সূরা আল-ইসরা-এর এই আয়াত আমাদের সামনে রিজিকের এক গভীর, শান্ত কিন্তু তীব্র সত্য তুলে ধরে: নিশ্চয় আপনার রব যাকে ইচ্ছা প্রশস্তভাবে জীবিকা দেন, আর যাকে ইচ্ছা সংকুচিত করে দেন। বাহ্যদৃষ্টিতে মানুষের জীবন যেন আয়ের হিসাব, সুযোগের হিসাব, সম্পদের ওঠানামার হিসাব; কিন্তু কুরআন জানিয়ে দেয়, এই সব হিসাবের ওপরে আছেন এক মহান রব, যাঁর দান কখনও কেবল প্রাচুর্যের নাম নয়, আর তাঁর কৃপণতাও কখনও অবহেলার নাম নয়। রিজিকের বিস্তারও তাঁর রহমতের ভাষা, সংকোচনও তাঁর হিকমতের ভাষা। তাই ধনী মানুষ শুধু সাফল্যের গল্প নয়, আর অভাবী মানুষ শুধু বঞ্চনার কাহিনি নয়; উভয়ের জীবনেই আল্লাহ এমন কিছু শিক্ষা লুকিয়ে রাখেন, যা অন্তরকে বদলে দিতে পারে।
এই আয়াতে এমন কোনো নির্ভরযোগ্য নির্দিষ্ট শানে নুযূল সুপ্রতিষ্ঠিত নয়, যা নিশ্চিতভাবে বলে দেওয়া যায়; তবে সূরার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এটি মানবজীবনের নৈতিক গঠন, সমাজের ভারসাম্য, এবং বান্দার অন্তরকে অহংকার ও হতাশা—দু’টোরই শিকল থেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে নাজিল হওয়া নির্দেশনার অংশ। সূরা আল-ইসরা-তে বারবার দেখা যায়, আল্লাহ মানুষের ভেতরের জগৎ, পারিবারিক দায়িত্ব, সামাজিক ন্যায়, অপচয়, অবৈধ অগ্রাসন, এবং আখিরাতের জবাবদিহির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। রিজিকের আয়াত তাই কেবল অর্থনৈতিক কথা বলে না; এটি মানুষের নৈতিক মেরুদণ্ডকে সোজা করে, তাকে শেখায় যে অন্যের হাতে যা আছে তা দেখে হৃদয় ভেঙে ফেলো না, আর নিজের হাতে যা আছে তা দেখে আত্মমুগ্ধ হয়ো না।
অতএব এই আয়াতের প্রথম ধাক্কা হৃদয়ে পড়ে এই বোধ হয়ে: আমার জীবনের দরজা কে খুলবে আর কে বন্ধ করবে—তা বাজার নির্ধারণ করে না, মানুষ নির্ধারণ করে না, এমনকি আমার পরিকল্পনাও চূড়ান্ত নির্ধারণকারী নয়; আল্লাহই নির্ধারণ করেন। তিনি বান্দাদের সম্পর্কে খবর রাখেন, দেখেন তাদের অন্তর, তাদের নফস, তাদের প্রয়োজন, তাদের সহ্যক্ষমতা, তাদের পরীক্ষার উপযোগিতা। কখনও সংকীর্ণতা আসে শোধরানোর জন্য, কখনও প্রাচুর্য আসে কৃতজ্ঞতা জাগানোর জন্য। তাই এই আয়াত বান্দাকে একদিকে তাওয়াক্কুলের মাটিতে নামায়, অন্যদিকে শোকর ও সংযমের আকাশে তুলে নেয়। যে অন্তর এই সত্যে জেগে ওঠে, সে আর রিজিককে দেবতার আসনে বসায় না; সে জানে, রিজিকের মালিককে ভুলে গেলে জীবনের সব পাওয়া-না-পাওয়াই অন্ধকার হয়ে যায়।
এই আয়াতের মধ্যে আছে মানুষের ভাঙা মনের জন্য এক অদ্ভুত সান্ত্বনা, আবার গোপন এক পরীক্ষা। কারণ রিজিক যখন বাড়ে, তখন হৃদয় সহজেই ভাবতে শেখে—আমি বুঝি নিজেই নিজের অভিভাবক; আর যখন কমে, তখন অন্তর ফিসফিস করে—আমাকে বুঝি ভুলে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু কুরআন এ দুই বিভ্রমকেই ভেঙে দেয়। আল্লাহ যাকে চান প্রশস্ত করেন, যাকে চান মেপে দেন—এখানে কোনো অন্ধ দৈব নেই, কোনো নির্বাক প্রকৃতি নেই; আছে কেবল এক পরম জ্ঞানী রব, যিনি বান্দার বাহ্যিক প্রয়োজনের চেয়ে অনেক গভীরে তার অন্তরের প্রয়োজনও জানেন। কখনো প্রাচুর্যই বান্দার জন্য ফিতনা, আবার কখনো সংকোচনই তার জন্য রহমতের আড়ালে লুকোনো নিরাপত্তা। তাই রিজিককে শুধু সংখ্যা ভেবে দেখা মানে, রবের হিকমতকে খণ্ডিত দৃষ্টিতে দেখা।
অতএব রিজিকের এ রহস্য মানুষকে কেবল উপার্জনের কৌশল শেখায় না; শেখায় আত্মসমর্পণের শিষ্টতা। দোয়া করতে থাকা, হালাল পথে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া, আবার ফলের ওপর ছুরি চালানো না—এটাই মুমিনের জীবন। কারণ আল্লাহর দেওয়া কখনো বিলম্ব নয়, আর তাঁর না-দেওয়াও কখনো নিষ্ঠুরতা নয়। তিনি বান্দাদের খবির, তাদের ভেতর-বাইরের সবকিছুর খবর রাখেন; তিনি বাছাই করেন, মেপে দেন, বাড়ান, কমান—সবই এমন এক প্রজ্ঞায়, যা শেষ বিচারে বান্দারই কল্যাণে ফিরে আসে। তাই যে হৃদয় এই আয়াত বুঝে, সে আর অভাবকে অভিশাপ ভাবে না, প্রাচুর্যকে স্থায়ী মালিকানা ভাবে না; সে প্রতিটি অবস্থায় বলে, আমার রব দেখছেন, জানছেন, এবং আমার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তাতেই আমার নাজাতের কোনো না কোনো দরজা লুকিয়ে আছে।
রিজিকের দরজা কখনো প্রশস্ত হয়, কখনো সংকীর্ণ হয়; কিন্তু এই ওঠানামার ভেতরেই মানুষের প্রকৃত পরীক্ষা। যে পেয়ে গর্বিত হয়, আর যে না পেয়ে ভেঙে পড়ে—দু’জনেরই অন্তর এখনো আয়াতের গভীর ভাষা শোনেনি। কারণ রিজিক কেবল অর্থ নয়, কেবল খাদ্য নয়, কেবল আরামও নয়; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক পরিমাপিত দান, যা বান্দার চরিত্রকে প্রকাশ করে, শোধরায়, কখনো জাগিয়ে তোলে, কখনো থামিয়ে দেয়। কখনো সংকোচন আসে অহংকার ভাঙার জন্য, কখনো বিস্তার আসে কৃতজ্ঞতা পরীক্ষা করার জন্য। আর যে হৃদয় বুঝে নেয়—দাতা আল্লাহ, মালিক আল্লাহ, হিসাবগ্রহণকারীও আল্লাহ—তার ভেতরে ধনী-দরিদ্রের বাজারি মানদণ্ড ভেঙে গিয়ে ইমানের নীরব রাজত্ব শুরু হয়।
এই আয়াত সমাজকেও আয়নার সামনে দাঁড় করায়। মানুষ যখন একে অন্যকে কেবল সম্পদের মাপকাঠিতে দেখে, তখন ভ্রাতৃত্ব ক্ষয়ে যায়, লোভ বাড়ে, ঈর্ষা জন্ম নেয়, আর সহানুভূতি শুকিয়ে যায়। অথচ আল্লাহর জ্ঞানে কে কতটা পাবেন, কে কতটা হারাবেন—সবই নির্ধারিত হিকমতের মধ্যে। তাই কারও প্রাচুর্য দেখে হিংসা নয়, কারও অভাব দেখে অবজ্ঞা নয়; বরং উভয়ের জন্যই ন্যায়ের, সাহায্যের, সংযমের এবং দোয়ার দরজা খুলে দেওয়া উচিত। সমাজের ভারসাম্য তখনই সুন্দর হয়, যখন মানুষ রিজিককে অহংকারের অস্ত্র না বানিয়ে আমানতের মতো বহন করে, এবং অভাবকে অপমান না ভেবে ধৈর্য ও আত্মসমর্পণের পথ হিসেবে গ্রহণ করে।
আল্লাহ ‘খবীর’—তিনি বান্দার অন্তর জানেন, ‘বসীর’—তিনি বান্দার জীবনের দৃশ্য-অদৃশ্য সব দেখেন। তাই বাহ্যিক অবস্থার ওপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে দেওয়া বোকামি; যে আজ সংকীর্ণতায় আছে, তার জন্যও কল্যাণ লুকিয়ে থাকতে পারে, আর যে আজ প্রশস্ততায় আছে, তার জন্যও জবাবদিহি অপেক্ষা করতে পারে। এই সত্য মনে রাখলে হৃদয় নরম হয়, দৃষ্টি নির্মল হয়, এবং দুনিয়ার ভাঙা প্রতিযোগিতা থেকে আত্মা ফিরে আসে তার আসল ঠিকানার দিকে। রিজিকের আয়াত আমাদের শেখায়—প্রাপ্তিতে কৃতজ্ঞ হও, সংকোচনে ধৈর্য ধরো, আর সর্বাবস্থায় সেই রবের দিকে ফিরে চলো, যিনি তোমাকে তোমার চেয়েও ভালো জানেন।
যে রব রিজিক বাড়ান, তিনিই সংকুচিত করেন; আর এ দুই অবস্থার মধ্যেই বান্দার জন্য আছে শুদ্ধির পথ। কখনো প্রাচুর্যকে আমানত মনে করে কৃতজ্ঞ হও, কখনো অভাবকে শিক্ষা মনে করে ধৈর্য ধরো। কারণ তোমার জন্য কল্যাণ কখন কোথায় লুকিয়ে আছে, তা তুমি জানো না; জানেন কেবল তিনি, যিনি খবীর, বাছীর। তাই রিজিকের পেছনে ছুটতে গিয়ে হৃদয়কে যেন হারিয়ে না ফেলি। সম্পদ চাই, কিন্তু এমনভাবে নয় যে তা আমাদের রবের স্মৃতি থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। প্রয়োজন চাই, কিন্তু এমনভাবে নয় যে তা আমাদের তাওয়াক্কুল ভেঙে দেয়।
এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষকে শেষ পর্যন্ত একটাই সত্য স্বীকার করতে হয়—আমি জানি না, আমার জন্য কী বেশি কল্যাণকর; আমি কেবল চাই আমার রবের সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হৃদয়। যাঁর দৃষ্টি আমার অগোচরেও সক্রিয়, যাঁর জ্ঞান আমার প্রয়োজনের আগে পৌঁছে যায়, তাঁর ওপর নির্ভর করাই ঈমানের প্রশান্তি। হে আল্লাহ, আমাদের রিজিককে আমাদের অহংকারের কারণ বানিও না, আমাদের অভাবকে আমাদের হতাশার কারণ বানিও না; বরং উভয় অবস্থাতেই তোমার দিকে ফিরে আসার সৌভাগ্য দাও। কারণ শেষে মানুষের হাতে থাকে না কিছুই—থাকে শুধু একটুকু বিশ্বাস, আর সেই বিশ্বাসই বাঁচিয়ে দেয় ভাঙা হৃদয়কে।