আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয় এতে নিদর্শন রয়েছে; কিন্তু তাদের অধিকাংশই বিশ্বাস করে না।” এই একটি বাক্যেই যেন বহু যুগের মানব-ইতিহাস জমে আছে। এর আগে সূরা আশ-শুআরায় একের পর এক নবীদের কাহিনি এসেছে—মূসা আলাইহিস সালাম, ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম, নূহ আলাইহিস সালাম, হূদ, সালিহ, লূত, শু‘আয়ব আলাইহিমুস সালাম—সত্যের আহ্বান, অবাধ্যতার জেদ, আর অবশেষে আল্লাহর সাহায্য ও বিচার। সেই দীর্ঘ বিবরণের শেষে এই আয়াত যেন ঘোষণা করে: এসব কাহিনি কেবল কাহিনি নয়, এগুলো আল্লাহর নিদর্শন; এগুলো মানুষের সামনে সত্যকে এমন উজ্জ্বল করে রাখে, যেন অন্ধ ছাড়া আর কেউ না দেখে।
তবু আয়াতের দ্বিতীয় অংশ হৃদয় কাঁপিয়ে দেয়—“কিন্তু তাদের অধিকাংশই বিশ্বাস করে না।” অর্থাৎ নিদর্শন দেখা আর ঈমান আনা এক জিনিস নয়। চোখে আলো পড়লেই অন্তর জেগে ওঠে না; অনেক সময় অহংকার, অভ্যাস, দুনিয়ার মোহ, এবং সত্যকে স্বীকার করার দায় মানুষকে আটকে রাখে। সূরা আশ-শুআরার এই সুরে নবীদের দাওয়াত আমাদের শেখায়, হকের কথা সবসময় সংখ্যায় জিতে না; বহুবার সত্য একা দাঁড়িয়ে থাকে, অথচ তার পেছনে থাকে আসমান-জমিনের প্রভুর শক্তি। তাই এই আয়াত মুমিনের হৃদয়ে একদিকে আশা জাগায়—আল্লাহর নিদর্শন কখনও ব্যর্থ নয়; অন্যদিকে দায়িত্বও জাগায়—দেখা যদি হয়, তবে তা মানার সাহসও চাই।
এখানে কোনো নির্দিষ্ট এক ঘটনার চেয়ে বেশি ফুটে উঠেছে একটি সার্বজনীন বাস্তবতা: নবীদের যুগে যেমন, তেমনি আজও মানুষ আল্লাহর আয়াত দেখে, কুরআনের বাণী শোনে, সত্যের ডাক অনুভব করে, তারপরও অধিকাংশ সময় গাফিলতি, অস্বীকার, বা বিলম্বের ঘেরাটোপে পড়ে থাকে। এই “অধিকাংশ” কথাটি আমাদের নিজের অন্তরকেও প্রশ্ন করে—আমি কি সেই সংখ্যার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছি, নাকি নিদর্শনকে সত্যিই হৃদয়ে গ্রহণ করছি? কারণ আল্লাহর নিদর্শন কেবল ইতিহাসের পৃষ্ঠা উল্টানোর জন্য নয়; তা মানুষকে ভাঙার, জাগানোর, এবং আবার বানানোর জন্য। সূরা আশ-শুআরার এই আয়াত তাই নিছক সমাপ্তি নয়, বরং এক নীরব জাগরণ—যে জাগরণে কুরআন আমাদের সামনে সত্যকে স্পষ্ট করে ধরে, আর আমাদের অন্তরকে জিজ্ঞেস করে: তুমি কি দেখছ, না কি এখনও অন্ধকারকে বেছে নিচ্ছ?
আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয় এতে নিদর্শন রয়েছে; কিন্তু তাদের অধিকাংশই বিশ্বাস করে না।” নবীদের দীর্ঘ কাহিনির শেষে এই বাক্যটি যেন আকাশের মতো প্রশস্ত, আবার বজ্রের মতো কঠিন। এখানে “এতে” শুধু একটি ঘটনা নয়; এতে আছে মূসা আলাইহিস সালামের সংগ্রাম, ফেরাউনের অহংকারভঙ্গ, ইবরাহিম আলাইহিস সালামের তাওহীদের দীপ্তি, নূহ, হূদ, সালিহ, লূত, শু‘আয়ব আলাইহিমুস সালামের আহ্বান ও প্রত্যাখ্যানের ইতিহাস। এসব কাহিনি মানুষের বিনোদনের জন্য নয়; এগুলো আল্লাহর আয়াত, সত্যকে প্রকাশ করার উজ্জ্বল দলিল। চোখের সামনে এত নিদর্শন, এত শিক্ষা, এত সতর্কবার্তা—তবু হৃদয় যদি জেগে না ওঠে, তবে দোষ আয়াতের নয়, অন্তরের পর্দার।
নবীদের দীর্ঘ কাহিনি, সত্যের অবিরাম ডাক, মিথ্যার সঙ্গে হকের নির্জন সংঘাত—সব কিছুর শেষে আল্লাহ তাআলা যেন মানুষের সামনে এক আয়না তুলে ধরেন: এতে অবশ্যই নিদর্শন আছে। মূসা আলাইহিস সালামের দৃঢ়তা, ইবরাহিম আলাইহিস সালামের তাওহীদের দীপ্তি, নূহ, হূদ, সালিহ, লূত, শু‘আয়ব আলাইহিমুস সালামের আহ্বান—এসব কিছু কেবল অতীতের ঘটনা নয়; এগুলো আল্লাহর কুদরতের জীবন্ত সাক্ষ্য, হৃদয়কে জাগানোর জন্য পাঠানো সতর্কবার্তা। ইতিহাসের পাতায় যে সত্য বারবার উঠে এসেছে, তা আজও সমান সত্য: আল্লাহর রাস্তা এক, আর মানুষের অবাধ্যতা বহু রূপে ফিরে আসে।
কিন্তু আয়াতের দ্বিতীয় অংশ অন্তর কাঁপিয়ে দেয়—“তাদের অধিকাংশই বিশ্বাস করে না।” এই বাক্যে শুধু আগেকার জাতিগুলোর কথাই নেই; এতে আমাদের সমাজেরও প্রতিচ্ছবি আছে। সত্য স্পষ্ট হয়, নসীহত শোনা হয়, নিদর্শন দেখা হয়, তবু অহংকার, গাফলত, দুনিয়ার ঝলক, আর নিজের নফসকে ছাড় দিতে না চাওয়ার কারণে মানুষ পিছিয়ে যায়। ঈমান এমন জিনিস নয় যা কেবল চোখে দেখা যায়; তা প্রথমে হৃদয়ের ভেতর নত হওয়ার নাম। তাই আল্লাহর এই সতর্কবাণী আমাদের আত্মপরীক্ষায় ডাক দেয়—আমি কি নিদর্শন দেখেও অবহেলায় রয়ে গেলাম, না কি সত্যকে চিনে নরম হয়ে সিজদায় নেমে এলাম?
এই আয়াতের মধ্যে ভয়ও আছে, আশা-ও আছে। ভয় এই জন্য যে, নিদর্শন দেখেও যদি হৃদয় কঠিন থাকে, তবে মানুষ সংখ্যার ভিড়ে হারিয়ে যেতে পারে; আর আশা এই জন্য যে, অল্প কিছু মুমিনও আল্লাহর কাছে অমূল্য। সত্য সবসময় অধিকাংশের হাতে থাকে না, কিন্তু আল্লাহর কাছে সত্যই বিজয়ী। অতএব, কুরআন আমাদের শুধু অতীত শোনায় না; সে আমাদের বর্তমানের বুকেও দরজা নক করে—হে মানুষ, নিদর্শন দেখ, সত্যকে চিনে নাও, আর দেরি কোরো না। কারণ শেষ পর্যন্ত সবাইকে ফিরতে হবে সেই আল্লাহর দিকেই, যাঁর আয়াতসমূহের সামনে কোনো অস্বীকার স্থায়ী হতে পারে না।
এই আয়াত আমাদের চোখের সামনে এক কঠিন সত্য রেখে দেয়। আল্লাহর নিদর্শন দূরে নেই; তা নবীদের কাহিনির ভিতর, সত্যের আহ্বানের ভিতর, মানুষের অবাধ্যতার পরিণতির ভিতর, আর আল্লাহর বিজয়ের নীরব ও অমোঘ ধারার ভিতর উজ্জ্বল হয়ে আছে। কিন্তু শুধু নিদর্শন দেখা যথেষ্ট নয়—অন্তর যদি জেগে না ওঠে, যদি অহংকার নরম না হয়, যদি নিজের পছন্দের মিথ্যাকে আঁকড়ে ধরা হয়, তবে সত্যের আলোও অনেকের কাছে অচেনা থেকে যায়। তাই আয়াতটি আমাদের দিকে ফিরে বলে: তুমি কি নিদর্শন দেখছ, নাকি শুধু কাহিনি পড়ছ? তুমি কি হককে চিনছ, নাকি কেবল তথ্য জমাচ্ছ?
অধিকাংশের পথই সত্যের মানদণ্ড নয়। পৃথিবীতে প্রথা, ভিড়, প্রচলন, বাহাদুরি—এসব অনেক কিছু সত্যকে ঢেকে দিতে পারে; কিন্তু আল্লাহর সামনে এগুলোর কোনো দাম নেই। যারা নবীদের অস্বীকার করেছে, তারা সংখ্যায় কম-বেশি হওয়ার কারণে ধ্বংস হয়নি; তারা ধ্বংস হয়েছে সত্যের সামনে হৃদয় বন্ধ করে দেওয়ার কারণে। আর যারা ঈমান এনেছেন, তারা কখনো সংখ্যার জোরে নয়, বরং আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে বেঁচে গেছেন। এই আয়াত তাই আমাদের মনে ভীতি জাগায়, আবার আশা জাগায়ও—যেন আমরা বলি, হে আল্লাহ, আমাকে এমন অন্তর দাও, যা নিদর্শন দেখে নরম হয়; এমন চোখ দাও, যা সত্যকে চিনে; এমন জিহ্বা দাও, যা অস্বীকারের ভাষায় আটকে না থাকে।
এখানে সবচেয়ে বড় শিক্ষা এই যে, সত্য সবসময় প্রচারিত হয়, কিন্তু সত্য সবসময় গ্রহণ করা হয় না। তাই ঈমানকে হালকা ভাবার কোনো উপায় নেই; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিরাট অনুগ্রহ, যা চাইতে হয়, রক্ষা করতে হয়, আর কান্নার সঙ্গে আঁকড়ে ধরতে হয়। সূরা আশ-শুআরার এই সমাপ্ত সুর যেন আমাদের বুকের ভিতর এক নীরব কাঁপন জাগিয়ে দেয়—আমি কি তাদের দলে, যাদের সামনে নিদর্শন ছিল তবু তারা ফিরেছিল? নাকি আমি সেই ক্ষুদ্র দলের একজন, যারা কম হলেও সত্যের পাশে দাঁড়িয়েছিল? হে রব, আমাদের অধিকারের নয়, রহমতের আশ্রয়ে বাঁচান; আমাদের হৃদয়কে সংখ্যার মোহ থেকে মুক্ত করুন; আর আপনার নিদর্শনকে যেন আমরা কেবল শুনে না যাই, বরং তার সামনে সিজদায় ভেঙে পড়ি।