মানুষ যখন সত্যের সামনে নত হওয়ার বদলে তাকে খণ্ড খণ্ড করে নিজের পছন্দমতো ব্যাখ্যার দেওয়াল তোলে, তখন কেবল মতভেদই জন্ম নেয় না—হৃদয়ের ভিতরেও নেমে আসে অন্ধকার। এই আয়াতে বলা হয়েছে, তাদের মধ্যে দলগুলো বিভিন্ন পথে বিভক্ত হয়ে গেল। কাকে নিয়ে এই বিভাজন? ঈসা (আ.)-কে ঘিরে মানুষের একাংশ তাঁকে সত্য নবী হিসেবে মানল, আরেকাংশ তাঁকে অস্বীকার করল, আবার কারও বিশ্বাস সত্যের সীমা ছাড়িয়ে বিভ্রান্তির দিকে গেল। কুরআন এখানে বিতর্কের বিস্তারিত ইতিহাস টেনে আনে না; বরং একটি গভীর বাস্তবতা দেখায়—যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা নিদর্শনকে মানুষ হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করে না, তখন সত্য এক থাকে, কিন্তু মানুষ অসংখ্য পথে ছড়িয়ে পড়ে। মারইয়াম, ঈসা, যাকারিয়া—এই সূরার স্মৃতিগুলো আমাদের সামনে রহমতের দরজা খুলে দেয়; আর এই আয়াত সেই দরজার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে সতর্ক করে, সত্যকে ছিন্নভিন্ন করলে পরিণতি কত নির্মম হতে পারে।
এখানে একটি ঐতিহাসিক ও সামাজিক বাস্তবতার ইঙ্গিতও আছে: নবীদের সম্পর্কে মানুষ যতবারই গোঁড়া পক্ষপাত, অতিরঞ্জন বা অস্বীকৃতির মধ্যে পড়েছে, ততবারই তারা সত্যের সোজা পথ থেকে সরে গেছে। বিশেষ কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা এখানে নির্ভরযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত না হলেও, আয়াতটি গোটা সেই পরিস্থিতির প্রতি ইশারা করে যেখানে ঈসা (আ.)-এর বিষয়কে কেন্দ্র করে মতভেদ তীব্র হয়েছিল এবং মানুষ দলাদলিতে জড়িয়ে পড়েছিল। কুরআনের ভাষা এখানে শান্ত, কিন্তু তাতে আঘাত আছে; কারণ বিভক্তি শুধু বৌদ্ধিক ভুল নয়, তা আত্মারও ক্ষতি। যে হৃদয় আল্লাহর রাসূলদের স্মরণে নম্র হতে শেখে না, সে শেষ পর্যন্ত নিজেই নিজের পক্ষে বিপরীত সাক্ষী হয়ে দাঁড়ায়।
তাই আয়াতের শেষ বাক্যটি যেন বজ্রের মতো নেমে আসে: মহাদিবসের ময়দানে কাফিরদের জন্য দুর্ভোগ। ‘মহাদিবস’ কেবল সময়ের পরিমাপ নয়, তা প্রকাশের দিন—যেদিন গোপন মতলব প্রকাশ পাবে, ভাঙা বিশ্বাসের হিসাব সামনে এসে দাঁড়াবে, আর মানুষ তার নিজের অবস্থান দেখবে আল্লাহর সামনে। এই সতর্কবাণী ভয়ের জন্য নয় শুধু; এটা জাগরণের জন্য। সূরা মারইয়াম আমাদের শেখায়, নবীদের স্মৃতি কেবল আবেগের স্মৃতি নয়, তা আখিরাতমুখী এক ডাক। যে ডাক আমাদের বলে, সত্যকে টুকরো টুকরো কোরো না, রহমতের নিদর্শনকে অস্বীকার কোরো না, কারণ একদিন বিভক্তির সব আবরণ সরিয়ে দিয়ে মহাসাক্ষাতের দিন আসবেই—আর সেদিন আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর শক্তি থাকবে কেবল তারই, যে বিনয় নিয়ে ঈমানের সোজা পথে ছিল।
সত্য যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে, তখন তা একটাই থাকে; কিন্তু মানুষের মন যখন নিজের অহংকার, পূর্বধারণা আর পক্ষপাতের হাতে তুলে দেয়, তখন সেই এক সত্যকে টুকরো টুকরো করে ফেলে। এই আয়াতে “দলগুলো পৃথক পৃথক পথ অবলম্বন করল” — এই সংক্ষিপ্ত বাক্যের ভেতর লুকিয়ে আছে মানব ইতিহাসের এক গভীর ট্র্যাজেডি। ঈসা (আ.)-কে কেন্দ্র করে মানুষ যখন ন্যায়ের সামনে নত হওয়ার বদলে নিজেদের অবস্থান বাঁচাতে শুরু করল, তখন সত্যের আলো নিভে গেল না, বরং মানুষের দৃষ্টি দুর্বল হয়ে গেল। কুরআন এখানে বিতর্কের পাণ্ডুলিপি লিখতে বসেনি; সে আমাদের হৃদয়কে আয়নার সামনে দাঁড় করায়—আমি কি সত্যকে গ্রহণ করছি, নাকি নিজের পছন্দকে সত্য বানিয়ে নিচ্ছি?
মারইয়াম, যাকারিয়া, ঈসা (আ.)-এর স্মৃতি এ সূরায় রহমতের এক কোমল আবহ তৈরি করে; আর এই আয়াত সেই কোমলতার মাঝেই আখিরাতের কঠিন শাস্ত্রকে জাগিয়ে তোলে। রহমত মানুষকে ডাকে, কিন্তু সেই ডাকে সাড়া না দিলে রহমতের দরজার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে যায় হুঁশিয়ারি। নবীদের বৃত্তান্ত আমাদের শেখায়—আল্লাহর কুদরতে অসম্ভবও সম্ভব, বয়সের শুষ্কতায়ও দোয়ার ফুল ফোটে, পবিত্রতার গর্ভে জন্ম নেয় বিস্ময়। কিন্তু এই বিস্ময়কে যারা ভেঙে মতাদর্শের অস্ত্রে পরিণত করে, তারা আসলে নিজেদেরই ক্ষতি করে। কুরআনের দৃষ্টি বড় নির্মম এবং বড় দয়ালু—সে এক হাতে আশার আলো জ্বালায়, আরেক হাতে কিয়ামতের কম্পন তুলে ধরে, যাতে হৃদয় জেগে ওঠে এবং মানুষ সত্যের পাশে ফিরে আসে।
মানুষ যখন আল্লাহর পাঠানো সত্যকে হৃদয় দিয়ে গ্রহণ না করে, তখন সে সত্যকে ভেঙে নিজের ইচ্ছামতো খণ্ড খণ্ড করে ফেলে। এই আয়াতের “তাদের মধ্যে দলগুলো পৃথক পৃথক পথ অবলম্বন করল” বাক্যটি শুধু এক ঐতিহাসিক বিভক্তির খবর নয়; এটি মানুষের অন্তরের পুরোনো অসুখেরও খবর। ঈসা (আ.)-কে ঘিরে কেউ সত্যকে মানল, কেউ অস্বীকার করল, কেউ আবার সীমা ছাড়িয়ে গেল—আর এভাবেই একটিমাত্র সত্য বহু ভাঙা মুখোশে আড়াল হয়ে গেল। কিন্তু সত্য কখনো দলাদলির সংখ্যায় বদলে যায় না; বদলে যায় মানুষের ভেতরের জবাবদিহির অনুভব।
এরপর আসে সেই কাঁপিয়ে দেওয়া সতর্কবাণী: ‘সুতরাং মহাদিবস আগমনকালে কাফেরদের জন্যে ধবংস।’ কুরআন এখানে তর্কের উত্তাপ বাড়ায় না, বরং আখিরাতের নিরাবরণ দৃশ্যকে সামনে এনে দেয়। মানুষ দুনিয়ায় কত মত, কত ব্যাখ্যা, কত পক্ষ বানাতে পারে; কিন্তু কিয়ামতের দিন কোনো পক্ষপাতই আগুনের ভয়কে ঠেকাতে পারবে না। সেদিনের “মহাদিবস” এমন এক উপস্থিতি, যেখানে মিথ্যা লুকোবে না, বিভ্রান্তি আশ্রয় পাবে না, আর অবিশ্বাসী হৃদয়ের জন্য থাকবে তীব্র আফসোসের মুখোমুখি দাঁড়ানো।
তবু এই ভয়ই মুমিনের জন্য করুণা। কারণ আল্লাহ আমাদের বিভক্তির এই কাহিনি শুনিয়ে দিচ্ছেন যেন আমরা সত্যের সঙ্গে নিষ্ঠাবান থাকি, নবীদের স্মৃতিকে সম্মান করি, এবং ঈসা (আ.) ও মারইয়ামের পবিত্র কাহিনি থেকে অন্তরকে আলোকিত করি। যাকারিয়া (আ.)-এর দোয়া, মারইয়ামের নিঃশব্দ আনুগত্য, ঈসা (আ.)-এর নিদর্শন—সবই আমাদের শেখায়, রহমতের দরজা খোলা আছে; কিন্তু সেই দরজা দিয়ে ঢুকতে হলে অহংকার ভাঙতে হয়। যে আজ নিজের নফসের দলাদলি ছেড়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসে, তার জন্য আখিরাত শুধু ভয় নয়—এক গভীর আশ্রয়ও বটে।
ফَوَيْلٌ লিবিশ্বাসহীনদের জন্য—এই সতর্কবাণী ভয় দেখানোর জন্য নয়, জাগানোর জন্য। কারণ মহাদিবস কল্পনার কোনো বিষয় নয়; সেদিন দল, পক্ষ, পরিচয়, অহংকার, বংশ, বুদ্ধির দম্ভ—সবই ভেঙে পড়বে, আর মানুষ একা দাঁড়াবে তার রবের সামনে। যে হৃদয় আজ আকাশের নিদর্শন দেখে নরম হয় না, সে সেদিন কী দিয়ে বাঁচবে? আর যে মানুষ নবীদের স্মৃতি থেকেও শিক্ষা নেয় না, তার জন্য ইতিহাসও একদিন সাক্ষী হয়ে দাঁড়াবে।
তাই এই আয়াত আমাদের শেষ আশ্রয়কে আবার মনে করিয়ে দেয়: আল্লাহর কাছে ফিরে আসাই নিরাপত্তা, আর তাঁর সামনে বিনয়ই মুক্তি। সত্যকে ভাগ করতে গিয়ে আমরা যেন নিজেরই অন্তর ছিন্ন না করি; নবীদের পথকে যেন দলাদলির অন্ধকারে হারিয়ে না ফেলি। কুরআন আমাদের ভয় দেখায়, যাতে আমরা ধ্বংসের দিকে না যাই; আর ভয় দেখিয়েই আমাদের দিকে রহমতের দরজা খুলে দেয়, যেন আজই আমরা ফিরে আসি—ভাঙা হৃদয় নিয়ে, লাজে নত হয়ে, ক্ষমার আশা বুকে চেপে।