“এখন?”—এই একটি শব্দেই কত শত বছরের অবাধ্যতা, কত দীর্ঘ অহংকার, কত নির্মম আত্মপ্রবঞ্চনা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। সূরা ইউনুসের এ আয়াতে ফিরআউনের মুখে উচ্চারিত শেষ অনুতাপের জবাব আসে এমন এক ভঙ্গিতে, যা মানুষের অন্তরকে কাঁপিয়ে তোলে: এখন বলছ, অথচ এর আগে তুমি সত্যকে অস্বীকার করেছ, নাফরমানি করেছ, আর ফাসাদের পথেই ছিলে। অর্থাৎ আযাব যখন ঘাড়ের ওপর এসে পড়ে, তখন উচ্চারিত অনুশোচনা আর জীবন্ত ঈমান এক জিনিস থাকে না। মুখে ‘বিশ্বাস’ এলেও, হৃদয়ের সেই নরম হওয়া যে আগে ঘটেনি, তা-ই এখানে নগ্ন হয়ে যায়।
এ আয়াত কেবল ফিরআউনের কাহিনি নয়; এটি প্রতিটি অহংকারী হৃদয়ের আয়না। সে ক্ষমতাকে সত্য ভেবেছিল, নিজের নিরাপত্তাকে স্থায়িত্ব ভেবেছিল, আর মানুষকে তুচ্ছ করে আল্লাহর সীমাকে অতিক্রম করেছিল। কিন্তু যখন পানির গর্জনে, ডুবে যাওয়ার হিম শীতলতায়, আর মৃত্যু-দরজার অন্ধকারে সব মিথ্যা সরে গেল, তখন তার মুখে সত্যের স্বীকারোক্তি এল—তবু তা আর মুক্তির দরজা খুলল না। এখানে শিক্ষা এই যে, তাওবা আল্লাহর রহমতের দরজা, কিন্তু সেই দরজাও খুলে থাকে জীবনের সুযোগে; আযাবের দৃশ্য দেখে, গলায় প্রাণ থেমে যাওয়ার ঠিক আগে যে অনুশোচনা জাগে, তা অনেক সময় কেবল বিলম্বিত ভয়ের আর্তি হয়ে থাকে।
সূরার বৃহত্তর ধারাবাহিকতায় এ কথা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ সূরা ইউনুস বারবার তাওহীদ, রিসালাত, কুরআনের সত্যতা, কিয়ামত এবং পূর্ববর্তী জাতিগুলোর পরিণতির কথা স্মরণ করায়। এখানে ফিরআউনের ঘটনা আল্লাহর ন্যায়বিচারের এক জীবন্ত নিদর্শন: যিনি সত্যকে দমন করেন, যিনি মানুষকে বিভ্রান্ত করেন, যিনি সীমালঙ্ঘনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন—শেষে তিনি নিজেই নিজের অন্তিম অবস্থা দেখে কেঁপে ওঠেন। কিন্তু সেই কাঁপুনি যদি আগে হতো, সেই নরমতা যদি অন্ধ অহংকারের আগেই আসত, তবে চিত্রটি অন্যরকম হতে পারত। তাই এই আয়াত শুধু শাস্তির ভয় দেখায় না; এটি আল্লাহর রহমতেরও গভীর দিক খুলে দেয়—যে রহমত জীবিত হৃদয়কে আগেই জাগিয়ে তোলে, যাতে মৃত্যুর ঠিক আগে নয়, জীবনের মাঝেই মানুষ ফিরে আসে।
‘এখন?’—এই প্রশ্নের ভেতরে শুধু বিস্ময় নেই, আছে মানুষের সমস্ত দেরির হিসাব। যে হৃদয় সত্যকে বারবার ঠেলে সরিয়েছে, যে অন্তর আলোর ডাক শুনেও অন্ধকারকেই আঁকড়ে ধরেছে, তার শেষ মুহূর্তের কাঁপা কণ্ঠ তাওবার নাম নিতে পারে; কিন্তু সে তাওবা আর আগের জীবনের সাক্ষ্যকে মুছে ফেলতে পারে না। আয়াতটি যেন আমাদের কানে বলে, অবাধ্যতা যখন অভ্যাস হয়ে যায়, পাপ যখন চরিত্রে পরিণত হয়, তখন সংকটের সময়ে উচ্চারিত অনুতাপও অনেক সময় কেবল আতঙ্কের ভাষা হয়ে থাকে, ঈমানের নয়।
এ আয়াতের ভেতর আল্লাহর ন্যায় যেমন ভয় জাগায়, তেমনি রহমতের দিকটাও গভীরভাবে স্পর্শ করে। কারণ সতর্কবার্তা আসলে নিষ্ঠুরতা নয়; বরং জীবনের আগেই জাগিয়ে দেওয়ার করুণা। যিনি এখনো শ্বাস নিচ্ছেন, তাঁর সামনে এখনো দরজা খোলা—তাই এই ‘এখন’ শব্দটিই আমাদের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর ও সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক। ভয়ংকর, যদি আমরা দেরি করি; আশাব্যঞ্জক, যদি আজই ফিরে আসি। আল্লাহ মানুষের অন্তরকে ডুবিয়ে দিতে চান না, তিনি চান মানুষ ডোবার আগেই সমুদ্রের স্রোত বুঝে ফিরুক—তাওহীদের দিকে, বিনয়ের দিকে, সেই সত্যের দিকে, যা দুনিয়ার সব অহংকারের চেয়ে অধিক স্থায়ী।
“এখন?”—এই এক শব্দের ভেতরেই লুকিয়ে আছে মানুষের চিরন্তন বিভ্রমের ভাঙন। যখন মৃত্যু একেবারে কাছে এসে দাঁড়ায়, যখন সমুদ্রের অন্ধকার, দমবন্ধ ভয়ের চাপ, আর শ্বাসরুদ্ধ সত্য মানুষকে ঘিরে ফেলে, তখন উচ্চারিত অনুতাপ আর আগের জীবনের ঈমান এক জিনিস থাকে না। ফিরআউনের মুখে এই জবাব যেন আসমানি আদালতের কঠিন ঘোষণা: তুমি আগে অবাধ্য ছিলে, আগে ফাসাদের পথেই ছিলে; সত্যকে তুমি অবসরে গ্রহণ করোনি, বরং সংকটের শেষ প্রান্তে এসে কেবল উচ্চারণ করেছ। মানুষের অন্তর কত আশ্চর্য—সুস্থ দেহে সে সত্যকে ঠেলে দেয়, আর বিপদ এলে সত্যকে ডেকে আনে; অথচ আল্লাহর দরবারে সময়মতো ফিরে আসাই মুক্তি, শেষ মুহূর্তের আর্তনাদ নয়।
এই আয়াত আমাদের সমাজকেও আয়নার সামনে দাঁড় করায়। কত ক্ষমতা, কত দাপট, কত আত্মম্ভরিতা মানুষকে ফেরাউনসুলভ করে তোলে—নিজেকে বড় ভাবতে ভাবতে সে ন্যায়ের সীমা ভেঙে ফেলে, মানুষের হক নষ্ট করে, আল্লাহর নির্দেশকে হালকা করে দেখে। তারপর যখন হিসাবের ঘনঘটা নেমে আসে, তখন ভাষা বদলায়, মুখ নরম হয়, চোখ ভিজে ওঠে; কিন্তু যে হৃদয় জীবদ্দশায় নরম হয়নি, সে কান্না অনেক সময় কেবল ভয়, তাওবা নয়। এ কারণেই এই আয়াত ভয় জাগায়, আবার আশা জাগায়ও: আল্লাহ জুলুমকারীকে সুযোগ দেন, কিন্তু অবশেষে সত্যকে এমনভাবে প্রকাশ করেন যে মিথ্যা নিজেরই ওজনে ভেঙে পড়ে।
তবু এই ভাঙনের মধ্যেও মুমিনের জন্য পথ রয়ে যায়। কারণ আল্লাহর রহমত মানুষকে নিঃশেষ করতে নয়, ফিরিয়ে আনতে চায়—শুধু সে ফেরা যেন সময় থাকতে হয়, অহংকার ভাঙার আগেই হয়, আযাবের দরজা বন্ধ হওয়ার আগেই হয়। সূরা ইউনুস আমাদের শেখায়, তাওহীদের সামনে শেষ পর্যন্ত সব শক্তি তুচ্ছ, সব দাবি মিথ্যা, সব আত্মগরিমা ধুলো; আর মানুষ যখন সত্যকে সত্য হিসেবে চিনে নেয়, তখনই তার মুক্তি শুরু হয়। এই আয়াত তাই কেবল ফিরআউনের পরিণতি নয়—এ আমাদের প্রত্যেকের জন্য নীরব সতর্কবার্তা: দেরি কোরো না, কারণ ‘এখন’ অনেক সময় এমন একটি শব্দ, যার পরে আর ফিরে আসার সময় থাকে না।
মানুষ কত সহজে নিজের শক্তিকে স্থায়িত্ব ভাবে, ক্ষমতাকে নিরাপত্তা ভাবে, আর অবাধ্যতাকে সাময়িক বলে ভুলে থাকে। অথচ এই আয়াত সেই ভ্রান্তির উপর শেষ আঘাত। যে ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শন দেখে জেদে অটল থাকে, যে ব্যক্তি সতর্কবার্তাকে উপহাস করে, যে ব্যক্তি অন্যায়কে অভ্যাস বানায়, তার জন্য অনুতাপের মুহূর্তও একদিন আসতে পারে—কিন্তু তখন অনুতাপের ভাষা থাকবে, তাওবার প্রাণ থাকবে না। এখানেই আল্লাহর ন্যায়বিচারের কঠোর সৌন্দর্য আছে: তিনি আগে থেকেই হুঁশিয়ার করেন, বারবার ডাকেন, রহমতের দরজা খোলা রাখেন; কিন্তু যখন মানুষ নিজেই সে দরজার দিকে পিঠ ফেরায়, তখন তার চূড়ান্ত ফাঁকি তাকে রক্ষা করতে পারে না।
তাই সূরা ইউনুসের এই শেষ সতর্কবাক্য শুধু ফিরআউনের জন্য নয়, আমাদের প্রত্যেকের জন্য। আমাদের অন্তরে যেন এমন এক ভীতি জাগে, যা অহংকার ভাঙে, আর এমন এক আশা জাগে, যা হতাশার আগে সিজদায় নামায়। আজও যদি হৃদয় নরম থাকে, আজও যদি চোখে অশ্রু আসে, আজও যদি মুখে ইস্তিগফার ওঠে, তবে তা আল্লাহর মহা রহমতেরই আলামত। কিন্তু যদি আজও আমরা সত্য জেনেও পিছিয়ে যাই, তবে কাল ‘এখন’ বলে কোনো লাভ থাকবে না। হে রব, আমাদের তাওবা দেরি করাবেন না; আমাদের অন্তরকে জীবিত করুন, আমাদের অবাধ্যতাকে ভেঙে দিন, আর আমাদের এমন মৃত্যুর আগেই ফিরিয়ে নিন, যখন ফিরতি দরজা এখনো খোলা থাকে।