সূরা আশ-শুআরার এই আয়াতটি যেন দীর্ঘ এক তর্কযুদ্ধের শেষে আসমানী ঘোষণা: وَإِنَّ رَبَّكَ لَهُوَ ٱلْعَزِيزُ ٱلرَّحِيمُ—নিশ্চয় আপনার পালনকর্তা প্রবল পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু। এখানে “আল-আযীয” আমাদের মনে করিয়ে দেয়, তাঁর ইচ্ছার সামনে কোনো শক্তি টিকে থাকতে পারে না; আর “আর-রাহীম” জানিয়ে দেয়, সেই পরাক্রম কখনো নিষ্ঠুরতা নয়, বরং দয়ার অন্তরাল থেকে আগত হিকমাহ। মানুষের কণ্ঠে যখন সত্যকে কবিতা, তন্ত্র, কল্পনা বা জেদ দিয়ে ঢেকে ফেলার চেষ্টা হয়, তখন আল্লাহর এই দুই গুণ হৃদয়কে সোজা করে দাঁড় করায়: সত্য দুর্বল নয়, এবং সত্যের রবও নিছক দূরবর্তী নন—তিনি শক্তিমান, আবার অশেষ অনুকম্পাময়।
এই সূরার বিস্তৃত ধারায় আমরা নবীদের কাহিনি, তাদের দাওয়াত, এবং অস্বীকারকারীদের একরোখা প্রতিরোধ দেখতে পাই। নির্দিষ্ট কোনো একক শানে নুযূলের ওপর এই আয়াতকে সীমাবদ্ধ করা জরুরি নয়; বরং এর জায়গা পুরো সূরার ভেতরেই। কোথাও মূসা আলাইহিস সালামের আহ্বান, কোথাও ইব্রাহীমের তাওহীদ, কোথাও শুআইব, লূত, সালিহ—সবার পথ যেন এক: মানুষের বানানো মিথ্যা ভেঙে আল্লাহর দিকে ডাকা। সেই দীর্ঘ সংঘাতের শেষে এই আয়াত মনে করিয়ে দেয়, নবীদের পথ কাঁটায় ভরা হলেও তাদের রব পরাজিত হন না, আর বান্দাদের সীমাহীন অবাধ্যতার মাঝেও তাঁর রহমতের দরজা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় না।
এখানেই মুমিনের জন্য এক সূক্ষ্ম শিক্ষা লুকিয়ে আছে। আমরা যখন সত্যের পক্ষে দাঁড়াই, তখন আমাদের অন্তর কখনো আতঙ্কে কাঁপে—ক্ষমতা কার হাতে, পরিণতি কী হবে, মানুষের চাপ কতদূর যাবে। এই আয়াত সেই কাঁপুনি থামিয়ে দেয়: তোমার রব আল-আযীয, তাই মিথ্যার হট্টগোল চিরস্থায়ী নয়; আবার তিনি আর-রাহীম, তাই তাওবা, প্রত্যাবর্তন, আর করুণার পথ শেষ হয়ে যায় না। পরাক্রম যদি থাকে, তা ন্যায়কে বিজয়ী করার জন্য; দয়া যদি থাকে, তা ভাঙা হৃদয়কে ফেরাতে। এভাবেই আশ-শুআরার এই আয়াত সত্যের দাওয়াতকে শক্তির অহংকার নয়, বরং আল্লাহর ক্ষমতা ও দয়ার ওপর গভীর ভরসার জায়গায় দাঁড় করায়।
যে সূরার বুকে নবীদের দীর্ঘ আহ্বান, মানুষের হঠকারিতা, আর সত্য-মিথ্যার তীব্র সংঘাত একসাথে বয়ে চলে, সেখানে এই একটি বাক্য যেন সব কিছুর অন্তিম মর্মভাষা: নিশ্চয় আপনার পালনকর্তা প্রবল পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু। এখানে পরাক্রম মানে শুধু শক্তির ঘোষণা নয়; এটি সেই অমোঘ সত্য, যার সামনে মিথ্যার যত সাজসজ্জা, যত বাকচাতুর্য, যত অহংকার—সবই একদিন ভেঙে পড়ে। যারা নবীদের কণ্ঠকে কবিতা বলে ঠেলে দিতে চেয়েছে, যারা হেদায়েতকে ঠাট্টার চোখে দেখেছে, যারা নিজেদের জেদকে সত্যের আসনে বসিয়েছে—তাদের জন্য এ আয়াত নিঃশব্দ কিন্তু বজ্রের মতো ঘোষণা: আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো প্রতারণাই স্থায়ী নয়। সত্যকে দেরিতে মানা যায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্যই টিকে থাকে; আর সেই সত্যের পেছনে আছেন আল-আযীয, যিনি পরাজিত হন না।
নবীদের দীর্ঘ আহ্বান, অস্বীকারকারীদের হঠকারী জেদ, আর সত্যকে কবিতা-জাদু-মনগড়া বুলি বলে উড়িয়ে দেওয়ার সেই পুরোনো মানব-অভ্যাসের মাঝখানে এই আয়াত একদম আসমানের মতো নেমে আসে: “নিশ্চয় আপনার পালনকর্তা প্রবল পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু।” অর্থাৎ সত্যকে চাপা দিতে মানুষের শক্তি যতই অহংকার করুক, শেষ কথা মানুষের নয়। মানুষের ভাষা শব্দ বানাতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা বানাতে পারে না। মানুষের দলিল জোরে কথা বলতে পারে, কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছার সামনে তার সব কোলাহল একদিন নিঃশব্দ হয়ে যায়। সূরা আশ-শুআরার এই প্রেক্ষাপটে আয়াতটি যেন ঘোষণা করে—দাওয়াত একা নয়, নবী একা নন; তাঁর পেছনে আছেন সেই রব, যাঁর পরাক্রম সত্যকে বিজয়ী করে এবং যাঁর দয়া বান্দাকে তাওবার পথে ফিরিয়ে আনে।
এখানে “আল-আযীয” হৃদয়ে ভয় জাগায়, কিন্তু হতাশা নয়; আর “আর-রাহীম” আশা জাগায়, কিন্তু শিথিলতা নয়। এই দুই গুণের মিলনে মুমিনের অন্তর শিখে নেয় ভারসাম্য—আল্লাহর সম্মুখে কাঁপতে হয়, আবার তাঁর রহমতেও আশ্রয় নিতে হয়। যে সমাজ সত্য শুনেও নিজেকে বড় মনে করে, নবীদের আহ্বানকে ঠাট্টা করে, দুর্বলকে পীড়ন করে, মাপে কম দেয়, সীমা লঙ্ঘন করে—সেই সমাজের জন্য এই আয়াত সতর্ক ঘণ্টা। কারণ আল্লাহর পরাক্রম কেবল শাস্তির জন্য নয়; তা ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করতেও, এবং ডুবে যাওয়া বান্দাকে দয়ার দিকে ফিরিয়েও আনে।
তাই আজ এই আয়াত আমাদের নিজের অন্তরে নামুক। আমি কি সত্যের সামনে নত হচ্ছি, নাকি নিজের অহংকারকে ধর্মের পোশাক পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখছি? আমি কি আল্লাহকে শুধু ভয়ের চোখে দেখি, নাকি আশা ও লজ্জার সঙ্গে স্মরণ করি? তাঁর পরাক্রম আমাকে শোধরাক, তাঁর দয়া আমাকে ভেঙে না দিয়ে তুলে ধরুক। কারণ শেষ পর্যন্ত যে রব নবীদেরকে অস্বীকারকারীদের ভিড়ের মাঝেও একা ফেলেননি, তিনি আজও তাঁর সত্যকে রক্ষা করেন। আর বান্দা যখন তাঁর দিকে ফিরে, তখন পরাক্রমশালী রবের দরবারেও দয়ার দরজা অদৃশ্য হয় না; বরং সেখানেই সত্যিকারের আশ্রয় খুলে যায়।
মানুষের গড়া সব অহংকার একদিন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, কিন্তু আল্লাহর রাজত্বে ক্লান্তি নেই। নবীদের কণ্ঠ যখন নির্জন মরুভূমিতে, ভিড়ের উপহাসে, ক্ষমতাবানের দম্ভে চাপা পড়ে যেতে বসেছিল, তখন এই আয়াত যেন আসমানের দরজা খুলে দেয়: নিশ্চয় আপনার পালনকর্তা প্রবল পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু। তিনি চাইলে মুহূর্তেই মিথ্যার মসনদ উল্টে দিতে পারেন; চাইলে কঠিন হৃদয়কে একটিমাত্র কিরণে ভেঙে দিতে পারেন। তাঁর সামনে কোন সত্য অস্বীকৃত থেকে যায় না, কোন জুলুম চিরস্থায়ী হয় না, কোন ভাঙা অন্তর চিরদিন ভাঙা থাকে না।
আর এইখানেই মুমিনের হৃদয় আশ্রয় পায়। আমরা যখন নিজের দুর্বলতা দেখি, পাপের ভারে নুয়ে পড়ি, তওবার পথকে দূর মনে করি, তখন মনে রাখা দরকার—যিনি পরাক্রমশালী, তিনি দয়ালুও। তাঁর শক্তি আমাদের ভয় দেখানোর জন্য নয়, সত্যের পথে দাঁড় করানোর জন্য; তাঁর দয়া আমাদের নিরাশ করার জন্য নয়, ফিরে আসার পথ খুলে দেওয়ার জন্য। তাই এ আয়াত শুধু তথ্য নয়, এক নীরব ডাক: তুমি যদি সত্যের দিকে ফিরতে চাও, তবে এমন রবের কাছে ফিরছ, যিনি ক্ষমতাবান হয়েও ক্ষমাশীল, শক্তিমান হয়েও করুণাময়। তাঁর সামনে মাথা নত করা হারের নাম নয়; এটাই মুক্তির শুরু, এটাই হৃদয়ের বেঁচে ওঠা।