সূরা মারইয়ামের এই আয়াত যেন হঠাৎ করেই মানুষের হাত থেকে সব কিছুর জোর কেড়ে নিয়ে আল্লাহর হাতে ফিরিয়ে দেয়। তিনি বলেন, আমিই পৃথিবীর ও তার উপর যা কিছু আছে, তার চূড়ান্ত মালিক হব; আর শেষ পর্যন্ত সবাই আমারই কাছে ফিরে আসবে। এই ঘোষণায় জীবনকে দেখা যায় নতুন চোখে। যে মাটির ওপর আমরা দাঁড়িয়ে আছি, যে ঘরকে আপন ভাবি, যে দেহকে নিজের বলে জেনে এত যত্ন করি, যে নাম-পরিচয়কে স্থায়ী মনে করি—সবই একদিন মুছে যাবে, অথবা অন্তত আমাদের হাত থেকে খসে পড়বে। মানুষের মালিকানা আসলে ধার করা আলো; আর আল্লাহর মালিকানা সত্য, স্থায়ী, অটুট।

মারইয়াম আলাইহাস সালামের কাহিনি, যাকারিয়া আলাইহিস সালামের দোয়া, ঈসা আলাইহিস সালামের অলৌকিক জন্ম—এই সূরার ভেতর দিয়ে বারবার যে বাস্তবতা উঁকি দেয়, এই আয়াত তাকে আরো গভীর করে তোলে। নবীদের স্মৃতিতে মানুষ শিখে—রহমত কীভাবে নেমে আসে, অসম্ভবকে কীভাবে সম্ভব করা হয়, আর দুনিয়ার প্রচলিত হিসাব কীভাবে আল্লাহর ইচ্ছার সামনে নত হয়। এই আয়াতও সেই শিক্ষা বহন করে: তোমাদের চারপাশের জগত, তোমাদের অর্জন, তোমাদের উত্তরাধিকার, তোমাদের প্রজন্ম—কোনোটিই চিরস্থায়ী নয়। আল্লাহ যখন বলেন তিনিই উত্তরাধিকারী, তখন তা শুধু সম্পদের বিষয়ে নয়; তা বলে দেয়, সব শক্তি, সব কর্তৃত্ব, সব বস্তুগত ও পার্থিব আশ্রয়ের শেষ আশ্রয় তিনি।

এর পেছনে কোনো একক নির্দিষ্ট কারণ-নুযূল নির্ভরযোগ্যভাবে স্থির করা না গেলেও, আয়াতের বৃহৎ প্রেক্ষাপট স্পষ্টভাবে আখিরাত-সচেতন এক সমাজবাণী। মক্কার অস্বীকার, মানুষের অহংকার, আর আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে না চাওয়ার মানসিকতার বিপরীতে এই আয়াত কাঁপিয়ে দেয় হৃদয়কে: যাকে তুমি হারানোর ভয় পাও, সে-ও আল্লাহর; যাকে তুমি নিজের বলে আঁকড়ে ধরো, সেও আল্লাহর; আর যেদিন সব কিছু ছেড়ে যেতে হবে, সেদিনও ফিরে যেতে হবে তাঁরই দরবারে। তাই এই আয়াত কেবল একটি তথ্য নয়, এটি আত্মার উপর নেমে আসা এক নীরব বজ্রধ্বনি—তোমার নয়, সবকিছুই তাঁর; তোমার অবশেষও তাঁর কাছে, তোমার হিসাবও তাঁর কাছে, আর তোমার মুক্তির পথও শুধু তাঁরই দিকে ফিরে যাওয়া।

আল্লাহ যখন বলেন, “আমিই চূড়ান্ত মালিক হব পৃথিবীর এবং তার উপর যারা আছে তাদের”—তখন মানুষের সকল দাবি, সকল অহংকার, সকল স্থায়িত্ব-ভ্রম এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ে। আমরা যে ভূমিকে নিজের বলে আঁকড়ে ধরি, যে সম্পদকে অর্জনের গৌরব ভাবি, যে সাফল্যকে পরিচয়ের মুকুট বানাই—সবকিছুই আসলে ক্ষণিকের আমানত। মানুষের হাতে থাকা মানে মালিক হওয়া নয়; মানুষের কাছে থাকা মানে স্থায়ী থাকা নয়। আজ যা আমাদের ঘিরে আছে, কাল তা আমাদের ছেড়ে যেতে পারে; আর যে সব কিছুর উৎস আল্লাহ, তার প্রত্যাবর্তনও শেষ পর্যন্ত আল্লাহরই দিকে।

এই সত্য হৃদয়কে নীরবে শাসন করে। কারণ মানুষ যখন নিজের মৃত্যুকে ভুলে যায়, তখন সে সম্পদের ভেতর স্থায়িত্ব খোঁজে, নামের ভেতর অমরত্ব খোঁজে, দেহের ভেতর সুরক্ষা খোঁজে। কিন্তু এই আয়াত এসে জানিয়ে দেয়—পৃথিবী কোনো চূড়ান্ত আশ্রয় নয়, বরং এক পরীক্ষার মাঠ; এখানকার অধিকার সাময়িক, এখানকার সম্পর্কও পরীক্ষিত। যাকারিয়ার প্রার্থনা, মারইয়ামের নিঃশব্দ সমর্পণ, ঈসা আলাইহিস সালামের আগমন—এই সূরার ভেতর নবীদের জীবন যেন আমাদের শেখায়, আল্লাহ চাইলে বন্ধ দরজা খুলে দেন, আর চাইলে খোলা দরজার মধ্যেও মানুষের অসহায়তা দেখিয়ে দেন। তাঁর সার্বভৌমত্বের সামনে সব কারণই নত, সব হিসাবই সীমিত।
আর “ইলায়না ইয়ুরজা‘উন”—শেষে সবাই আমারই কাছে ফিরে আসবে—এই এক বাক্য দুনিয়ার সমস্ত শব্দকে স্তব্ধ করে দেয়। আমরা যেখানেই যাই, যতদূরই ছুটি, যে-ই আমাদের ঘিরে থাকুক, ফিরতি পথ একটাই: আল্লাহর দরবার। সেখানে লুকোনো কিছু থাকবে না, হারিয়ে যাওয়া কিছু থাকবে না, প্রভাব, বংশ, অর্থ, ভয়—কিছুই কাজে আসবে না; থাকবে শুধু সত্যের মুখোমুখি এক নগ্ন প্রত্যাবর্তন। তাই মুমিনের চোখে পৃথিবী পাথর নয়, পথ; সম্পদ লক্ষ্য নয়, পরীক্ষা; জীবন ভোগ নয়, প্রস্তুতি। যে হৃদয় এই আয়াতের সামনে নত হয়, সে বুঝে যায়—চূড়ান্ত মালিক যিনি, তাঁর কাছেই ফিরে যাওয়ার জন্যই তো আমার প্রতিটি শ্বাস আমাকে ধীরে ধীরে ডাকছে।

এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে মানুষের ভেতরের অহংকার কাঁপতে শুরু করে। যে মানুষ নিজেকে কত কিছু মনে করে, তার হাতে যা আছে তা আসলে আল্লাহর দেওয়া আমানত; আর যা একদিন চলে যাবে, তাতে তার দাবি টেকে না। জমি, ঘর, সম্পদ, পরিবার, শরীর, ক্ষমতা—সবকিছুই দেখতে স্থায়ী লাগে, কিন্তু স্থায়িত্বের আসল অধিকারী একমাত্র আল্লাহ। তিনি যখন বলেন, আমিই পৃথিবীর ও তার ওপর যারা আছে তাদের চূড়ান্ত মালিক হব, তখন বুঝি মানুষের সব মালিকানাই ক্ষণিকের ভাড়া। আমরা যার ওপর অধিকার ফলাই, সে-ও একদিন মাটি হয়ে যাবে; আর যে মাটি আজ আমাদের পদতলে, সেই মাটিও একদিন তাঁরই রাজত্বের সাক্ষী হয়ে দাঁড়াবে।

এই সত্য সমাজকে ভেতর থেকে ভেঙে নয়, বরং ভেতর থেকে শুদ্ধ করে। কারণ মানুষ যখন ভুলে যায় যে শেষ মালিক আল্লাহ, তখন লোভ বাড়ে, জুলুম বাড়ে, সম্পদের মোহ বাড়ে, উত্তরাধিকারের দ্বন্দ্ব বাড়ে, মানুষের হক চাপা পড়ে যায়। কিন্তু কুরআন মনে করিয়ে দেয়—কেউ কারও চূড়ান্ত মালিক নয়; কারও জীবন কারও হাতে বন্দি নয়; কারও রিজিক, মর্যাদা, কিংবা আয়ু কারও নিয়ন্ত্রণে চিরস্থায়ী নয়। এ আয়াত আমাদের শেখায়, যা কিছু পেয়েছি তা নিয়ে গর্ব নয়, বরং জবাবদিহির ভয় থাকা চাই। কারণ দুনিয়ার হিসাব যত জটিলই হোক, শেষ হিসাব এক জায়গায়—আল্লাহর সামনে।

আর তাই এই আয়াত হৃদয়ে আশা ও ভয়, দুটোকেই জাগিয়ে তোলে। ভয় এই যে, যা কিছু আজ আমার বলে আঁকড়ে ধরি, তা একদিন আমাকে ছেড়ে যাবে; আর আশা এই যে, যিনি সবকিছুর চূড়ান্ত মালিক, তাঁর কাছে ফিরে যাওয়াই আমাদের শেষ ঠিকানা। এই ফিরে যাওয়া শাস্তির আশঙ্কাও বহন করে, রহমতের দরজাও খুলে দেয়। যে অন্তর তাঁর দিকে ফিরে আসে, সে হারায় না; সে নিজের আসল ঠিকানা খুঁজে পায়। সূরা মারইয়াম আমাদের এই সত্যের ভেতর দিয়ে চালিয়ে নেয়—নবীদের স্মৃতি, দোয়া, মুজিজা, কষ্ট, রহমত—সবকিছুর শেষে এক ঘোষণা: তোমাদের সব যাত্রা শেষ হবে তাঁর কাছেই। তাই আজই বুকের ভেতর থেকে মিথ্যা মালিকানার ভর নামিয়ে দাও, আর বলো, হে আল্লাহ, সবই তোমার; আমিও তোমারই দিকে ফিরছি।

মানুষ যখন বলে, এটা আমার, ওটা আমার, তখন আয়াতটি নীরবে কিন্তু চূড়ান্তভাবে বলে—না, কিছুই তোমার নয়; সবই সাময়িকভাবে তোমার হাতে রাখা আমানত। পৃথিবীকে আমরা যতই আঁকড়ে ধরি, একদিন সে-ই আমাদের ছেড়ে দেবে। দেহ ক্লান্ত হবে, ঘর খালি হবে, প্রিয়জন স্মৃতিতে পরিণত হবে, আর যে সম্পদকে জীবন-ভর নিরাপত্তা ভেবেছিলাম, তা-ও আমাদের কোনো কাজে লাগবে না। তখন স্পষ্ট হবে—যার দিকে ফিরে যেতে হবে, তিনিই তো আসল মালিক; যাঁর কাছে সব ফেরা অনিবার্য, তিনিই তো চূড়ান্ত সত্য।

এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে হৃদয় নরম হয়ে আসে। কারণ এখানে শুধু মৃত্যু নেই, এখানে হিসাব আছে; শুধু বিচ্ছেদ নেই, এখানে প্রত্যাবর্তন আছে; শুধু শূন্যতা নেই, এখানে রবের দরবার আছে। মারইয়াম, যাকারিয়া, ঈসা আলাইহিমুস সালাম—এই সূরার নবীস্মৃতিগুলো আমাদের শেখায় যে আল্লাহর রহমত দেরি করলেও হারায় না, আর তাঁর সিদ্ধান্ত অদ্ভুতভাবে আমাদের ধারণার চেয়েও বড়। তাই আজ যদি কিছু পাও, অহংকার কোরো না; আর যদি কিছু হারাও, ভেঙে পড়ো না। কারণ যা তোমার ছিল বলে মনে করেছিলে, তা কখনোই তোমার ছিল না। শেষ সত্য এই যে, আমরা সবাই ফিরছি তাঁরই কাছে—শূন্য হাতে, ভাঙা অহংকার নিয়ে, কেবল ঈমান আর আমলের ওজন নিয়ে। সেই ফিরে যাওয়ার জন্যই আজই নিজেকে প্রস্তুত করো।