মানুষ বলে: আমি যখন মরে যাব, তখন কি সত্যিই আবার জীবিত করে বের করা হবে? এই একটি প্রশ্নের ভেতরে লুকিয়ে আছে বিস্ময়, সংশয়, আর এক ধরনের আত্মঅহংকারও। মৃত্যু মানুষকে দেখে থমকে যায়, কারণ মৃত্যু তার পরিচিত সব হিসাব ভেঙে দেয়। দেহ যখন নিস্তেজ হয়, কবর যখন নীরব হয়, তখন ক্ষণস্থায়ী চোখ মনে করে—এটাই যেন শেষ। কিন্তু সূরা মারইয়াম এমন এক সূরা, যেখানে হৃদয় বারবার নবীদের স্মৃতি দিয়ে জাগানো হয়: যাকারিয়ার দীর্ঘশ্বাস, মরিয়মের পবিত্রতা, ঈসা আলাইহিস সালামের নিদর্শন—সবই যেন বলে, আল্লাহর রহমত সাধারণ নিয়মের সীমায় বাঁধা নয়। যিনি অনুগ্রহে অসম্ভবকে সম্ভব করেন, তিনি পুনরুত্থানকেও অসম্ভব রাখেন না।
এই আয়াতে মানুষের মুখে উচ্চারিত প্রশ্নটি কেবল তথ্য-অনুসন্ধান নয়; এর মধ্যে আখিরাত অস্বীকারের ছায়াও আছে। কুরআনের ভাষা মানুষকে তার অন্তরের অবস্থার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়—যে অন্তর আল্লাহর কুদরতের প্রশস্ত আকাশের বদলে নিজের ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতাকেই মানদণ্ড বানায়, সে-ই মৃত্যুর পরে জীবনের কথা শুনে থমকে যায়। এই সূরার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটও তাই করুণ অথচ দৃঢ়: এখানে নবীদের কাহিনি একসঙ্গে হৃদয়কে নরম করে এবং বিশ্বাসকে দৃঢ় করে। মরিয়ম ও ঈসা আলাইহিমাস সালামের ঘটনায় যেমন আল্লাহর বিশেষ ক্ষমতার নিদর্শন আছে, তেমনি যাকারিয়া আলাইহিস সালামের দোয়ায় আছে আশা ও জবাবের প্রতিশ্রুতি। ফলে এই প্রশ্নের উত্তর কেবল বুদ্ধির নয়, ঈমানেরও—মৃত্যুর পরে জীবিত করা আল্লাহর জন্য কঠিন নয়; বরং মানুষের সীমাবদ্ধ চেতনা-ই এ সত্যকে ভারী মনে করে।
সাবাবুন নুযূল সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট, নির্ভরযোগ্য ঘটনা বর্ণিত নেই; তাই একে কেবল কোনো এক ব্যক্তির কথাই বলা যায় না। এ আয়াত মানুষের সামগ্রিক মানসিকতাকে তুলে ধরে—যে মানসিকতা আখিরাতকে দূরের কথা মনে করে, আর কবরকে শেষ সীমানা ভেবে বসে। সূরা মারইয়ামের করুণ-আলোকময় সুরে এই প্রশ্ন তাই একটি দরজা হয়ে ওঠে: মৃত্যুর বাস্তবতা দেখে যে হৃদয় কেঁপে ওঠে, তার সামনে আখিরাতের আহ্বান আরও স্পষ্ট হয়। আল্লাহ এখানে মানুষের সংশয়কে উন্মোচন করেন, যেন সে বুঝতে পারে—জীবনের শুরু যেমন তাঁর ইচ্ছায়, তেমনি জীবনের দ্বিতীয় উত্থানও তাঁরই হাতে; আর সেই হাতের সামনে কোনো নীরব মাটি, কোনো গলে যাওয়া হাড়, কোনো বিস্মৃত স্মৃতি অক্ষম নয়।
মানুষের এই উচ্চারণে শুধু বিস্ময় নেই, আছে নিজের সীমাবদ্ধতার বন্দী ঘরও। সে বলে, আমি মরে গেলে আবার উঠব কীভাবে? এ প্রশ্নের ভেতরে এমন এক আত্মিক কুয়াশা থাকে, যেখানে মানুষ দেহের ভাঙন দেখে আত্মার সত্যকে ভুলে যায়, মাটির নিস্তব্ধতা দেখে আল্লাহর সৃষ্টিশক্তির প্রশস্ততাকে ছোট করে ফেলে। অথচ মৃত্যু তো আল্লাহর কুদরতের বিপরীত কোনো জয় নয়; মৃত্যু তো তাঁরই নির্ধারিত দরজা, যার ভেতর দিয়ে মানুষ দুনিয়ার গলিতে নয়, আখিরাতের বিস্তৃত প্রান্তরে প্রবেশ করে। যে চোখ কবরকে শেষ মনে করে, সে আসলে নিজের দেখার সীমাকেই শেষ ধরে নিয়েছে।
এই আয়াত আমাদের হৃদয়ের সামনে এক কঠিন অথচ করুণ দরজা খুলে দেয়: আমরা কি আল্লাহর ক্ষমতার সামনে নত হচ্ছি, নাকি নিজের অভ্যাসের সামনে সন্দেহকে পোষণ করছি? মানুষ যখন পুনরুত্থানের কথা শুনে থমকে যায়, তখন কুরআন তাকে জিজ্ঞেস করে না শুধু, তাকে জাগিয়ে তোলে। কারণ আখিরাতের বিশ্বাস মানে শুধু ভবিষ্যতের মানচিত্র জানা নয়; মানে আজকের জীবনকে সত্যের আলোয় দেখা, পাপকে ছোট মনে না করা, হিসাবকে বাস্তব ধরা, আর মৃত্যু নামের অতিথিকে আল্লাহর কাছে ফেরার সেতু হিসেবে চেনা। এই সূরা যেন ফিসফিস করে বলে—যে আল্লাহ মরিয়মকে সম্মানিত করেছেন, যাকারিয়াকে দোয়ার সৌন্দর্য শিখিয়েছেন, ঈসার মাধ্যমে নিদর্শন প্রকাশ করেছেন, তিনি তোমার মাটিতে মিশে যাওয়াকে চিরতরে মিশে যাওয়া বানান না; তাঁর কাছে প্রত্যাবর্তন আছে, জবাবদিহি আছে, আর অনন্ত জীবনের সত্যও আছে।
মানুষের এই প্রশ্নে কেবল কৌতূহল নেই; আছে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক বিরোধিতা, আছে নিজের নশ্বরতাকে ভুলে থাকার অভ্যাস। মৃত্যুর দিকে তাকালে মানুষ কেঁপে ওঠে, কারণ মৃত্যু তার গর্বকে নিঃশব্দ করে দেয়, তার পরিকল্পনাকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়, তার জমিয়ে রাখা সব হিসাবকে এক ঝটকায় অর্থহীন করে ফেলে। তখন সে বলে, আমি যদি মরে যাই, তবে কি সত্যিই আবার জীবিত হব? এই প্রশ্ন কুরআন আমাদের সামনে এনে বসায়, যেন আমরা নিজেরাই নিজেদের অন্তরের শব্দ শুনি। মানুষ কত সহজে জীবনকে স্থায়ী মনে করে, অথচ তার নিঃশ্বাসও ধার করা; কত সহজে দুনিয়াকে শেষ সত্য ধরে, অথচ দুনিয়া তো এক ক্ষণিকের ছায়া। সূরা মারইয়াম এই ছায়ার ভেতরেই আমাদের এমন এক আলো দেখায়, যেখানে নবীদের স্মৃতি, রহমতের স্রোত, আর কিয়ামতের দৃঢ় ডাক একসাথে মিলে হৃদয়কে জাগিয়ে তোলে।
যে আল্লাহ যাকারিয়ার শূন্য হাতেও আশা জাগিয়েছেন, মরিয়মের নিঃসঙ্গতার মধ্যে পবিত্রতা রক্ষা করেছেন, ঈসা আলাইহিস সালামের মাধ্যমে বিস্ময়ের নিদর্শন প্রকাশ করেছেন, তাঁর কাছে পুনরুত্থান কোনো দূরাশা নয়। মানুষের বিস্ময় এখানে আসলে মানুষের সীমাবদ্ধতার স্বীকারোক্তি; কিন্তু সেই স্বীকারোক্তি যদি বিনয় হয়ে না ওঠে, তবে তা অস্বীকারের চেহারা নেয়। আয়াতটি আমাদের শিখিয়ে দেয়—শেষ বিচারের দিন কোনো কবিতার উপমা নয়, কোনো নৈতিক রূপক নয়; তা সত্য, নিশ্চিত, অবশ্যম্ভাবী। তাই হৃদয়কে আজই জাগতে হয়, আমলকে আজই শুদ্ধ করতে হয়, গোপন পাপকে আজই কাঁপতে হয়। যে ব্যক্তি মৃত্যুকে শুধু এক প্রস্থান মনে করে না, বরং আল্লাহর সামনে ফিরে যাওয়ার দরজা বলে জানে, সে-ই নিজের জীবনের প্রতিটি শ্বাসকে জবাবদিহির আলোয় দেখতে শেখে।
মানুষের এই প্রশ্নে শুধু বিস্ময় নেই, আছে এক নীরব প্রতিরোধও। মৃত্যু তাকে ভয় দেখায়, কারণ মৃত্যু তার সব অধিকার, সব অহংকার, সব জমিয়ে রাখা হিসাব এক মুহূর্তে থামিয়ে দেয়। সে মনে করে, ধুলো হয়ে গেলে ফেরার পথ কোথায়? কিন্তু কুরআন এই সংশয়ের সামনে কোনো তর্কের বিজয় দেখাতে চায় না; বরং হৃদয়কে কাঁপিয়ে বলে, তোমার নিজের জন্মও কি তোমার হাতে ছিল? যে সত্তা তোমাকে শূন্যতা থেকে অস্তিত্ব দিয়েছেন, তাঁর কাছে পুনরুত্থান কি কঠিন? এই প্রশ্নের জবাব আকাশে নয়, মাটির নীরবতায়ও লেখা আছে; বীজ ফেটে অঙ্কুর হয়, শুকনো জমিনে সবুজ জেগে ওঠে, আর মানুষ তবু অবাক হয়ে বলে—মৃতের পরে জীবন? যেন সে নিজের চারপাশে আল্লাহর নিদর্শন দেখেও দেখছে না।
সূরা মারইয়ামের কোমল অথচ অগ্নিসদৃশ সুরে এই আয়াত আমাদের তওবার কাছে নিয়ে আসে। এখানে ঈসা, যাকারিয়া, মরিয়ম আলাইহিমুস সালাম—সব স্মৃতি একসাথে হৃদয়কে জানিয়ে দেয়, রহমত মানে কেবল দুনিয়ার স্বস্তি নয়; রহমত মানে এমন এক সত্য, যা মানুষকে তার শেষ ঠিকানার জন্য জাগিয়ে তোলে। আজ যে জীবনকে চূড়ান্ত মনে করে, কাল সে কবরের নীরবতা ভেদ করে উঠবে—এই ঘোষণা কোনো কল্পকাহিনি নয়, বরং আল্লাহর চূড়ান্ত প্রতিশ্রুতি। তাই এই আয়াত পড়ে যদি বুক ভারী না হয়, তবে বুঝতে হবে হৃদয় এখনও অনেক দূরে। আমরা যেন এমন মানুষ না হই, যে মৃত্যুকে দেখে ভয় পায়, কিন্তু মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য প্রস্তুত হয় না; বরং এমন বান্দা হই, যে এখনই মাথা নত করে, এখনই ক্ষমা চায়, এখনই আখিরাতের জন্য সত্যিকার জীবন শুরু করে।