আল্লাহ তাআলা এখানে এক শ্রেণির মানুষের পরিচয় খুব সংক্ষিপ্ত, কিন্তু বিদীর্ণকারীভাবে তুলে ধরেছেন: যারা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করে, আর শান্তি স্থাপন করে না। এই বাক্যটি শুধু একটি নৈতিক অভিযোগ নয়; এটি মানুষের অন্তরের রোগের উলঙ্গ চিত্র। ফাসাদ মানে কেবল দাঙ্গা-হাঙ্গামা নয়—এ হলো সত্যকে বিকৃত করা, সম্পর্ককে বিষিয়ে তোলা, ন্যায়ের জায়গায় অন্যায় বসানো, ক্ষমতার জায়গায় জুলুমকে দাঁড় করানো। আর “শান্তি স্থাপন করে না” বলতে বোঝায়, তারা নিজের চারপাশে এমন কোনো কল্যাণ ছড়ায় না, যা ভাঙা মানুষকে জোড়া লাগায়, আহত সমাজকে সান্ত্বনা দেয়, নষ্ট বিবেককে জাগায়। এমন মানুষ বাইরে থেকে কথা বলতে পারে, প্রতিশ্রুতি দিতে পারে, বড় বড় বুলি আওড়াতে পারে; কিন্তু তাদের হাতে কোনো সংশোধন নেই, হৃদয়ে কোনো নির্মলতা নেই।

সূরা আশ-শুআরার এই প্রসঙ্গে পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে মূসা আলাইহিস সালামের দাওয়াত ও ফিরআউনের মুখোমুখি সত্যের দৃশ্য প্রবাহিত হয়েছে। তাই এই আয়াতকে সেই বৃহত্তর বর্ণনার আলোকে বুঝলে আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে: সত্যের আহ্বান যখন আসে, তখন মানুষের সামনে দুই পথ খোলা থাকে—একটি আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন, অন্যটি অহংকারে দাঁড়িয়ে ফাসাদের পথে হাঁটা। আয়াতটি কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার সীমায় আটকে নেই; বরং এটি এক সার্বজনীন নীতির ঘোষণা। যখনই মানুষ আল্লাহর বিধান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন তার সভ্যতা বাহ্যিক চাকচিক্য পেলেও ভেতরে ভাঙন জমে। পরিবারে অবিশ্বাস, সমাজে অবিচার, নেতৃত্বে জুলুম, আর কথার ভেতরে প্রতারণা—এসবই ফাসাদের বিভিন্ন মুখ।

এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে অন্তর কেঁপে ওঠে, কারণ এটি আমাদের কাছে নীরবে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়: আমি কি সংশোধনের মানুষ, না ফাসাদের? আমি কি এমন একজন, যার উপস্থিতিতে অশান্তি বাড়ে, নাকি এমন একজন, যার আচরণে আল্লাহর বান্দারা একটু স্বস্তি পায়? দুনিয়ার বড় বড় ফেতনা অনেক সময় শুরু হয় ক্ষুদ্র অবহেলা থেকে—সত্যকে না বলা, মিথ্যাকে নীরবে প্রশ্রয় দেওয়া, অন্যের হককে তুচ্ছ ভাবা, নিজের স্বার্থে শান্তি ভাঙা। আল্লাহর কিতাব মনে করিয়ে দেয়, মানুষের কাজের মূল্য তার ভেতরের নীতি দিয়ে নির্ধারিত হয়। যে হৃদয় আল্লাহকে ভয় করে, সে ভাঙে না; সে গড়ে। সে কলুষ ছড়ায় না; সে পরিশুদ্ধ করে। আর যে এই নীতির বিপরীতে চলে, তার কণ্ঠ যতই উঁচু হোক, তার কাজের শেষ পরিণতি ফাসাদের অন্ধকারেই ডুবে থাকে।

এই আয়াতের নীরবতা আসলে বজ্রের মতো। আল্লাহ তাআলা অল্প কথায় এমন একটি মানুষকে চিহ্নিত করেন, যার ভিতর জেগে আছে ভাঙার নেশা, আর গড়ার কোনো আগ্রহ নেই। পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা মানে শুধু চোখে দেখা বিশৃঙ্খলা নয়; বরং এমন এক আত্মিক পতন, যেখানে মানুষ সত্যের সামনে নত হতে শেখে না, বরং নিজের প্রবৃত্তিকে সত্যের আসনে বসিয়ে দেয়। তখন তার ভাষা মধুর হলেও অন্তর বিষাক্ত থাকে, তার উপস্থিতি ভদ্র হলেও তার ছায়া কলুষিত হয়। সে সম্পর্কের মধ্যে কাঁটা বোনে, ন্যায়কে দুর্বল করে, ক্ষমতাকে অমানবিক করে, আর কল্যাণের নাম নিয়ে কল্যাণকেই অপমান করে।

আর ‘শান্তি স্থাপন করে না’—এই বাক্যটি যেন হৃদয়ের গহীনে আরও গভীর দাগ কাটে। কারণ শান্তি শুধু যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়; শান্তি হলো হৃদয়ের ভেতর আল্লাহর বিধানের সঙ্গে সুর মেলানো, সমাজে ন্যায়ের ভারসাম্য রক্ষা করা, দুর্বলকে আশ্রয় দেওয়া, বিভেদকে কমানো, এবং মানুষকে আল্লাহমুখী করা। যে ব্যক্তি নিজেই সংশোধনের পথে হাঁটে না, সে অন্যের জন্য সংশোধনের বীজও বপন করতে পারে না। তাই কুরআন আমাদের কেবল অন্যকে চিনতে শেখায় না, নিজের ভেতরের ফাসাদকেও চিনিয়ে দেয়—অহংকার, হিংসা, লোভ, অন্যায় প্রবণতা, মিথ্যার মোহ—এসবই তো সেই অদৃশ্য অনর্থের মুখ।
নবীদের কাহিনি যখন কুরআনে আসে, তখন বোঝা যায় দাওয়াতের আসল মানে কেবল কথা বলা নয়; বরং সত্য দিয়ে ভাঙন সারানো, আল্লাহর পথে ফিরিয়ে আনা, আর অন্ধকারের ভিতর আলো জ্বালানো। মূসা আলাইহিস সালামের দাওয়াতের ধারায় এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ফিরআউনি মানসিকতা সব যুগেই আছে: যারা ক্ষমতা দিয়ে মানুষকে চুপ করাতে চায়, আর নিজেদের জুলুমকেই শৃঙ্খলা বলে চালাতে চায়। কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টিতে তারা সফল নয়; তারা ফাসাদকারী, সংশোধনহীন, জবাবদিহির ভারে নত হওয়ার আগেই যারাও একদিন হিসাবের মুখোমুখি হবে। এই আয়াত তাই শুধু অন্যের জন্য সতর্কবাণী নয়; এটি আমাদের প্রতিদিনের অন্তর-পরীক্ষা: আমি কি অনর্থ বাড়াচ্ছি, নাকি আল্লাহর রহমতের মতো কিছু শান্তি, কিছু ন্যায়, কিছু সংশোধন পৃথিবীতে রেখে যেতে পারছি?

এই আয়াত যেন মানুষের মুখোশ টেনে খুলে দেয়। পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা কেবল রাস্তায় অশান্তি ছড়ানো নয়; কখনও তা হয় কথার বিষ, কখনও সম্পর্কের ভাঙন, কখনও ন্যায়ের নাম করে অন্যায়কে সাজানো। যে হৃদয় আল্লাহকে ভয় করে না, সে নিজের স্বার্থকে সত্যের মতো দেখায়, আর নিজের ক্ষতিকে সমাজের নিয়ম বলে চালাতে চায়। কিন্তু কুরআন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়—এই সব কোলাহল, এই সব জুলুম, এই সব ভাঙচুরের শেষ ঠিকানা আল্লাহর দরবার। সেখানে কোনো দাবি টিকবে না, কোনো সাজানো ভাষণ রক্ষা করবে না। সেখানে প্রকাশ পাবে কে সত্যকে জাগাতে চেয়েছিল, আর কে শুধু ফাসাদের আগুনে নিজের ছায়া লম্বা করেছিল।

আর “শান্তি স্থাপন করে না” বাক্যটি মানুষের আত্মাকে আরও গভীরে নাড়া দেয়। কারণ একজন মানুষ শুধু ক্ষতি না করলেই নির্দোষ হয় না; সে যদি কল্যাণে না দাঁড়ায়, জোড়া লাগাতে না চায়, আহতকে সান্ত্বনা না দেয়, ন্যায়ের পক্ষে না বলে—তবে তার নীরবতাও একধরনের অপচয়। কুরআনের দৃষ্টিতে জীবন মানে কেবল বেঁচে থাকা নয়; জীবন মানে সংশোধন, নির্মাণ, আলোর পক্ষে থাকা। যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে ফিরে আসে, তার হাত শান্তির হাত হয়ে ওঠে, তার কথা প্রশান্তির দরজা খুলে দেয়, তার উপস্থিতি মানুষের মনে ভরসা জাগায়। আর যে ফিরে আসে না, সে হয়তো শক্তিশালী দেখায়, কিন্তু ভেতরে সে ক্রমশ শূন্য হয়ে যায়।

এ আয়াত আমাদের নিজেদের দিকে তাকাতে বাধ্য করে: আমি কি মানুষের মধ্যে ফাসাদ বাড়াচ্ছি, নাকি সংশোধনের অংশ হচ্ছি? আমি কি সম্পর্ক ভাঙছি, নাকি হৃদয় জোড়া লাগাচ্ছি? আমি কি নীরবে অন্যায়ের পাশে দাঁড়াচ্ছি, নাকি সত্যের দিকে ফিরছি? এই প্রশ্নগুলোই ঈমানকে জীবন্ত করে। কারণ শেষ বিচারে মানুষ আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে একা—তার পক্ষে থাকবে না কোনো ভাঙা যুক্তি, থাকবে না কোনো সামাজিক সাফল্য, থাকবে না কোনো কৃত্রিম মর্যাদা। থাকবে শুধু একটি অন্তর: তা কি অনর্থের দাগে কালো, নাকি তাওবার অশ্রুতে ধোয়া? সূরা আশ-শুআরার এই আয়াত আমাদেরকে ভয়ও দেয়, আশা-ও দেয়—ভয় এই জন্য যে ফাসাদ আল্লাহর কাছে ঘৃণ্য; আর আশা এই জন্য যে কেউ যদি ফিরে আসে, আল্লাহর রহমত তার জন্য পথ খুলে দিতে পারে।

আল্লাহর এই বাক্যটি যেন আমাদের বুকের ভেতর নীরবে বাজে: যারা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করে, আর শান্তি স্থাপন করে না। বাহ্যত তারা হয়তো নিজেদের কথাকে বুদ্ধি বলে সাজায়, নিজেদের কর্তৃত্বকে প্রয়োজন বলে দাঁড় করায়, নিজেদের ক্ষতিকে ন্যায্যতা দিতে চায়; কিন্তু আসমানের আদালতে এসব সাজানো মুখোশের কোনো দাম নেই। সত্যের ডাক যখন আসে, তখন মানুষকে ভাঙার জন্য নয়, জোড়া লাগানোর জন্যই আসতে হয়। যে অন্তর আল্লাহকে ভয় করে, সে ক্ষমতা পেলেও জুলুমকে ভালবাসে না; কথা বললেও কাউকে পদদলিত করে না; নিজের লাভ দেখলেও মানুষের দুঃখকে অদৃশ্য করে দেয় না।

এই আয়াত আমাদের চুপ করিয়ে দেয়, কারণ আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে ফাসাদের স্পর্শে আক্রান্ত। কখনো জবানে, কখনো সিদ্ধান্তে, কখনো উদাসীনতায়, কখনো নীরব সমর্থনে আমরা শান্তির পথে দাঁড়াইনি। তাই এখন দরকার আত্মসমালোচনা—আমি কি সংশোধনের মানুষ, নাকি শুধু ভাঙনের অভ্যাস বহন করছি? আমি কি কারও হৃদয়ে সান্ত্বনা হয়েছি, নাকি কেবল তীব্রতা ও অশান্তি বাড়িয়েছি? আল্লাহ আমাদের এমন অন্তর দান করুন, যা ফাসাদকে অপছন্দ করে, সংশোধনকে ভালোবাসে, এবং তাঁর সামনে লজ্জিত হয়ে ফিরে আসে। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষের কথাই নয়, তার কাজই সাক্ষ্য দেবে—সে পৃথিবীতে অনর্থ ছড়িয়েছে, নাকি আল্লাহর রহমতের কোনো শীতল ছায়া হয়ে উঠতে চেয়েছে।