সূরা মারইয়ামের স্নিগ্ধ, করুণাময় প্রবাহের ভেতর এই আয়াতটি হঠাৎই এক বজ্রঘাতের মতো নেমে আসে। যে সূরায় যাকারিয়ার মোনাজাত, মারইয়ামের পবিত্রতা, ঈসা আলাইহিস সালামের অলৌকিক জন্ম আর নবীদের স্মৃতি হৃদয়কে নরম করে, সেই একই সূরায় আল্লাহ তাআলা এখন আখিরাতের এক ভয়াবহ দৃশ্য তুলে ধরেন: কসম করে তিনি ঘোষণা করছেন, মানুষকে তাদের শয়তান-সঙ্গীদেরসহ একত্র করা হবে, তারপর জাহান্নামের চারপাশে নতজানু অবস্থায় হাজির করা হবে। এখানে শুধু শাস্তির সংবাদ নেই, আছে সম্পর্কের হিসাবও। মানুষ কোন সঙ্গ বেছে নিয়েছিল, কার কণ্ঠে সে নিজের বিবেককে চুপ করিয়েছিল, কার পেছনে হেঁটে সে সত্য থেকে দূরে সরে গিয়েছিল—এই আয়াত সেই সব নীরব কিন্তু বিপজ্জনক সঙ্গতিকে উন্মোচিত করে।

আয়াতের ভাষা অত্যন্ত কঠিন, কিন্তু এর কঠোরতা আসলে রহমতেরই আরেক রূপ। কারণ আল্লাহ আগে থেকেই সতর্ক করে দেন, যাতে মানুষ ফিরে আসতে পারে। শয়তান শুধু এক অদৃশ্য শত্রু নয়; সে মানুষের ভেতরকার লোভ, অহংকার, বিলম্ব, নাফরমানি, আর গোনাহকে সুন্দর দেখানোর নিরব প্ররোচনা। যে তাকে অনুসরণ করে, সে একা পড়ে না; সে নিজের সিদ্ধান্তকে এক ভয়ংকর দলে লিখে ফেলে। তাই এখানে জাহান্নামের সামনে সমাবেশ মানে কেবল দেহের উপস্থিতি নয়, বরং অন্তরের পরাজয়ও। নতজানু হয়ে দাঁড়ানো সেই মুহূর্তে মানুষের সমস্ত দাবী, অহংকার, অজুহাত, আর দুনিয়াবি ঔদ্ধত্যের মুখোশ খুলে যাবে।

এই সূরার বৃহৎ প্রবাহে এ আয়াতের জায়গা খুব অর্থবহ। এখানে কোনো নির্দিষ্ট, নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত কারণ-নুযূলের কথা না বললেও বোঝা যায়, মক্কার সেই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এটি নাজিল হয়েছে, যেখানে অস্বীকার, তামাশা, এবং আখিরাতকে দূরে ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা ছিল প্রবল। সূরা মারইয়াম নবীদের দয়ার ইতিহাস শোনায়, যাতে মানুষ আল্লাহর নৈকট্যের স্বাদ পায়; আর এই আয়াত সেই স্বাদের পাশে তিক্ত সত্যটি রাখে—শেষ পরিণতি অবহেলার নয়, জবাবদিহির। যে আল্লাহ যাকারিয়ার ভাঙা আশা থেকে সন্তান দান করেন, মারইয়ামের নিঃসঙ্গতায় আশ্রয় দেন, ঈসা আলাইহিস সালামকে নিদর্শন বানান, তিনিই আবার ঘোষণা করেন: কেউ শয়তানের সহচর হয়ে পালাতে পারবে না। শেষ দিন আসবে, আর মানুষকে দাঁড় করানো হবে তাদের নিজের পথের সামনে—যে পথ তারা আজ বেছে নিচ্ছে।

এই আয়াতে সবচেয়ে কাঁপিয়ে দেওয়া বাক্যটি হলো, “আপনার পালনকর্তার কসম।” আল্লাহ যখন নিজের রবুবিয়তের কসমে কথা বলেন, তখন তা কোনো সাধারণ সতর্কবার্তা থাকে না; তা হয়ে ওঠে অস্বীকারের সব দরজা বন্ধ করে দেওয়া এক চূড়ান্ত ঘোষণা। এখানে মানুষের ইতিহাসের ভেতর লুকিয়ে থাকা সব ভ্রান্ত সঙ্গ, সব অন্ধ অনুকরণ, সব নীরব সায় এক মুহূর্তে উন্মোচিত হয়ে যায়। যে শয়তানকে মানুষ কেবল গল্পের নাম ভেবেছিল, যে প্ররোচনাকে সামান্য দুর্বলতা মনে করেছিল, যে গোনাহকে বারবার “পরে তওবা করব” বলে পিছিয়ে দিয়েছিল, সেই সবকিছু একদিন মানুষকে নতজানু করে দাঁড় করাবে। দুনিয়ায় যাদের পেছনে আমরা হাঁটতাম, আখিরাতে তাদের পরিণতি থেকে আমরা পালাতে পারব না; কারণ সঙ্গও একধরনের সাক্ষ্য হয়ে যায়।

“জাহান্নামের চারপাশে নতজানু অবস্থায়” — এই দৃশ্য শুধু শাস্তির দৃশ্য নয়, এটি আত্মাভিমানের পতনের চূড়ান্ত মুহূর্ত। যে মানুষ দুনিয়ায় বুক ফুলিয়ে চলেছিল, সত্যের সামনে মাথা নত করতে শেখেনি, আল্লাহর আয়াতকে হালকা ভেবেছিল, সে সেখানে নিজের অসহায়তা নিয়ে উপস্থিত হবে। নতজানু হওয়া এখানে শারীরিক ভঙ্গি মাত্র নয়, বরং অহংকারের মৃত্যুঘণ্টা। তখন আর কেউ নিজের যুক্তি, পদমর্যাদা, অনুসারী, সম্পদ, বা প্রভাব নিয়ে দাঁড়াতে পারবে না। যেটি বাকি থাকবে, তা হলো খালি হাত, খালি অন্তর, আর অপরাধের ভারে নুয়ে পড়া আত্মা। এই আয়াত আমাদের আজই প্রশ্ন করে: আমি কি এমন কোনো সঙ্গ বেছে নিচ্ছি, যে আমাকে আল্লাহর দিকে নেয়, নাকি এমন কারো কাছে নিজেকে সঁপে দিচ্ছি, যে হাসিমুখে আমাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে? শয়তানের সবচেয়ে বড় জয় হলো, সে মানুষকে বোঝাতে পারে যে সে একা নয়; অথচ আখিরাতে দেখা যাবে, সেই সঙ্গই ছিল তার সর্বনাশের শুরু।
এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে মানুষের সব বাহানা নিঃশব্দ হয়ে যায়। দুনিয়ায় যে নিজেকে স্বাধীন ভেবেছিল, নিজের খেয়ালকে নীতি বানিয়েছিল, প্রবৃত্তির ইশারাকে আলোর মতো গ্রহণ করেছিল, আখিরাতে সে বুঝবে—সে একা যায়নি; সে সঙ্গে করে নিয়েছিল তার শয়তান-সঙ্গকে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে এবং শয়তানদেরকে একত্র করার ঘোষণা দিচ্ছেন, যেন প্রকাশ পায় কারা কারা সত্যের ডাক শুনেও প্রতারণার পথে হেঁটেছে। এ শুধু ব্যক্তিগত পাপের বিচার নয়, এটি সঙ্গ, প্রভাব, আনুগত্য, এবং অন্তরের দুর্বলতারও হিসাব। কে কাকে অনুসরণ করেছিল, কে কাকে নিজের হৃদয়ে জায়গা দিয়েছিল, কে কাকে নিয়ে সত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল—সবকিছু সেখানে উন্মোচিত হবে।

আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, এই দৃশ্য সমাজেরও আয়না। যখন সত্যের বদলে ভোগ, সততার বদলে সুবিধা, আল্লাহভীতির বদলে লোক-দেখানো চালচলন সমাজের মানদণ্ড হয়ে ওঠে, তখন শয়তানের কাজ সহজ হয়ে যায়। সে কখনো সরাসরি ডাকে না, বরং ধীরে ধীরে মানুষকে নত করায়—গোনাহের সামনে, অহংকারের সামনে, অবজ্ঞার সামনে। আর একদিন তারা সবাই নতজানু অবস্থায় জাহান্নামের চারপাশে দাঁড়াবে—যে নত হওয়া ইবাদতের ছিল না, ভয় ও অপমানের ছিল। আজ যে মাথা অহংকারে উঁচু করে, সেদিন সেই মাথাই কাঁপবে। তাই এই আয়াত আমাদের ভেতরকার দরজা বন্ধ করতে শেখায়: কার সঙ্গ আমাদের অন্তরকে নরম করছে, আর কার সঙ্গ আমাদের আল্লাহ থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে—এই প্রশ্নের জবাব আজই দিতে হয়।

যে তাকে অনুসরণ করে, সে শেষ পর্যন্ত একাকী নয়—তার সঙ্গেই দাঁড়িয়ে যাবে সেই প্রতারণার প্রকৃত মুখ, যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল কিন্তু রক্ষা করেনি, যে আনন্দের নাম দিয়ে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। এই আয়াত আমাদের শেখায়, দুনিয়ায় সঙ্গীর পরিচয় দিয়ে শেষ বিচার নির্ধারিত হয় না; সেখানে প্রতিটি আত্মা তার নিজের নির্বাচন নিয়ে উপস্থিত হবে। কাকে ভালোবেসেছি, কাকে মান্য করেছি, কাদের ইশারায় গুনাহকে সহজ মনে করেছি—সেইসব গোপন অভ্যাসও একদিন প্রকাশ্য হয়ে যাবে। জাহান্নামের চারপাশে নতজানু অবস্থা কেবল শরীরের ভঙ্গি নয়; তা হবে অহংকারের মৃত্যু, অস্বীকারের ভাঙন, আর বহুদিনের মিথ্যার সামনে চূড়ান্ত অসহায়তা।

তবু এই ভয়ের বাণীকে নিরাশার শেষ কথা ভাবা যাবে না। কোরআন মানুষকে ভাঙতে চায় না, জাগাতে চায়। সূরা মারইয়ামে রহমতের ধারাবাহিকতা আমাদের বুঝিয়ে দেয়—আল্লাহর রাস্তা এখনও খোলা, চোখের জল এখনও মূল্যবান, প্রত্যাবর্তন এখনও সম্ভব। আজ যদি কেউ নিজের অন্তরকে দেখে কেঁপে ওঠে, যদি কেউ উপলব্ধি করে যে তার কিছু সঙ্গ তাকে আল্লাহর কথা ভুলিয়ে দিয়েছে, তবে এটাই জাগরণের মুহূর্ত। শয়তানের ডাকে নয়, রবের ডাকে সাড়া দেওয়ার দিন আজই। কারণ কাল যখন সবাইকে নতজানু করে দাঁড় করানো হবে, তখন সবচেয়ে বড় ধন হবে সেই হৃদয়, যে দুনিয়াতেই নত হয়েছিল, কিন্তু জাহান্নামের সামনে নয়; সিজদায়, অশ্রুতে, তাওবায়, তার পালনকর্তার সামনে।