এই আয়াতে ফিরআউনের দরবারের মানুষেরা মূসা আলাইহিস সালামের সত্য-আহ্বানের জবাবে তাঁকে অপমানের ভাষায় আঘাত করে বলছে, তুমি তো জাদুগ্রস্তদেরই একজন। অর্থাৎ, যখন সত্য মানুষের অহংকার, স্বার্থ আর প্রথার দেয়ালে ধাক্কা দেয়, তখন তারা যুক্তি দিয়ে নয়, বিদ্রূপ দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে। মিথ্যার সবচেয়ে পুরোনো কৌশলগুলোর একটি হলো সত্যবক্তাকে পাগল, বিভ্রান্ত, প্রভাবিত কিংবা অসংলগ্ন প্রমাণ করার চেষ্টা। এভাবেই হৃদয়ের অন্ধকার নিজের অপরাধ ঢাকতে চায়—সত্যকে আঘাত করে, সত্যের বাহককে ছোট করে।
সূরা আশ-শুআরা’য় মূসা, ইবরাহীম, নূহ, হূদ, সালিহ, লূত ও শু‘আইব আলাইহিমুস সালামের দাওয়াতের ধারাবাহিক কাহিনি এসেছে। এখানে প্রতিটি জাতির ভেতর একরকমই মানবচিত্র দেখা যায়: নবী আসেন তাওহীদের আলো নিয়ে, আর অভ্যাসে জমে থাকা সমাজ তার জবাবে অপবাদ, অস্বীকার ও তাচ্ছিল্য ছুড়ে দেয়। এই আয়াতের নির্দিষ্ট কোনো আলাদা শানে নুযূল বর্ণিত নয়; বরং এটি সেই বৃহত্তর কুরআনিক বাস্তবতার অংশ, যেখানে নবীদের প্রতি জাতিগুলোর প্রতিক্রিয়া বারবার এক রূপ নেয়। সত্য যখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তখন মিথ্যা তার ভাষা হারিয়ে ফেলে—তাই সে ব্যক্তির মর্যাদা ভাঙতে চায়।
এই শব্দগুলো আমাদেরও আয়নার সামনে দাঁড় করায়। কতবার সত্য কথা শুনেও আমরা তাকে গ্রহণ না করে বলেছি, এটি তো খুব কঠিন, খুব অস্বস্তিকর, হয়তো বক্তাই অতিরঞ্জন করছে! অথচ কুরআন শেখায়, আল্লাহর নবীদের দাওয়াত মানুষের চোখে কখনো কখনো অদ্ভুত, অস্থির বা অসহ্য বলে মনে হতে পারে, কিন্তু তা সত্য থেকে বিচ্যুত হয় না। মানুষের অপবাদ আল্লাহর পথে কোনো বাধা নয়; বরং পরীক্ষা—কে বিদ্রূপের শব্দে টলে যায়, আর কে রবের উপর দৃঢ় থাকে। এই আয়াতে যেন বলা হচ্ছে, সত্যকে অপবাদ দিয়ে থামানো যায় না; বরং অপবাদই একদিন প্রকাশ করে দেয়, কারা বাস্তবে অন্ধ আর কারা আলোর সাক্ষী।
সত্য যখন মানুষের ভেতরের অহংকারের সঙ্গে আঘাত করে, তখন অনেকেই তাকে শুনতে চায় না; তারা আগে থেকেই রায় তৈরি করে ফেলে। এই আয়াতে ফিরআউনের পক্ষের লোকেরা মূসা আলাইহিস সালামের কথার জবাব যুক্তি দিয়ে নয়, অপবাদ দিয়ে দেয়—তুমি তো জাদুগ্রস্তদের একজন। এ এক পুরোনো মানব-স্বভাব: সত্যের মুখোমুখি হয়ে নিজের অন্তর্গত দুর্বলতাকে স্বীকার করার বদলে সত্যবক্তাকেই আঘাত করা। কারণ সত্য হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়লে অহংকার কেঁপে ওঠে, আর অহংকার নিজের কাঁপন ঢাকতে বিদ্রূপকে ঢাল বানায়।
কিন্তু আল্লাহর কুদরতের সামনে মানুষের এই সব তুচ্ছ অপবাদ কত অসহায়! নবীদের দাওয়াত কোনো মানুষের প্রশংসায় দাঁড়ায় না, কারও অপমানে ভেঙেও পড়ে না; তা দাঁড়িয়ে থাকে আল্লাহর হক্কের ওপর, আল্লাহর নূরের ওপর, আল্লাহর সাহায্যের ওপর। তাই এই আয়াত শুধু একটি কথোপকথন নয়, এটি প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য আয়না—যেখানে দেখা যায়, আমরা সত্যের পাশে দাঁড়াব, নাকি ভিড়ের সঙ্গে মিশে সত্যের ওপর কাদা ছুঁড়ব। যে হৃদয় আল্লাহর দিকে নত, সে অপবাদে দমে না; কারণ সে জানে, মানুষের মুখের শব্দ নয়, আল্লাহর ফয়সালাই চূড়ান্ত, আর সত্যের পথ যতই কণ্টকাকীর্ণ হোক, শেষ আলো তারই হাতে।
তারা বলল, তুমি তো জাদুগ্রস্তদেরই একজন। সত্যের মুখে এ এক চিরচেনা মানবিক প্রতিরোধ—যেখানে যুক্তির আলো জ্বলতে শুরু করে, সেখানেই অহংকার অন্ধকারের ভাষা খুঁজে নেয়। ফিরআউনের লোকেরা মূসা আলাইহিস সালামের কথাকে শোনার আগে তাঁর ব্যক্তিত্বকে দাগিয়ে দিতে চাইল; কারণ সত্য যদি একবার হৃদয়ে ঢুকে পড়ে, তবে ক্ষমতার মিথ্যা মুখোশ খুলে যায়। তাই তারা অপবাদকে ঢাল বানাল, বিদ্রূপকে প্রাচীর বানাল, যেন দাওয়াতের শব্দ তাদের অন্তরের ভাঙনকে স্পর্শ করতে না পারে।
কুরআন যেন আমাদেরকে দেখিয়ে দেয়—নবীদের সাথে মানুষের এই আচরণ নতুন নয়, আর শুধু ইতিহাসের পাতায়ও সীমাবদ্ধ নয়। যখনই কোনো বান্দা আল্লাহর পথে ডাক দেয়, তখন সমাজের ভেতর লুকিয়ে থাকা স্বার্থ, অভ্যাস, ঔদ্ধত্য ও গর্ব তাকে ছোট করতে চায়। ‘জাদুগ্রস্ত’ বলা ছিল কেবল একটি কথা নয়; ছিল সত্যকে অস্বাভাবিক, অসম্ভব, গ্রহণের অযোগ্য বলে ঘোষণা করার কৌশল। অথচ প্রকৃত জাদু ছিল তাদের দৃষ্টির বিভ্রান্তিতে, তাদের অন্তরের পর্দায়, তাদের সত্য-অসহিষ্ণুতায়। মানুষ যখন আল্লাহর নিদর্শনের সামনে নত হতে চায় না, তখন সে নিদর্শনকে নয়—নিজের বিদ্বেষকে যুক্তি সাজিয়ে কথা বলে।
এই আয়াত আমাদেরও থামিয়ে জিজ্ঞেস করে: আমি কি সত্য শুনলে তা গ্রহণ করি, নাকি আমার ভেতরের অহংকারও অপবাদ দিতে শেখে? অনেক সময় আমরা নিজের নফসকে বাঁচাতে সত্যবক্তাকে ভুল বুঝি, তাকে কঠোর বলি, তাকে অবাস্তব বলি, তার কথা থেকে পালিয়ে যাই। অথচ আল্লাহর কুদরতের সামনে মানুষের এই অপমান ক্ষণস্থায়ী; নবীদের দাওয়াত টিকে থাকে, আর অস্বীকারের ধুলো উড়ে যায়। তাই মুমিনের কাজ হলো ভয় ও আশা দুটোকেই বুকে রাখা—অস্বীকারকারীদের কণ্ঠে ভেঙে না পড়ে, নিজের অন্তরকে জবাবদিহির সামনে দাঁড় করানো; কারণ শেষ আশ্রয় কোনো মানুষের প্রশংসা নয়, বরং আল্লাহর ক্ষমা, আল্লাহর সাহায্য, আর তাঁরই কাছে ফিরে যাওয়া।
সত্যের কণ্ঠ যখন মানুষের ভিতরের মূর্তিকে আঘাত করে, তখন অপবাদই অনেকের প্রথম আশ্রয় হয়। তারা তর্কের পথে না গিয়ে সত্যবক্তাকে হেয় করতে চায়, যেন কথার ওজন কমে গেলে হক্কের আলোও নিভে যাবে। কিন্তু আল্লাহর কিতাব আমাদের শিখিয়ে দেয়, নবীদের দাওয়াত মানুষের প্রশংসায় দাঁড়ায় না; তা দাঁড়ায় রব্বুল আলামীনের সত্যতায়। তাই মূসা আলাইহিস সালামকে “জাদুগ্রস্ত” বললেও সত্য মিথ্যা হয়ে যায়নি, বরং মিথ্যার নগ্ন রূপ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এই আয়াত আমাদেরও আয়না দেখায়। কত সহজে আমরা এমন কথা বলে ফেলি, যার ভেতরে দয়া নেই, বিচার নেই, বরং আছে কেবল নিজেকে রক্ষা করার তাড়না। কখনো সত্যকে না বুঝে, কখনো বুঝেও মানতে না চেয়ে আমরা তার বাহককে সন্দেহের ছায়ায় ঠেলে দিই। অথচ ঈমানের সৌন্দর্য হলো, সত্য এসে গেলে নিজের অহংকারকে নিচে নামানো, নিজের ভুলকে স্বীকার করা, আর আল্লাহর সামনে নরম হয়ে যাওয়া। যে হৃদয় সত্যের সামনে নতি স্বীকার করতে জানে, তার জন্য অপবাদ শেষ কথা নয়; তার জন্য হিদায়াতই শেষ আশ্রয়।