এই আয়াতে কাফিরদের মুখে এমন একটি অবমাননাকর কথা শোনা যায়, যা যুগে যুগে একই রূপে ফিরে আসে: নবীর বাণীকে তারা নতুন সত্য হিসেবে গ্রহণ করতে চায় না, বরং তাকে নামিয়ে আনে পুরনো অভ্যাস, লোকচলতি কথা, আগের লোকদের চালচলন ও পুনরাবৃত্তি হিসেবে। অর্থাৎ, তারা বার্তাটির ওজনকে অস্বীকার করতে চায় শব্দের আড়ালে। আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা দাওয়াতকে যখন মানুষ ‘এ তো পুরনো কথা’ বলে হালকা করে, তখন প্রকৃতপক্ষে তারা সত্যকে খণ্ডন করছে না; তারা নিজেদের হৃদয়ের সংকীর্ণতাকে প্রকাশ করছে। কারণ সত্য পুরনো হয় না, সত্যের আলোকে শুধু অন্ধ চোখই ধুলোমাখা বলে মনে করে।
সূরা আশ-শুআরার এই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন নবীর কাহিনি একের পর এক আসে, যেন বোঝানো হয়—অস্বীকৃতির ভাষা ভিন্ন হলেও অন্ধকারের স্বভাব একই। কেউ বলে জাদু, কেউ বলে কবিতা, কেউ বলে আগেকার গল্প, কেউ বলে লোকজ অভ্যাস; কিন্তু এই সব কথার ভেতরে যে মূল জেদ, তা হলো হিদায়াতের সামনে নত না হওয়ার অহংকার। এখানে কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক sabab al-nuzul নিশ্চিতভাবে বর্ণিত না হলেও আয়াতের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট স্পষ্ট: মক্কার মুশরিকরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তাওহীদের আহ্বানকে ভাঙতে, ছোট করতে ও মানসিকভাবে তুচ্ছ করতে চেয়েছিল। তারা বুঝতে চাইত না যে নবীর কণ্ঠ পুরনো যুগের প্রতিধ্বনি নয়; তা আল্লাহর পাঠানো জীবন্ত ডাকে পরিণত হয়, যা মানুষের অন্তরকে জাগিয়ে তোলে, তার নাফসকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়, এবং তার গোপন অহংকারকে নগ্ন করে দেয়।
এই আয়াত হৃদয়কে সতর্ক করে: সত্যকে যদি আমরা আগেভাগেই ‘চেনা’ বলে উপেক্ষা করি, তবে হয়তো নতুন কিছু প্রত্যাখ্যান করছি না—বরং আল্লাহর হিদায়াতকে বারবার হারিয়ে দিচ্ছি। মানুষ অনেক সময় সত্যের বিরুদ্ধে তর্ক করে না, শুধু তাকে গুরুত্বহীন বানিয়ে দেয়; আর গুরুত্বহীন বানানোর এই কৌশলই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ যে অন্তর আল্লাহর বাণীকে ‘কথাবার্তা’ বলে ঠেলে দেয়, সে অন্তর ধীরে ধীরে নিজের অন্ধকারকেই নরম কম্বলের মতো বুকে জড়িয়ে নেয়। এই আয়াত আমাদের শেখায়, নবীদের ডাক কোনো সময়ের ফ্যাশন নয়, কোনো জাতির পুরনো বয়ানও নয়—এটি স্রষ্টার পক্ষ থেকে বান্দার প্রতি চিরন্তন প্রশ্ন: তুমি কি সত্যের সামনে মাথা নত করবে, নাকি পুরনো অজুহাতের আড়ালে নিজেকে বাঁচাবে?
নবীদের কণ্ঠে যখন সত্য নেমে আসে, তখন অস্বীকারকারীদের প্রথম আশ্রয় হয় ভাষার অবমূল্যায়ন। তারা বলে, এসব তো আগের লোকদের কথাবার্তা, পুরনো অভ্যাস, চেনা বুলি—যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা আলোকে কেবল মানুষের মুখের ধুলোয় ঢেকে দেওয়া যায়। কিন্তু সত্য কি সময়ের সঙ্গে পুরনো হয়? না, পুরনো হয় মানুষের অন্তরের চোখ; আর যে হৃদয় অহংকারে জড়সড়, সে নতুন সূর্যকেও এক পুরনো ছায়া বলে মনে করে। এই আয়াত আমাদের সামনে উন্মোচন করে এক গভীর মানবিক প্রতারণা: মানুষ সত্যের ওজন সহ্য করতে না পেরে তাকে হালকা করতে চায়।
তাই এই আয়াত আমাদের নিজের ভেতরেও প্রশ্ন তোলে—আমি কি কোনো সত্যকে এমনভাবে ‘চেনা’ বলে উড়িয়ে দিই? আমি কি নসিহতকে পুরনো, হিদায়াতকে সাধারণ, কুরআনকে শুধু শুনে যাওয়া শব্দে নামিয়ে আনি? যদি তা করি, তবে আমরাও সেই পুরনো অন্ধত্বেরই উত্তরাধিকার বহন করি। কিন্তু যে অন্তর বিনয়ী, সে জানে: আল্লাহর কথা কখনো পুরনো নয়; বরং প্রত্যেক যুগে, প্রত্যেক হৃদয়ে, তা নতুনভাবে নেমে আসে। সত্যের সামনে নত হওয়াই মানুষের সৌন্দর্য, আর সত্যকে ছোট করে দেখাই তার পতন।
নবীর আহ্বান যখন কানে আসে, তখন হৃদয়ের ভেতরে এক অদ্ভুত পরীক্ষা শুরু হয়। যে মানুষ সত্যের সামনে নত হতে চায় না, সে প্রথমে সত্যকে অস্বীকার করে না—সে তাকে ছোট করে দেখায়, তাকে ‘পুরনো কথা’ বলে হালকা করে দেয়, যেন আকাশের বার্তাকেও মাটির ধুলোর মতো উড়িয়ে দেওয়া যায়। এই আয়াত সেই আত্মপ্রবঞ্চনার মুখোশ খুলে দেয়। কারণ আল্লাহর বাণী কখনো পুরনো হয় না; পুরনো হয় শুধু মানুষের গাফিলতি, আর তার সঙ্গে জমে ওঠা অহংকার।
সমাজ যখন আল্লাহর ডাকে সাড়া না দিয়ে বারবার একই অজুহাতে আশ্রয় নেয়, তখন বুঝতে হবে হৃদয়ের পর্দা ঘন হয়ে গেছে। কেউ বলে কাব্য, কেউ বলে লোককথা, কেউ বলে আগেকার অভ্যাস—কিন্তু সব কথার নিচে লুকিয়ে থাকে একটিই ভয়: যদি এই বাণী সত্য হয়, তবে আমাকে নিজের জীবন বদলাতে হবে। আর এখানেই পরীক্ষার মূল: আমরা কি সত্যের সামনে নিজেকে বদলাব, নাকি সত্যকেই আমাদের আরামদায়ক অস্বীকৃতির ছাঁচে ঢালার চেষ্টা করব?
এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দাওয়াতকে অবজ্ঞা করা সহজ; কিন্তু আল্লাহর দরবারে সেই অবজ্ঞার জবাব কঠিন। প্রতিটি হৃদয় একদিন নিজের কথার হিসাব দেবে, নিজের শুনে-না-শোনা, মানে-না-মানা, ভালোবেসে-না-নমা সবকিছুর হিসাব দেবে। তাই ভয়ও আছে, আশা-ও আছে: ভয় এই যে, সত্য এসে দরজায় কড়া নাড়ার পরও যদি আমরা তাকে ‘পুরনো কথা’ বলে ফিরিয়ে দিই; আর আশা এই যে, যে হৃদয় একবার বিনয়ের সঙ্গে শুনতে শেখে, তার জন্য আল্লাহর আলো কখনো দেরি করে না।
মানুষের অহংকার সত্যকে কত সহজে ছোট করে ফেলে! আজও সে একই মুখোশ পরে ফিরে আসে—কখনো বলে “পুরনো কথা”, কখনো বলে “এই তো সবার জানা”, কখনো বলে “এতে নতুন কী আছে?” কিন্তু আল্লাহর বাণী পুরনো হয় না; পুরনো হয় মানুষের হৃদয়ের অন্ধত্ব। যে অন্তর আলোকিত, তার কাছে কুরআনের একটি আয়াতও পাহাড়ের মতো ভারী; আর যে অন্তর বিদ্রূপে আচ্ছন্ন, তার কাছে আসমানের কথা-ও লোককথা বলে মনে হয়।
এই আয়াত আমাদের সামনে এক তীক্ষ্ণ আয়না ধরে দেয়: আমি কি সত্যের সামনে নরম হচ্ছি, নাকি নিজের জেদকে বাঁচাতে সত্যকে হালকা করে বলছি? নবীদের দাওয়াতকে যেদিন মানুষ পুরনো অভ্যাস বলে উড়িয়ে দেয়, সেদিন সে শুধু বার্তাকে প্রত্যাখ্যান করে না—নিজের মুক্তির দরজাও নিজের হাতেই বন্ধ করে দেয়। তাই আজ যদি হৃদয়ে সামান্যও জীবনের আলো চাই, তবে একবার বিনয় নিয়ে বলি: হে আল্লাহ, আমার ভিতরের অস্বীকার ভেঙে দাও; আমাকে এমন হৃদয় দাও, যা তোমার সত্যকে নতুন করে নয়, সত্য হিসেবে চিনতে শেখে।