আল্লাহ বলেন, কোনো জনপদকে তিনি এমনিই ধ্বংস করেননি; তার আগে সেখানে ছিল সতর্ককারী। এ এক অমোঘ সত্য—অবহেলার অন্ধকার যতই ঘন হোক, তার আগে রহমতের আলো এসে পড়ে। মানুষ যেন বলতে না পারে, “আমাদের তো কিছুই বলা হয়নি।” না, বলা হয়েছিল। হৃদয়কে নরম করার জন্য কণ্ঠ এসেছিল, বিবেককে জাগানোর জন্য আহ্বান এসেছিল, সত্যকে চিনিয়ে দেওয়ার জন্য সতর্কবার্তা এসেছিল। ধ্বংসের ঘটনা হঠাৎ মনে হলেও, আল্লাহর ন্যায়বিচারে তা হঠাৎ নয়; তার আগে ছিল দাওয়াত, ছিল সুযোগ, ছিল ফিরে আসার দরজা।
সূরা আশ-শুআরার এই পর্বে বারবার নবীদের কাহিনি, তাদের দাওয়াত, এবং সত্য অস্বীকারকারী জাতির পরিণতি সামনে আনা হয়েছে। এখানে নির্দিষ্ট কোনো একক ঐতিহাসিক ঘটনার নামে কথা বলা হয়নি; বরং এটি এক সার্বজনীন আইন—আল্লাহ কাউকে পাকড়াও করার আগে তার কাছে হক পৌঁছে দেন, হেদায়াতের পথ খুলে দেন, সতর্ককারী প্রেরণ করেন। কখনো নবীর কণ্ঠে, কখনো ওহির বাণীতে, কখনো জীবনের ভাঙন-জাগানিয়া ঘটনাপ্রবাহে মানুষকে জাগিয়ে তোলা হয়। তাই এ আয়াত কেবল অতীতের ধ্বংসস্তূপের কথা বলে না; এটি আজকের হৃদয়কেও প্রশ্ন করে—তোমার কাছে কি সতর্কবার্তা পৌঁছায়নি?
এই আয়াতের ভেতরে আল্লাহর ন্যায় যেমন প্রকাশিত, তেমনি প্রকাশিত তাঁর করুণাও। তিনি অবহেলাকে শাস্তির কারণ বানান ঠিকই, কিন্তু আগে মানুষকে অজুহাতহীন করার জন্য পথ দেখান। এ যেন মুমিনের হৃদয়ে ভয় ও আশার দুটো দরজা একসঙ্গে খুলে দেওয়া—ভয়, এই জন্য যে সত্যের ডাক উপেক্ষা করা বিপজ্জনক; আর আশা, এই জন্য যে আল্লাহ অন্ধকারে নিক্ষেপ করার আগে আলো পাঠান। যে জাতি সতর্কবার্তা পেয়ে জেগে ওঠে, সে রহমতের ছায়ায় আশ্রয় পায়; আর যে বারবার ডাকে সাড়া না দিয়ে পাথরের মতো স্থির থাকে, তার পতন আসলে নিজেরই বাছাই করা অন্ধত্বের ফল।
যে জনপদ আজ ধ্বংসের গল্প হয়ে আছে, তার ভেতর একদিন মানুষের মতো মানুষেরাই হাঁটত; হাসি ছিল, ব্যবসা ছিল, গৃহস্থালি ছিল, নিজের সময়কে চিরস্থায়ী ভাবার ভুলটাও ছিল। কিন্তু আল্লাহর ন্যায় এমন নয় যে, হঠাৎ আকাশ ফেটে নেমে আসে এবং মানুষের কাছে কৈফিয়তহীন হয়ে যায়। তিনি আগে পাঠান সতর্ককারী, আগে জাগিয়ে তোলেন, আগে দরজায় কড়া নাড়েন। যেন অন্ধকারকে অন্ধকার বলার আগেই আলো এসে দাঁড়ায়। যেন কেউ পরে বলতে না পারে, আমরা জানতাম না; আমাদের কাছে সত্য পৌঁছেনি। এই আয়াতে সেই রহমতের কঠিন সৌন্দর্য আছে—কঠিন, কারণ এতে দায়িত্বের বোঝা; সৌন্দর্য, কারণ এতে অবকাশ, তাওবা, ফিরে আসার সুযোগ।
এই আয়াত আমাদের নিজেদের জীবনেও অদ্ভুতভাবে নেমে আসে। আমরা কি ভাবি, আমাদের সময়ের শহর, ঘর, সম্পর্ক, পরিকল্পনা—সবই নিরাপদ, সবই স্থায়ী? অথচ আল্লাহর ন্যায় এমন সূক্ষ্ম যে, তিনি মানুষকে প্রথমে ডেকে নেন, তারপরও যদি হৃদয় না নড়ে, তখনই পরিণতি এসে দাঁড়ায়। তাই সতর্কবার্তা আসা কোনো শাস্তি নয়; তা শাস্তি ঠেকানোর সুযোগ। কোরআনের কণ্ঠ আমাদের আজও সেই দরজার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়: শুনবে কি, নরম হবে কি, ফিরে আসবে কি? ধ্বংসের আগে যে সতর্ককারী আসে, তিনি কেবল অতীতের জাতিদের জন্য নন; তিনি আজও আমাদের ভেতরের ঘুমন্ত আত্মার দিকে আঙুল তুলে বলেন—এখনো সময় আছে, এখনো ফিরে আসা যায়।
আল্লাহর এই ঘোষণা আমাদের ভেতরের অজুহাতের দরজাগুলো একে একে বন্ধ করে দেয়। মানুষ কত সহজে বলে, “আমরা জানতাম না”, “আমাদের কেউ শোনায়নি”, “আমাদের সামনে সত্য স্পষ্ট ছিল না।” কিন্তু এই আয়াত সেই আত্মপ্রবঞ্চনার মুখে সত্যের দীপ্তি জ্বেলে দেয়। কোনো জনপদ হঠাৎ অন্ধকারে ডুবে যায়নি; তার আগে সেখানে এসেছে সতর্ককারী। এসেছে এমন এক কণ্ঠ, যা মানুষকে ধ্বংসের আগে জাগাতে চেয়েছে, পাপের আগে কাঁপিয়ে দিতে চেয়েছে, গাফিলতির ঘুম ভাঙাতে চেয়েছে। এভাবেই আল্লাহর রহমত কাজ করে—প্রথমে সতর্কতা, তারপর সুযোগ, তারপরও যদি অন্তর পাথর হয়ে থাকে, তখনই আসে ন্যায়বিচারের কঠিন রায়।
তাই এই আয়াত কেবল অতীত জাতির জন্য নয়; এটি আজকের সমাজের আয়না। আমাদের চারপাশেও কত “জনপদ” আছে—ঘর, পরিবার, মহল্লা, প্রতিষ্ঠান, মন—যেখানে সতর্কবার্তা বারবার এসে ধাক্কা দেয়, কিন্তু কান সাড়া দেয় না, বিবেক জেগে ওঠে না। কুরআন যখন বলে ধ্বংসের আগে সতর্ককারী ছিল, তখন তা আমাদেরকে ভয় ও আশা—দু’টিই একসঙ্গে দেয়। ভয়, এই জন্য যে অবহেলা জমতে জমতে বিপর্যয় ডেকে আনে; আশা, এই জন্য যে এখনো দরজা খোলা, এখনো ফিরতে দেরি হয়নি, এখনো আল্লাহ বান্দাকে জাগাতে চান। যে হৃদয় আজ নরম হয়, সে ধ্বংসের আগে রক্ষা পায়; যে চোখ আজ অশ্রু ফেলে, সে কালকের আগুন থেকে বাঁচতে পারে। এই আয়াত তাই আমাদের অন্তরকে বলে: সতর্কবার্তাকে উপেক্ষা কোরো না, কারণ আল্লাহর ন্যায় যেমন সত্য, তাঁর রহমতও তেমনি সত্য—আর সেই রহমতের প্রথম চিহ্নই হলো, তিনি আগে থেকেই মানুষকে ডেকে দেন।
কত বিস্ময়কর আল্লাহর ন্যায়! তিনি শাস্তি দেন, কিন্তু তার আগে দরজা বন্ধ করেন না; তিনি পাকড়াও করেন, কিন্তু তার আগে সতর্ক করেন। এই আয়াত আমাদের ভেতরের সেই অজুহাতকে ভেঙে দেয়, যা বলে—আমি জানতাম না, আমাকে কেউ বলেনি। না, আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্য এমনভাবে পৌঁছে যায় যে আত্মা আর সম্পূর্ণ অন্ধকারে থাকে না। কোনো জনপদ, কোনো সমাজ, কোনো হৃদয়কে তিনি হঠাৎ অন্ধকারে নিক্ষেপ করেন না; আলো আসে, কণ্ঠ আসে, উপদেশ আসে, তারপরও যদি মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে ধ্বংস আর কেবল একটি পরিণতি হয়ে দাঁড়ায়।
আজকের মানুষের জন্যও এ বাণী তীক্ষ্ণ আয়নার মতো। আমরা কতবার শুনেও শুনি না, কতবার বুঝেও বুঝতে চাই না, কতবার সতর্ক হয়েও হৃদয় শক্ত করে ফেলি। অথচ আল্লাহর রহমত এইখানেই যে, তিনি আমাদের আগে থেকেই ডাকেন; তাঁর সতর্কবার্তা আমাদেরকে ভয় দেখাতে নয়, ফিরিয়ে আনতে আসে। তাই এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে মাথা নত হয়—হে রব, আমাদের এমন বানিয়ে দিন না যে আমরা নসিহতকে উপেক্ষা করে ধ্বংসকে নিজের হাতে ডেকে আনি। আমাদের অন্তরকে এমন নরম করুন, যেন আপনার সতর্ককারী কণ্ঠ শোনামাত্রই আমরা ফিরে আসতে পারি; কারণ আপনার ন্যায় কঠোর, আর আপনার রহমত তার চেয়েও অধিক বিস্তৃত।