আল্লাহ তাআলা এখানে যেন কিয়ামতের দরজায় দাঁড়িয়ে মানুষের কানে এক গভীর আহ্বান পৌঁছে দিচ্ছেন: তাদেরকে সেই পরিতাপের দিনের ব্যাপারে সতর্ক করে দিন। সেদিন আর সুযোগের বাজার খোলা থাকবে না, আর বিলম্বের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকারও জায়গা থাকবে না। যখন সব বিষয় চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়ে যাবে, যখন ফয়সালা হয়ে যাবে—তখন মানুষের ভেতরের গাফিলতা হঠাৎ করে ভয়াবহ সত্যে রূপ নেবে। আজ যে হৃদয় অবহেলায় নরম, কাল সে হৃদয় হাহাকারে পুড়বে। আজ যে মানুষ ঈমানকে পিছিয়ে দেয়, কাল তার সামনে বুঝে ফেলার আর কোনো উপায় থাকবে না।

এই আয়াতের ভাষায় ‘حَسْرَة’—পরিতাপ, এমন এক অনুভূতি যা কেবল দুঃখ নয়; তা হলো হারিয়ে ফেলার অসহ্য জ্বালা, এমন এক আফসোস যা আর কখনো ফেরত আসে না। দুনিয়ায় মানুষ কত কিছুর জন্য আফসোস করে, কিন্তু আখিরাতের আফসোস হবে ভিন্ন রকম—সেখানে আফসোস হবে সত্যকে চিনেও গ্রহণ না করার জন্য, ডাকে সাড়া না দেওয়ার জন্য, আল্লাহর সতর্কবাণীকে হালকা মনে করার জন্য। আর এই আয়াতের পরই যে অবস্থা উল্লেখ করা হয়েছে—মানুষ এখন গাফিল, এখন বিশ্বাস করছে না—সেটাই যেন পরিতাপের মূল বীজ। গাফিলতি কখনোই নিরীহ নয়; তা ধীরে ধীরে হৃদয়কে পাথর বানায়, আর ঈমানের আলোকে ঢেকে দেয়।

সূরা মারইয়ামের বৃহত্তর সুরও এ কথাই মনে করিয়ে দেয়—যাকারিয়ার দোয়া, মারইয়ামের পবিত্রতা, ঈসা আলাইহিস সালামের নিদর্শন, নবীদের স্মৃতি—সবকিছুর ভেতর দিয়ে আল্লাহ বান্দাকে রহমত, কুদরত ও আখিরাতের দিকে ফেরান। এই সূরায় নবীদের কাহিনি কেবল ইতিহাস নয়; তা মানুষের হৃদয়ে জীবন্ত হুশিয়ারি। কারণ একই আল্লাহ যিনি দোয়া কবুল করেন, সন্তানের সুসংবাদ দেন, মায়াময় রহমত নাযিল করেন—তিনিই আবার শেষ দিনের ফয়সালা ঘোষণা করবেন। তাই এই আয়াত আমাদের শেখায়: ঈমানকে আজই জাগাতে হবে, তাওবা আজই করতে হবে, কারণ পরে যখন পরিতাপের দিন এসে যাবে, তখন গাফিল চোখ শুধু দেখবে—কিন্তু ফিরে যাওয়ার পথ আর থাকবে না।

আল্লাহ এখানে যেন গাফিল মানুষের সামনে এক অদৃশ্য দরজা খুলে দিচ্ছেন—সেই দরজা, যার অপর পাশে আর কোনো অবকাশ নেই, শুধু চূড়ান্ত সত্য। পরিতাপের দিন; যখন সব ফয়সালা হয়ে যাবে, যখন আর ফিরিয়ে আনার মতো কোনো মুহূর্ত অবশিষ্ট থাকবে না, যখন মানুষ বুঝবে—যা উপেক্ষা করেছি, তা-ই ছিল আসল জীবন; আর যার পিছনে ছুটেছি, তা ছিল ছায়ার মতো ক্ষণস্থায়ী। এই সতর্কবাণী ভয় দেখানোর জন্য নয়, বরং হৃদয়কে জাগানোর জন্য। কারণ গাফিলতির ঘুম সবচেয়ে বিপজ্জনক হয় তখনই, যখন মানুষ মনে করে তার হাতে এখনো অনেক সময় আছে।

আজ যে অন্তর ঈমানকে পিছিয়ে দেয়, কিয়ামতের সেই দিনে তার সামনে শুধু আফসোসের দরজা খুলবে। ‘حَسْرَة’—এই শব্দের ভেতরে আছে ভাঙা হৃদয়ের দীর্ঘশ্বাস, হারিয়ে ফেলার জ্বালা, আর ফিরে পাওয়ার অসম্ভব বেদনা। দুনিয়ায় আফসোস অনেক কিছুর হয়; কিন্তু আখিরাতের পরিতাপ হবে এমন এক আগুন, যা মানুষকে তার নিজের অবহেলা, অস্বীকার, এবং টালবাহানার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে। তখন বোঝা যাবে, ঈমান কোনো বিলাসিতা ছিল না; তা ছিল বাঁচার নৌকা, আর আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়া ছিল মুক্তির প্রথম শ্বাস।
সূরা মারইয়ামের এই আয়াত তাই আমাদের কানে কেবল এক ভয়ংকর ভবিষ্যৎ নয়, এক কোমল রহমতের ডাকও পৌঁছে দেয়। আল্লাহ আগে থেকেই সতর্ক করেন, যাতে বান্দা শেষ মুহূর্তে ধ্বংসের স্বাদ না পায়। যারা এখনো অনবধানতায় ডুবে আছে, তাদের জন্য এ আয়াত এক জাগরণের ঘণ্টা; আর যারা বিশ্বাস স্থাপন করছে না, তাদের জন্য এক নীরব তিরস্কার—কেন এত স্পষ্ট আহ্বান শুনেও হৃদয় নরম হয় না? আখিরাতের হিসাব অস্বীকার করে কেউ নিরাপদ হতে পারে না; বরং যে আজ জেগে উঠবে, সে-ই কাল সেই পরিতাপের আগুন থেকে বাঁচবে।

আল্লাহ তাআলা এখানে মানুষের সামনে এমন এক দিনের ছবি তুলে ধরেন, যেদিন সব হিসাবের বই বন্ধ হয়ে যাবে, সব অজুহাত নিঃশেষ হবে, আর সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের অন্তর কেঁপে উঠবে। এটি শুধু ভবিষ্যতের কোনো সংবাদ নয়; এটি গাফিল হৃদয়ের ওপর নেমে আসা এক জাগরণধ্বনি। আজ যে মানুষ সময়কে নিজের হাতে মনে করে, কাল সে বুঝবে সময় কখনো তার ছিল না; আজ যে মানুষ ঈমানকে পরে ভাবছে, কাল সে দেখবে পরের জন্য আর কোনো দরজা খোলা নেই। ‘পরিতাপের দিন’—এই শব্দে কেবল দুঃখ নেই, আছে এমন এক অসহ্য বেদনা, যখন মানুষ বুঝবে, সে হারিয়েছে এমন এক সম্পদ, যা আর ফেরানো যাবে না: আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়ার সুযোগ।

মানুষের সমাজেও এই আয়াতের ছায়া গভীর। চারদিকে ব্যস্ততা, কথার জটলা, ভোগের টান, আত্মতুষ্টির নরম বিছানা—এসবের মধ্যে অন্তর ধীরে ধীরে আখিরাতের স্মৃতি হারিয়ে ফেলে। তখন গুনাহ আর ভয়ংকর লাগে না, মৃত্যু আর নীরবভাবে টানে না, হিসাবের কথা আর হৃদয়কে কাঁপায় না। কুরআন এই গাফিলতাকে ভাঙতে চায়, কারণ গাফিলতি শুধু স্মৃতির দুর্বলতা নয়; তা আত্মার ঘুম, যা মানুষকে সত্যের সামনে অন্ধ করে দেয়। আর অবিশ্বাসের ভেতর এই ঘুম আরো ঘনীভূত হয়, যতক্ষণ না বাস্তবতা এসে দরজায় কড়া নাড়ে—তখন আর বিশ্বাসের সময় থাকে না, থাকে কেবল আফসোস।

এই আয়াত তাই ভয় দেখানোর জন্য নয়, বরং জাগানোর জন্য। আল্লাহ আমাদেরকে এমন এক পরিণতির কথা জানান, যাতে আমরা আজই নিজেকে প্রশ্ন করি: আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, এবং কোন দিনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছি? যে হৃদয় আজ নরম হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, সে-ই কাল আশ্রয় পাবে রহমতের ছায়ায়; আর যে হৃদয় আজও অবহেলায় হারিয়ে আছে, তার জন্য সত্যের প্রতিধ্বনি একদিন হয়ে উঠবে আগুনের মতো তীব্র। তাই মুমিনের জীবন মানে কেবল আশা নয়, কেবল ভয়ও নয়; বরং আশা ও ভয়ের মাঝখানে জেগে থাকা, নিজের আমলকে বারবার যাচাই করা, এবং আখিরাতের জন্য এমন প্রস্তুতি নেওয়া—যেন হঠাৎ সেই দিন এসে না বলে, ‘তুমি প্রস্তুত ছিলে না।’

আজকের গাফিলতাই যদি কালকের হাহাকারের বীজ হয়, তবে মানুষের এ জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতারণা আর কী? এই আয়াত আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয় সেই নির্জন প্রান্তরে, যেখানে সব আপত্তি নীরব, সব অজুহাত ভেঙে পড়ে, আর সত্যের সামনে শুধু এক নির্মম হিসাব থাকে। দুনিয়ায় আমরা যে সময়কে এত সহজে উড়িয়ে দিই, যে মৃত্যুকে এত দূরে ভাবি, যে আখিরাতকে এত অস্পষ্ট করে রাখি—সেদিন সেই সব অবহেলা একত্র হয়ে পরিতাপের আগুন জ্বালাবে। তখন মানুষ বুঝবে, ঈমানকে পরে রাখার অর্থ ছিল নিজের হাতেই নিজের ক্ষতি লেখা।

কুরআন যখন হুশিয়ার করে, তখন তা ভয় দেখানোর জন্য নয়; বরং আমাদের জাগিয়ে তোলার জন্য। আল্লাহ আমাদের গাফিলির মধ্যে হারিয়ে যেতে দেন না, বরং স্মরণের দোরগোড়ায় আবার ফিরিয়ে আনেন। তাই এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে মুমিনের হৃদয় কেঁপে ওঠে, কারণ সে জানে—আজ তওবার দরজা খোলা, আজ ইমানের পথে ফিরে আসার সময় আছে, আজ কাঁদার চোখকে আল্লাহ গ্রহণ করেন। কিন্তু যদি আজও আমরা নির্লিপ্ত থাকি, যদি আজও অন্তর ভেজে না, তাহলে সেই ‘حَسْرَة’-র দিন একদিন এসে আমাদেরই নাম ধরে ডাকবে। হে আল্লাহ, আমাদের গাফিলদের কাতার থেকে তুলে নাও, আমাদের হৃদয়কে আখিরাতের জন্য জাগিয়ে দাও, আর আমাদের এমন ঈমান দান করো যা পরিতাপের আগে তাওবার পথে ফিরিয়ে আনে।