সূরা আশ-শুআরার এই আয়াতে একটি নরম কিন্তু কাঁপিয়ে দেওয়া প্রশ্ন জেগে ওঠে: তোমাদেরকে দিয়েছেন চতুষ্পদ জন্তু ও পুত্র-সন্তান। বাহ্যত এ তো সমৃদ্ধি, জীবনের ছায়া, ঘরের উষ্ণতা, জীবিকার প্রশস্ততা। কিন্তু কুরআন এখানে ধন-সম্পদের প্রশংসা করতে চায় না; বরং স্মরণ করিয়ে দেয় যে, এগুলো কারও কৌশল, প্রতিভা বা বংশগৌরবের ফল নয়। এগুলো আল্লাহর দান—একটি আমানত, যা মানুষকে ফুলিয়ে তোলে, আবার বিনয়ের পরীক্ষাও নেয়। যাকে দেওয়া হয়েছে, সে যদি মনে করে আমি নিজেই যথেষ্ট, তাহলে সেই নিয়ামতই তার অন্তরে অহংকারের আগুন জ্বালাতে পারে। আর যে হৃদয় জানে “তিনি দিয়েছেন”, তার কাছে একই নিয়ামত কৃতজ্ঞতার অশ্রু হয়ে ঝরে।
সূরা আশ-শুআরার বৃহত্তর ধারাবাহিকতায় এ আয়াত নবি হূদ আলাইহিস সালামের আহ্বানের অংশ। ‘আদ জাতির কাছে তিনি সত্যের ডাক নিয়ে এসেছিলেন, আর তারা শক্তি, ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের মোহে মুগ্ধ ছিল। এমন সমাজে মানুষ অনেক সময় নিজের গোত্র, তার সন্তান-সন্ততি, পশু-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তিকে নিরাপদ আশ্রয় ভাবে; মনে করে, এত কিছু থাকলে আল্লাহর ডাককে অস্বীকার করলেও চলে। কুরআন সেই ভ্রান্ত ভরসার ভিত নাড়িয়ে দেয়। সে বলে: তোমাদের চারপাশের এই সমৃদ্ধি তোমাদের স্বাধীনতার সনদ নয়, বরং প্রভুর অনুগ্রহের সাক্ষ্য। আর অনুগ্রহ যখন হেদায়েতের সামনে দাঁড়ায়, তখন তাকে অহংকার নয়, শোকর শোভা দেয়।
এই আয়াতের হৃদয়ভেদী শিক্ষা হলো: জীবনকে যে জিনিসগুলো টিকিয়ে রাখে বলে আমরা ভাবি—উট, গৃহপালিত পশু, সন্তান, ঘর-সংসার, পারিবারিক শক্তি—সেগুলিও আল্লাহর কুদরতের প্রকাশ। সন্তান মানুষকে আনন্দ দেয়, উত্তরাধিকার দেয়, আশ্রয়ের অনুভব দেয়; পশু-সম্পদ দেয় চলাচল, খাদ্য, উপার্জন, সামাজিক মর্যাদা। কিন্তু এসবের কোনোটিই চূড়ান্ত ভরসা হতে পারে না। আজ যার হাতে আছে, কাল তা পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই এই আয়াত আমাদের শেখায়, নিয়ামতকে মালিকানা নয়, দান হিসেবে দেখতে; গর্ব নয়, কৃতজ্ঞতা হিসেবে বাঁচতে; আর হৃদয়ের সমস্ত নিরাপত্তা মানুষের হাতে নয়, বরং একমাত্র আল্লাহর হাতে সমর্পণ করতে।
যে নিয়ামতের নাম এখানে উচ্চারিত হয়, তা খুব সাধারণ শোনালেও তার ভেতরে লুকিয়ে আছে জীবনের বড় এক সত্য: চতুষ্পদ জন্তু আর পুত্রসন্তান—মানুষের হাতে বানানো কোনো সুরক্ষাকবচ নয়, এগুলো আল্লাহর দান। মরুভূমির সমাজে পশুই ছিল জীবিকা, শক্তি, চলার ভরসা; আর সন্তান ছিল বংশ, সম্মান, ভবিষ্যৎ—অর্থাৎ দুনিয়ার দৃশ্যমান ভরকেন্দ্র। তাই এই আয়াত যেন নিঃশব্দে বলে, তোমাদের যা কিছু আছে, তা তোমাদের শক্তি নয়; তা তোমাদের রবের অনুগ্রহ। যে হৃদয় এই সত্য ভুলে যায়, সে নিয়ামতের দিকে তাকিয়ে আল্লাহকে ভুলে যায়। আর যে হৃদয় কৃতজ্ঞ, সে একই সম্পদে সিজদার স্বাদ খুঁজে পায়।
যে ব্যক্তি নিয়ামতকে মালিকানা ভেবে বসে, তার অন্তর পাথর হয়ে যায়; আর যে ব্যক্তি তা আমানত মনে করে, তার চোখে দুনিয়া ছোট হয়ে আসে, আখিরাত বড় হয়ে ওঠে। এই আয়াত আমাদের শেখায়, নিয়ামতের প্রকৃত পরীক্ষা অভাবের দিনে নয়, প্রাচুর্যের দিনে। পশু-সম্পদ ও সন্তান—দুটোই আল্লাহর রহমতের প্রকাশ, আবার একইসঙ্গে আত্মাভিমান ভাঙার কুঠার। তাই মুমিনের জীবন এমন হওয়া উচিত, যেখানে প্রতিটি ভোগের ভেতরে কৃতজ্ঞতার কাঁপন থাকে, আর প্রতিটি প্রাপ্তির ভেতরে এই বোধ জেগে থাকে: আমাকে দেওয়া হয়েছে, আমি নিজে কিছুই দিইনি।
তোমাদেরকে দিয়েছেন চতুষ্পদ জন্তু ও পুত্র-সন্তান—এই একটি বাক্যের মধ্যেই কত ঘরের ছবি, কত বেঁচে থাকার আয়োজন, কত অহংকারের নীরব ভিত্তি ভেঙে পড়ে। মানুষ যখন সম্পদকে নিজের কৃতিত্ব ভাবে, সন্তানকে নিজের স্থায়িত্ব মনে করে, তখন সে ভুলে যায়—যা দিয়ে সে নিজেকে নিরাপদ ভাবছে, সেটিও তার হাতে গড়া নয়; সবই আল্লাহর দান। জীবনের বাহ্যিক সমৃদ্ধি অনেক সময় অন্তরের জন্য সবচেয়ে সূক্ষ্ম ফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়: ভরাট ঘর, বিস্তৃত জীবিকা, আশপাশে সন্তান-সন্ততির কোলাহল—সব মিলিয়ে মনে হয়, আমরা বুঝি অটুট। অথচ কুরআন আমাদের জাগিয়ে দেয়, এই অটুটতার অনুভূতিটাই সবচেয়ে অনিশ্চিত।
সূরা আশ-শুআরার এই ধারায় নবীদের কাহিনি আমাদের শেখায়, সত্যের দাওয়াত কখনো শূন্য হাতে আসে না; তার সঙ্গে থাকে আল্লাহর ক্ষমতার সাক্ষ্য, আর মানুষের হৃদয়ের পরীক্ষা। যে জাতি বাহ্যিক প্রাচুর্যে মাতোয়ারা, সে অনেক সময় ভাবে—আমাদের তো অভাব নেই, সুতরাং হেদায়েতের প্রয়োজনও নেই। কিন্তু আল্লাহর দেওয়া পশুসম্পদ ও সন্তানসন্ততি আশ্রয় নয়; এগুলো কেবল পথের সাময়িক সঙ্গী, কৃতজ্ঞতার দায়, জবাবদিহির স্মারক। এগুলোকে কেন্দ্র করে যদি হৃদয় আল্লাহকে ভুলে যায়, তবে নিয়ামত নিজেই বিপরীতে পরিণত হয়; আর যদি মানুষ বলে, ‘তিনি দিয়েছেন’, তবে ধন-সন্তানও ইমানের নরম আলো হয়ে ওঠে।
এই আয়াত তাই অন্তরে এক নীরব কাঁপুনি জাগায়: আমি কি যা পেয়েছি তা দিয়ে নিজেকে বড় ভাবছি, নাকি তা আমাকে মালিকের দিকে আরও বিনয়ী করে তুলছে? শেষ পর্যন্ত আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই সত্তার কাছে, যিনি দিয়েছেন, যিনি বাড়িয়েছেন, যিনি এক নিমিষে কাড়তেও পারেন, আবার রহমতের দরজা খুলেও দিতে পারেন। বাহ্যিক সমৃদ্ধি থাকলেও হৃদয় যদি কৃতজ্ঞ না হয়, তবে সে সমৃদ্ধি মরিচিকার মতো; আর অভাব থাকলেও হৃদয় যদি আল্লাহকে চিনে, তবে সেটাই সত্যের দরজা। এই আয়াত আমাদের শেখায়—নিয়ামতকে উপভোগ করো, কিন্তু মালিক ভুলো না; সন্তানকে ভালোবাসো, কিন্তু তার মধ্যেও আল্লাহর আমানত দেখো; জীবনকে সাজাও, কিন্তু কিয়ামতের হিসাবকে আরও গভীরভাবে স্মরণ করো।
এজন্য এই নিয়ামতকে সত্যের সামনে ঢাল বানানো যায় না। সম্পদ থাকলে কি সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া যায়, সন্তান থাকলে কি আল্লাহর ডাককে অস্বীকার করা যায়? না, বরং যার ঘর ভরে গেছে অনুগ্রহে, তার অন্তর ভরে যাওয়া উচিত বিনয়ে। কারণ এসব দান একদিন পরীক্ষায় পরিণত হবে—কৃতজ্ঞতা আছে কি না, নরম হৃদয় আছে কি না, আল্লাহর দিকে ফেরার সাহস আছে কি না। সন্তান, সম্পদ, নিরাপত্তা—সবই যখন তাঁরই হাতে, তখন বান্দার জন্য একমাত্র শোভা হলো মাথা নত করা।
আজ এই আয়াত আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে: তুমি কি পেয়েছ, নাকি তোমাকে দেওয়া হয়েছে? যদি সত্যিই বুঝতে পারো যে দেওয়া হয়েছে, তবে অহংকার গলে যাবে, বুক নরম হবে, আর তওবার দরজা আপনিই খুলে যাবে। যে হৃদয় নিজেকে মালিক ভাবে, সে অন্ধ; আর যে হৃদয় মালিককে চিনে, সে শান্ত। তাই এই দানগুলোর দিকে তাকিয়ে শুধু আনন্দ নয়, লজ্জাও আসুক—আমি কি এমন দাতার সামনে কৃতজ্ঞ হতে পেরেছি? আমি কি সত্যকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দিয়েছি? সূরা আশ-শুআরা আমাদের সেই ভয়াবহ অথচ করুণ সত্যের দিকে ফেরায়: মানুষের হাতে যা আছে, তা শেষ পর্যন্ত মানুষের নয়; সবই আল্লাহর, আর তাঁরই কাছে ফিরে যেতে হবে।