হাশরের ময়দানে একদিন এমন এক প্রশ্ন উঠবে, যা মানুষের সব অহংকারকে নিঃস্ব করে দেবে: “হে আমার রব, আমাকে কেন অন্ধ অবস্থায় উঠালেন, অথচ আমি তো দুনিয়ায় দেখতাম?” এ প্রশ্ন কেবল চোখের অন্ধত্বের নয়; এ প্রশ্ন অন্তরের সেই শূন্যতার, যা সত্যকে জেনেও তাকে ধারণ করেনি। দুনিয়ার আলো ছিল, পথও ছিল, সতর্কবার্তাও ছিল; কিন্তু যে অন্তর আল্লাহর স্মরণে জাগেনি, তার চোখের দেখা শেষ পর্যন্ত মুক্তি দেয় না। তখন মানুষ বুঝবে—দেখা আর বোঝা এক জিনিস নয়, আর স্মরণহীন দৃষ্টি অনেক সময় আখিরাতে সবচেয়ে বড় পর্দা হয়ে দাঁড়ায়।
সূরা ত্বহার এই প্রসঙ্গটি মূসা আলাইহিস সালামের দাওয়াত, তাওহীদের আহ্বান, আর মানুষের অন্তরকে সজাগ করার দীর্ঘ আখ্যানের ভেতরে আসে। এ সূরায় বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে, যে রব মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, পথ দেখিয়েছেন, কথা বলেছেন, বিধান দিয়েছেন, তিনিই একমাত্র উপাস্য। কিন্তু মানুষ যখন সেই ডাকে পিঠ ফেরায়, তখন দুনিয়ার স্বচ্ছতা আখিরাতের অন্ধকার ঠেকাতে পারে না। এখানে কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনা নয়, বরং হাশর ও জবাবদিহির সেই চিরন্তন দৃশ্যকে সামনে আনা হয়েছে—যেখানে বান্দা নিজের অবস্থার সত্য কারণ নিজেই প্রকাশ করে দেয়। আক্ষেপের ভাষা তখন কেবল অভিশপ্ত পরিণতির ধ্বনি নয়; তা হয়ে ওঠে জীবিতদের জন্য এক কঠোর সতর্কতা।
এই আয়াতের ভেতরে এক হৃদয়বিদারক শিক্ষা লুকিয়ে আছে: মানুষ যদি আল্লাহকে ভুলে থাকে, তবে সে দুনিয়ায় যতই দৃষ্টি-সম্পন্ন হোক, অন্তরে অন্ধত্ব জন্ম নিতে থাকে। আর সেই অন্ধত্বের শেকড় আখিরাতে প্রকাশ পেলে, অভিযোগের কোনো ভাষাই তাকে বাঁচাতে পারবে না। তাই আজকের দিনই হলো স্মরণ ফেরানোর দিন, আলোর দিকে মুখ ফেরানোর দিন। যে অন্তর আজ আল্লাহর কালাম, সালাত, তাওবা আর একত্ববাদের আলোয় নরম হয়, সে-ই কিয়ামতের দিনে অন্ধতার আতঙ্কে ভাঙবে না। কারণ হাশরের মাঠে সত্যিকারের বাশীরতা চোখে নয়, ঈমানে—আর সে ঈমান জেগে ওঠে আল্লাহকে মনে রাখার মাধ্যমে।
হাশরের মাঠে এই আর্তনাদ যেন মানুষের ভেতরের আসল দারিদ্র্যকে উন্মোচন করে দেয়। দুনিয়ার চোখ ছিল, কিন্তু অন্তর ছিল কি? আলো দেখেছিল, কিন্তু হিদায়াত চিনেছিল কি? মানুষ কত কিছু দেখে; পাহাড়, নদী, মুখ, পথ, সময়—কিন্তু আল্লাহর নিদর্শনের ভেতরে যে ডাক লুকিয়ে থাকে, তা যদি হৃদয় না শোনে, তবে দেখার এই ক্ষমতাও একদিন অভিযোগে পরিণত হয়। তখন বোঝা যায়, অন্ধত্ব শুধু দৃষ্টির নয়; সত্যকে ফিরিয়ে দেওয়ারও নাম অন্ধত্ব। যে হৃদয় স্মরণকে হারিয়েছে, সে চোখ মেলে থেকেও পর্দার বাইরে যেতে পারে না।
সূরা ত্বহার এই আয়াত আমাদের আজই জাগিয়ে দেয়—চোখের দৃষ্টি নয়, অন্তরের বশিরতাই আসল সম্পদ। আল্লাহর স্মরণে যে হৃদয় সজীব হয়, সে দুনিয়ার অন্ধকারেও পথ চিনে নেয়; আর স্মরণহীন হৃদয় দুনিয়ার আলোর মাঝেও পথ হারায়। তাই এই আয়াত কেবল ভবিষ্যতের ভয় নয়, বর্তমানের করুণ জাগরণ। আজ যদি আমরা আল্লাহকে স্মরণ করি, কুরআনের আহ্বানকে আপন করে নিই, তাওহীদের আলোয় নিজেকে শোধরাই, তবে হাশরের দিন অন্ধত্বের আর্তনাদ আমাদের ভাগ্য হবে না। সেদিনের অন্ধকার ঠেকাতে হলে আজই অন্তরের জানালা খুলতে হবে, কারণ যে হৃদয় এখানে রবকে চিনে, সেখানে তার পথ হারায় না।
হাশরের ময়দানে যখন মানুষ নিজের জীবনকে একবার সম্পূর্ণ নগ্ন সত্যের সামনে দাঁড় করানো দেখবে, তখন এই আর্ত প্রশ্নটি তার অন্তর থেকে উঠে আসবে—হে আমার রব, আমাকে কেন অন্ধ অবস্থায় উঠালেন, অথচ আমি তো দুনিয়ায় দেখতাম? এ অন্ধত্ব চোখের নয়, এ অন্ধত্ব সেই হৃদয়ের, যে হৃদয় সত্য দেখেও তা গ্রহণ করেনি, হিদায়াতের আলো পেয়েও তাকে সঞ্চয় করেনি। দুনিয়ায় যার দৃষ্টি ছিল, ভাষা ছিল, সুযোগ ছিল, উপদেশও ছিল; কিন্তু আল্লাহর স্মরণকে জীবনের কেন্দ্র বানায়নি—তার জন্য আখিরাতে দৃষ্টি থাকা সত্ত্বেও পথ হারানোই হবে সবচেয়ে তীব্র অপমান।
মানুষ অনেক কিছু দেখে, কিন্তু সব দেখা জাগিয়ে তোলে না; আবার কেউ খুব কম দেখে, তবু তার অন্তর আল্লাহর নূরে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সূরা ত্বহা-র এই আয়াত আমাদের শেখায়, বাহ্যিক দৃষ্টি শেষ পর্যন্ত কাজ দেয় না যদি অন্তরের চোখ অন্ধ হয়ে থাকে। যে সমাজে দুনিয়ার চাকচিক্য মানুষকে মোহিত করে, যেখানে অহংকার সত্যের কণ্ঠ রোধ করে, যেখানে গাফলতি ইবাদতকে দুর্বল করে দেয়—সেখানে এই আয়াত এক নির্মম আয়না। আজ যে রবের ডাকে সাড়া দেয় না, কাল সে নিজেকেই অপরিচিত মনে করবে।
তবু এই ভয় আশাহীনতার জন্য নয়; বরং জেগে ওঠার জন্য। কুরআন আমাদেরকে প্রতিদিন স্মরণ করিয়ে দেয়—দৃষ্টি মানে কেবল দেখা নয়, দৃষ্টি মানে সত্যকে চিনে নেওয়া, তার কাছে নত হওয়া, আল্লাহর দিকে ফিরে আসা। যে হৃদয় আজ কাঁদে, তাওবা করে, স্মরণে নরম হয়, সে-ই আখিরাতের অন্ধত্ব থেকে রক্ষা পেতে পারে। তাই এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষকে নিজের কাছে ফিরে আসতে হয়: আমি কি সত্যিই দেখছি, নাকি কেবল চোখে আলো বহন করছি? আমি কি আল্লাহকে স্মরণ করছি, নাকি স্মরণহীনতার অন্ধকারে ধীরে ধীরে নিজের পরিণতি লিখে চলেছি?
তাই আজই নিজেদের জিজ্ঞেস করা দরকার—আমার দৃষ্টি কি আমাকে আল্লাহর দিকে টেনে নিচ্ছে, নাকি আমাকে আরও দূরে ঠেলে দিচ্ছে? আমার স্মৃতি কি রবকে ডেকে, নাকি দুনিয়াকে মোহের মতো জড়িয়ে ধরে? সূরা ত্বহা আমাদের মূসা আলাইহিস সালামের ডাকে ফিরিয়ে আনে, তাওহীদের নির্মল সত্যের দিকে ফেরায়, আর মনে করিয়ে দেয়: যে রব সৃষ্টি করেছেন, তিনি পথও দেখান; যে রব কথা বলেছেন, তিনি জবাবদিহির দিনে নীরব থাকবেন না। সেই দিনে নূর চাওয়া যাবে, কিন্তু নূরের বীজ বুনতে হবে আজই—তওবা দিয়ে, ইখলাস দিয়ে, নামাজের ভিজে সিজদায়, কুরআনের সামনে ভাঙা হৃদয়ে।
হে আমার রব, আমাদের এমন অন্ধ করে তুলো না যেন আমরা সত্যকে জেনেও চিনতে না পারি, ডাক শুনেও ফিরে না আসি, আলো হাতে পেয়েও ছায়াকে বেছে নিই। আমাদের দৃষ্টি, স্মৃতি, অন্তর—সবকিছুকে তোমার যিকিরে জীবিত করে দাও। কারণ শেষ বিচারের দিনে সবচেয়ে বড় সম্পদ চোখের জ্যোতি নয়, বরং তোমার সন্তুষ্টির নূর। আর যে হৃদয় দুনিয়ায় আল্লাহকে স্মরণ করে কেঁপেছে, সে হৃদয়ই হাশরের আতঙ্কে একদিন শান্তির পথ খুঁজে পাবে।