কত অদ্ভুত মানুষের ভরসা! যে জীবনকে সে ধরে নেয়, যে সুখকে সে আঁকড়ে থাকে, যে আরামকে সে নিজের দুর্গ মনে করে—আল্লাহর সামনে তা কতটা ক্ষণস্থায়ী, এই এক আয়াত যেন সে সত্যটি নিঃশব্দে কিন্তু কঠিনভাবে জানিয়ে দেয়। “তখন তাদের ভোগ-বিলাস তা তাদের কি কোনো উপকারে আসবে?”—এখানে প্রশ্নটি শুধু অতীতের কোনো এক জাতির জন্য নয়; এটি প্রতিটি হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়া। যখন সত্যকে অস্বীকার করা হয়, নবীদের আহ্বানকে উপহাস করা হয়, আর মানুষ বিলাসের নেশায় বিবেককে চুপ করিয়ে রাখে, তখন সেই সব আরাম, সেই সব উপকরণ, সেই সব সাময়িক রঙিনতা কি মৃত্যুর সামনে, বিচারের সামনে, আল্লাহর ন্যায়ের সামনে একবিন্দু দাঁড়াতে পারে?

সূরা আশ-শুআরার এই অংশে বারবার নবীদের কাহিনি এসেছে—একই সত্য, একই দাওয়াত, একই হুঁশিয়ারি। তাদের জাতিরা বলেছে, মিথ্যা, কাব্য, জাদু, কল্পনা; আর নিজেদের স্বাচ্ছন্দ্য, ক্ষমতা, সমৃদ্ধি, ভোগ-বিলাসকে ঢাল বানিয়ে সত্যকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। এই আয়াত সেই ভ্রান্ত আত্মবিশ্বাসের পরিণতি মনে করিয়ে দেয়। বাহ্যিক উন্নতি, ভোগের প্রাচুর্য, আরাম-আয়েশের মায়া মানুষকে কিছু সময়ের জন্য মোহিত করতে পারে; কিন্তু আল্লাহর সত্যের সামনে তা কেবল ছায়া, কেবল ধার করা আলো। অবাধ্যতার সাথে মিশে থাকা সম্পদ ও বিলাস শেষ বিচারে রক্ষাকবচ নয়; বরং অনেক সময় তা আরও ভারী জবাবদিহির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এই আয়াতের মর্মে কোনো নির্দিষ্ট এক ঘটনার সীমা নেই; বরং এটি পূর্ববর্তী অস্বীকারকারীদের সামষ্টিক পরিণতির সারকথা। কেউ যদি নবীদের সতর্কবাণী শুনেও মনে করে, “আমার শান্তিই আমার নিরাপত্তা”, “আমার আরামই আমার সত্য”, তাহলে সে নিজেরই ক্ষণস্থায়ী সুখকে চূড়ান্ত আশ্রয় বানাচ্ছে। কিন্তু কবরের নীরবতা, হাশরের ভয়, আর আল্লাহর ন্যায়ের সামনে সেই ভোগ-বিলাস কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। সত্যের আলোকে যে জীবন গড়ে ওঠে, সেটাই স্থায়ী; আর যে জীবন ভোগের জালে আটকে যায়, তার আরাম একদিন তারই বিরুদ্ধে সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। এই আয়াত আমাদের অন্তরকে জাগিয়ে বলে—যা কিছু আজ উপভোগ করছি, তা দিয়ে যেন সত্যকে ঠেকাতে না চাই; কারণ আল্লাহর কাছে উপকারী কেবল সেই হৃদয়, যা তাঁর সামনে নত হয়।

মানুষ যখন সত্যের ডাক শুনে কান বন্ধ করে, তখন সে মনে করে তার চারপাশের আরাম-আয়েশই তার নিরাপত্তা। ঘর, ধন, আসবাব, ভোগ, সম্মান, আসক্তির জাল—এসবকে সে জীবনরক্ষার দেয়াল ভেবে বসে। কিন্তু এই আয়াত নির্দয়ভাবে সেই ভুলের পর্দা সরিয়ে দেয়: যা তাকে কিছু সময় ভোগের সুযোগ দিয়েছে, তা কি সত্যিই তাকে রক্ষা করতে পেরেছিল? ভোগ মানুষকে বাঁচায় না; ভোগ শুধু মানুষকে ভুলিয়ে রাখে। আর ভুলে থাকার মেয়াদ যতই দীর্ঘ হোক, মৃত্যুর একটিমাত্র নিঃশ্বাস তার সব হিসাব উল্টে দেয়। তখন বিলাসের মোলায়েমতা আর থাকে না, থাকে শুধু খালি হাত, খালি অন্তর, আর আল্লাহর সামনে অনাবৃত সত্য।

এখানে একটি গভীর শিক্ষা আছে—আল্লাহর বিরোধিতার সঙ্গে সুখের সম্পর্ক নেই, আর হককে অস্বীকার করেও কেউ স্থায়ী নিরাপত্তা অর্জন করতে পারে না। কুরআন বারবার নবীদের কাহিনিতে দেখায়, সত্যের আহ্বান সব যুগে এক, আর মানুষের অজুহাতও প্রায় এক: আজকের আনন্দ, আজকের স্বাচ্ছন্দ্য, আজকের প্রাচুর্য। কিন্তু যে অন্তর নিজের ভোগকে ইমানের চেয়ে বড় মনে করে, সে ধীরে ধীরে নিজেকেই ঠকায়। কারণ ভোগের কাজ আনন্দ দেওয়া; মুক্তি দেওয়া নয়। শান্তির ছদ্মবেশে সে মানুষকে ঘুম পাড়ায়, কিন্তু জাগরণের দিনে তাকে নিঃস্ব করে ফেলে।
এই আয়াত তাই এক নীরব প্রলয়ধ্বনি। এতে আল্লাহ যেন আমাদের অন্তরকে জিজ্ঞেস করছেন: যে সুখ তোমাকে আমার দিকে ফিরতে দেয় না, তা কি তোমার কাজের? যে আরাম তোমাকে সত্যের সামনে অবনত হতে শেখায় না, তা কি তোমার পাথেয়? মানুষ যতক্ষণ দুনিয়ার আলোকে চূড়ান্ত ভেবে নেয়, ততক্ষণ তার চোখে এই প্রশ্ন তীব্র লাগে না। কিন্তু যেই মৃত্যু দরজায় কড়া নাড়ে, যেই হিসাবের ময়দান সামনে ভেসে ওঠে, তখন বোঝা যায়—ভোগ ছিল ক্ষণিকের পর্দা, সত্যই ছিল স্থায়ী আশ্রয়।

মানুষের সবচেয়ে বড় প্রতারণা অনেক সময় এইখানেই—সে ভাবে, যতদিন ভোগ আছে, ততদিন নিরাপত্তা আছে; যতদিন আরাম আছে, ততদিন সত্যকে এড়িয়ে চলা যায়। কিন্তু এই আয়াত সেই মায়াকে এক আঘাতে ভেঙে দেয়। যা তাদের দেওয়া হচ্ছিল, যা তারা ভোগ করছিল, যা দিয়ে তারা নিজেদের জীবনকে রঙিন মনে করছিল—আল্লাহর সামনে তার একটুও ওজন থাকল না। নবীদের আহ্বানকে অস্বীকার করে যে সমাজ বিলাসে ডুবে থাকে, তার ভিতরে বাইরে যতই জৌলুশ থাকুক, অন্তরে সে আসলে শূন্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।

এই প্রশ্নটি শুধু অতীতের কোনো এক জাতির জন্য নয়; এটি আজকের মানুষের বিবেকের কাছেও পৌঁছে যায়। আমাদের সম্পদ, অবস্থান, আরাম, আনন্দ, প্রশংসা, সুযোগ—এসব কি সত্যকে বাঁচাতে পারে? যদি হৃদয় আল্লাহ থেকে দূরে সরে যায়, তবে ভোগের পাহারায় সেই হৃদয়কে কে রক্ষা করবে? মানুষ অনেক সময় নিজের হাতে গড়া স্বস্তিকে নিরাপদ ভেবে নেয়, অথচ মৃত্যু এসে নিঃশব্দে জানিয়ে দেয়—সবই ছিল সাময়িক আশ্রয়, চূড়ান্ত আশ্রয় নয়।

তাই এই আয়াত আমাদের আত্মসমালোচনার দিকে ডাকে। যে জীবন বাহ্যত সফল, কিন্তু আল্লাহর স্মরণ থেকে শূন্য, সে জীবনের পরিণতি কত ভয়ংকর! আবার যে অন্তর ভেঙে পড়ে, তবু সত্যের কাছে ফিরে আসে, তার জন্য এই ভয়ই রহমতের দরজা খুলে দেয়। আজও প্রতিটি হৃদয়ের সামনে একই প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে—আমরা কি ভোগের নেশায় সত্যকে ভুলে থাকব, নাকি আল্লাহর সামনে নিজের ক্ষণস্থায়ী অবস্থান বুঝে নরম হৃদয়ে ফিরে আসব? কারণ শেষ পর্যন্ত আরাম রক্ষা করবে না; রক্ষা করবে কেবল সেই ঈমান, যা সত্যকে সত্য বলে মানে, আর নিজেকে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করে।

মানুষ যখন সত্যের ডাক শুনেও আরামের নরম বিছানাকে আঁকড়ে ধরে, তখন তার পতন অনেক সময় হঠাৎ আসে না; বরং ধীরে ধীরে আসে—বিবেকের নিস্তব্ধতা দিয়ে, হৃদয়ের কঠিনতা দিয়ে, আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরে যাওয়ার অভ্যাস দিয়ে। এই আয়াত সেই ঘুমন্ত অহংকারকে জাগিয়ে দেয়। যা কিছু আমরা ভোগ বলি, যা কিছু আমরা সাফল্য বলি, যা কিছু আমাদের নিরাপদ মনে হয়—সেগুলো কি শেষ বিচারের দিনে একটুকু ওজনও বহন করতে পারবে? দুনিয়ার আরাম মানুষকে কিছু সময় ভুলিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু আল্লাহর ন্যায়ের সামনে সে আরাম কোনো ঢাল নয়, কোনো আশ্রয় নয়, কোনো মুক্তিপত্রও নয়।

যে হৃদয় আজও ভোগের আড়ালে সত্যকে অবহেলা করছে, সে যেন এ আয়াতের সামনে নীরবে দাঁড়িয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করে: আমার সঞ্চয় কোথায়, আমার ভরসা কোথায়, আমার শেষ আশ্রয় কোথায়? নবীদের কাহিনিগুলো আমাদের শেখায়—আল্লাহর দাওয়াতের চেয়ে বড় কোনো বিলাস নেই, আর তাঁর অবাধ্যতার চেয়ে ভয়ংকর কোনো দারিদ্র্য নেই। তাই আজই ফিরতে হবে; কারণ ভোগ বিলাস টিকে থাকে না, সৌন্দর্য ফিকে হয়, শক্তি ক্ষয় হয়, আর মানুষ একা হয়ে যায়—শুধু আল্লাহর রহমতই তখন সত্যিকার আশ্রয়। হে রব, আমাদের অন্তরকে ভোগের মোহ থেকে বাঁচাও, সত্যকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করার তাওফিক দাও, আর শেষ বিচারের দিনে আমাদেরকে এমন হৃদয় দিও যা শুধু তোমারই সামনে নত থাকে।