“তুমি আমাদেরই মতো একজন মানুষ ছাড়া আর কিছু নও”—এ এক বাক্য, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে মানুষের চিরচেনা এক অন্ধতা। যখন সত্য চোখের সামনে দাঁড়ায়, তখন অনেকেই তার আলোকে গ্রহণ করার বদলে তার বাহ্যিক রূপটাকেই প্রশ্ন করে। মানুষ তো মানুষই; তার হাঁটা, কথা বলা, ক্ষুধা-তৃষ্ণা, ক্লান্তি—সবই পরিচিত। কিন্তু আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে বেছে নেন, তখন সেই একই মানবদেহের ভেতর নেমে আসে ওহির জ্যোতি, হিদায়াতের ওজন, সত্যের আমানত। সুতরাং নবীকে “আমাদের মতো মানুষ” বলে খাটো করা আসলে মানুষের নিজের দৃষ্টিসীমাকেই প্রকাশ করে; সত্যকে নয়। কারণ মর্যাদা দেহে নয়, বরং আল্লাহর মনোনয়নে, আল্লাহর বার্তায়, এবং সেই বার্তা পৌঁছে দেওয়ার সত্যতায়।
এই আয়াত সূরা আশ-শুআরার সেই দীর্ঘ প্রেক্ষাপটে এসেছে, যেখানে বহু নবীর কাহিনি একে একে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে—একই অবিশ্বাস, একই বিদ্রূপ, একই অভিযোগ বারবার ফিরে আসে। কওমেরা তাদের রাসূলদের বলেছে, মানুষ হয়ে কীভাবে তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসেন; যেন আকাশ থেকে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য মানবতা-রহিত কোনো সত্তা হওয়া জরুরি! কিন্তু কুরআন এই ধারণাকে উল্টে দেয়: মানুষের কাছেই তো মানুষকে পথ দেখানোর জন্য মানুষই আসেন, যেন তারা তার ভাষা বোঝে, তার জীবন দেখে, তার দাওয়াতে নিজেরাই সাড়া দিতে পারে। এখানে কোনো নির্দিষ্ট এক ঐতিহাসিক ঘটনার কঠোর সনদ আমাদের সামনে নেই; বরং এটি নবুওয়াত অস্বীকারের এক সার্বজনীন মানসিকতা, যা বিভিন্ন যুগে, বিভিন্ন সমাজে, বিভিন্ন মুখে ফিরে এসেছে।
আর “আমরা তোমাকে মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত মনে করি”—এই সন্দেহের বাক্যটি শুধু একটি নবীর বিরুদ্ধে বলা হয়নি; এটি সত্যের বিরুদ্ধে মানুষের আত্মরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়ারও নাম। যখন অহংকার ভাঙতে চায় না, যখন অভ্যাস বদলাতে চায় না, যখন গুনাহ নিজের আরামের মতো প্রিয় হয়ে ওঠে, তখন সত্যকে মিথ্যার পোশাক পরানো হয়। অথচ আল্লাহর রাসূলের সত্যতা মানুষের ধারণার কাছে বন্দী নয়; তা আল্লাহর সাহায্যে উজ্জ্বল হয়। এই আয়াত আমাদের হৃদয়কে প্রশ্ন করে: আমরা কি বাহ্যিক সাদৃশ্য দেখে হুকুম জারি করি, নাকি অন্তরের চোখ দিয়ে বুঝি যে আল্লাহ যার ওপর হিদায়াত নাজিল করেন, তার মানবতা তাকে ছোট করে না; বরং তার মাধ্যমে আল্লাহ মানুষের কাছে পৌঁছে দেন জীবন বদলে দেওয়ার সেই বাণী, যা আত্মাকে জাগিয়ে তোলে এবং সত্য-মিথ্যার সব পর্দা ছিঁড়ে ফেলে।
মানুষ যখন সত্যের মুখোমুখি হয়, তখন তার সবচেয়ে পুরোনো আশ্রয় হয় সন্দেহ। সে নবীকে দেখে, আর বলে: “তুমি তো আমাদেরই মতো মানুষ।” হ্যাঁ, মানুষই তিনি—এতেই তো আল্লাহর কুদরতের গভীরতা। কারণ আল্লাহর হিদায়াত মানুষের ভেতরেই নাজিল হয়, মানুষের ভাষাতেই পৌঁছে, মানুষের হৃদয়েই ধাক্কা দেয়। কিন্তু যাদের চোখ বাহ্য রূপের বাইরে দেখতে শেখেনি, তারা দেহের সাদৃশ্য দেখেই মর্যাদার ফায়সালা করে ফেলে। তারা বুঝতে চায় না, মানুষের মতো হওয়া আর আল্লাহর মনোনীত হওয়া এক জিনিস নয়।
সূরা আশ-শুআরা বারবার মনে করিয়ে দেয়, নবীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নতুন কিছু নয়; যুগে যুগে সত্যকে ছোট করার ভাষা প্রায় এক, কেবল মুখ বদলায়। আজও মানুষ বাহ্যিক মিল দেখে, জীবনের সাধারণতা দেখে, দায়িত্বের ভার না দেখে—সত্যকে অস্বীকার করে। কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা কথা মানুষের ধারণার মুখাপেক্ষী নয়। যা সত্য, তা মানুষ মানুক বা না মানুক, তা আলোর মতোই থাকে। এই আয়াত আমাদের থামিয়ে জিজ্ঞেস করে: আমরা কি বাহ্যিক মানুষটিকে বিচার করছি, নাকি তাঁর মাধ্যমে পৌঁছানো আল্লাহর হিদায়াতকে? আর যে হৃদয় এই প্রশ্নে কেঁপে ওঠে, সে বুঝতে শুরু করে—মানুষের ধারণা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আল্লাহর সত্য চিরস্থায়ী।
মানুষ যখন সত্যের মুখোমুখি হয়, তখন তার প্রথম প্রতিরক্ষা-ঢাল হয় এই বাক্য: “তুমি আমাদের মতোই একজন মানুষ।” যেন মানুষের রূপই আল্লাহর নিদর্শন অস্বীকার করার যথেষ্ট কারণ। কিন্তু মানুষ তো নিজের সীমা দিয়েই সবকিছু মাপে; সে চায়, সত্যও তার পরিচিত কাঠামোর মধ্যে আটকে থাকুক। এ কারণেই নবীদের জীবনে বারবার দেখা যায়—দাওয়াতের আলোকে তারা গ্রহণ না করে, বাহ্যিক সাদৃশ্যকে অজুহাত বানিয়ে সত্যকে দূরে ঠেলে দেয়। অথচ আল্লাহর বাছাই মানুষের চোখে অনন্য নাও মনে হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর কাছে সেটিই মর্যাদার দরজা, হিদায়াতের সেতু, আর অন্তরের জন্য রহমতের আহ্বান।
এই আয়াত আমাদের নিজের ভেতরের কণ্ঠকেও প্রশ্ন করে। আমরা কি সত্যকে তার দলিল, তার নৈতিক ভার, তার আসমানি সৌন্দর্য দিয়ে বুঝি, নাকি মানুষকে দেখে বিচার করি? সমাজ যখন অহংকারে ভরে যায়, তখন নবীর আহ্বানও সেখানে “সাধারণ মানুষের কথা” হয়ে ওঠে; আর যখন হৃদয় নরম হয়, তখন একই কথা হয়ে ওঠে জীবন বদলে দেওয়ার আহ্বান। মিথ্যার স্বভাবই এমন—সে সত্যকে ছোট দেখাতে চায়, আর সত্যের স্বভাব হলো ধৈর্য, স্পষ্টতা, ও আল্লাহর উপর ভরসা। তাই নবীদের কাহিনি আমাদের শেখায়, একে একে যুগ বদলালেও মানুষের এই পুরনো অসুখ বদলায় না; শুধু পরীক্ষার রূপ বদলায়।
আজ এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের আত্মাকে জিজ্ঞেস করতে হয়—আমি কি কোনো দিন সত্যকে এভাবে অস্বীকার করেছি? আমার অহংকার কি আমাকে এমন বানিয়েছে, যেখানে আমি আল্লাহর হিদায়াতকে মানুষমাত্রের কথা ভেবে হালকা করে দেখি? মৃত্যু একদিন আমাদের সেই সব অজুহাত থেকে ছিঁড়ে নেবে, আর তখন থাকবে শুধু আমল, শুধু অন্তর, শুধু রবের সামনে নগ্ন বাস্তবতা। তাই ভয়ও দরকার, আশা-ও দরকার; কারণ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দেন, এবং যাকে ইচ্ছা সতর্ক করেন। যে হৃদয় এখনই নরম হয়, সে-ই একদিন বুঝতে পারে—নবী মানুষ ছিলেন, হ্যাঁ; কিন্তু তাঁর মুখে যে সত্য নাজিল হয়েছিল, তা মানুষের নয়, আসমানের। আর সেই আসমানি সত্যই মানুষকে মাটি থেকে তুলে আলোর দিকে নেয়।
এই আয়াত আমাদেরও প্রশ্ন করে—আমরা কি কখনো সত্যের মুখোমুখি হয়ে তার ভাষা, তার বাহ্যিক রূপ, তার পরিচিত মানচিত্র দেখে তাকে খাটো করেছি? কতবার আমরা হককে গ্রহণ না করে আগে আপত্তি তুলেছি, আগে সন্দেহ করেছি, আগে বিদ্রূপ করেছি? অথচ সত্যের ওজন পোশাকে নয়, বংশে নয়, কণ্ঠস্বরের ভঙ্গিতে নয়; সত্যের ওজন আল্লাহর সাক্ষ্যে। তাই যারা নবীদের “মিথ্যাবাদী” বলেছে, তারা আসলে নিজেদের সীমাবদ্ধ দৃষ্টিকেই প্রকাশ করেছে। তাদের চোখ ছিল, কিন্তু অন্তর ছিল অন্ধ; তাদের কান ছিল, কিন্তু স্বীকৃতির দরজা ছিল বন্ধ।
আজও এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের জিজ্ঞেস করতে হয়—আমি কি সত্যকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করি, নাকি আমার পছন্দ-অপছন্দের ছাঁচে তাকে বিচার করি? আল্লাহ যাকে চান, তাকে সাধারণ মানুষের মাঝেই অসাধারণ দায়িত্ব দেন; আর যাকে চান, তাকে সত্যের সামনে নত হতে শেখান। সুতরাং এই বাক্য আমাদের জন্য শুধু একটি ঐতিহাসিক অভিযোগ নয়, এটি আত্মসমালোচনার আয়না। যেন আমরা অহংকারের অন্ধকারে না যাই, যেন ওহির আলোকে মানুষকে নয়, হককে মাপি। শেষ পর্যন্ত বিজয় কণ্ঠের নয়, সত্যের; বাহ্যিক সাদৃশ্যের নয়, আল্লাহর মনোনয়নের। আর যে এই সত্য বুঝে, তার হৃদয় ভয়ে কাঁপে, লজ্জায় নরম হয়, এবং নীরবে বলে—হে আল্লাহ, আমাকে এমন না করো, যেন আমার সামনে সত্য এসে দাঁড়ায় আর আমি তাকে শুধু মানুষ বলেই ফিরিয়ে দিই।