধু মুখের কথা নয়; এটি নিজের সীমানা জানা, গুনাহের সামনে কেঁপে ওঠা, এবং রবের সামনে ভেঙে পড়া হৃদয়ের নাম।

আর এই ভাঙাই মুমিনের মুক্তি। যে নিজেকে স্মরণ করে, সে তার রবকে ভুলতে পারে না; যে নিজের শূন্যতা বুঝে, সে আখিরাতকে অবহেলা করতে পারে না। আজ মানুষের অন্তরে যত দম্ভ, ততই তার আত্মা অনাথ; আর যত বিনয়, ততই তার ভেতরে রহমতের দরজা খুলে যায়। এ আয়াত যেন নরম অথচ অদম্য কণ্ঠে বলে: তোমার অস্তিত্ব তোমার কৃতিত্ব নয়, এটি আল্লাহর অনুগ্রহ। তাই ফিরে এসো—নিজের আত্মম্ভরিতার কারাগার থেকে, নিজের ভ্রান্ত নিরাপত্তা থেকে, নিজের ছোট্ট অহংকার থেকে। কেননা যিনি শূন্য থেকে সৃষ্টি করেন, তিনি পুনরুত্থানও করতে পারেন; যিনি প্রথমবার জীবন দিয়েছেন, তাঁর কাছে আখিরাত কোনো কঠিন বিষয় নয়। মানুষ যদি এই সত্য মনে রাখে, তবে তার হৃদয় নরম হয়, চোখ অশ্রুসিক্ত হয়, এবং জীবন আল্লাহমুখী হয়ে ওঠে।

এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে মানুষের সব বড়াই ধীরে ধীরে মুছে যেতে থাকে। যে আজ নিজেকে অপরিহার্য ভাবে, কালকেও থাকবে বলে মনে করে, যার ভেতর অহংকারের কড়্কড় শব্দ, ক্ষমতার নেশা, আর নিজের বুদ্ধির ওপর অতিরিক্ত ভরসা—তাকে আল্লাহ একটিমাত্র সত্যের দিকে ফিরিয়ে দেন: তুমি কিছুই ছিলে না। তোমার ছিল না কোনো সত্তা, না কোনো দাবি, না কোনো ভাষা, না কোনো অধিকার। তারপর তুমি হলে; আর হওয়াটাও তোমার ক্ষমতায় হয়নি, তোমার ইচ্ছায় হয়নি, তোমার প্রাপ্যেও হয়নি—এ ছিল নিখাদ রহমত। তাই মানুষের জন্য সবচেয়ে সুন্দর অবস্থা হলো বিনয়; কারণ নিজের সূচনার কথা যে ভুলে যায়, সে নিজের শেষের কথাও ভুলে বসে।

সূরা মারইয়ামের নবী-স্মৃতি আমাদের শেখায়, আল্লাহর বান্দারা সবাই এক দীর্ঘ করুণার ধারায় দাঁড়িয়ে আছেন—যাকারিয়ার দোয়া থেকে মারইয়ামের নিঃশব্দ আনুগত্য, ঈসা আলাইহিস সালামের বিস্ময়কর নিদর্শন থেকে আখিরাতের কঠোর স্মরণ পর্যন্ত। এই আয়াত সেই ধারার মাঝখানে মানুষের হৃদয়ে আয়না ধরেছে: তুমি শূন্য থেকে এসেছ, তাই শূন্যতায় ফিরে যাওয়া তোমার অন্তিম গন্তব্য নয়, বরং তোমার চূড়ান্ত হিসাবের প্রস্তুতি। যে তার স্রষ্টাকে স্মরণ করে, সে কৃতজ্ঞ হয়; যে কৃতজ্ঞ হয়, সে নরম হয়; আর যে নরম হয়, তার জন্য তাওবার দরজা খোলা থাকে। সুতরাং আজ যদি হৃদয় কিছুটা কেঁপে ওঠে, সেটাই নিয়ামত। কারণ এই কাঁপনই মানুষকে ফিরিয়ে আনে—নিজের দিকে নয়, আল্লাহর দিকে; নিজের অহংকারের দিকে নয়, তার সিজদার স্থানের দিকে; এবং এই স্মরণই শেষ পর্যন্ত ঈমানের সবচেয়ে কোমল, সবচেয়ে সত্য, সবচেয়ে মুক্তিদায়ী ভাষা।