“যখন শু’আয়ব তাদেরকে বললেন, তোমরা কি ভয় কর না?”—এই একটি প্রশ্নের ভেতরে নবীর দাওয়াতের সমগ্র তীব্রতা যেন জেগে ওঠে। শু’আয়ব আলাইহিস সালামের আহ্বান ছিল কেবল উপদেশের নরম সুর নয়; তা ছিল অন্তরের ঘুম ভাঙানোর ডাক, এমন এক ডাক যা মানুষকে নিজেকে, নিজের লেনদেনকে, নিজের জবাবদিহিকে এবং সর্বোপরি আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর দিনকে স্মরণ করায়। “তোমরা কি ভয় কর না?”—এই প্রশ্নের মধ্যে ভয় দেখানোর চেয়ে বেশি আছে আত্মা জাগানোর করুণা। কারণ যে হৃদয়ে তাকওয়া নেই, সে হৃদয় অন্যায়ের ও প্রতারণার কাছে খুব দ্রুত নত হয়ে যায়; আর যে হৃদয়ে আল্লাহভীতি জাগে, সে আর শুধু নিজের লাভ দেখে না, সত্যের ওজনও অনুভব করে।

এই আয়াতের বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে শু’আয়ব আলাইহিস সালামকে দেখা যায় এমন এক জাতির প্রতি আহ্বান জানাতে, যারা মাপে-ওজনে অসততা করত এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারকে ক্ষতবিক্ষত করেছিল। কুরআন বহু স্থানে তাদের এই নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র টেনে আনে, আর এখানে নবীর প্রথম আঘাতটা যায় অন্তরে—কারণ বাহ্যিক অন্যায়ের শিকড় সাধারণত ভেতরের ভয়হীনতায়। মানুষের যখন আল্লাহর ভয় মরে যায়, তখন বাজারও অসুস্থ হয়, সম্পর্কও বিকৃত হয়, অধিকারও চাপা পড়ে। তাই শু’আয়বের কথা কেবল একটি জাতির জন্য নয়; এটি প্রতিটি যুগের ব্যবসায়ী, শাসক, পরিবার, সমাজ—সবার জন্য প্রশ্ন: তোমাদের হৃদয় কি সত্যিই এমন নিষ্ঠুর হয়ে গেছে যে, তোমরা আল্লাহর সামনে জবাবদিহির কথা ভুলে গেলে?

এখানে “তোমরা কি ভয় কর না?”—এই বাক্যটি কুরআনের দাওয়াতি ভাষার এক চিরন্তন দ্যুতি। নবীরা মানুষকে প্রথমে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে এনেছেন, তারপর সেই ফিরতি আলো মানুষের আচার-আচরণে নেমে এসেছে। আশ-শুআরা সূরায় নবীদের কাহিনি বারবার দেখায়—দাওয়াত, অস্বীকার, সতর্কবাণী, এবং শেষ পর্যন্ত আল্লাহর সত্যের বিজয়। শু’আয়বের এই প্রশ্নও আমাদের সামনে সেই কঠিন আয়না ধরে: আমরা কি সত্যের সামনে ভীত, নাকি মানুষ, সম্পদ, স্বার্থ আর অভ্যাসের সামনে? তাকওয়া মানে শুধু আবেগী অনুভূতি নয়; তাকওয়া মানে এমন এক জাগ্রত হৃদয়, যা অন্যায়কে ভয় করে, আল্লাহকে ভয় করে, এবং সেই ভয়েই ন্যায়ের দিকে ফিরে আসে। এ আয়াতের ধাক্কা এখানেই—যে হৃদয় একবার আল্লাহভীতির স্বাদ পেল, সে আর মিথ্যার আরামে স্বস্তি খুঁজে পায় না।

শু’আয়ব আলাইহিস সালামের এই প্রশ্নটি যেন কেবল একটি বাক্য নয়, বরং আত্মার দরজায় নক করা এক জাগ্রত বজ্রধ্বনি। তিনি বলেননি, তোমরা কেন ভয় করো না—যেন প্রথমে দোষারোপ, পরে বিচার; বরং বললেন, তোমরা কি ভয় কর না? এই প্রশ্নে নরমতা আছে, কিন্তু শৈথিল্য নেই; মায়া আছে, কিন্তু ছাড় নেই। নবীর কণ্ঠে যখন তাকওয়ার ডাক ওঠে, তখন তা মানুষের ভেতরের সেই অংশকে স্পর্শ করে, যেখানে এখনও সত্যের শেষ প্রদীপটি নিভে যায়নি। কারণ মানুষ যখন আল্লাহকে ভুলে যায়, তখন অন্যায়কে সহজ মনে করে; আর যখন আল্লাহভীতি জাগে, তখনই ছোট-বড় সব লেনদেন, সব কথা, সব আচরণ নিজের আসল ওজন ফিরে পায়।

এই আয়াতের অন্তর্লীন স্রোত আমাদের শেখায়, নৈতিক পতনের শুরু প্রায়ই বাহ্যিক চুরির আগে অন্তরের ভয়হীনতায়। মাপে-ওজনে অসততা, অধিকার হরণ, প্রতারণা, সমাজকে নিজের লাভের জন্য ভেঙে ফেলা—এসব শুধু বাজারের অপরাধ নয়, এগুলো ঈমানের ভেতরে সৃষ্ট শূন্যতারও চিহ্ন। তাই শু’আয়বের দাওয়াত কেবল অর্থনীতির সংস্কার ছিল না; তা ছিল অন্তরের সংস্কার, এমন এক আহ্বান যেখানে মানুষকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়—তুমি কি ভাবছ, কেউ দেখছে না? কিন্তু আল্লাহ তো দেখছেন। তুমি কি ভাবছ, কিছুই হবে না? কিন্তু একদিন দাঁড়াতেই হবে। তাকওয়া মানে এই স্মৃতি: আল্লাহর উপস্থিতি, আল্লাহর জ্ঞান, আল্লাহর বিচার, আল্লাহর প্রতিশোধ ও করুণার সামনে হৃদয়ের কাঁপুনি।
আর এই কাঁপুনিই মানুষকে ফিরিয়ে আনে সত্যের পথে। শু’আয়ব আলাইহিস সালামের প্রশ্নে তাই শুধু ভর্ৎসনা নেই; আছে পথহারা মানুষকে ডেকে বলার অশেষ দয়া—ফিরে এসো, তোমাদের অন্তরকে মরতে দিয়ো না। যে সমাজে আল্লাহভীতি মরে যায়, সেখানে ন্যায়ের ভাষা ধীরে ধীরে নিঃশব্দ হয়ে পড়ে, আর সত্যকে কবিতার মতো সুন্দর শোনানো হলেও তার প্রাণ থাকে না। কিন্তু নবীর বাক্য সেই প্রাণ ফিরিয়ে দিতে চায়। “তোমরা কি ভয় কর না?”—এই প্রশ্ন আজও প্রতিটি অন্তরকে জাগায়: আমি কি আমার জীবনের মাপটাকে আল্লাহর সামনে ঠিক রাখছি, না মানুষের চোখ এড়িয়ে সুবিধার পথে হেঁটে চলেছি? যে হৃদয় এই প্রশ্নে কেঁপে ওঠে, তার জন্যই এই আয়াত রহমত; আর যে হৃদয় কাঁপে না, তার জন্যই এটি সতর্কবার্তা।

যখন শু’আয়ব আলাইহিস সালাম বললেন, “তোমরা কি ভয় কর না?”—এই প্রশ্ন যেন মানুষের অন্তরের দরজায় কড়া নাড়ে। এটি কেবল ভয়ের কথা নয়; এটি জাগরণের কথা। যে সমাজে লেনদেনের মাপে জুলুম জমে ওঠে, যেখানে লাভের মোহে সত্যকে ছোট করে দেখা হয়, সেখানে নবীর কণ্ঠ প্রথমেই হৃদয়ের গহিনে তাকওয়ার আলো জ্বালাতে চায়। কারণ অন্যায়ের সবচেয়ে গভীর শিকড় বাহ্যিক আচরণে নয়, অন্তরের ভয়হীনতায়। আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর অনুভব যখন মুছে যায়, তখন মানুষ মানুষের হকও হালকা করে দেখে, আর অবিচারকে অভ্যাস বানিয়ে ফেলে। শু’আয়বের এই ডাক তাই শুধু একটি সম্প্রদায়ের জন্য নয়; এটি প্রতিটি যুগের প্রতিটি আত্মার জন্য—যে আত্মা নিজের কর্মকে পরখ করতে জানে, কিন্তু রবের জবাবদিহিকে ভুলে যেতে চায়।

এই আয়াতে দাওয়াতের ভাষা একসঙ্গে কোমল ও কাঁপানো—এতে ভীতি আছে, আবার মমতাও আছে। নবী সরাসরি আঙুল তোলেন না, বরং জিজ্ঞেস করেন: তোমরা কি সত্যিই ভয় কর না? যেন তিনি বলতে চান, মানুষের বিচার এড়িয়ে গেলেও আল্লাহর বিচার এড়ানো যাবে না। তাকওয়া মানে শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের আবেগ নয়; তা হলো ন্যায্যতা, সততা, সংযম, আর অপরের অধিকার রক্ষার জীবন্ত অনুভূতি। তাই এই প্রশ্ন মানুষের বাহ্যিক অবস্থা নয়, তার ভিতরের নৈতিক কাঠামোকে লক্ষ্য করে। যে হৃদয় আল্লাহভীতিতে কেঁপে ওঠে, সে হৃদয় আর মাপে কম দেয় না, প্রতারণাকে বুদ্ধিমত্তা ভাবে না, এবং সাময়িক লাভের জন্য অনন্ত ক্ষতি বেছে নেয় না।

শু’আয়বের কণ্ঠে আমরা দেখি নবীদের চিরন্তন পদ্ধতি—অন্যায়কে শুধু নিন্দা করা নয়, মানুষকে নিজের আত্মার দিকে ফিরিয়ে আনা। কারণ সত্যের দাওয়াত প্রথমে শোনায়, তারপর জাগায়; প্রথমে নরম করে, তারপর ভেতর থেকে ভেঙে দেয় অহংকারের দেয়াল। এই প্রশ্নের সামনে আজও মানুষকে দাঁড়াতে হয়: আমি কি আল্লাহকে ভয় করি, নাকি শুধু দুনিয়ার ক্ষতি? আমি কি নিজের সুবিধা দেখি, নাকি হকের ওজন বুঝি? সূরা আশ-শুআরার এই আয়াত আমাদের শেখায়, সমাজের বিকৃতি অনেক সময় বাজারে দেখা যায়, কিন্তু তার শুরু হয় অন্তরে। আর অন্তরের চিকিৎসা একটাই—তাকওয়া। যে হৃদয় “তোমরা কি ভয় কর না?” প্রশ্নে কেঁপে ওঠে, সে হৃদয়ই সত্যের পথে ফিরে আসে; আর সেই ফেরা-ই মানুষের মুক্তি, সমাজের পুনর্জন্ম, এবং আল্লাহর দিকে এক বিনীত প্রত্যাবর্তন।

শু’আয়ব আলাইহিস সালামের এই জিজ্ঞাসা যেন শুধু এক জাতির দিকে উচ্চারিত একটি বাক্য নয়; তা যেন প্রত্যেক যুগের মানুষকে আয়নার সামনে দাঁড় করায়। আমরা কি সত্যিই ভয় করি? নাকি ভয়কে শুধু দুনিয়ার ক্ষতি, লোকসম্মান হারানো, লাভ কমে যাওয়া, প্রতিদ্বন্দ্বীর এগিয়ে যাওয়া—এসবের সঙ্গেই বেঁধে রেখেছি? অথচ আসল ভয় হওয়া উচিত সেই সত্তার সামনে, যিনি আমাদের অন্তরের গোপন হিসাবও জানেন, কারও চোখের আড়ালের প্রতারণাও দেখেন, এবং একদিন সমস্ত মাপজোক, চুক্তি, কথা ও নীরবতার জবাব চাইবেন। যখন হৃদয় থেকে তাকওয়া উঠে যায়, তখন মানুষ নিজেরই হাতে নিজের সত্যকে বিক্রি করে ফেলে; আর যখন তাকওয়া ফিরে আসে, তখন ছোট্ট একটি ভুলও ভারী হয়ে ওঠে, কারণ সে ভুলের ওপারে আল্লাহর অসন্তুষ্টির ছায়া দেখা যায়।

এই আয়াত আমাদের শেখায়, দাওয়াতের প্রথম কাজ মানুষকে লজ্জিত করা নয়, বরং জাগিয়ে তোলা; ধমক নয়, অন্তরে কম্পন সৃষ্টি করা। নবীর প্রশ্নের ভেতরে আছে মমতা, আছে সতর্কতা, আছে ফিরিয়ে আনার আকুতি। আজও যদি আমরা এই প্রশ্ন শোনি, তাহলে হয়তো আমাদের ব্যবসার খাতায়, সম্পর্কের মাপে, কথার সত্যতায়, ন্যায়ের অবস্থানে, আর গুনাহের অভ্যাসে বহু ফাটল ধরা পড়বে। কিন্তু সেই ফাটলই রহমতের দরজা হতে পারে, যদি আমরা ভেঙে না পড়ে, বিনয় নিয়ে স্বীকার করি—হ্যাঁ, আমরা ভয় করিনি, আর তাই এত দূর ভুলে চলে এসেছি। আল্লাহ আমাদের অন্তরে তাকওয়ার আলো ফিরিয়ে দিন, যেন আমরা শুধু নিজের সুবিধা নয়, তাঁর সামনে দাঁড়ানোর দিনটিকেও অনুভব করতে শিখি।