দারিদ্রের ভয় কখনো কখনো মানুষের বুকের ভেতর এমন এক অন্ধকার তৈরি করে, যেখানে সন্তান আর আশীর্বাদ হয়ে থাকে না; বরং বোঝা, আশঙ্কা, হিসাব, ভয়—সবকিছুর নাম হয়ে দাঁড়ায়। সূরা আল-ইসরা’র এই আয়াত সেই অন্ধকারের বুক চিরে ঘোষণা করে: তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না দারিদ্র্যের আশঙ্কায়। রিজিকের মালিক তো মানুষ নয়, আল্লাহ। তিনি সন্তানদেরও দেন, আবার তোমাদেরও দেন। অর্থাৎ, যে জীবনকে তোমরা রক্ষার দায়িত্ব পেয়েছ, সেটির জীবনোপকরণও কারও কৃপায় নয়; তা সরাসরি রবের দান। কুরআনের ভাষা এখানে শুধু নিষেধের ভাষা নয়, এটি তাওহীদের ভাষা—ভয়কে ছিন্ন করে ভরসাকে জাগিয়ে তোলার ভাষা।

এই আয়াতে সন্তানের কথা এসেছে, কিন্তু এর গভীরে আছে আরও বড় একটি নৈতিক ও সামাজিক জখমের চিকিৎসা। জাহিলি সমাজে দরিদ্রতার ভয়ে সন্তানকে হত্যা করা, বিশেষত অনাহার, লজ্জা, বা ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কারণে জীবনের মূল্য অস্বীকার করা—এমন নির্মম বাস্তবতা থেকে কুরআন মানুষকে ফিরিয়ে আনে। এখানে কোনো একটি ব্যক্তিগত পাপের কথা নেই শুধু; আছে পরিবারভিত্তিক করুণ সিদ্ধান্ত, আছে সমাজের অর্থনৈতিক ভয়, আছে বেঁচে থাকার হিসাবের মধ্যে মানবিকতাকে হারিয়ে ফেলার প্রবণতা। তাই আয়াতটি শুধু শিশুহত্যা নিষেধ করে না; এটি মানুষের হৃদয়কে শিক্ষা দেয় যে অভাবের ভয় দিয়ে কেউ জীবন-মরণের ফয়সালা করতে পারে না।

আরও গভীরে গেলে বোঝা যায়, এই বাণী আখিরাতমুখী জীবনেরও এক কঠিন স্মরণ। সন্তান আল্লাহর আমানত; আমানতের উপর হাত ওঠানো মানে কেবল একটি প্রাণ নষ্ট করা নয়, বরং রবের সামনে দাঁড়ানোর দিনকে ভুলে যাওয়া। কুরআন এখানে সমাজকে কাঁপিয়ে দিয়ে বলছে, ‘নিশ্চয় তাদেরকে হত্যা করা মারাত্মক অপরাধ।’ অর্থাৎ, এটি ছোট কোনো ভুল নয়, এটি বড় এক নৈতিক বিপর্যয়। তাই এই আয়াত আমাদের কানে শুধু নসিহত করে না; হৃদয়ে জিজ্ঞাসা জাগায়—আমরা কি রিজিককে বিশ্বাস করি, নাকি আমাদের ভয়কেই ইলাহ বানিয়ে ফেলি?

কুরআন এখানে মানুষের বুকের ভেতরকার সবচেয়ে নির্মম হিসাবটিকে সামনে টেনে আনে—দরিদ্রতার ভয়। এই ভয় মানুষকে এমন এক অন্ধকারে ঠেলে দেয়, যেখানে ভবিষ্যৎ ঈমানের চোখে দেখা হয় না; কেবল অভাবের ছায়া দেখা হয়। তখন সন্তান আর রহমতের প্রতীক থাকে না, হয়ে ওঠে আশঙ্কার নাম। আল্লাহ এই আয়াতে সেই ভীত হৃদয়কে ডেকে বলেন, তোমাদের ভয় যাকে বড় করে দেখছে, তার চেয়েও বড় আমি; তোমাদের হাতে নয়, আমার হাতেই রিজিকের ভাণ্ডার। সন্তানকে নিয়ে যে আশঙ্কা, তা মূলত রিজিককে আল্লাহর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার এক ভুল দৃষ্টি। কুরআন সেই দৃষ্টিকে ভেঙে দেয়—কারণ জীবনকে বাঁচিয়ে রাখা এবং জীবনকে খাদ্য দেওয়া, দুটোই রবের পরিকল্পনার অংশ।

এখানে নিষেধ শুধু একটি অন্যায়কে বন্ধ করার জন্য নয়; এটি মানুষের নৈতিক কেন্দ্রে আঘাত করা এক তাওহীদী ঘোষণা। যখন একজন মানুষ মনে করে, আমি না কষলে, আমি না কমালে, আমি না থামালে সংসার চলবে না—তখন সে অজান্তেই স্রষ্টার জায়গায় নিজেকে বসিয়ে ফেলে। এই আয়াত তাকে ফিরিয়ে আনে তার দাসত্বে, তার সীমায়, তার ফকিরি স্বীকারে। সন্তানকে হত্যা করা কেবল রক্তপাত নয়; তা ভবিষ্যতের সঙ্গে, আমানতের সঙ্গে, এবং আল্লাহর রহমতের সঙ্গে যুদ্ধ। তাই আল্লাহ বলেন, তাদেরকে হত্যা করা মারাত্মক অপরাধ। কারণ যে হাত জীবনের শুরুতেই ছুরি তোলে, সে শুধু একটি প্রাণকে নয়, হৃদয়ের মধ্যে থাকা আখিরাত-সচেতনতাকেও আহত করে। আর যে অন্তর আল্লাহর রিজিকে ভরসা করতে শেখে, সে অভাবের অন্ধকারেও আলো দেখে; সে বোঝে, সন্তান বোঝা নয়, বরং রিজিকের সাথে নেমে আসা এক পরীক্ষা, এক আমানত, এক জান্নাত-দ্বারের সম্ভাবনা।
দারিদ্র্যের ভয় মানুষকে কেবল হিসাবি করে না, কখনো কখনো তাকে নিষ্ঠুরও করে তোলে। তখন হৃদয় আর আল্লাহর ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে আশঙ্কা, সঙ্কট, সম্ভাব্য লজ্জা আর অনিশ্চয়তার ওপর। এই আয়াতে আল্লাহ যেন মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা সেই অন্ধকারকে স্পর্শ করে বলছেন: সন্তানের জীবন নিয়ে ভয় করো না, কারণ জীবন দেওয়ার দায়িত্ব তোমাদের নয়। যে রব আজ তোমাকে দেখছেন, তিনিই তাদেরও দেখছেন; যে রব তোমার জন্য রিজিক লিখেছেন, তিনিই তাদের জন্যও রিজিক লিখেছেন। এখানে কুরআন কেবল একটি অপরাধ থামায় না, বরং রিজিক-চিন্তার ভেতর লুকিয়ে থাকা শির্কি আতঙ্ককে ভেঙে দেয়।

সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আমানত; সে কোনো অযাচিত বোঝা নয়, বরং পরীক্ষার সঙ্গী, দুআর কারণ, এবং আখিরাতের পথে এক দায়িত্বপূর্ণ সম্পর্ক। এই আয়াত পরিবারকে শেখায়, সন্তানের আগমনকে সংকটের চোখে দেখো না; তাকে দেখো রহমতের দরজা হিসেবে। সমাজ যখন নৈতিকতার চেয়ে অভাবকে বড় করে, তখন মানুষ জীবনের পবিত্রতাকে ছোট করে ফেলে। কিন্তু কুরআন সমাজের এই বিকৃত মানসিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বলে: উপার্জনের অনিশ্চয়তা দিয়ে জীবনের অধিকার মাপো না। আল্লাহর রিজিকের সামনে তোমার ভয় ক্ষুদ্র, তোমার হিসাব দুর্বল, তোমার অজুহাত ভঙ্গুর।

এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে অন্তর কেঁপে ওঠে, কারণ এটি আমাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের মধ্যেও আখিরাতের ছায়া দেখায়। আমরা কেবল বড় পাপকেই ভয় করি, কিন্তু অনেক সময় ছোট যুক্তি, সুবিধা, সংকোচ আর ভবিষ্যৎভীতির আড়ালে হৃদয়ের দোষ লুকিয়ে রাখি। আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দেন, কোনো প্রাণের ওপর হাত তোলা কিংবা তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করা সামান্য ভুল নয়; তা ‘খিত’আন কাবীরা—এক ভয়ংকর অপরাধ। তাই মুমিনের কাজ হলো ভয়কে ঈমানে রূপ দেওয়া, অভাবকে দোয়ায় ভাঙা, আর সন্তানের মুখে জীবনের হাসিকে আল্লাহর নেয়ামত হিসেবে দেখা। যে অন্তর রিজিকদাতাকে চিনে নেয়, সে আর রিজিকের ভয়ে কারও জীবন নিভিয়ে দিতে পারে না।

যে মানুষ নিজের সন্তানের রিজিকের দুশ্চিন্তায় কেঁপে ওঠে, সে যেন একবার থেমে আল্লাহর এই বাক্যটি শুনে: “আমিই তাদেরকে রিজিক দিই, আর তোমাদেরকেও।” কত ছোট হয়ে যায় মানুষের হিসাব, কত বড় হয়ে দাঁড়ায় রবের প্রতিশ্রুতি। আমরা যাকে ভবিষ্যৎ বলে ভয় পাই, আল্লাহ তাআলা তাকে বর্তমানেরই রিজিক দিয়ে আগলে রেখেছেন। সন্তানের জীবন কাড়ার অধিকার কোনো অভাবের নেই, কোনো লজ্জার নেই, কোনো সামাজিক চাপের নেই; কারণ জীবন মানুষের তৈরি নয়, জীবন আল্লাহর আমানত। আর আমানতের ওপর ভয়ভিত্তিক নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত নেওয়া কেবল দারিদ্র্যের ভুল নয়, এটি ঈমানেরও পরীক্ষা।

এই আয়াত আমাদের শুধু অতীতের এক অন্ধকার প্রথার দিকে আঙুল তুলে দেখায় না; আজও কত রকমভাবে আমরা জীবনকে হালকা করে ফেলি, ভালোবাসাকে হিসাবের খাতায় নামিয়ে আনি, সন্তানের ভবিষ্যৎকে নিজের অক্ষমতার অজুহাতে সংকুচিত করে দিই। অথচ আল্লাহর সামনে দাঁড়ালে মানুষের ভয়, অভাব, অস্থিরতা—সবই ক্ষুদ্র হয়ে যাবে। তখন বোঝা যাবে, যে হাত জীবন দিতেও পারে না, সে হাত জীবন ছিনিয়ে নেবারও যোগ্য নয়। সূরা আল-ইসরা আমাদের শেখায়, পরিবার মানে কেবল রুটি-রুজির হিসাব নয়; পরিবার মানে বিশ্বাস, আমানত, দয়া, এবং আখিরাতমুখী দায়িত্ব। যে হৃদয় আল্লাহর রিজিকের ওপর ভরসা করতে শেখে, সেই হৃদয়ই সন্তানের চোখে ভয় নয়, নিরাপত্তা হয়ে ওঠে।