এই আয়াতে অবিশ্বাসীদের মুখে এক চেনা অভিযোগ শোনা যায়: “তুমি তো জাদুগ্রস্তদের একজন।” সত্য যখন মানুষের অহংকারের দরজায় কড়া নাড়ে, তখন তারা তার কথা শোনার বদলে তার চরিত্রকে খাটো করতে চায়, তার বাণীকে ব্যাখ্যা না করে তাকে দুর্বল, বিভ্রান্ত, প্রভাবিত—এমন সব শব্দে বেঁধে ফেলতে চায়। যেন সত্যের আলোকে গ্রহণ করা তাদের জন্য পরাজয়, আর অপবাদই তাদের শেষ আশ্রয়। সূরা আশ-শুআরার এই ধারাবাহিকতায় আমরা দেখি, জাতিগুলো নবীদের ডাকে কেবল যুক্তি দিয়ে নয়, কটু সন্দেহ, বিদ্রূপ এবং মানসিক প্রতিরোধ দিয়ে জবাব দিয়েছে; আর এই আয়াত সেই পুরোনো মানবপ্রবৃত্তিরই এক তীক্ষ্ণ ছবি।

‘ٱلْمُسَحَّرِينَ’ শব্দটি শুধু একটি সহজ অপবাদ নয়; এর ভেতরে আছে এমন ইঙ্গিত, যেন তারা নবীর কথাকে স্বাভাবিক, সুস্থ, আল্লাহপ্রদত্ত বিবেকের ফল বলে মানতে প্রস্তুত নয়। বরং তারা এমন দেখাতে চায়, যেন তিনি নিজেই কোনো অদৃশ্য প্রভাবের অধীনে আছেন। এই মানসিকতা খুব পরিচিত: যখন হৃদয় সত্যকে ভালোবাসে না, তখন চোখ সত্যের স্পষ্টতাকেও অস্পষ্ট দেখায়। নবীদের দাওয়াত তো মানুষের রূহকে জাগানোর জন্য; কিন্তু যাদের অন্তর কবরের মতো শক্ত, তাদের কাছে সেই ডাকও বিভ্রান্তির শব্দ বলে মনে হয়। তাই এই আয়াত কেবল একটি ঐতিহাসিক বাক্য নয়, এটি মানুষের আত্মপক্ষ সমর্থনের সেই পুরোনো ভাষা—যে ভাষা সত্যকে অস্বীকার করতে গিয়েও সত্যের সামনে নিজেই নগ্ন হয়ে পড়ে।

ব্রডার কুরআনিক প্রেক্ষাপটে এই অপবাদ দেখা যায় বিশেষ করে মূসা আলাইহিস সালামের দাওয়াতের বিরুদ্ধাচরণে, এবং সূরার ভেতরে আগের উম্মতদের একই মানসিকতা তুলে ধরা হয়েছে। এখানে কোনো নির্দিষ্ট একক সামাজিক ঘটনার খবর দেওয়া হয় না; বরং আল্লাহ সেই সার্বজনীন বাস্তবতাকে সামনে আনেন, যেখানে অহংকার, ক্ষমতার ভয়, অভ্যাসের টান এবং জবাবদিহির আতঙ্ক সত্যকে অপবাদে ঢেকে ফেলতে চায়। কিন্তু আল্লাহর নিদর্শন অপবাদে বদলায় না। নবীর কণ্ঠ জাদু নয়, প্রতারণা নয়, বিকার নয়; তা হল হেদায়েতের আহ্বান, যা মানুষের বিবেককে চেপে ধরা পর্দা ছিঁড়ে ফেলতে চায়। আর যে অন্তর ইনসাফের সাথে শোনে, সে বুঝতে পারে—এটা জাদুগ্রস্ততার নয়, বরং সত্যকে সহ্য করতে না পারার রোগ।

সত্যের কণ্ঠ যখন মানুষের অন্তরের মিথ্যা-সজ্জিত প্রাচীরকে নাড়িয়ে দেয়, তখন অস্বীকারের ভাষা প্রায়ই একরকমই হয়: তারা বাণীর উত্তর দেয় না, বক্তাকে আঘাত করে। এই আয়াতে সেই পুরোনো মানবস্বভাব ধরা পড়ে—নবীর ডাকে তারা আলো খোঁজে না, বরং আলোটাকেই সন্দেহের কাদা ছিটিয়ে ঢাকতে চায়। "তুমি তো জাদুগ্রস্ত"—এ কথা শুধু অপবাদ নয়; এ এক মানসিক প্রতিরক্ষা, যেখানে সত্য গ্রহণ মানে আত্মসমর্পণ, আর অপবাদ মানে অহংকার রক্ষা। মানুষ যখন হিদায়াতকে ভালোবাসে না, তখন সে সত্যের স্পষ্টতাকেও রহস্য বানিয়ে ফেলে।

কিন্তু আল্লাহর বাণী এমন নয় যে, মানুষের কথার ভারে তার দীপ্তি কমে যাবে। নবীদের কাহিনিতে বারবার দেখা যায়, দাওয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ কখনো কবিতা, কখনো জাদু, কখনো উন্মাদনা—কত নামেই না সত্যকে ছোট করতে চেয়েছে। অথচ প্রকৃত জাদু হলো মানুষের হৃদয়, যা অহংকারে এমন বদ্ধ হয়ে যায় যে ন্যায়ের ডাকও তাকে নরম করে না। এই আয়াত আমাদের শেখায়, সত্য সবসময় প্রথমে বাহিরের কানকে নয়, ভেতরের জমিনকেই আঘাত করে; আর যে জমিন অনুর্বর, সেখানে বৃষ্টি নামলেও কাঁটা-ই বেশি জাগে।
তাই এই বাক্য আজও কেঁপে ওঠে প্রতিটি যুগে, প্রতিটি সমাজে, প্রতিটি হৃদয়ে—যেখানে হককে স্বীকার করার বদলে মানুষ অপবাদে আশ্রয় নেয়। নবীর দাওয়াতকে "জাদুগ্রস্ত" বলা মানে হলো, আল্লাহর নিদর্শনের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অক্ষমতাকে আড়াল করা। কিন্তু মুমিন জানে, আল্লাহর সত্যকে মিথ্যার নাম দিয়ে মুছে ফেলা যায় না; বরং সেই অপবাদই শেষে অপবাদদাতার অন্তরের দেউলিয়াপনাকে প্রকাশ করে। এ আয়াত আমাদের থামিয়ে জিজ্ঞেস করে: আমি কি সত্য শুনে নতি স্বীকার করি, নাকি সত্যের মুখে নিজের অহংকার বাঁচাতে এখনো অপবাদই খুঁজি?

মানুষ যখন সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পায়, তখন সে সত্যকে অস্বীকার করার আগে সত্যবক্তাকে ছোট করতে চায়। এই আয়াতে অবিশ্বাসীদের মুখে যে অপবাদ ওঠে, তা কেবল এক ব্যক্তির প্রতি বিদ্রূপ নয়; এটি অহংকারের সেই চিরচেনা ভাষা, যা নবীদের কণ্ঠে আল্লাহর আহ্বান শুনেও নিজের ভেতরের শাসন টিকিয়ে রাখতে চায়। তারা বলে, তুমি তো জাদুগ্রস্তদের একজন। অর্থাৎ, কথাটিকে পরীক্ষা করার সাহস নেই, তাই বক্তাকে সন্দেহের খাঁচায় পুরে রাখা হয়। হৃদয় যখন পাপে শক্ত হয়ে যায়, তখন সত্যের আলোও তার কাছে অসহ্য লাগে; সে আলোকে গ্রহণ করলে আত্মসমর্পণ করতে হবে, আর আত্মসমর্পণ মানে নিজের প্রতিমাকে ভাঙা। তাই সে মিথ্যা ব্যাখ্যা বানায়, অপবাদকে আশ্রয় করে, এবং নিজের অন্ধকারকে বুদ্ধিমত্তা বলে চালাতে চায়।

এই আয়াত আমাদের নিজেদের ভেতরেও প্রশ্ন তোলে: আমরা কি কোনো সময় হকের কথা শুনে তা মানার বদলে বলেছি, এ তো সহজ কথা নয়, এ তো কারও প্রভাবে বলা, এ তো সময়ের সঙ্গে বদলে যাবে? কতবার আমরা সত্যকে তার যুক্তি দিয়ে বিচার না করে, আমাদের স্বার্থ, অভ্যাস, অহংকার কিংবা দলীয় পক্ষপাত দিয়ে বিচার করেছি। অথচ আল্লাহর দাওয়াত মানুষের মতো নয়—এ দাওয়াত আত্মাকে জাগায়, বিবেককে নরম করে, গাফিলতিকে কাঁপিয়ে দেয়। নবীদের কাহিনি আমাদের শেখায়, সমাজ যখন সত্যের সামনে দাঁড়ায়, তখন তার ভাষা দুটোই হতে পারে: হয় বিনয়, নয় অপবাদ। আর যে অন্তর অপবাদকে বেছে নেয়, সে আসলে নিজেরই পরিণতি লিখতে থাকে। আজও মানুষের সামনে সেই একই পথ খোলা আছে: হয় আল্লাহর কথার কাছে ফিরে আসা, নয়তো নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে সত্য থেকে আরও দূরে সরে যাওয়া। শেষ বিচারে মানুষকে তার অপবাদ বাঁচাবে না; তাকে বাঁচাবে শুধু সেই প্রত্যাবর্তন, যেখানে সে নিজের ভুল স্বীকার করে, হৃদয়কে নরম করে, এবং রবের দরবারে ভেঙে পড়ে।

মানুষ যখন সত্যের মুখোমুখি হয়, তখন তার প্রথম প্রতিক্রিয়া অনেক সময় প্রশ্ন নয়, প্রতিরোধ। চোখের সামনে পরিষ্কার নিদর্শন থাকলেও অহংকার আগে মাথা তোলে, তারপর ভাষা খোঁজে—আর সেই ভাষার সবচেয়ে সহজ অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায় অপবাদ। “তুমি তো জাদুগ্রস্তদের একজন”—এ কথা শুধু এক নবীর বিরুদ্ধে বলা কোনো কটু বাক্য নয়; এ হলো সেই পুরোনো হৃদয়রোগ, যা সত্যকে শুনে থামে না, বরং সত্যবক্তাকেই ছোট করে সত্যকে ছোট করতে চায়। মানুষ নিজের ভেতরের অস্বস্তিকে ঢাকতে অন্যের ওপর সন্দেহের চাদর ফেলে দেয়। আল্লাহর বাণী তার স্বরূপে উজ্জ্বল, কিন্তু যে অন্তর নরম নয়, সে আলোকে আলো হিসেবে দেখে না; সে আলোকে আঘাত বলে মনে করে।

এই আয়াত আমাদের সামনে এক ভীতিকর আয়না ধরে। আমরা কি কখনও সত্য শুনে তাকে মাপতে বসেছি, নাকি সত্য আমাদের অভ্যাস, স্বার্থ, অহংকার—এসবকে নাড়া দেওয়ায় আমরা তাকে অস্বস্তিকর বলে দূরে ঠেলে দিয়েছি? নবীদের দাওয়াত এমন ছিল না যে তা মানুষের খেয়াল-খুশির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হবে; বরং তা মানুষকে নিজের সীমা চিনতে বাধ্য করে, নিজেকে ভাঙতে শেখায়, এবং আল্লাহর সামনে নত হতে ডাকে। তাই যারা অন্তরের কুটিলতায় আটকে থাকে, তারা নবীর বাণীকে তুচ্ছ করতে চায়, যেন অস্বীকারের অন্ধকারে তাদের অপরাধ কিছুটা হালকা হয়ে যায়। কিন্তু সত্য অপবাদে মরে না; মরে শুধু তারাই, যাদের অন্তর সত্যকে আশ্রয় দিতে রাজি হয়নি।

হে রব, আমাদের অন্তরকে এমন নিস্তেজ কোরো না, যেখানে সত্য এসে দাঁড়ালে আমরা তাকে সন্দেহ করি। আমাদের জিহ্বাকে এমন নির্মল করো, যাতে আমরা অপবাদ দিয়ে নয়, নম্রতায় বাঁচি; আর আমাদের হৃদয়কে এমন জীবিত করো, যাতে তোমার নিদর্শন দেখেও আমরা বিমুখ না হই। যে মানুষ নিজের ভেতরের অন্ধকারকে চিনতে পারে, সে-ই আসলে আলোর দরজায় পৌঁছায়। এই আয়াত তাই শুধু এক অবিশ্বাসীর কথা শোনায় না; এ আমাদের নিজের আত্মাকে প্রশ্ন করে—আমি সত্যকে গ্রহণ করছি, নাকি নিজের অহংকার বাঁচাতে তাকে অস্বীকার করছি? শেষ বিচারে মর্যাদা তারই, যে আল্লাহর বাণীর সামনে নত হয়। অপবাদ মানুষের মুখে থাকে; হিদায়াত থাকে আল্লাহর হাতে।