সূরা মারইয়ামের এই আয়াতে কিয়ামতের এক ভয়ংকর কিন্তু সত্য-উদ্বোধক দৃশ্য আমাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। সেদিন মানুষ আল্লাহর সামনে ফিরে দাঁড়াবে; তখন শোনা ও দেখার ক্ষমতা আর আজকের মতো অস্পষ্ট, ঢিলেঢালা, অবহেলিত থাকবে না। সত্য যেন হঠাৎই তার সমস্ত পর্দা সরিয়ে নিয়ে তাদের হৃদয়ের সামনে দাঁড়িয়ে যাবে। যা আজ মানুষ অস্বীকার করে, ঠাট্টা করে, অথবা দূরে ঠেলে রাখে—সেদিন তা এমন স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, অস্বীকারের আর কোনো অবকাশ থাকবে না। এই আয়াত যেন আমাদের কানে কানে বলে: আখিরাত দূরের কোনো ধারণা নয়, বরং এমন এক আগমন, যেখানে মানুষের ভেতরের সমস্ত ভুল ধারণা ভেঙে যাবে।

কিন্তু আয়াতের সবচেয়ে কাঁপিয়ে দেওয়া বাক্যটি হলো—আজ জালেমরা প্রকাশ্য বিভ্রান্তিতে রয়েছে। অর্থাৎ, সত্যের সামনে দাঁড়ানোর আগেই তারা পথ হারিয়েছে; আর এই পথহারানো কেবল চিন্তার ভুল নয়, এটি আত্মার অন্ধকার, হৃদয়ের জেদ, এবং ন্যায়কে অস্বীকার করার পরিণতি। জুলুম এখানে শুধু কারও ওপর বাহ্যিক অন্যায় নয়; বরং আল্লাহর স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, নবীদের আহ্বানকে অবহেলা করা, নিজের নফসকে সত্যের ঊর্ধ্বে বসানো—এসবও এর ভেতরেই পড়ে। আজ যে মানুষ নিজেকে নিরাপদ ভাবে, সে-ই হয়তো বিভ্রান্তির সবচেয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন; আর কিয়ামতের দিন সে টের পাবে, তার চোখ তখন খুলেছে বটে, কিন্তু সেই খোলা চোখের সামনে আর ফেরার রাস্তা নেই।

সূরা মারইয়ামের সামগ্রিক ধারায় যাকারিয়া আলাইহিস সালামের দোয়া, মারইয়ামের পবিত্রতা, ঈসা আলাইহিস সালামের অলৌকিক জন্ম, এবং নবীদের স্মৃতিময় বয়ান—সবকিছুই আল্লাহর রহমত ও ক্ষমতার দিকে মানুষকে ফিরিয়ে আনে। এই আয়াত সেই ধারারই হৃদয়বিদারক সমাপ্তি-আহ্বান: দুনিয়ার শব্দে বধির থেকো না, কারণ একদিন এমন শোনা আসবে যখন অস্বীকারের সব দেয়াল ভেঙে পড়বে; দুনিয়ার গাফিল চোখে ঘুমিয়ে থেকো না, কারণ একদিন এমন দেখা আসবে যখন সত্য আর পর্দার আড়ালে থাকবে না। নির্ভরযোগ্যভাবে কোনো নির্দিষ্ট কারণ-নাযিল এখানে স্থির নয়; তবে কুরআনের বৃহত্তর প্রসঙ্গে এই সতর্কবাণী সব যুগের মানুষের জন্য—যে জালিম, যে অবহেলাকারী, যে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকে পিছিয়ে দেয়, সে আজই বিভ্রান্তির মধ্যে আছে, যদিও সে তা বুঝতে চায় না।

আল্লাহর দরবারে পৌঁছানোর দিনটি এমন নয় যে সেখানে মানুষ অন্ধ থাকবে আর সত্য আড়াল হয়ে থাকবে। বরং সেদিন শ্রবণ ও দৃষ্টি এমন তীব্র হয়ে উঠবে যে, যা আজ অন্তর বুঝতে চায় না, তা তখন অস্তিত্বের ভেতর দিয়ে অনুভূত হবে। আজ মানুষের কান বহু সত্য শুনেও বন্ধ হয়ে থাকে, চোখ বহু নিদর্শন দেখেও অসাড় থাকে; কিন্তু যখন প্রত্যাবর্তনের সেই অনিবার্য মুহূর্ত এসে দাঁড়াবে, তখন সবকিছু নিজের প্রকৃত রূপে উন্মোচিত হবে। তখন নবীদের আহ্বান, আল্লাহর আয়াত, জীবনের প্রতিটি অবহেলিত সতর্কবার্তা—সবই এমন স্পষ্ট হবে যে অস্বীকারের শেষ অবলম্বনটুকুও ছাই হয়ে যাবে।

আয়াতের এ অংশ হৃদয়কে কাঁপিয়ে দেয়, কারণ এটি আমাদের আজের অবস্থাকে উল্টে দেখায়। এখন যারা জুলুম করে, তারা মনে করে তাদের পথই যেন পরিষ্কার, তাদের যুক্তিই যেন শক্ত, তাদের গাফলতিই যেন স্বাভাবিক। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার মুখোশের নিচেই আছে প্রকাশ্য বিভ্রান্তি। জুলুম কেবল মানুষের ওপর অন্যায় নয়; তা হলো সত্যকে চেপে ধরা, আল্লাহর সামনে বিনয়ী না হওয়া, নিজের নফসকে হক-এর চেয়ে বড় মনে করা। আর এমন বিভ্রান্তি যতক্ষণ দুনিয়ায় থাকে, ততক্ষণ তা অনেক সময় মানুষ নিজেই টের পায় না; কিন্তু আখিরাতের আলোয় সেই অন্ধকার আর গোপন থাকে না। তখন মানুষ বুঝবে—সেদিনের শোনা-দেখা আসলে নতুন উপলব্ধি নয়, বরং আজ যে হৃদয় জাগ্রত হয়নি, তারই চূড়ান্ত উন্মোচন।
কিয়ামতের সেই দিন শুধু হিসাবের দিন নয়, তা হলো সত্যের এমন এক উন্মোচন, যেখানে মানুষের শ্রবণ ও দৃষ্টির সমস্ত পর্দা খুলে যাবে। আজ যে হৃদয় কানে শুনেও শোনে না, চোখে দেখেও দেখে না, সেদিন তার উপলব্ধি হবে নিখুঁত, তীক্ষ্ণ, নির্দয়ভাবে স্পষ্ট। যে আল্লাহকে এড়িয়ে চলে, যে ন্যায়কে চেপে ধরে, যে নিজের ভেতরের জুলুমকে নাম দেয় বুদ্ধি বা স্বাধীনতা—সে আজই আসলে অন্ধকারে হাঁটছে। আয়াতটি যেন আমাদের থামিয়ে দেয় এবং বলে: সময় এখনই; কারণ ‘আল-ইয়াওম’-এর গাফিলতি একদিন চিরস্থায়ী আফসোসে পরিণত হতে পারে।

এখানে জুলুম শুধু অন্যের হক নষ্ট করা নয়; এটি সত্যকে জেনে-শুনে অস্বীকার করা, কৃতজ্ঞতার বদলে অহংকার বেছে নেওয়া, আল্লাহর ডাকে সাড়া না দিয়ে নিজের নফসের গোলাম হয়ে যাওয়া। সমাজ যখন এমন জুলুমকে স্বাভাবিক মনে করে, তখন তার চোখে ধুলো পড়ে না—তার বিবেকই মরে যায়। আর যে জাতি, যে পরিবার, যে ব্যক্তি তাওবার দরজা থাকা সত্ত্বেও ফিরে আসে না, সে ধীরে ধীরে বিভ্রান্তিকে নিজের পরিচয় বানিয়ে ফেলে। কিন্তু এই আয়াতের ভেতরে আশার আলোও আছে: আজ যদি আমরা নিজেকে কঠোরভাবে জিজ্ঞেস করি, আমি কি সত্যিই শুনছি? আমি কি সত্যিই দেখছি? তাহলে আল্লাহর রহমতে জাগরণের পথ এখনও খোলা।

আখিরাতের সামনে দাঁড়ালে মানুষের সব মুখোশ খুলে যাবে; কেবল আমল, ঈমান, এবং অন্তরের সততা কথা বলবে। সেদিন সত্য এতটা কাছাকাছি হবে যে, অস্বীকারকারীও অস্বস্তিতে সত্যকে চিনে ফেলবে; আর মুমিনের জন্য সেই দিন হবে আশ্বাসের, কারণ সে জানবে—দুনিয়ার কষ্ট, ধৈর্য, একাকীত্ব, আর অদৃশ্যভাবে বয়ে আনা আনুগত্য বৃথা যায়নি। তাই এই আয়াত আমাদের হৃদয়ে ভয় জাগায়, আবার ভরসাও জাগায়: ভয়, কারণ জুলুমের পরিণতি কঠিন; ভরসা, কারণ যারা ফিরে আসে তাদের জন্য রাহমতের দরজা বন্ধ নয়। এখনই ফিরে আসতে হবে, কারণ মৃত্যুর পরে উপলব্ধি আসে; কিন্তু তাতে আর তাওবার সুযোগ থাকে না।

যেদিন মানুষ আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে, সেদিন তার ভেতরের সমস্ত আবরণ খুলে যাবে। আজ যে সত্যকে কুয়াশা মনে হয়, সেদিন তা হয়ে উঠবে সূর্যের মতো তীব্র; আজ যে কথাকে অসম্ভব বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়, সেদিন তা হবে হৃদয়ের সামনে দাঁড়ানো অনিবার্য বাস্তবতা। এই আয়াত আমাদের কানে আঘাত করে—এখনই সময়, যখন শোনা উচিত, দেখা উচিত, বুঝে নেওয়া উচিত; কারণ আখিরাতে এসে উপলব্ধির দরজা খোলা থাকবে, কিন্তু ফিরে আসার দরজা বন্ধ হয়ে যাবে।

কিন্তু আজ জালেমরা প্রকাশ্য বিভ্রান্তিতে রয়েছে। এই জুলুম শুধু মানুষের ওপর অত্যাচার নয়; এটি হলো সত্যকে চাপা দেওয়া, নিজের নফসকে কেন্দ্র বানানো, আল্লাহর ডাকে সাড়া না দেওয়া, এবং আসমানি আলো সামনে থাকা সত্ত্বেও অন্ধকারকে বেছে নেওয়া। কুরআন যেন আমাদের থামিয়ে বলে—বিভ্রান্তি কখনো হঠাৎ নেমে আসে না; তা আসে অবহেলা, অহংকার, আর তওবার দেরি থেকে। যাকে আজ সহজ বলে মনে হয়, কাল তা-ই হয় সবচেয়ে ভারী বোঝা।

সূরা মারইয়ামের নবীস্মৃতিময় এই সুর আমাদের শিখায়, রহমতও সত্য, আখিরাতও সত্য। যাকারিয়ার আশা, মারইয়ামের পবিত্রতা, ঈসা আলাইহিস সালামের নিদর্শন—সবই একদিকে আল্লাহর দয়া, আরেকদিকে তাঁর জবাবদিহির ঘোষণা। তাই আজ যদি অন্তর একটু নরম হয়, তাহলে তা অপচয় করা উচিত নয়। আজ যদি চোখে অশ্রু আসে, তাহলে তা ফিরিয়ে দেওয়া উচিত নয়। আজ যদি মনে হয় আমি পথ হারিয়েছি, তবে সেটাই সম্ভবত হেদায়াতের দরজা। কারণ আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর দিন অনেক কিছুই স্পষ্ট হবে; কিন্তু মুমিনের সৌভাগ্য এই যে, সে আজই স্পষ্ট হয়ে যেতে চায়—তার রবের দিকে, তার তাওবার দিকে, তার বিনয় আর মুক্তির দিকে।