সূরা আশ-শুআরার এই আয়াতে এক ভয়ংকর আত্মতুষ্টির কণ্ঠ শোনা যায়: “আমরা শাস্তিপ্রাপ্ত হব না।” কথাটা শুধু একটি বাক্য নয়; এটি এমন এক অন্তরদৃশ্য, যেখানে মানুষ নিজের পাপ, অবাধ্যতা আর সত্যকে অস্বীকার করার পরও মনে করে—আল্লাহর ন্যায়বিচার যেন পৌঁছাবে না, হিসাব যেন আসবেই না। কুরআন এই উচ্চারণকে আমাদের সামনে এনে দেয় যেন আমরা বুঝি, অবহেলা কত দ্রুত আত্মপ্রবঞ্চনায় পরিণত হয়। যখন হৃদয় সত্যকে গ্রহণ করতে চায় না, তখন সে নিজের জন্য এমন এক নিরাপত্তা-ভ্রম তৈরি করে, যেখানে শাস্তির কথা অবিশ্বাস্য শোনায়, আর জবাবদিহির কথা দূরের কাহিনি মনে হয়। কিন্তু কুরআনের দৃষ্টিতে এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক অন্ধতা: অপরাধী নিজেই নিজের নির্দোষতার সার্টিফিকেট লিখে নেয়।
এই আয়াত যে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এসেছে, সেখানে একের পর এক নবীর দাওয়াতের সামনে তাদের জাতিগুলোর প্রত্যাখ্যান, অহংকার, এবং ভ্রান্ত নিশ্চিন্ততা তুলে ধরা হচ্ছে। সূরা আশ-শুআরার বিশেষ সুরই হলো—নবীদের কাহিনি আমাদের সামনে শুধু ইতিহাস হিসেবে নয়, হৃদয়ের আয়না হিসেবে হাজির করা। এখানে কবিতা, বাগ্মিতা, সামাজিক মর্যাদা, এবং মিথ্যা অভিযোগের আড়ালে সত্যকে আঘাত করার মানুষের চিরন্তন কৌশলও ধরা পড়ে। যারা নবীর সতর্কবার্তা শুনেও বলে, “আমরা শাস্তি পাব না,” তারা আসলে আল্লাহর ক্ষমতাকে ছোট করে দেখে; তারা ভাবে, দুনিয়ার জাঁকজমকই স্থায়িত্বের প্রমাণ। অথচ কুরআন স্মরণ করিয়ে দেয়—শাস্তি অস্বীকার করলেই বিলীন হয় না, আর অবাধ্যতা বারবার উচ্চারণ করলেই সত্য মিথ্যা হয়ে যায় না।
এখানে কোনো বিশেষ একটি কারণ-নাজুলের নির্ভরযোগ্য বর্ণনা না টেনে, কুরআনের সামগ্রিক শিক্ষা আমাদের সামনে মুখ খুলে কথা বলে: ব্যক্তি হোক বা জাতি, যখন তারা সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে, রাসূলের আহ্বানকে তুচ্ছ করে, এবং নিজেদের নিরাপদ ভাবতে থাকে, তখন সেই আত্মবিশ্বাসই তাদের পতনের পূর্বাভাস হয়ে দাঁড়ায়। এই আয়াত আমাদের অন্তরকে জিজ্ঞেস করে—আমি কি কখনও এমন ভেবেছি যে, আমার জন্য হিসাব আলাদা, আমার জন্য অব্যাহতি আছে, আমার ছোট্ট গুনাহগুলো হয়তো ধরাই পড়বে না? কুরআন সেই মায়া ভেঙে দেয়। আল্লাহর পাকড়াও অকারণ নয়, আর তাঁর দয়া শাস্তির চেয়ে বিস্তৃত হলেও তা অবাধ্যতার লাইসেন্স নয়। এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে হৃদয় কেঁপে ওঠে: মানুষ কত সহজে “না” বলে সত্যকে, আর আল্লাহ কত নীরবে তার সমস্ত অস্বীকারকে ঘিরে রাখেন।
“আমরা শাস্তিপ্রাপ্ত হব না”—এই বাক্যটি কেবল এক জাতির উচ্চারণ নয়; এটি মানুষের সেই পুরনো ভ্রান্ত নিশ্চয়তা, যেখানে সে নিজের পাপকে হালকা করে দেখে, আর আল্লাহর ধরাকে দূর মনে করে। হৃদয় যখন সত্যকে ঠেলে সরায়, তখন বিবেককে স্তব্ধ করার জন্য সে নিজেই নিজের কাছে মিথ্যা সান্ত্বনা বানিয়ে নেয়। কুরআন যেন আমাদের দেখায়—অস্বীকার শুধু মুখের কথা নয়, এটি আত্মার এক রোগ; মানুষ জানে, ভেতরে ভেতরে সে সঠিক পথে নেই, তবু সে চায় জবাবদিহির দিনটিকে অবাস্তব বলে মনে করতে। কিন্তু যে সত্তা আকাশ ও পৃথিবীকে ধারণ করেন, তাঁর ন্যায়বিচারকে কেমন করে কেউ অস্পর্শ্য ভাবতে পারে?
তবু এই আয়াতে শুধু ভয় নয়, রহমতের আগেই এক করুণ জাগরণও আছে। আল্লাহ চান না মানুষ নিজের মিথ্যা আশ্বাসে ডুবে যাক; তিনি চান বান্দা হিসাবের কথা স্মরণ করুক, সীমার কথা জানুক, নিজের অবস্থাকে দেখে কেঁপে উঠুক। কারণ যে কেঁপে ওঠে, তার জন্য তওবার দরজা এখনো খোলা। আর যে ‘আমরা শাস্তিপ্রাপ্ত হব না’ বলে বুক ফুলিয়ে থাকে, সে আসলে নিজের হৃদয়ের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে—আল্লাহর শক্তিকে নয়, নিজের অন্ধতাকেই। এই আয়াত তাই আমাদের সামনে এক আয়না রাখে: আমি কি সত্যের সামনে নত, নাকি এখনও মনে মনে ভাবি—জবাবদিহি আমার জন্য নয়? এই প্রশ্নের ভেতরেই ইমান জাগে, ভয় জেগে ওঠে, আর অন্তর আল্লাহর দিকে ফিরে যেতে শেখে।
“আমরা শাস্তিপ্রাপ্ত হব না”—এই বাক্যে কেবল অস্বীকারের ভাষা নেই, আছে আত্মপ্রবঞ্চনার বিষ। মানুষ যখন সত্যকে বারবার দূরে সরায়, তখন হৃদয়ের ভেতর এক অদ্ভুত নিশ্চিন্ততা জন্ম নেয়; সে ভাবে, আমি তো এখনো বেঁচে আছি, আমার উপর কিছুই নেমে আসছে না, অতএব শাস্তির কথাটা যেন কেবল ভয় দেখানো। কিন্তু কুরআন এই ভ্রান্ত আশ্বাসকেই উন্মোচিত করে দেয়। কারণ আল্লাহর ন্যায়বিচার মানুষের কল্পনার দেরির মতো নয়; তিনি অবকাশ দেন, অবহেলা করেন না। অবিশ্বাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ হলো এই ধারণা—জবাবদিহি হয়তো অন্যদের জন্য, আমার জন্য নয়।
সূরা আশ-শুআরার নবীদের কাহিনির ধারায় এই আয়াত আমাদের সামনে এক সমাজচিত্র তুলে ধরে, যেখানে দাওয়াতের ডাকে কান না দিয়ে মানুষ নিজেদের ভেতরেই নিরাপত্তার দুর্গ বানায়। নবীদের কথা শোনার পরও তারা ভাবে, ক্ষমতা, ভিড়, প্রথা, বা নিজেদের জেদ তাদের বাঁচিয়ে দেবে। কিন্তু সত্যের কণ্ঠ একসময় সব আবরণ ছিঁড়ে ফেলে। এখানে কবিতা আর অলংকারের জয় নেই, আছে হৃদয়ের পরীক্ষা; মিথ্যার রং যতই উজ্জ্বল হোক, আল্লাহর সামনে তা মলিন। এই আয়াত তাই শুধু অতীতের কোনো জাতির নয়, আজকের মানুষেরও আয়না—যে সমাজ নৈতিকতাকে দুর্বলতা মনে করে, অন্যায়কে স্বাভাবিক ধরে, আর আল্লাহর সতর্কবাণীকে পিছিয়ে রাখে।
এই বাক্য আমাদের ভেতরে প্রশ্ন জাগায়: আমি কি সত্যিই শাস্তিমুক্ত বলে ভেবে বসেছি? নাকি গুনাহের ওপর পর্দা টেনে নিজেকেই সান্ত্বনা দিচ্ছি? মুমিনের হৃদয় এখানে ভয় ও আশার মাঝখানে দাঁড়িয়ে যায়—ভয়, যেন আল্লাহর অসন্তুষ্টিকে তুচ্ছ না করে; আর আশা, যেন তাঁর রহমত থেকে দূরে না সরে। যে অন্তর নিজের হিসাব নেয়, সে নরম হয়, জেগে ওঠে, ফিরে আসে। আর যে অন্তর বলে ওঠে, “আমরা শাস্তিপ্রাপ্ত হব না,” তার জন্যই এই আয়াতের কাঁপন। কারণ মানুষের শেষ আশ্রয় তার যুক্তি নয়, তার মালিকের দরবার। ফিরে আসার দরজা খোলা আছে, কিন্তু আত্মপ্রবঞ্চনার ঘুম থেকে জাগাই সবচেয়ে জরুরি।
তাই কুরআনের এই সংক্ষিপ্ত বাক্য আমাদের অহংকারকে থামিয়ে দেয়। যে হৃদয় সত্যের ডাক শুনে নরম হয় না, সে একদিন নিজের আত্মপ্রবঞ্চনার সামনে কেঁপে উঠবে। নবীদের কাহিনিগুলো আমাদের ভয় দেখানোর জন্য নয়, জাগিয়ে তোলার জন্য—যাতে আমরা বুঝি, শাস্তি নেই বলে বুক ফুলানো কত সহজ, আর হাশরের দিনে সেই বুকই কত অসহায় হয়ে পড়ে।
আল্লাহ আমাদের সেই অন্ধ নিশ্চিন্ততা থেকে রক্ষা করুন, যেখানে মানুষ নিজের অপরাধকেও নিরাপত্তা ভেবে বসে। আমাদের অন্তরকে এমন তাওফিক দিন, যাতে আমরা দেরি হওয়ার আগেই ফিরে আসি, ক্ষমা চাই, ভেঙে পড়ি, এবং সত্যকে সত্য হিসেবে মেনে নিই। কারণ শাস্তি অস্বীকার করে নয়, বরং আল্লাহর সামনে বিনয়ী হয়ে, চোখের পানি আর তাওবার পথেই বান্দা রক্ষা পায়।